Robbar

যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 10, 2026 4:56 pm
  • Updated:February 10, 2026 4:58 pm  

লালচে হয়ে যাওয়া ঝুরঝুরে কাগজে ছাপা কিছু ঝাপসা ফটোগ্রাফ, মিশরের অপূর্ব কাজ করা একটা চামড়ায় বাঁধানো অ্যালবামে সাঁটা, আমার দেরাজে আজও রাখা আছে। কবে একটা অকারণ যুদ্ধ এসে মানুষের ঘরবাড়ি প্রাণ স্মৃতি ভেঙেচুরে ছিতছাতুর করে দিয়েছিল তার একটা ম্লানচিহ্ন হয়ে। তার শেষের পাতায় পেন্সিলে লেখা ‘শ্রী সেনদা’। লম্বাটে টানাহাতের সই। যে করেছিল আর যার জন্য– তারা আজ কোথায়। তারাই বা কোথায় যারা এই সবকিছু বাধিয়ে তুলেছিল?

জয়া মিত্র

৮.

আমাদের বাড়িতে একটা পালকের বালিশ ছিল। ছোট, অনেক পুরনো, চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, একটু নোংরা মতো। আমার জ্ঞান-বয়স থেকে সেটা দেখেছি। ওকে বলত ‘ডাউনি পিলো’। তার গল্পটা আমি তখন কিছুটা জানতাম, বাড়ির সকলেই জানত। বড় হয়ে পুরোটা বুঝে বেশ আশ্চর্য হয়ে থাকতাম। ওই বালিশ আমাদের দেশের নয়। ওটা ইতালি থেকে একজন আমার বাবাকে দিয়েছিলেন। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা তাঁকে ‘মা’ বলতেন। বাবার ছিল, সেই অধিকারে আমি ছোটবেলায় প্রায়ই সেটা মাথায় দিয়ে শুতে চাইতাম, যদিও ব্যাপারটা খুব আরামের ছিল না। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বাবা ইংরেজ বাহিনীতে ডাক্তার হয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, যেমন, অনেক ভারতীয়কেই তখন যেতে হয়েছিল। মিশর-সহ আফ্রিকার নানা দেশে যান, সেখানকার নানারকম অদ্ভুত কারুকার্য করা সিল্কের চাদর, মিহি জালিকাজ করা ছোট ছোট রুপোর গয়না, স্ট্যাম্প– এসব আমরা ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে দেখেছি। হারিয়েছি, নষ্টও করেছি। তাই মিশর, সিরিয়া, নাইজেরিয়া– এরকম অন্যদের কাছে অপরিচিত সব নাম আমাদের কাছে খুব সাধারণ, সেই অনেক দূরের বাড়িতে জন্ম থেকেই পরিচিত ছিল। যেমন ছিল, সেই পালকের বালিশটা।

মায়ের পুরনো কালো কাগজের অ্যালবামে ছিল লালচে হয়ে যাওয়া এমন অনেক লোকের ছবি, যারা আমাদের দেশের লোক নয়। খুব বড়সড়, কুচকুচে কালো কিংবা একেবারে সাদা গায়ের রঙের লোক। কেউ মিলিটারির পোশাক পরা, কেউ ফ্রক পরা, কেউ পায়জামা। একজন মহিলার খুব দুঃখী-মতো ছবি, সাদা গায়ের রং, সাদা চুল। সাদা-কালো ছবিতে জামাটাও সাদা। ফুল ছাপ ছাপ। দু’জন বেশ হাসিখুশি মেয়ে, হয়তো আমার পিসির সমান। তারাও সাদা রঙের। মায়ের কাছে শুনতাম, তাদের একজনের নাম মারিয়া।

অলংকরণ: শান্তনু দে

যুদ্ধের সময়ে কী কারণে জানি না, ইন্ডিয়ান আর্মির কিছুজন ইতালি নামের সেই দেশে পৌঁছয়। তাদের মধ্যে সেই ডাক্তার ছিলেন, যিনি বেশ কিছু বছর পরে আমার বাবা হবেন। সেখানে জার্মান সেনাদের হাতে বন্দিও হয় তারা। কোনও রকমে, কী রকমে, তা অবশ্য আমরা কোনও দিন জানতে পারিনি, তাদের দু’জন– একজন ডাক্তার সেন, অন্যজনের নাম সুন্দর সিং, এঁরা সেই বন্দিশিবির থেকে পালান। তাদের পেছনে শত্রুদলের সৈন্যরা তাড়া করে আসতে থাকে। একটা সরু গলির মুখে এসে তারা শত্রু-সৈন্যদের বিভ্রান্ত করার জন্য সামরিক কৌশল অনুযায়ী, দু’জনে দু’দিকে দৌড়ন। নির্জন সেই ফাঁকা গলিতে হঠাৎ একটা বাড়ির দরজা খুলে একটা হাত ডাক্তারকে ভেতরে টেনে নেয়। কিছু বোঝার বা জিজ্ঞেস করার আগেই, ভাষা জানেন না স্বভাবতই, তাঁকে তাঁরই বয়সি একজন যুবক তাড়াতাড়ি করে মাটির নিচের ঘরে লুকিয়ে দেয়। এরকম ঘর সে দেশে অনেক বাড়িতেই থাকত, যেগুলোকে বলা হত ‘সেলার’। তারপর কীভাবে যে অনেক সময় কেটেছে, মাঝেমাঝে কয়েকবার অন্ধকারের মধ্যেই কেউ এসে সামান্য কিছু খাবার দিয়ে গিয়েছে, কিছু জানা যায়নি।

সাংঘাতিক অনিশ্চিতি, ভয়ের মধ্যে কাটানোর এক দীর্ঘ সময় পর তাঁকে সেই ঘর থেকে মাটির ওপরে তুলে আনা হয়। দেখেন দু’টি মেয়ে আর তাদের মায়ের পরনে কালো পোশাক। রাস্তা থেকে বন্দিকে উধাও হয়ে যেতে দেখে সৈন্যরা গলির সব বাড়ির ছেলেদের দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে। তিনদিন আগে। তারপর কতদিন সেখানে ছিলেন, কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে কোথায় গেলেন– এসব কথা হয়তো বড়রা শুনেছিলেন, কিন্তু আমাদের ছোট ছোট মাথা পর্যন্ত তার আর হদিশ হয়নি।

এইসব কথা আমাদের বাবার মুখ থেকে শোনা হয়নি, কিন্তু কাকাদের মুখ থেকে বহুবার শুনে শুনে আমাদের জানা হয়ে গিয়েছিল। মা কখনও খুব বেশি কিছু বলেননি, কিন্তু ওই ছোট্ট বালিশ যে পাখির পালক দিয়ে তৈরি, ওকে যে ‘ডাউনি পিলো’ বলে– সেকথা, দূরদেশের সেই বৃদ্ধা আর তাঁর না-চেনা মেয়েদের কথা খুব আস্তে আস্তে মা কোনও কোনও দিন বলতেন। মারিয়া ছিলেন সেই দূরদেশের মায়ের বড় মেয়ে। আমার মা বলেছিলেন, কেমন ভাবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাবা আবার যোগাযোগ করেন সেই ধর্ম-মায়ের সঙ্গে। তাঁকে চিঠি লিখতেন। ক্রিসমাসে জন্মদিনে কার্ড পাঠাতেন। বড়দিনে আসা পুরনো কার্ড আমরা বড় হয়ে ওঠার পর দেখেছি, মায়ের বাক্সে। একটু হলদেটে হয়ে আসা সিল্কের মতো মসৃণ কার্ডে গোলাপ ফুল আর মোমবাতির ছবি। ভেতরে লম্বা ধাঁচের হাতের লেখা, কালিতে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উন্মাদদের গুলিতে নিহত সেই উকিল মানুষটির মা, সেই অচেনা দেশের ডাক্তার ছেলেটিকে পাঠিয়েছিলেন নিজের ছেলের মাথার বালিশটা। মায়ের গল্প বলার মধ্যে বীরত্বের কথা থাকত না, কেমন যেন মনখারাপ করত। মায়ের কাছেই শুনেছিলাম, কয়েক বছর পর সেই যুবকের প্রথম কন্যা জন্মালে সেই দূরের মা-র উদ্দেশ্যে তার নাম রাখেন– লিবার্তা। স্বাধীনতা।

নিতান্ত সাধারণ একটা মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবার, কী করে যে জড়িয়ে গিয়েছিল এক নিষ্ঠুর মারণখেলার সঙ্গে, এরকম কত পরিবার ছিল সারা দেশে, ইতিহাসে কোথাও তো লেখা নেই সেইসব ভাঙাচোরা কথা। চোখের জলের, রক্তের, অহৈতুকী ভালোবাসার, শুধু মানুষকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ ভালোবাসার, কত কাহিনি দেশের সমাজ-ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে রাখা আছে, কে সেইসব কথা বলবে? কোন স্মৃতিতে ঘর খুঁজে পাবে সেই কথাগুলো? হারিয়ে যাওয়া সেই ময়লামতো ছোট্ট বালিশটা মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে ভেসে ওঠে, একেবারে হারিয়ে যাওয়ার আগেকার পরীকথার মতো। একটা অর্থহীন নিষ্ঠুরতার জীবন্ত সাক্ষ্যের স্মৃতি হয়ে।

লালচে হয়ে যাওয়া ঝুরঝুরে কাগজে ছাপা কিছু ঝাপসা ফটোগ্রাফ, মিশরের অপূর্ব কাজ করা একটা চামড়ায় বাঁধানো অ্যালবামে সাঁটা, আমার দেরাজে আজও রাখা আছে। কবে একটা অকারণ যুদ্ধ এসে মানুষের ঘরবাড়ি প্রাণ স্মৃতি ভেঙেচুরে ছিতছাতুর করে দিয়েছিল, তার একটা ম্লানচিহ্ন হয়ে। তার শেষের পাতায় পেনসিলে লেখা ‘শ্রী সেনদা’। লম্বাটে টানাহাতের সই। যে করেছিল আর যার জন্য– তারা আজ কোথায়। তারাই বা কোথায়, যারা এই সবকিছু বাধিয়ে তুলেছিল?

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!

৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা

৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম