When Memories Fade। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা

বাঙালি এমনিতে স্মৃতিকাতর জাতি। তাই বাঙালিরা ‘স্মৃতি’– এই নাম রাখতে ভালোবাসে। স্মৃতিকণা– এই নামও শুনেছি। কী অর্থ? স্মৃতির কণা। এককণা স্মৃতি? যদি আর কিছু না-থাকে তাহলে স্মৃতিটুকু থাক। এককণা স্মৃতি থাকুক। তাই হবে। বাঙালির বিশ্বকবির গানে আছে ‘তবু মনে রেখো’। বিশ্বকবি বাঙালিকে অনেক কিছু দিয়েছেন। গান দিয়েছেন। বাড়ির নাম দিয়েছেন। শান্তিনিকেতনে কত বাড়ি কবির বাণী নাম হিসেবে বহন করছে। একটি-দু’টি বাড়ির নাম কি আর ‘তবু মনে রেখো’ হবে না!

শেষ আপডেট: মে ১১, ২০২৬, ১২:০০   
Facebook WhatsApp Messenger

২.

স্মৃতি মন্ডলকে চেনেন?

কী বললেন? আপনাদের পাড়ায় থাকতেন, এখন চলে গিয়েছেন। কোথায় গেলেন? হায়দরাবাদ! ভালো। হায়দরাবাদে চাকরিটা নিশ্চয়ই স্থিতিশীল। আচ্ছা, খোঁজ নিয়ে নিচ্ছি। স্মৃতি মন্ডল তো চেনা নাম।

আমাদের মনে হয়, অনেক স্মৃতি মন্ডলই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। আপনাদের পাড়ার মেয়ে স্মৃতি মন্ডল তাঁদেরই একজন। কী যেন নাম আপনাদের পাড়ার? বাগানপাড়া। নামটা কিন্তু বেশ! বামুনপাড়া, বদ্যিপাড়া, গয়লাপাড়া– এইসব বৃত্তিভিত্তিক নাম নয়, জাতপাতের গল্প নয়, ফুলের গল্প ফলের গল্প। বাগানে তো নানারকম ফুল-ফলের গাছ থাকে। যাক গে, স্মৃতির কথায় ফেরা যাক।

বাঙালি এমনিতে স্মৃতিকাতর জাতি। তাই বাঙালিরা ‘স্মৃতি’– এই নাম রাখতে ভালোবাসে। স্মৃতিকণা– এই নামও শুনেছি। কী অর্থ? স্মৃতির কণা। এককণা স্মৃতি? যদি আর কিছু না-থাকে তাহলে স্মৃতিটুকু থাক। এককণা স্মৃতি থাকুক। তাই হবে। বাঙালির বিশ্বকবির গানে আছে ‘তবু মনে রেখো’। বিশ্বকবি বাঙালিকে অনেক কিছু দিয়েছেন। গান দিয়েছেন। বাড়ির নাম দিয়েছেন। শান্তিনিকেতনে কত বাড়ি কবির বাণী নাম হিসেবে বহন করছে। একটি-দু’টি বাড়ির নাম কি আর ‘তবু মনে রেখো’ হবে না! হবে, হতেই হবে। সে বাড়ির নাম স্মৃতিকণা রাখা চলে, ‘তবু মনে রেখো’-র বদলে বেশ স্মৃতিকণা। স্মৃতির একটি কণা আমার জন্য থাক। তাই তো গানের আবেদন ‘তবু মনে রেখো।’

স্মৃতি সচরাচর মেয়েদের নাম। ছেলেদের নাম স্মৃতি দিয়ে রাখতে গেলে স্মৃতির সঙ্গে পরপদ হিসেবে কিছু একটা যোগ করতেই হয়। ‘স্মৃতিময়’ ছেলেদের বেশ নাম। ছেলেরা তো সবাই দুষ্মন্ত নয়। তাদের ওপরে দুর্বাসার অভিশাপ নেমে আসে না। শকুন্তলাকে তারা সবাই ভুলে যাবে, এমন না-ও হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ, ‘তবু মনে রেখো’-র রবীন্দ্রনাথ, এক স্মৃতিময় একলা পুরুষের কথা লিখেছিলেন। তাঁর গল্প আপনারা ‘বাঁশি’ কবিতায় পড়েছেন। কিনু গয়লার গলিতে সে থাকে। ভাড়া বাড়িটি ঠিক যেমন হয় তেমনই। রাস্তার ওপরে দোতলা বাড়ির একতলা ঘর। লোনা পড়া দেওয়াল। বালি ধসা। স্যাঁতা পড়া দাগ। সদাগরি অফিসের কনিষ্ঠ কেরানি, এই ঘরে তার থাকা। সঙ্গী এক টিকটিকি। সন্ধেবেলা ২৫ টাকা মাইনের কেরানিটি শিয়ালদহ স্টেশনে সময় কাটায়। ইলেকট্রিকের খরচ বাঁচে। বেচারা, নিজের অস্তিত্বকে কুণ্ঠিত গোপনীয়তায় ঢেকে রাখা এই মানুষটি গিয়েছিল ধলেশ্বরী নদীতীরে পিসিদের গ্রামে। সেখানে তার পিসি বিয়ের সম্বন্ধ করেছিল তার। শুধু কেরানিটি পালিয়ে আসে। বিয়ে করার মুরোদ নেই তার। দত্তবাবুদের বাড়িতে ছেলেকে পড়িয়ে খেতে পায় যে, সে আর কেমন করে মেয়েটির ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নেয়। এই কাপুরুষতাই, এই পালিয়ে আসাই তার নিয়তি। তবে তার মনের কথাটিকে রবি ঠাকুর বাঙালি কেরানিদের জন্য অমর করে রেখেছেন।

‘ধলেশ্বরী নদীতীরে পিসিদের গ্রাম।
তাঁর দেওরের মেয়ে,
অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।
লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল—
সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।
মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,
আমি তথৈবচ।
ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া–
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
‘ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া–/ পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর।’

মনে নিত্য আসা-যাওয়া মানে পিসির দেওরের মেয়ে রয়ে গেল তার স্মৃতিতে। এই কেরানিটির নাম দিতে ইচ্ছে করে স্মৃতিময়। স্মৃতিময় বেচারা বাঙালি পুরুষদের নাম।

যাই হোক, আবার স্মৃতি মন্ডলের কথায় আসি। কেন বলছি স্মৃতি মন্ডলের কথা বারবার, এবার হয়তো বুঝতে পারবেন। আমি ঠিক স্মৃতি মন্ডলের কথা বলছি না, আমি বলছি ‘স্মৃতিমণ্ডল’-এর কথা। কিছু বুঝলেন? দেখুন বানানটা আপনার চোখের সামনে বদলে দিলাম। মন্ডল নয়, লিখছি মণ্ডল। মণ্ডল মানে গোল। স্মৃতিমণ্ডল মানে গোলাকার এক পদার্থ, যার মধ্যে স্মৃতি থাকে। স্মৃতি মানে মেমারি। ওই যে ডাক্তারবাবুকে গিয়ে বলেন, ‘একটা ওষুধ দিন মেমারি লস হচ্ছে।’ সেই মেমারি, স্মৃতি। তা থাকে স্মৃতিমণ্ডলের ভিতরে। স্মৃতির গোলক হচ্ছে আপনার মাথা। ডাক্তারবাবুকে জিগ্যেস করলেই জানতে পারবেন স্মৃতি বুকে থাকে না, মাথার ভিতরে থাকে। তাই স্মৃতির গোলক, আপনার মাথা, তারই ভালো নাম ‘স্মৃতিমণ্ডল’। শুধু আপনারই বা কেন হবে, আমার আপনার সকলের মাথার নাম ‘স্মৃতিমণ্ডল’। স্মৃতি নামের মন্ডল পদবিধারী মেয়ের কথা বলছি না, বলছি এক সমাসবদ্ধ পদের কথা। স্মৃতিমণ্ডল।

zoom
শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

জানেন, আমাদের কোম্পানি একটি নতুন জিনিস বাজারে আনতে চলেছে। এই জিনিসটি আনার আগে কোম্পানি আপনাদের মাথার নতুন নাম স্থির করেছে। সেই নাম ভারতবর্ষীয়। সেই নামটি হল ‘স্মৃতিমণ্ডল’। আপনারা বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে বসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতি সন্ধেবেলা মাথায় হাত বুলবেন। না না, অপরের মাথায় নয়, নিজের নিজের মাথায় হাত বোলাতে হবে। বোলাবেন আর বলবেন এই মন্ত্র: ‘সর্বভূতে বিদ্যমান অঙ্গশ্রেষ্ঠ স্মৃতিমণ্ডলায় নমঃ। নমঃ মণ্ডল নমঃ মণ্ডল নমঃ মণ্ডল।’ এই মন্ত্র দশবার বলার পর ঘরের আলো নিভিয়ে দেবেন। চুপ করে চোখ বন্ধ করে আধঘণ্টা বসে থাকবেন। দেখবেন আপনাদের মাথাটি আপনাদের কাছে ক্রমশই দামি হয়ে উঠছে। আপনারা মাথার বদলে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ‘স্মৃতিমণ্ডল’ বলে ভাবতে পারছেন। এইভাবে মাস ছয়েকের অনুশীলন ও মন্ত্র পাঠের পরে যখন আপনার মাথাটিকে ‘স্মৃতিমণ্ডল’ বলে ভাবতে আর বিন্দুমাত্র অসুবিধে হবে না, তখন আমাদের কোম্পানি আপনাদের দেবে সম্পূর্ণ বিনাপয়সায় ‘স্মৃতিমণ্ডল’-এর জন্য একটি টুপি!

তা পরলেই আশ্চর্য এক কাণ্ড হবে। ওই যে ফোনে আজকাল ‘ডিজঅ্যাপিয়ারিং মেসেজেস’ বলে একটা ব্যবস্থা থাকে তেমনই এই টুপি পরলেই স্মৃতিমণ্ডল থেকে প্রতি সাতদিন অন্তর সাতদিনের স্মৃতি মুছে যাবে। স্রেফ হারিয়ে যাবে। মনে থাকবে না। এর সুফল অনেক। যেমন ধরুন, এই সপ্তাহে আপনি পরীক্ষায় ব্যাক পেয়েছেন, মনে কষ্ট। সেই কষ্ট থেকে আপনি মুক্তি পেলেন। এই ধরা যাক, একটি পুরুষ বা একটি মেয়ে প্রেম করছে সেই প্রেমের স্মৃতি, টুপি পরলেই স্মৃতিমণ্ডল থেকে সপ্তাহান্তে মুছে যাবে। ফলে জামা-কাপড়ের মতো প্রেমিক-প্রেমিকা বদল করতে পারবেন। খুনির আত্মগ্লানি এক সপ্তাহের বেশি থাকবে না। ফলে সে ঘন ঘন প্রতি সপ্তাহে খুন করতে পারবে। আজকাল তো ‘পার্টি-পলিটিক্স’-এর জন্য মাঝে মাঝেই খুন করতে হয়। স্মৃতি নেই যখন, নীতিও থাকবে না। বেশ একটা যা-ইচ্ছে-তাই অবস্থা। স্মৃতিই তো যত নষ্টের গোড়া।

আপনারা কী ভীষণ কর্মময় হয়ে উঠবেন। একটানা কাজ করতে পারবেন। দেশান্তরে শ্রমিকদের আর বাড়ির জন্য কষ্ট থাকবে না। তাই বলছিলাম– স্মৃতিমণ্ডলকে চিনুন। আমাদের মাথার আরেক নাম– স্মৃতিমণ্ডল। সেখানে নিকট ভবিষ্যতে আমাদের কোম্পানি-নির্মিত বাজারজাত টুপি পরুন। স্মৃতির দোটানা থেকে বাঙালির মুক্তি হোক। ‘তবু মনে রেখো’ বাড়িগুলি আমরা ভেঙে ফেলি। নতুন নতুন বাড়ি বানাই। টাকা রোল করুক। এ জগৎ এক মহা কর্মশালা। প্রতি সাতদিন অন্তর স্মৃতি মুছে যাক।

‘সর্বভূতে বিদ্যমান অঙ্গশ্রেষ্ঠ স্মৃতিমণ্ডলায় নমঃ।’ স্মৃতিমণ্ডলে টুপি পরুন। মন্ডল পদবি আমরা ‘ন’ দিয়ে লিখতে চাই। কারণ মণ্ডল বলতে আমরা স্মৃতিমণ্ডলকে বোঝাই। ‘ণ’ পদবির জন্য বরাদ্দ করা হবে না। এটা নতুন ‘স্মৃতিমণ্ডল কমিশন’-এর বিধান। সরকার নয়, রাষ্ট্র নয়, কোম্পানিই কমিশন দেবে। স্মৃতিমণ্ডলে টুপি পরাবে। আপনারা আমাদের স্মৃতিমণ্ডল দিন, আমরা আপনাদের স্মৃতিলোপী টুপি দেব।

পড়ুন সিরিয়ালসি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …

১. এই বঙ্গে যা যা চাই!

Memory Memory Lost memory police Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar বাঁশি

Share this article on