Robbar

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ককরোচ পার্টি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 16, 2026 6:58 pm
  • Updated:June 16, 2026 9:11 pm  

আর্জেন্টিনায় ফুটবল আসলে এক সংস্কৃতি। ফুটবলের কৌশল কিংবা শৈলী কেমন হবে, এইসব নিয়ে অনর্গল আলাপচারিতায় ডুবে থাকতে পারেন আর্জেন্টিনীয়রা। এই ব্যাপারে তাদের সঙ্গে মিল ডাচদের। তাই ভিন্ন আদর্শের, ভিন্ন ভাবধারার ফুটবলের সন্ধান পাওয়া যায় আর্জেন্টিনাতেও। এখান থেকেই উঠে আসেন বিভিন্ন নামী-অনামী প্রশিক্ষকরা, আধুনিক ফুটবলের পরিভাষায় কোচ কিংবা ম্যানেজার প্রতিটি ভূমিকায়ই তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।

শ্রুতায়ু ভট্টাচার্য

ভূগোল বইয়ের পাতা উল্টে আন্দিজ পর্বতমালা, পম্পাস তৃণভূমি কিংবা পাতাগোনিয়া মরুভূমির হদিস জানার আগেই বোধহয় গড় বাঙালির পরিচয় ঘটে আর্জেন্টিনা নামের দেশের সঙ্গে। সৌজন্যে ফুটবল। মারাদোনা থেকে মেসিম্যানিয়ায় আক্রান্ত ফুটবলপ্রেমীর পছন্দের তালিকায় লেখা থাকে নীল-সাদা জার্সিতে উজ্জ্বল আরও কত খেলোয়াড়ের নাম। কেম্পেস, পাসারেলা, বুরুচাগা, বাতিস্তুতা, রিকলমে, আগুয়েরো, দি মারিয়া হয়ে নয়নমণি আলভারেজ বা ‘দিবু’ মার্তিনেজ। কিন্তু আর্জেন্টিনার ‘ককরোচ ক্যাডার’? তাদের নিয়ে চর্চা কতটুকু?

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচের ভূমিকায় দিয়েগো মারাদোনা, মাঠে লিওনেল মেসি (২০১০)

নাম শুনেই চমকে গেলেন তো? না, না, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সঙ্গে এদের দূরদূরান্তের সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক ফুটবলেরই। এবারের পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ ৪৮ দেশের। তার মধ্যেই চোখ টেনেছে এক পরিসংখ্যান। তাদের ‘ককরোচ ক্যাডার’ দিয়ে আর্জেন্টিনা সংখ্যায় টেক্কা দিয়েছে বাকি বিশ্বকে। কারা এই ‘ককরোচ ক্যাডার’?

নামটা দিয়েছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ ফুটবল লেখক জোনাথন উইলসন। বছর দুই আগে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ লেখা ‘দ্য ককরোচ ক্যাডার’ শীর্ষক  নিবন্ধে আর্জেন্টিনার ফুটবল প্রশিক্ষকদের তিনি অভিহিত করেছেন এই নামেই। কিন্তু কেন?

উইলসন এই উপমা ধার করেছেন আর্জেন্টিনার প্রাক্তন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় রবার্ট পারফিউমোর থেকে। এই আর্জেন্টিনীয়ের মতে, আরশোলা সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে যেমন শত প্রতিকূলতাকে জয় করে টিকে গিয়েছে, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরাও তেমনই। তুষার, পর্বত, উচ্চতা, গরম, ভাষা কিংবা সময়ের প্রতিবন্ধকতা, কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। শুধু খেলোয়াড়েরাই নন। উইলসন দেখান, সে-দেশে ফুটবল আসলে এক সংস্কৃতি। ফুটবলের কৌশল কিংবা শৈলী কেমন হবে, এইসব নিয়ে অনর্গল আলাপচারিতায় ডুবে থাকতে পারেন আর্জেন্টিনীয়রা। এই ব্যাপারে তাদের সঙ্গে মিল ডাচদের, এমনটাই মনে করেন প্রশিক্ষক গুস্তাভো আলফারো। তাই ভিন্ন আদর্শের, ভিন্ন ভাবধারার ফুটবলের সন্ধান পাওয়া যায় আর্জেন্টিনাতেও। এখান থেকেই উঠে আসেন বিভিন্ন নামী-অনামী প্রশিক্ষকরা, আধুনিক ফুটবলের পরিভাষায় কোচ কিংবা ম্যানেজার প্রতিটি ভূমিকায়ই তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বিভিন্ন আদর্শের ফুটবল ধারণার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে, আত্মস্থ করে, নিজেদের ভাবনাকে যোগ করে স্বকীয় কৌশল ও ফুটবলশৈলী বেছে নেওয়ার লড়াইয়ে শামিল হন তাঁরা। আর এখানেই আসে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।

আলবিসিলেস্তের স্বপ্নের জাদুকর

শুধুই নিজেদের মহাদেশে নয়, আরও জানতে হলে ছুটতে হবে পৃথিবীর দিকে দিকে। তাই অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি জ্ঞানস্পৃহায়ও তাঁরা পাড়ি জমান ইউরোপে। দিয়েগো সিমিওনের মতো অনেকেই সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন। তবে এই ‘ককরোচ ক্যাডার’দের কীর্তি শুধুই হাল আমলে না। মনে করা হয় চারের দশকের ‘লা মাকিনা’ নামে খ্যাত রিভারপ্লেটের ফুটবলশৈলীর সঙ্গে ডাচদের ‘টোটাল ফুটবল’-এর অনেক মিল ছিল!

‘লা মাকিনা’ খ্যাত রিভারপ্লেটের ফুটবলাররা

উইলসনের নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় ২০২৪-এর কোপা আমেরিকার সময়ে। সেবার ১৬ দেশের এই প্রতিযোগিতায় সাত দলের প্রশিক্ষকই ছিলেন আর্জেন্টাইন! আর এবার ৪৮ দেশের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ছয় প্রশিক্ষক ছ’টি ভিন্ন দলের দায়িত্বে। মার্সেলো বিয়েলসা (উরুগুয়ে), গুস্তাভো আলফারো (প্যারাগুয়ে), নেস্তর লোরেঞ্জো (কলম্বিয়া), মরিসিও পচেতিনো (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), সেবাস্তিয়ান বেকাচেসি (ইকুয়েডর) এবং গতবারের বিশ্বজয়ী প্রশিক্ষক লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা)। একই দেশ থেকে এতজন প্রশিক্ষক এক বিশ্বকাপে এর আগে প্রতিনিধিত্ব করেননি। অবশ্য এর আগের রেকর্ডও ছিল তাদেরই দখলে। ২০১৮ বিশ্বকাপেও ‘ডাগ আউট’-এ ছিলেন পাঁচ আর্জেন্টিনীয় প্রশিক্ষক। সেবার দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে আফ্রিকা এবং এশিয়ার দলের প্রশিক্ষক হিসেবেও দেখা গিয়েছিল আর্জেন্টিনীয়দের। একুশ শতকের বেশ কিছু বিশ্বকাপেই ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস কিংবা জার্মানির প্রশিক্ষকদের সঙ্গে সংখ্যায় সমানে টেক্কা দিয়েছে আর্জেন্টিনা। এ-ব্যাপারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের তুলনায় তারা এখন বেশ এগিয়ে।

বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি

এবারের ছ’জন কোচের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ মার্সেলো বিয়েলসা। তাঁর ঝুলিতে দুটো বিশ্বকাপে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা। তবে, সে স্মৃতি সুখের নয়। ২০০২-এ আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্ব অতিক্রম না-করতে পারার যন্ত্রণা তাঁর চিরসঙ্গী। ২০১০-এও চিলিকে বিশ্বকাপে তুলে, সুন্দর ফুটবলের ছাপ রাখলেও সে-যাত্রাও থামতে হয় শেষ ষোলোয়। ট্রফিজয়ের খতিয়ান নয়, ফুটবল খ্যাপা ‘এল লোকো’র পরিচিতি তাঁর নিজস্ব ফুটবল দর্শনের জন্য। আর্জেন্টিনার দুই প্রাক্তন বিশ্বজয়ী কোচ মেনোত্তি এবং বিলার্দো নিজেদের ফুটবল দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই দুই ঘরানা অনুসরণ করতেন তাঁদের উত্তরসূরিরা। বিয়েলসার নিজস্ব দর্শন তৈরিতে প্রভাব ফেলে ইতালীয় আরিগো সাচ্চি, ডাচ লুই ফান গল এবং উরুগুয়ের অস্কার তাবারেজের ধ্যানধারণা। নিরন্তর প্রেসিং, ইনভার্টেড উইংব্যাক, মাল্টিফাংশনাল খেলোয়াড়ের ব্যবহার, রোটেশনাল ম্যান মার্কিং– এসব বৈশিষ্ট্য তিনি নিয়ে আসেন আর্জেন্টিনীয় ফুটবলে। নিজের দেশের বাইরেও মেক্সিকো এবং চিলির ফুটবল পরিকাঠামো বদলে দেওয়ায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এছাড়া স্পেনের অ্যাথলেটিক বিলবাও কিংবা ইংল্যান্ডের লিডস ইউনাইটেডকে নিয়ে তাঁর লড়াই সর্বজনবিদিত। পেপ গুয়ার্দিওলা তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষক হিসেবে মানেন। কোচেদের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে কিংবা সেমিনারে তাঁর উপস্থিতি সমাদৃত হয় বারবার। তবে স্বদেশেই আলফিও বাসিলের মতো প্রশিক্ষকেরা মনে করেন, বিয়েলসার খেলানো বড় বেশি ইউরোপীয় ধাঁচের, দেশজ ফুটবলের ছাপ যেন বড়ই কম।

বিশ্বকাপে উরুগুয়ের দায়িত্বে আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা

এহেন বিয়েলসা উরুগুয়ের কোচ হলে সেদেশে একই সঙ্গে আশা ও আশঙ্কার দোলাচল দেখা দেয়। এমনিতেই পাসারেলা ছাড়া বিদেশি কেউ উরুগুয়ের কোচিং করাননি। সেদেশের সংস্কৃতিতে বিষয়টা কেউ খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। যাই হোক, এবারের বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জন পর্বের খেলায় বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলকে উরুগুয়ে একবার করে হারিয়েও দেয়। মাঝপর্বে বেশ কিছুটা ছন্দপতন সামলে চতুর্থ হয়ে তারা বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। তবে সবটাই ইতিবাচক নয়। তাঁর কঠোর অনুশীলন পদ্ধতি (‘মার্ডার বল’ যার একটি উদাহরণ) ঘিরে চাপানউতোর আছে ফুটবল মহলে। খেলোয়াড়রা মানুষ না-হয়ে রোবট হলে তিনিই সমস্ত ট্রফি জিততেন– বিয়েলসার এমন এক সরস উক্তি বেশ জনপ্রিয়। তবে খেলা যাতে রোবোটিক কিংবা যান্ত্রিক না-হয়ে পড়ে, খেলোয়াড়েরা যাতে শারীরিক দক্ষতার তুঙ্গে থেকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে খেলাকে বুঝে নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেন সেটাই তাঁর অভীষ্ট। বিয়েলসা মনে করেন, দর্শক যেন খেলার সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারেন। তবে এবারের বিশ্বকাপেও দল নির্বাচনে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। উরুগুয়ের কিংবদন্তি বর্ষীয়ান খেলোয়াড় সুয়ারেজকে দলে রাখেননি, নেননি নান্দেজকেও। গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় রোনাল্ড আরাউহো প্র্যাকটিসে চোট পেতে তাঁর পরিবারের লোকজন দায়ী করেছেন বিয়েলসাকেই।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ড্রয়ের পর বিয়েলসাকে নিয়ে আশঙ্কা নতুন করে উসকে দিয়েছে। এইসব সামলে স্পেন, কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে উরুগুয়ে কেমন ফল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে সেদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। আর ফুটবলের ট্যাকটিক্স, স্টাইল নিয়ে মাথা ঘামানো লোকজনের চোখ থাকবে জীবনের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে সিস্টেম-প্রিয় ‘এল লোকো’র সম্ভাবনাময় কাব্যিক প্রাপ্তির দিকে।

উরুগুয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে বিশ্বকাপে কঠিন পরীক্ষা ‘এল লোকো’র

বিশ্বকাপ আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বে এবার বিয়েলসার শিষ্য মরিসিও পচেতিনো। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দিনেই স্বদেশীয় গুস্তাভো আলফারোর প্যারাগুয়েকে ৪-১ এ উড়িয়ে দিয়ে দারুণ শুরু করেছে তাঁর দল। কোচ হিসেবে প্রথম বিশ্বকাপ হলেও ইউরোপীয় ফুটবলে পচেতিনো যথেষ্ট পরিচিত। টটেনহ্যামকে নিয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলানো হোক, কিংবা মেসি-এমবাপে-নেমারের মতো তারকাখচিত পিএসজি-কে কোচিং করানো, তাঁর পেশাদারি জীবনে একাধিক কীর্তি। কোনও দল ঢেলে সাজানো শুরু হলে বাজারে ভেসে ওঠে পচেতিনোর নাম। উঠতি খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করায় তিনি বেশ দক্ষ। তাঁর দলেরও বৈশিষ্ট্য আক্রমণাত্মক প্রেসিং, হাই-ইনটেনসিটি ফুটবল। তবে মার্কিন পুরুষ ফুটবল দলের দায়িত্বে তাঁর কাজ বেশ কঠিন। মার্কিন মহিলা ফুটবল দলের একাধিকবার বিশ্বজয় এবং ধারাবাহিক সাফল্যের তুলনায় পুরুষ দল একেবারেই ম্রিয়মাণ। তাই কোচ নির্বাচনের সময়ে লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে, পুরুষ দলকে নিয়ে বিশ্বকাপে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে হবেই। এর সঙ্গে তুলে আনতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও। দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মধ্যে পচেতিনোর সামনে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ বলতে শুধু ছিল মহাদেশীয় কনকাকাফ গোল্ড কাপের খেলাগুলো। সেখানে ফাইনালে উঠলেও হারতে হয় মেক্সিকোর কাছে। তবে সাম্প্রতিককালে প্রীতি ম্যাচে জাপানকে ২-০ এবং গুরু বিয়েলসার উরুগুয়েকে ৫-১ গোলে হারানোয় তাঁর দল যে খানিক মানসিক জোর পেয়েছে, তা বলাই যায়। বিতর্কও রয়েছে। বিশ্বকাপ স্কোয়াড বাছাইয়ের সময়ে খেলোয়াড়দের ই-মেল করে জানিয়েছেন বাদ পড়ার খবর। রুষ্ট হয়েছেন অনেকেই। মাঝে শোনা গিয়েছিল, এসি মিলানের প্রস্তাবে তিনি রাজি হতে পারেন। তবে তা হয়নি। সম্প্রতি জলপানের বিরতির সময়ে ল্যাপটপ নিয়ে পচেতিনোর খেলোয়াড়দের রণকৌশল বোঝানোর ছবি ভাইরাল হয়েছে। বিশ্বকাপের শুরু দুর্দান্ত হলেও এই দলকে তিনি কতদূর নিয়ে যেতে পারেন তার দিকে নজর থাকবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাগ আউটে কোচ মরিসিও পচেতিনো

কলম্বিয়ার প্রশিক্ষক নেস্তর লোরেঞ্জো আরেক বর্ণময় চরিত্র। ’৯০ বিশ্বকাপে মারাদোনার সতীর্থ লোরেঞ্জো খেলা ছাড়ার পরে দীর্ঘ সময়ে আর্জেন্টিনার প্রাক্তন কোচ হোসে পেকেরম্যানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন। ২০০০-’০১-এ আর্জেন্টিনার যুব দল কিংবা ২০০৬-এর বিশ্বকাপে তিনি সহকারী কোচ ছিলেন। পেকেরম্যান কলম্বিয়ার কোচ হলে সেখানেও তিনি দীর্ঘ সাত বছর সহকারী হিসেবে কাজ করেন, দুটো বিশ্বকাপেও যান। এরপর নিজে পেরুতে এফবিসি মেলগার ক্লাবে কিছুদিন কোচিং করিয়ে ২০২২ সালে কলম্বিয়ার জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। কলম্বিয়া ফুটবল নিয়ামক সংস্থার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনাও হয়। তবে হাজার হোক তিনটে বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। দায়িত্ব নিয়ে সব সন্দেহের অবসান ঘটান তিনি। প্রীতি ম্যাচে জার্মানি ও স্পেনের সঙ্গে জয় তো আসেই, কোপা আমেরিকা ফাইনালে দলকে নিয়ে যান তিনি। সেই ম্যাচে এক্সট্রা টাইমে হারতে হলেও যোগ্যতা অর্জন পর্বের ফিরতি ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে এক রকমের ‘প্রতিশোধ’ নেয় কলম্বিয়া। এবার বিশ্বকাপ যাত্রা। গ্রুপে পর্তুগালের মত কঠিন প্রতিপক্ষ রয়েছে। তবে লোরেঞ্জোর হাতে রয়েছে দিয়াজের মতো তারকা, হামেস রদ্রিগেজের মতো বর্ষীয়ান প্লেমেকার। আর একটা বিষয়ে লোরেঞ্জোর ধন্যবাদ প্রাপ্য। আধুনিক ফুটবলে মৃতপ্রায় ক্ল্যাসিক ‘নাম্বার টেন’-কে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন! যে ভূমিকায় একুশ শতকের শুরুতেও মাঠে রাজকীয় বিচরণ করতে দেখা যেত জিদান কিংবা রিকলমেদের। এখন তার শেষ প্রতিনিধি হিসেবে খেলছেন হামেস কিংবা পরিবর্ত হিসেবে নামা হুয়ান কুইন্তেরো। লোরেঞ্জোর জমানায় যথেষ্ট দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহার দিয়েছে কলম্বিয়া। তবে যোগ্যতা অর্জন পর্বে হোঁচট খেতেও হয়েছে মাঝেমাঝেই। সব বাধা পার করে তৃতীয় হয়ে বিশ্বকাপে ওঠার পরে লোরেঞ্জোর কলম্বিয়ার লক্ষ্য কিন্তু অনেক দূর।

কলম্বিয়ার প্রশিক্ষক নেস্তর লোরেঞ্জো

ইকুয়েডরকে নিয়ে বিশ্বকাপে সেবাস্তিয়ান বেকাচেসির শুরুটা ভালো হয়নি। আইভরি কোস্টের কাছে শেষ মুহূর্তে হারতে হয়েছে। গ্রুপে জার্মানির মতো শক্ত দলও আছে। বেকাচেসি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত নাম। তবে ২০১৪ এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে সাম্পাওলির অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। ২০২৪-এ ইকুয়েডরের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। যোগ্যতা অর্জন পর্বে ইকুয়েডর দ্বিতীয় হয়ে উঠেছে এবং বেকাচেসি দায়িত্ব নেওয়ার পরে একটা মাত্র খেলায় তারা হেরেছিল। গোল খেয়েছিল মাত্র ৫টা। প্রীতি ম্যাচেও মরক্কো, নেদারল্যান্ডসের মতো দলের বিরুদ্ধে ড্র করেছে। ইকুয়েডরের ফুটবলে এখন একটা সোনালি প্রজন্ম। মোসেস কাইসেদো, এস্তুপিয়ান, হিনক্যাপি, কেন্দ্রি পেজের মতো খেলোয়াড় আছেন। তবে বড় সমস্যা গোলের খরা। ইকুয়েডরের সমর্থকেরা বেকাচেসির খেলার ধরনে রীতিমত বিরক্ত। অতি রক্ষণাত্মক সতর্কতায় মেপে মেপে খেলার অভ্যাসকে তারা ভালো চোখে দেখে না। সোশাল মিডিয়া খুললেই দেখা যায় সমালোচনা। আক্রমণে ভালো প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কোচ তাদের ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারছেন না, এমনই অভিযোগ। হারের পরে বেকাচেসি কোনও নতুন পরিকল্পনা করেন কি না, সেটাই দেখার।

ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাচেসি

২০২২ বিশ্বকাপে ইকুয়েডরকে নিয়ে সাড়া জাগিয়ে শুরু করলেও গুস্তাভো আলফারোর অভিযান শেষ বিচারে ব্যর্থই ছিল। এবারের বিশ্বকাপে তিনি প্যারাগুয়ের প্রশিক্ষক। ১৬ বছর পরে বিশ্বকাপে তুলেছেন তাদের। প্রথম ম্যাচেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খারাপভাবে হারতে হয়েছে তাঁর দলকে। আলফারোর কাছে পরের দু’ম্যাচ মরণপণ লড়াইয়ের, প্রতিপক্ষ তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে হারানো তাঁর দলের একটা বড় কৃতিত্ব। দার্শনিক ভঙ্গিতে খেলাকে ব্যাখ্যা করতে ভালবাসা এই প্রশিক্ষকের চ্যালেঞ্জ কিন্তু এখন অনেক কঠিন।

প্যারাগুয়ের প্রশিক্ষক গুস্তাভো আলফারো

বছর ৪৮-এর লিওনেল স্কালোনির সামনে আবার একেবারেই অন্য লক্ষ্য, বিশ্বকাপ ধরে রাখা। আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ-তৃষা মেটানোর প্রধান কারিগর তো তিনিই। সঙ্গে দিয়েছেন দুটো কোপা আমেরিকা, একটা ফিনালিসিমাও। দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে রয়েছেন, কাজ করেছেন একাধিক খেলোয়াড়ের সঙ্গে। তবে তিনি দলগত আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁর সহকারী সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্যামুয়েল, আইমার, আয়ালার মতো প্রাক্তন খেলোয়াড়। যা আগে প্রায় কেউই সাফল্যের সঙ্গে পারেননি, স্কালোনিরা সেটা করে ফেলেছেন। মেসিকে আর্জেন্টিনা দলে খোলা মনে খেলার পরিসর দিয়েছেন। এই জন্য তাঁরা তৈরি করেছেন একটা ‘কোর গ্রুপ’, যাতে মাঠের আদানপ্রদান হবে সহজাত। খেলার মধ্যে অনেক বেশি আন্তঃব্যক্তিক (interpersonal) সম্পর্ক তৈরি হবে।

আর্জেন্টিনাকে ফের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন লিওনেল স্কালোনি

ইউরোপে জনপ্রিয় ঘরানা ‘হুয়েগো দে পসিশিওঁ’ (Juego de Posición)-এর থেকে কিঞ্চিত দূরত্ব বজায় রেখে স্কালোনি গুরুত্ব দিয়েছেন ফুটবলের সাংস্কৃতিক দিককে। শিশু-কিশোর ফুটবলারদের অত্যধিক তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত করতে স্কালোনির আপত্তি আছে। ফুটবলের সহজাত দিকগুলো হারিয়ে যাচ্ছে বলেও অতীতে আক্ষেপ করেছেন স্কালোনি। তাই ফুটবল কৌশল এবং শৈলীকে দেখার একটি পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি তৈরি করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে গত বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলের ক্ষেত্রে ‘থার্ডম্যান মুভমেন্ট’টিকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন স্বতন্ত্র কায়দায়। তিনি বলেছেন, সতীর্থ পাবলো আইমার ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার আগে অবধি ‘থার্ডম্যান রান’ সম্পর্কে শোনেননি। অথচ, বর্তমানে আধুনিক ইউরোপীয় ফুটবলে প্রশিক্ষণের সময়ে সেটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে শেখানো হয়। স্কালোনির মতে, আর্জেন্টিনীয়রা পোত্রেরো-য় ফুটবল খেলতে খেলতে ছোটবেলায় সহজাতভাবে এই ধরনের মুভমেন্ট আত্মস্থ করে, ট্রেনিং গ্রাউন্ডে আলাদা করে তাদের শেখাতে হয় না। এটা তাদের নিজস্ব ফুটবল ঘরানা ‘লা নুয়েস্ত্রা’-রই অংশ, কে কোথায় থাকবে, সবটাই বুঝে নেওয়া যায়, এর জন্য আলাদা অনুশীলনের প্রয়োজন নেই।

কোচিং স্টাফদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি

বিশ্বজয়ী স্কালোনির এবারের দলগঠন কিন্তু সমালোচনা এড়ায়নি। অভিযোগ, তিনি ত্রিশোর্ধ্ব বেশ কিছু খেলোয়াড়কে দলে নিয়েছেন, কোথাও হয়তো পক্ষপাত রয়েছে। অবশ্য স্কালোনি এসব খুব একটা গায়ে মাখছেন না। তাঁর লক্ষ্য আর্জেন্টিনাকে নিয়ে আরও সুন্দর ফুটবল খেলানো। নামের বিচারে এগিয়ে থাকলেও গ্রুপে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া কিংবা জর্ডনের সঙ্গে খেলা যে খুব সহজ হবে না, এটা আর্জেন্টিনার সমর্থকরা জানে। গতবার প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের সঙ্গে হারের অভিজ্ঞতা থেকে এবার আরও সতর্ক হয়ে নামতে চাইবেন স্ক্যালোনিরা। ৪০ ছুঁই ছুঁই মেসিকে কীভাবে তিনি ব্যবহার করেন, সেটাও দেখার।

এলএম টেন: রাঙিয়ে দিয়ে যাওয়ার বেলায়

‘ককরোচ ক্যাডার’দের কাজ সহজ নয়। বিশ্বকাপ যাত্রায় পরস্পরের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকেরই। সংখ্যায় খুব একটা পিছিয়ে নেই ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানির প্রশিক্ষকরাও। প্রথা ভেঙে ইতালির কার্লো আন্সেলোত্তিকে দায়িত্ব দিয়েছে ব্রাজিল। শেষ হাসি কে হাসবে, তা দেখতে তাকিয়ে থাকতে হবে ফাইনাল পর্যন্ত। তবে অদূর ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনাকে কোচের জন্য যে বাইরে তাকাতে হবে না, তা বলাই যায়। আরশোলারা তো টিকে থাকবেই!

… পড়ুন বিশ্বকাপ নিয়ে ‘গোলগপ্‌পো’ সিরিজের অন্যান্য লেখা …

১. বৈষম্যের পৃথিবীতে ফুটবল আজও প্রতিরোধ

২. বাঁধভাঙা উত্তাপে কি পুড়বে বিশ্বকাপ?

৩. ফুটবলের আয়নায় বাঙালির বিশ্বদর্শন

৪. মৃত্যুর ডিফেন্স ভেঙে গোল

৫. বিশ্বকাপ ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ নয়