


ফিফার পরিবেশগত নীতি ও ২০২৬ বিশ্বকাপের নেতিবাচক জলবায়ু প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই মারাত্মক সমালোচনামূলক একটি রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। সেটির শিরোনাম– “ফিফা’স ক্লাইমেট ব্লাইন্ড স্পট” (FIFA’s Climate Blind Spot)। ‘সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপন্সিবিলটি’ (Scientists for Global Responsibility) এবং ‘এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড’ (Environmental Defense Fund)-এর মতো পরিবেশবাদী সংস্থার যৌথ গবেষণায় এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে উদ্বেগের সঙ্গে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দূষণ-সৃষ্টিকারী এই টুর্নামেন্টে আনুমানিক ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে! এই পরিমাণটি বিগত (২০১০-২০২২) বিশ্বকাপগুলির গড় নির্গমনের চেয়ে প্রায় ৯২% বেশি।
১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই– গোটা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ প্রবল আবেগ আর তীব্র উন্মাদনায় মেতে উঠবে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। ভারতের অংশগ্রহণ না-ই বা থাকল, আন্তর্জাতিক ফুটবল দুনিয়ায় বাঙালির আবির্ভাব না-ই বা ঘটল, তবু কে না জানে, এই খেলার সঙ্গে জড়িয়ে সবার বাঁধনহীন আবেগ ও ভালোবাসা– ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’।

বাঙালি তো চিরকালই ফুটবল-পাগল। বাংলার তারকা ফুটবলার না থাকলেও, কলকাতা বরাবর নানা উপলক্ষে নানা দেশের ফুটবল টিমের কোনও না কোনও সুপারস্টারকে আপনজন হিসেবে বরণ করেছে হৃদয়ের উচ্ছ্বসিত আবেগে, গত শতকের সেই পাঁচের দশক থেকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের লেভ ইয়াসিন বা ইংল্যান্ডের ববি মুর, ব্রাজিলের পেলে, ক্যামেরুনের রজার মিলা থেকে শুরু করে হাল আমলে আর্জেন্টিনার দিয়েগো মারাদোনা বা লিওনেল মেসিকে কলকাতার মাঠে দেখতে পেয়ে প্রজন্মান্তরের যে আপামর বাঙালি উদ্বেল হয়েছে, তারাই প্রতি চার বছর অন্তর মেতে ওঠে বিশ্বকাপ নিয়ে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ফাইনালে হার-জিতের বহু আগে থেকেই প্রিয় দলকে বাজি রেখে উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে বাঙালি ভাগ হয়ে যায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স বা জার্মানি শিবিরে। কোনওবার আবার অপ্রত্যাশিতভাবে ট্রফি উঠে এসেছে স্পেন কিংবা ইতালির হাতে। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা জিতে যাওয়ায় একদা ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরবাসীর সে কী মনোবেদনা! ফ্রান্সের ‘আইকনিক’ খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপে তখন তাদের কাছে ট্রাজিক হিরো। ফ্রান্সের সাফল্য কামনায় এমবাপে বন্দনায় পুজোও দিয়েছিল চন্দননগর! তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির প্রাণের টান এখনও যেন বিশেষভাবে ঘিরে থাকে সেই নেইমার-রোনাল্ডো আর মেসির দলকে কেন্দ্র করে।

এবারের ঐতিহাসিক টুর্নামেন্টে আবার কোন চমক অপেক্ষা করছে কে জানে! তবে ফলাফল তো পরের কথা, বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে সারা দুনিয়ার মতো আগামী সাড়ে পাঁচ সপ্তাহ বাংলার যাবতীয় ফুটবলপ্রেমীর চোখ থাকবে টিভির পর্দায় অথবা অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটে। সে রাত জেগেই হোক, শেষরাত কিংবা খুব ভোরে।
বাঙালির চায়ের কাপে আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের ঝড় কিংবা ইউরোপীয় ফুটবলের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবার আরও জমজমাট হবে। মেসি, এমবাপে, ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের মতো বিশ্বসেরা তারকা যখন বল পায়ে মাঠে নামবেন, তখন থমকে যাবে গোটা পৃথিবী।

২০২৬ বিশ্বকাপ কিন্তু নানা দিক দিয়ে ঐতিহাসিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো– ইতিহাসে প্রথমবার কোনও ফুটবল বিশ্বকাপ যৌথভাবে তিনটি দেশের মাটিতে আয়োজিত হতে চলেছে। তিন আয়োজক দেশের প্রতিনিধিত্ব ফুটিয়ে তুলেছে বিশেষভাবে ডিজাইন করা লাল, সবুজ, নীল-রঙা বিশ্বকাপের বল ‘ট্রিওন্ডা’। ‘ট্রি’ অর্থাৎ তিন এবং স্প্যানিশ শব্দ ‘ওন্ডা’ মানে আবহ বা পরিবেশের ঢেউ। রংচঙে বলটিতে তিন দেশের প্রতীক– মেপল লিফ, স্টার এবং প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার দ্যোতক ক্যাকটাসে বসে সাপ খেতে থাকা সোনালি ঈগল। এর আগে ২০০২ সালে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। সেবারে খেলা হয়েছিল দু’টি দেশের ২০টি শহরে। আর এবার তিনটি দেশ হাত মিলিয়েছে এই মহাযজ্ঞ সফল করতে, যেখানে মোট ১৬টি শহরের বিশ্বমানের সব স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিটি ম্যাচ। ফুটবল দুনিয়ার নজরের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি, মেক্সিকোর তিনটি এবং কানাডার দু’টি শহর।

মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও অ্যাজটেক স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী ম্যাচ থেকে শুরু করে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার এবং সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি– ভৌগোলিক দিক থেকে এত বিশাল অঞ্চল জুড়ে বসছে খেলার আসর। দূরত্বের হিসেবে করলে সব মিলিয়ে ৪,৫০০ কিমিরও বেশি। এতদিন বিশ্বকাপ মানেই ছিল ৩২টি দলের লড়াই। আটটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দলগুলি শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের জন্য লড়ত। এবারের বিশ্বকাপ থেকে সেই চেনা সমীকরণ অতীত। ফুটবলের বিশ্বায়নকে আরও ত্বরান্বিত করতে এবং অন্যান্য দেশগুলিকে বিশ্বমঞ্চে সুযোগ করে দিতে ফিফা দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে করেছেন ৪৮। দলের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে টুর্নামেন্টের ফরম্যাটেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এবার রয়েছে মোট ১২টি গ্রুপ এবং প্রতি গ্রুপে ৪টি করে দল। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দু’টি দল এবং সব গ্রুপ মিলিয়ে সেরা ৮টি তৃতীয় স্থানে থাকা দল সরাসরি পৌঁছে যাবে নকআউট পর্বে। অর্থাৎ, এবার নকআউট রাউন্ড শুরু হবে ‘রাউন্ড অফ ৩২’ থেকে।
দল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের সংখ্যাও একলাফে অনেক বেড়ে গিয়েছে। আগের ৬৪টি ম্যাচের পরিবর্তে ফুটবল-পাগল দর্শকেরা এবার উপভোগ করতে পারবেন মোট ১০৪টি রোমাঞ্চকর ম্যাচ! তাতে অংশগ্রহণ করছেন মোট ৭১টি দেশের ৪৪৯ ক্লাবের ১,২৪৮ ফুটবলার! কাজেই ফুটবলের এই দীর্ঘতম মহোৎসবের স্থায়িত্ব এবং উত্তেজনা দুই-ই এবার অন্য মাত্রা ছুঁতে চলেছে।

কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে অধীর আগ্রহে দুনিয়ার মানুষ যখন মাতোয়ারা, প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বাজেটের বিপুল আয়োজন, চূড়ান্ত আনন্দ-উল্লাস এবং নানা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের জৌলুসের উন্মাদনায় সকলে যখন মোহিত, তখন কেউ কি কল্পনা করতে পারছেন যে, ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দূষণকারী আসর হতে চলেছে! ফিফার পরিবেশগত নীতি ও ২০২৬ বিশ্বকাপের নেতিবাচক জলবায়ু প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই মারাত্মক সমালোচনামূলক একটি রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। সেটির শিরোনাম– “ফিফা’স ক্লাইমেট ব্লাইন্ড স্পট” (FIFA’s Climate Blind Spot)। ‘সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপন্সিবিলটি’ (Scientists for Global Responsibility) এবং ‘এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড’ (Environmental Defense Fund)-এর মতো পরিবেশবাদী সংস্থার যৌথ গবেষণায় এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে উদ্বেগের সঙ্গে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দূষণ-সৃষ্টিকারী এই টুর্নামেন্টে আনুমানিক ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে! এই পরিমাণটি বিগত (২০১০-২০২২) বিশ্বকাপগুলির গড় নির্গমনের চেয়ে প্রায় ৯২% বেশি।

টুর্নামেন্টের পরিধি প্রসারিত করে ফিফা দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮টি করেছে এবং খেলাগুলি তিনটি দেশের ১৬টি বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দিয়েছে। উত্তর আমেরিকায় ইউরোপ বা এশিয়ার মতো উন্নত ‘হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক’ না থাকায়, দল ও লাখ লাখ ভক্তদের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণভাবে বিমান ভ্রমণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহনই কার্বন ফুটপ্রিন্ট আকাশচুম্বী হওয়ার মূল কারণ। রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ফিফা মুখে পরিবেশ রক্ষার বড় বড় কথা (Sustainability Pledges) বললেও বাস্তবে তার বিপরীত কাজ করছে, যা স্পষ্ট ‘গ্রিনওয়াশিং’ (Greenwashing)। অর্থাৎ পরিবেশ-রক্ষার নামে ভুয়ো বা অতিরঞ্জিত প্রচার।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হল সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি ‘আরামকো’ (Aramco)-র সঙ্গে ফিফার স্পনসরশিপ চুক্তি। এই চুক্তির প্রচার ও বিক্রির কারণে ২০২৬ সালে পরোক্ষভাবে আরও অতিরিক্ত তিন কোটি টন কার্বন নির্গমন হতে পারে। ‘ক্লাইমেট ব্লাইন্ড স্পট’ রিপোর্টের মূল বার্তা হল– পরিবেশের কথা বিবেচনা না-করে ফিফা কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে টুর্নামেন্টের আকার বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে একটি ‘বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি’ বিশ্বকাপ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে ফিফাকে সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবতে হবে।
কানাডার বিখ্যাত জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. ক্যাথারিন হ্যাহো (Dr. Katharine Hayhoe) ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এই আয়োজন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ক্রমাগত বাড়তে থাকা পরিবেশগত বিপর্যয় এবং অব্যবস্থার এক চরম নিদর্শন। অথচ আয়োজক দেশ এবং ফিফা এই টুর্নামেন্টকে পরিবেশবান্ধব বা কার্বন-নিরপেক্ষ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের দাবি, এই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ‘সবুজ’ বা পরিবেশবান্ধব বিশ্বকাপ। কারণ, এত বড় টুর্নামেন্টে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্টেডিয়ামগুলিতে রয়েছে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে কার্যকর করা হচ্ছে কড়া নিয়ম। ভ্রমণের ধকল এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে ম্যাচগুলিকে ভৌগোলিক ক্লাস্টার বা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন দলকে গ্রুপ পর্বে খুব বেশি দূরে ভ্রমণ করতে না-হয়।

ফিফার বক্তব্য, কাতার বা রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের মতো এবার আর নতুন করে বিশাল স্টেডিয়াম তৈরি করতে হয়নি, যে-সব স্টেডিয়াম আগে থেকে রয়েছে, সেখানেই ম্যাচ হচ্ছে। ফলে নির্মাণজনিত দূষণ এড়ানো গিয়েছে। টুর্নামেন্টের ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে বেশিরভাগই কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রেখে ইউএস ‘গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল’ থেকে ‘LEED’ (গ্রিন বিল্ডিং) সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। স্টেডিয়ামগুলিতে জ্বালানি সাশ্রয় এবং জল অপচয় রোধের ব্যবস্থা রয়েছে। মূল কথা, স্টেডিয়ামগুলি পরিবেশবান্ধব হলেও, ভেবে দেখার মতো বিষয় হল– নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, মায়ামি, বস্টন, ফিলাডেলফিয়া, আটলান্টা, হিউস্টন, কানসাস সিটি, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটলের পাশাপাশি মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, মনটেরি, টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার-সহ তিনটি দেশের দূরবর্তী ১৬টি শহরে বিভিন্ন দলের খেলোয়াড় ও লাখ লাখ ক্রীড়ামোদী দর্শকের বিমান ভ্রমণ ও অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের ফলে প্রচুর পরিমাণ দূষণ ঘটবে। ফিফার এই ছোটখাটো সবুজ উদ্যোগের তুলনায় তা বহুগুণ বেশি। গবেষণা সংস্থা ‘Greenly’-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ীও, এই বিশ্বকাপের জেরে প্রায় ৭.৮ থেকে ৯ মেগা টন (৭৮ থেকে ৯০ লাখ টন) কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশতে চলেছে। টুর্নামেন্টের মোট কার্বন ফুটপ্রিন্টের সিংহভাগই (প্রায় ৮৭%) দর্শকদের বিমান ভ্রমণের কারণে ঘটবে বলে আশঙ্কা। পরিবেশবিদরা বলছেন, এক বছরে ২০ লাখ মোটরগাড়ি থেকে যে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ঘটে, শুধু এই বিশ্বকাপের জন্য বিমান পরিবহনের জ্বালানি থেকেই সেই পরিমাণ দূষণ ছড়াবে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬, ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপগুলিতে বিমান ভ্রমণের দরুন কার্বন নির্গমন আগের গড় তুলনায় ১৬০ থেকে ৩২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া ২০৩০ সালের স্পেনের কাপ-আসরে আসরে ৬১ লাখ টন এবং ২০৩৪ সালের সৌদি আরবের আসরে ৮৬ লাখ টন কার্বন নির্গমন হতে পারে। যেখানে ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গত চারটি বিশ্বকাপের গড় নির্গমন ছিল ৪৭ লাখ টন, সেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপে বৃদ্ধি ঘটবে ৯২ শতাংশ, ২০৩০-এ ২৯ শতাংশ এবং ২০৩৪-এ ৮২ শতাংশ!
এর ওপরে রয়েছে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের গুনাগার। খেলার মাঠ অর্থাৎ স্টেডিয়ামের বাইরের এক বিশাল পরিবেশগত খরচ হল এর ডিজিটাল সম্প্রচার। কলকাতা, শিলিগুড়ি বা দুর্গাপুরের শপিং মলে কিংবা হোটেল, রেস্তোঁরা বা গেটেড কমিউনিটিতে জায়ান্ট স্ক্রিনে অথবা নিজের বাড়ি বা ক্লাবে সকলে একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে কার না ভালো লাগে? আর শুধু ম্যাচ দেখলেই তো হবে না, বন্ধু ও প্রিয়জনের সঙ্গে খেলা নিয়ে তো টুকরো-টাকরা আলোচনাটাও চালিয়ে যেতে হবে। ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ উসকে বাণিজ্যিক ফায়দা তুলতে পারস্পরিক জোট বেঁধেছে অ্যাডিডাস (Adidas) এবং হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp)। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফুটবল ইমোজিটিকে তারা সরাসরি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রিওন্ডা’-তে রূপান্তরিত করেছে। ফলে এখন থেকেই পুরো টুর্নামেন্ট চলাকালীন চ্যাটের ভেতরে এটি কেবল একটি স্থির আইকন বা ছবি হয়ে থাকার পরিবর্তে, হোয়াটসঅ্যাপের ফুটবল ইমোজিটি সরাসরি ‘ট্রিওন্ডা’র রূপ ধারণ করবে। আর সকলের উন্মাদনায় ভর করে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ফিভার’কে একেবারে আমাদের প্রতিদিনের আলাপচারিতার মধ্যে নিয়ে আসবে। এর আসল বাণিজ্যিক লক্ষ্য হল– গ্রুপ চ্যাট, রিঅ্যাকশন এবং ম্যাচ চলাকালীন অনবরত মেসেজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে ভক্তরা বর্তমানে যেভাবে ফুটবল উপভোগ করে, তার সঙ্গে সরাসরি জুড়ে যাওয়া। খেলা দেখা বা মেসেজ চালাচালির সময় আমরা নিশ্চয়ই খেয়ালও করব না যে, বিশ্বজুড়ে শত কোটি মানুষের লাইভ স্ট্রিমিং, ডেটা সেন্টার ও ব্রডকাস্টিং সার্ভারগুলি চালু রাখতে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের ব্যবহার আবার পরোক্ষভাবে জলবায়ু দূষণ বাড়াবে। পরিবেশবিদরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ফিফা যেন প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বাস্তবতাকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলেছে। অসংখ্য সমর্থক, খেলোয়াড় ও ফুটবলের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে যেখানে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেখানে ফিফার নানা সিদ্ধান্ত উল্টে সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। সচেতনভাবে বা অজান্তেই ফিফা পরিবেশকে এক চরম বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে এই টুর্নামেন্ট বিশাল পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে বিশ্ব উষ্ণায়নের সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র দাবদাহ ও চরম আবহাওয়া সরাসরি খেলোয়াড় ও দর্শকদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর আমেরিকায় মে-জুন মাসে যে রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা তৈরি হয়েছে, তা এবারের বিশ্বকাপকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সংগঠন ক্লাইমেট সেন্ট্রালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৯৭টি ম্যাচই ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তীব্র গরমে খেলোয়াড়দের দৌড়নোর গতি যেমন কমে যেতে পারে, তারা যেমন সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে, তেমনই খেলার সামগ্রিক মান পড়ে যেতে পারে। আবহাওয়া গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, অন্তত ২৬টি ম্যাচে ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ (WBGT– যা তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সূর্যের তাপের যৌথ সূচক) ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করতে পারে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের সংগঠন (FIFPRO)-এর নিয়ম অনুযায়ী, এই সূচক ২৮ ডিগ্রি পার হলে হিটস্ট্রোকের হাত থেকে খেলোয়াড়দের বাঁচাতে ম্যাচ স্থগিত বা পিছিয়ে দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। দর্শকদের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি এবং খেলোয়াড়দের ‘ডিহাইড্রেশন’ রোধ করতে ফিফা এবার ম্যাচের প্রতি অর্ধে আবশ্যিক বিরতি বা ‘কুলিং ব্রেক’ যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। মোদ্দা কথা, ২০২৬ বিশ্বকাপ নিজেই এক জলবায়ু সংকটের জটিল আবর্তে আটকে পড়েছে। একদিকে এই আয়োজন বিপুল পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে পরিবেশ দূষিত করছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে মাঠগুলিকে খেলোয়াড়দের জন্য একেকটি ‘তপ্ত চুল্লি’তে পরিণত করছে।
ওয়ার্ল্ড মেটেরিওলজিকাল অর্গানাইজেশন (WMO) ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, ২০২৬-২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১৮৫০-১৯০০ সালের (প্রাক্-শিল্পায়ন যুগ) গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে। আশঙ্কা, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে যে কোনও একটি বছর উষ্ণতম বছর হিসেবে ২০২৪ সালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বের নানা দেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ডেটা সেন্টার, নানা তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার গ্লোবাল কেপেবিলিটি সেন্টার (জিসিসি) ইত্যাদির মাধ্যমে আবহাওয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার এবং জল সংকটের তথ্য সামনে তো আসছেই। এবারে জানা যাচ্ছে, এই বিশ্বকাপের জেরেও জলবায়ু পরিস্থিতি আরও বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা। আধুনিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার তাগিদে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির খেসারত হিসেবে আমরা ক্রমাগত খুইয়ে চলেছি প্রকৃতির স্বাভাবিকতা।

তবে বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের সূচনার ঠিক প্রাক্ লগ্নে পরিবেশ সুরক্ষার চেতাবনি শোনালে উৎসবের রসভঙ্গ হয়। কাজ কি তেমন বেরসিকের ভূমিকা পালন করে? উত্তর আমেরিকার আকাশ-জুড়ে এখন উৎসবের আলো। মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী মারিয়াচি সংগীত, আমেরিকার আধুনিক পপ সংস্কৃতি আর কানাডার শান্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য– সব এক সুতোয় বাঁধতে চলেছে ফুটবলের জাদু। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি হতে চলেছে মানবজাতির ঐক্য, বৈচিত্র্য এবং ক্রীড়াশৈলীর এক অনন্য উদযাপন। এখন শুধু মাঠে বল গড়ানোর অপেক্ষা, বিশ্ব তাকিয়ে আছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপঙ্কর দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved