


আচার্যের মৃত্যুশয্যার পাশে সুধীরা দেবীকে দেখা যায়নি। ঘরের দুয়ার তিনি রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। এমনকী, মৃত্যুর পরেও সে দ্বার খোলেনি। ছাত্রছাত্রী আর আশ্রমিকেরা ঘিরে ছিল আচার্যের পুষ্পশোভিত দেহ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শববাহকেরা দেহ নিয়ে যাওয়ার সময় কনিষ্ঠা কন্যা যমুনা তাঁকে শেষবারের মতো ডাকতে গেলেও তিনি আসেননি। সুধীরা দেবীর এই প্রতিক্রিয়া সেদিন সকলের কাছে বড় আশ্চর্য লেগেছিল। তিনি কি তীব্র দহনে সবার চোখের আড়ালে নিজেকে দগ্ধ করছিলেন? না কি সে ছিল এক নিঃশব্দ অপরাধবোধ– কে বলতে পারে সেকথা?
বাংলা নতুন বছরের গায়ে এক করুণ চিহ্ন জড়িয়ে আছে বলে আমার মনে হয়। অন্তত শিল্পীদের মনে সেই ছায়া ভেসে ওঠে। এর অন্যতম কারণ, ছোটবেলায় বড়দের কাছে শুনেছিলাম, নববর্ষের পরেই প্রয়াত হয়েছিলেন আচার্য নন্দলাল বসু। যদিও সেদিন এর অর্থ আমার কাছে তেমন পরিষ্কার ছিল না। বড় হয়ে বুঝেছি, তাঁর মতো মহাশিল্পীর প্রয়াণ কাকে বলে। আবার একথাও প্রবলভাবে সত্য যে, শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তাঁদের ভাবনা, আদর্শ, শিল্পকাজ রয়ে যায় মহাকালের দফতরে।

মনে পড়ে, আমার মায়ের খাটের তলায় একখানা পুরনো রংচটা ট্রাঙ্ক ছিল। সেখানে জমা হত কত যে বাতিল-জঞ্জাল, তার ইয়ত্তা নেই! ফেলে দেওয়া কাপড়ের টুকরো, দড়ি, সুতো, ছেঁড়া কাগজ, কবেকার চিঠি, ভাঙা পুতুল– কী নেই সেখানে? সে এক রহস্যময় ভাঁড়ার! একটু বড় হয়ে সেই তোরঙ্গ আসে আমার হেফাজতে। অবসর পেলেই তার ডালা খুলে চলে বিস্তর খোঁজাখুঁজি, সে এক রকমের খেলা, গভীর অনুসন্ধানও বটে।
একদিন সেখানে ছেঁড়াখাতার ভিতর থেকে বেরল বিবর্ণ খবরের কাগজের কয়েকটা টুকরো। কাঁচি দিয়ে কাটা কিছু খবর, তার মধ্যে একটা আমাকে বিশেষভাবে চোখকে টানল– ‘শিল্পজগতে মহাগুরু নিপাত’ এই শিরোনামে একটা কলাম। প্রধান টাইটেলের নিচে একটু ছোট হরফে লেখা– ‘আচার্য নন্দলালের মহাপ্রয়াণ’। ‘বাংলা তথা ভারতের সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের অন্যতম প্রধান ঋত্বিক শিল্পগুরু আচার্য নন্দলাল বসুর জীবনদীপ নির্বাপিত। শনিবার বিকাল ৫টা ৩২ মিনিটে দেশিকোত্তম দেশবন্দিত শিল্পসাধক নন্দলাল তাঁর ‘সব হতে আপন’ শান্তিনিকেতনের নিজ বাসভবনে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যাঁর ৫০ বৎসর বয়সে রবীন্দ্রনাথ– ‘সত্তর বছরের প্রবীণ যুবা’– তাঁকে ‘কিশোর গুণী অভিভাষণে সম্ভাষিত করেছিলেন, মৃত্যুকালে সেই নন্দলালের বয়স হয়েছিল তিরাশী বৎসর’। নিচে তারিখ– রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ১৯৬৬।

খবরের কাগজের এই টুকরো আমাকে বেশ বিচলিত করে তুলেছিল। শান্তিনিকেতনের প্রতি আগ্রহ দিনের পর দিন গাঢ়তর করেছে মায়ের ট্রাঙ্ক থেকে পাওয়া সেই বিবর্ণ একফালি কাগজ। মনে মনে কতবার আকাশ-পাতাল ভেবেছি, কেমন ছিলেন এই নন্দলাল বসু? কীভাবে ছবি আঁকা শেখাতেন তিনি? ছবি ভালো না-হলে তিনি কি ছাত্রদের বকুনি দিতেন– এইসব নানা ছেলেমানুষি সেই সময়ে আমাকে ঘিরে রেখেছিল। পরে, শান্তিনিকেতনে পড়তে এসে ছেলেবেলার কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি প্রবীণ আশ্রমিকদের স্মৃতিকথায়– তবে এক নতুন প্রশ্ন আমার মনকে জাগিয়ে রেখেছে। সে হল, উনি কি মানসিকভাবে বড় একা, বড় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন? যদিও একথার কোনও উত্তর হয় না। আবার এ-ও সত্যি যে, প্রকৃত শিল্পী সর্বদা একাকী পথ চলেন। সত্যিকার শিল্পীর জীবন বয়ে চলে রবীন্দ্রনাথের সেই গানের বাণীর মতো– ‘যে পথে যেতে হবে সে পথে তুমি একা/ নয়নে আঁধার রবে ধেয়ানে আলোকরেখা।’ ধ্যানের সেই আলোকরেখাই তো শিল্পীর পথে অনন্ত আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবনও কি তেমন ছিল না, ওঁর কবিতার ছত্রের মতো? ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’ যিনি, তিনিই তো শিল্পী, মহাশিল্পী। চকিতে মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি গান– ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে।/ ভরে রইলো বুকের তলা, কারো কাছে হয় নি বলা,/ কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে।’ এইটেই শিল্পীর জীবনের অমোঘ মন্ত্র। তাঁর যত না-বলা কথা, সে বলে যেতে হয় অক্ষরের ভিতর দিয়ে, রং আর রেখার আঁচড়ে। রবীন্দ্রনাথ কতবার বাতি নিভে যাওয়া একলা পথ কেবল ঝড়কে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছেন। সাথীহীন একলা রবীন্দ্রনাথ, কত অগণিত গভীর রাত্রি কেবল আকাশের তারার দিকে চেয়ে বিনিদ্র কাটিয়েছেন, কে তার খবর রাখে! তখন সঙ্গে জাগে তাঁর গান, জেগে থাকে তাঁর বাঁশি।

নন্দলালের জীবনও কি এমনটাই? কিছু কিছু স্মৃতি-আলেখ্যে যেন এমনই আভাস মেলে। তিনি যেন পরিবারের বাঁধন আলগা করে দিয়েছিলেন। কেবল ছাত্রছাত্রীরাই তাঁকে ঘিরে থাকত পুত্রকন্যার মতো। তাঁরাই শেষবেলায় তাদের অসুস্থ ‘মাস্টারমশাই’কে সেবা করেছে, ওষুধ এনেছে, পথ্যের ব্যবস্থা করেছে। কেবল শেষের দিকেই নয়, তিনের দশকের মাঝামাঝি মাদুরাই থেকে এসেছেন অরুণাচল পেরুমাল। খাঁ খাঁ দুপুরে শান্তিনিকেতনে এসেছেন নন্দলালের কাছে, কলাভবনে ভর্তি হবেন। নন্দলালকে তিনি কখনও দেখেননি, কেবল মডার্ন ‘রিভিউ পত্রিকা’য় নন্দলালের একটি ছবিই একমাত্র ভরসা। কলাভবনের কাছে তাঁর এসে মনে হল, নন্দলাল বুঝি মাঠ পেরিয়ে গুরুপল্লীর দিকে এগিয়ে চলেছেন। পিছন থেকে না-ডেকে দীর্ঘ পথ অনুসরণ করে বাড়ি পর্যন্ত এসে অবশেষে তাঁকে ধরতে পারলেন। ভর্তির প্রসঙ্গ সরিয়ে রেখে নন্দলাল তাঁকে নিয়ে খেতে বসলেন। মাদুরাই থেকে আগত ছাত্রের স্মৃতিতে নন্দলালকে অনুসরণের অনুপুঙ্খ বিবরণ থাকলেও তাঁদের খাবার সময় সুধীরা দেবীর উপস্থিতি ধরা পড়েনি। আমরা জানি, সুধীরা দেবী ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, ব্যক্তিত্বময়ী এবং অজস্র গুণের অধিকারিণী। তাঁর শিল্পবোধ ছিল তীক্ষ্ণ। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি যখন ফুলের মালা গাঁথতেন, তখন সে যেন যথার্থ শিল্পকলা হয়ে উঠত। কিন্তু সময়ের নিরিখে নন্দলালের সঙ্গে কি তাঁর মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল? কেবল তা কেন? প্রিয় ছাত্র বিনোদবিহারী বা রামকিঙ্করের সঙ্গেও কি ক্রমে নেমে আসছিল সম্পর্কের শৈথিল্য? কে বলতে পারে সে-কথা? এ কি তবে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সংঘাত? বিনোদবিহারী যখন হিন্দি ভবনের দেওয়ালে ‘মধ্যযুগের সন্ন্যাসী’ মিউরাল করার প্রস্তাব নন্দলালকে জানালেন, আচার্য তখন তাঁকে নিষেধ করলেন। কিন্তু সেই প্রথম বিনোদবিহারী গুরুর নিষেধ অমান্য করে হিন্দি ভবনের অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে সেই কাজ সমাধা করলেন। এর মধ্য দিয়ে গুরু-শিষ্যের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি পল্লবিত হয়ে উঠতে সময় লাগেনি। আর তারপরেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিনোদবিহারী শান্তিনিকেতন ত্যাগ করে চাকরি নিয়ে নেপালে চলে গেলেন। নন্দলাল ছাত্রের এই চলে যাওয়াকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন।

এর কিছু আগেই, কবির প্রয়াণের পরে, ১৯৪৫ সালে শেষবার যখন মহাত্মা গান্ধী শান্তিনিকেতনে এলেন, তখন গান্ধীজির কাছে নন্দলালের প্রশ্ন ছিল, তাঁর অবর্তমানে কার হাতে তিনি কলাভবনকে দিয়ে যাবেন? এই প্রশ্নে মহাত্মা বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, একথার অর্থ নন্দলাল নিজের যোগ্য উত্তরসূরি গড়ে তুলতে পারেননি। সেটা একান্তই নন্দলালের অক্ষমতা। এই সমস্যার সমাধান গান্ধীজি করতে পারেন না। মহাত্মার এহেন তিরস্কারে আহত নন্দলালের মনে হয়েছে, তাঁর সব কাজ, সব চেষ্টা যেন ‘কারুকার্যমণ্ডিত জলহীন ভৃঙ্গারের মতো’ হয়ে উঠেছে।

এইসব ঘটনা কি নন্দলালকে ভিতর থেকে আরও একলা, আরও নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল? সেই সঙ্গে পত্নী সুধীরা দেবী তাঁর সঙ্গে একত্রে বসবাস করছিলেন না, তিনি কাছেই আরেকটি বাড়িতে বাস করতেন। তবে সুধীরা দেবী নিজেকে শিল্পাচার্যের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেও নন্দলাল প্রতিদিন দেবতার কাছে পূজা নিবেদনের মতো ছবি আঁকার পট নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতেন। পারিপার্শ্বিক জীবন থেকে নিজেকে যেন আরও বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছিলেন তিনি। শেষের দিকে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর স্মৃতিশক্তিও কিছুটা ক্ষীণ হয়ে আসে। অবশেষে বাংলা নববর্ষের অব্যবহিত পরে, ইংরেজি ১৬ এপ্রিল বিকেলের দিকে তাঁর দেহাবসান ঘটে।

এ-ও এক আশ্চর্য ঘটনা যে, আচার্যের মৃত্যুশয্যার পাশে সুধীরা দেবীকে দেখা যায়নি। ঘরের দুয়ার তিনি রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। এমনকী, মৃত্যুর পরেও সে দ্বার খোলেনি। ছাত্রছাত্রী আর আশ্রমিকেরা ঘিরে ছিল আচার্যের পুষ্পশোভিত দেহ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শববাহকেরা দেহ নিয়ে যাওয়ার সময় কনিষ্ঠা কন্যা যমুনা তাঁকে শেষবারের মতো ডাকতে গেলেও তিনি আসেননি। সুধীরা দেবীর এই প্রতিক্রিয়া সেদিন সকলের কাছে বড় আশ্চর্য লেগেছিল। তিনি কি তীব্র দহনে সবার চোখের আড়ালে নিজেকে দগ্ধ করছিলেন? না কি তা ছিল এক নিঃশব্দ অপরাধবোধ– কে বলতে পারে সে-কথা?
আর বিনোদবিহারী? যিনি গুরুর ওপর তীব্র অভিমানে একদা আশ্রম ত্যাগ করেছিলেন, আহত বিধ্বস্ত স্বরে তিনি বলেছেন– ‘অনেকদিনের পরিচিত বিরাট গাছ ঝড়ের ধাক্কায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে দেখলে মনে যে ভাব জাগে, নন্দবাবুর মৃত্যুতে আমার মনে সেই ভাব জেগেছে– এটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তাঁর শিল্পপ্রতিভার সাক্ষ্য ইতিহাসে থাকবে এবং ভাবীকালের মানুষ তা উপভোগ করবে। তাঁর জীবনের কথাও লেখা হবে– কেবল ভাবীকাল পাবে না নন্দবাবুর সেই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের স্পর্শ’।
শিল্পাচার্যের ছাত্রের এই কথা বর্ণে বর্ণে সত্য।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন সুশোভন অধিকারী-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved