Robbar

ক্রিকেট বনাম নারীত্ব

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 13, 2026 5:35 pm
  • Updated:June 13, 2026 5:35 pm  

একজন ক্রিকেটার হিসেবে অনয়া বাঙ্গার ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার দায় সমস্ত লিঙ্গের মানুষের ওপর বর্তায়। অনয়া এই ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন বা নেবেন। কারণ ধরে নেওয়া যায়, এই মানবসমাজে রূপান্তরের পরবর্তী পরিণতি কী হতে পারে– এ আন্দাজ অন্তত অনয়ার ছিল। ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি স্বেচ্ছায় রূপান্তরিত হয়েছেন। অস্বীকার করেছেন তাঁর সিজেন্ডার সত্তাকে। আঁকড়ে ধরেছিলেন রূপান্তরকে। ক্রিকেটকে নয়। ক্রিকেট বা আরও বৃহত্তর অর্থে ক্রীড়াও নিজের জায়গায় অবিচল রয়েছে। শুধু গর্বের মাস বা একটি লঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে অনয়াকে সমর্থন করা ক্রীড়া নৈতিকতার পক্ষে কতটা বেমানান সেটা একবার ভাবা উচিত।

পৌলমী ঘোষ

কীসের গর্ব? আমরা সবাই মানুষ সেই গর্ব, না কি আধিপত্যের? আমাদের মনলোক জুড়ে আছে নানারকম অমানুষী অনুষঙ্গ। তাই বুদ্ধিশুদ্ধির জন্য একমাস ধরে ব্রত পালন করে আধুনিক পৃথিবী। নানা অনুষ্ঠানে উৎসবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা, লিঙ্গ যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে আমরা মানুষেরই প্রতিনিধি। এই বোধ জাগিয়ে তোলার জন্য লিঙ্গগত এবং যৌনতার দিক থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের জোট বাঁধতে হয়েছে। অধিকারের আন্দোলনে শামিল হতে হয়েছে। ১৯৬৯ সালের জুন মাসে স্টোনওয়াল আন্দোলন মানবতাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ভিন্ন ডিসকোর্সে। জুন মাস হল গর্বের মাস। আজকের পৃথিবীর ইতিহাস, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বহুবিধ অবদানের একটি বার্ষিক উদ্‌যাপন।

স্টোনওয়াল আন্দোলন, ১৯৬৯

এবছরই অলিম্পিক্সে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পৃথিবীর এই শ্রেষ্ঠতম প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত মানুষ আর অংশ নিতে পারবেন না। রীতিমতো মানবতার পরিপন্থী! না, মানবতা আরও বিশাল, সেখানে একজনের ইচ্ছা অন্যের বঞ্চনার কারণ হলে সেই ইচ্ছাকে আইনি সমর্থন করা যাবে না। অলিম্পিক্সের বিশ্বমঞ্চে তুরিয়ান তুঙ্গিয়ান বলিয়ান হওয়ার জন্য বহু পুরুষ বহু সময়ে আশ্রয় নিয়েছে নারীর অবয়বে। সেই পুরুষের অভিসন্ধি পূর্ণ হওয়ার পথ সহজ হয়েছে। কিন্তু অসুবিধা ভোগ করতে হয়েছে একই প্রতিযোগিতার অন্য নারী প্রতিযোগীদের।

তবে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা অনুযায়ী, মানুষের মর্যাদা ও অধিকারে লিঙ্গ পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক। সুতরাং রূপান্তরিতরাও অন্য মানুষের মতো সকল সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অধিকারের উপভোক্তা। নিঃসন্দেহে সামাজিক দিক থেকে, আইন বা সংবিধানের দিক থেকে লিঙ্গ বিভাজন অযৌক্তিক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প প্রত্যেকটি প্রাথমিক ক্ষেত্রে রূপান্তরিত, রূপান্তরকামী, তৃতীয় লিঙ্গ– প্রত্যেকের সমান অধিকার স্বাভাবিক। তবে একটা বিষয় কোনও ভাবেই অস্বীকার করা যায় না যে, ক্রীড়া ক্ষেত্রে তৃতীয় লিঙ্গ, রূপান্তরকামী বা রূপান্তরিতদের জন্য সমান অধিকার বা আইন যথেষ্ট স্পর্শকাতর। তাই যেকোনও আইন এক্ষেত্রে নিয়ামক সংস্থা খুব ভেবেচিন্তেই নিয়ে থাকে। আবার সাধারণভাবেই বোঝা যায়, শারীরিক গঠন ও ক্ষমতায় লিঙ্গ-পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষের তুলনায় দৈহিক শক্তি নারীর কম। ক্রীড়া বিষয়টি আদ্যোপান্ত একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত শারীরিক ক্ষমতার প্রদর্শন। তাই সেখানে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন অতি প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি। শুধু অলিম্পিক্স নয়, বিশ্বের যেকোনও ক্রীড়া সংস্থার সংবিধান অনুযায়ী, রূপান্তরিত প্রতিযোগীদের জন্য তাই কড়াকড়ি একটু বেশিই। ফুটবল, হ্যান্ডবল, হকি সর্বত্র একইভাবে বিশ্লেষণ করা হয় বিষয়টিকে। আইসিসি, বিসিসিআই কোনও স্তরেই চিন্তাভাবনা আলাদা নয়। যেহেতু বিসিসিআই এই নিয়মগুলি অনুসরণ করে, তাই ডব্লিউপিএল বা উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগের মতো ঘরোয়া ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলিতেও নিয়মের কোনও পরিবর্তন পরিমার্জন সম্ভব নয়। ২০২৩ সালের নতুন সংশোধনীতে আইসিসি স্পষ্ট করেছে– বয়ঃসন্ধি উতরে পুরুষ স্বেচ্ছায় রূপান্তরিত হয়ে নারী হলে তাদের প্রতিযোগিতায় প্রবেশাধিকার দেওয়া যাবে না। এই নিয়মে আটকে পড়েছেন আমাদের অনয়া বাঙ্গার। 

অনয়া বাঙ্গার

জন্মকালীন লিঙ্গ পরিচয়ে তিনি ছিলেন আরিয়ান বাঙ্গার। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় বাঙ্গারের পুত্র। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটচর্চায় মগ্ন হন তিনি। যথেষ্ট সম্ভাবনাময় ছিল তাঁর ক্রিকেট প্রতিভা। রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে ভরসা জুগিয়েছেন। ক্রিকেট প্যাশনের পাশাপাশি তিনি অনুভব করেছিল নারীত্বের টান। তাঁর চিন্তা-চেতনা চলা-বলার কোথাও পুরুষের প্রবৃত্তি তিনি নিজেই অনুভব করতে পারতেন না। চেহারা, সমাজ– যে যাই বলুক, আরিয়ান নিজেকে নারী বলে ভাবতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে পরিবার-পরিজনকে বোঝানো শুরু হল। এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তায় তিনি হয়ে উঠলেন অনয়া। 

নতুন সামাজিক পরিচয় তাঁকে আনন্দ দিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তাঁর কাছে খেলার মাঠ হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক মঞ্চে রূপান্তরকামীদের অন্তর্ভুক্তির জন্য আইসিসি ও বিসিসিআইয়ের কাছে তিনি আবেদন করেছিলেন। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় তাঁর শরীরী সক্ষমতা যে সিজেন্ডার বা জন্মসূত্রে নারীর দৈহিক শক্তি, সহনশীলতা বা গতির সমতুল্য– তার স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণপত্রও জমা দিয়েছিলেন। এমনকী আনুষঙ্গিক তথ্য হিসাবে নিজের নানা শরীরী উপাদানের নমুনাও তুলে দিয়েছিলেন আইসিসিকে। দেখিয়েছিলেন, তাঁর শরীরে থাকা নারী ও পুরুষ হরমোনের মাত্রা কোনওভাবেই অন্যদের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করে না। 

লিঙ্গ পরিবর্তনের আগে-পরে: আরিয়ান থেকে অনয়া

তবু তিনি সব ধরনের টুর্নামেন্ট থেকে বঞ্চিত। উল্টে সমাজের বিকৃত প্রথা অনুযায়ী বারবার শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। যারা সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তারাই আড়ালে ঘৃণ্য আবেদন জানিয়েছে। অথচ তাঁর ক্রিকেটের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা নিয়ে এর সিকিভাগ আলোচনাও কখনও হয়নি। লিঙ্গ পরিবর্তনের পর তাঁকে নিয়ে সমাজ মাধ্যমে চলেছে অসহনীয় কুরুচিকর অমানবিক রসিকতা। সম্প্রতি একটি চ্যানেলের টক শো-তে উপস্থিত হয়ে, তিনি, তাঁর সঙ্গে হওয়া বেশ কিছু ঘটনার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। মূল প্রবাহের লিঙ্গচিহ্ন এবং যৌনতাবোধ-সম্পন্ন মানুষের মানসিক বিকৃতি সামনে এসেছে। তিনি বেআব্রু করেছেন তথাকথিত কিছু ক্রিকেটের নায়ক, খলনায়ক বা পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতাদের কদর্য রুচিকে। ব্যক্ত করেছিলেন সন্তানের অসম্মানে একজন বাবার অসহায় পরামর্শ– ‘তুমি ক্রিকেট ছেড়ে দাও’। 

অনয়া বাঙ্গারের পরিবর্তিত লিঙ্গ-পরিচয় তাঁকে প্রচলিত আধুনিক সমাজের সেকেলে রক্ষণশীল প্রবণতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাঁর গল্পে সংবেদনশীল মানুষ দুঃখ পায়। অমানবিক ব্যক্তিরা মজা পায় তাঁকে অসম্মান করে। এই গর্বের মাসে হয়তো প্রচুর আলোচনা হবে ক্রিকেটে তাঁর প্রবেশাধিকার না-থাকা নিয়ে। সহানুভূতির বন্যা বয়ে যাবে। তবে নিশ্চিতভাবেই, একজন ক্রিকেটার হিসেবে অনয়া বাঙ্গার ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার দায় সমস্ত লিঙ্গের মানুষের ওপর বর্তায়। অনয়া এই ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন বা নেবেন। কারণ ধরে নেওয়া যায়, এই মানবসমাজে রূপান্তরের পরবর্তী পরিণতি কী হতে পারে– এ আন্দাজ অন্তত অনয়ার ছিল। ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি স্বেচ্ছায় রূপান্তরিত হয়েছেন। অস্বীকার করেছেন তাঁর সিজেন্ডার সত্তাকে। আঁকড়ে ধরেছিলেন রূপান্তরকে। ক্রিকেটকে নয়।

ক্রিকেট বা আরও বৃহত্তর অর্থে ক্রীড়াও নিজের জায়গায় অবিচল রয়েছে। শুধু গর্বের মাস বা একটি লঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে অনয়াকে সমর্থন করা ক্রীড়া নৈতিকতার পক্ষে কতটা বেমানান, সেটা একবার ভাবা উচিত। এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, নিশ্চয়ই অনয়া রূপান্তর অথবা ক্রিকেট– এই ক্যাটাগরিকাল ইম্পারেটিভের মধ্যে নিঃস্বার্থহীনভাবে বেছে নিয়েছিলেন নারীত্বকেই।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পৌলমী ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

………………….