


১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিলের বিশ্বজয় বাংলার ফুটবল সাংবাদিকতার চোখ দিয়ে পেলেকে এক অন্য আসনে প্রতিষ্ঠা দেয়, পেলে হয়ে ওঠেন ‘ফুটবল সম্রাট’। অন্য দিকে এই দশকেই অমল দত্তের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলের ঝলক দেখে বাঙালি দর্শক এবং খেলোয়াড়রা। ব্যক্তিগত সংগ্রহের ভিডিও ক্যাসেট এবং প্রোজেক্টর নিয়ে তিনি পৌঁছে যান গ্রামে-গঞ্জে-মফস্সলে। স্ট্যানলি ম্যাথিউজ কীভাবে ‘ওভারল্যাপ’ করতেন, সেই প্রথম চাক্ষুষ করে বাঙালি দর্শক।
বিশ শতকের বিশ্ব-ইতিহাস নিয়ে বহুচর্চিত গ্রন্থ ‘দ্য এজ অফ এক্সট্রিমস’ (The Age of Extremes)-এর এক জায়গায় এরিক হবসবম লিখছেন, ‘ব্রাজিল দলের গৌরবময় সময়টা যারা দেখেছে, তারা কি এর শিল্পের দাবিকে অস্বীকার করতে পারে?’ কে না জানে ব্রাজিলীয় ফুটবলের শিল্প-জাদুতে মজেছিল বাঙালিও। আজও বিশ্বকাপ এলে এক অংশের বাঙালি উদ্বেল হয়ে ওঠে হলুদ-সবুজ জার্সির প্রেমে। কিন্তু বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের কি সৌভাগ্য হয়েছিল সে-যুগের গ্যারিঞ্চা, পেলে কিংবা কার্লোস আলবার্তোদের ফুটবল চাক্ষুষ করার? উত্তর হল, না! টেলিভিশনে ফুটবল সম্প্রচার তখন দূরঅস্ত। তাহলে বিশ্ব-ফুটবল কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রেমে বাঙালি পড়ল কেমন করে? কেমন করেই বা তার মুখে মুখে ঘুরল পুসকাস থেকে গ্যারিঞ্চা, বেকেনবাওয়ার থেকে ইউসেবিও-র নাম? টেলিভিশন আসার পরেই বা কেমন করে পালটে গেল বিশ্বকাপের দর্শন?

১৯৩০ থেকে ১৯৩৮, পুরুষদের প্রথম তিন বিশ্বকাপের সময়ে ভারতবর্ষ পরাধীন। এই তিন বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডও অংশগ্রহণ করেনি। ফিফা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল তারা। বাংলার সংবাদপত্রে ফুটবলের খবর কিন্তু ১৯১১-এ মোহনবাগানের শিল্ড বিজয়ের পর থেকেই গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হত। ১৯৩৪-’৩৮ মহামেডান স্পোর্টিংয়ের গৌরবময় অধ্যায়ও ঠাঁই পেয়েছিল খবরের কাগজে। কলকাতার ফুটবলের পাশাপাশি ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় আলাদা করে মিলত ইংল্যান্ডের ক্লাব ফুটবল কিংবা কাউন্টি ক্রিকেটের খবরও। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম তিন সংস্করণে উরুগুয়ের জয় কিংবা ইতালির জোড়া জয়ের খবর তেমন গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসেনি সংবাদপত্রের পাতায়। হয়তো ইংল্যান্ড যোগ না-দেওয়ায় তাদের উপনিবেশে সেই খেলা নিয়ে তেমন সাড়া পড়েনি।
১৯৩৮ সালে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ‘পৃথিবীর ফুটবল কাপ প্রতিযোগিতা’য় ইতালির জয়ের খবর ছাপা হয়। তখন বিশ্ব-রাজনীতিতে এক তোলপাড় করা যুগ। বিশ্ব ফুটবল প্রতিযোগিতার তৃতীয় পর্ব শেষ হতে না-হতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সলতে পাকানো শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে, থমকে যায় পরের প্রতিযোগিতাগুলো।

১৯৪৭-এ বাংলার বুকের ওপর দিয়ে দেশভাগ ঘটে গিয়েছে, বাঙালির পরিচিতি হয়েছে দ্বিখণ্ডিত। ১৯৫০-এর বিশ্বকাপ থেকেই পশ্চিমবঙ্গের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ‘বিশ্ব ফুটবল প্রতিযোগিতা’র খবর আসতে শুরু করে। তখনকার সংবাদপত্রে এর নাম কখনও ‘নিখিল বিশ্ব ফুটবল প্রতিযোগিতা’ কখনও বা ‘জুলেস রিমেট কাপ’। বিশ্ব রাজনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশ অংশগ্রহণ করতে না-পারায় এই প্রতিযোগিতায় ভারত যোগদানের সুযোগ পায়। প্রথমে আগ্রহ দেখালেও শেষমেশ ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন দল না-পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ‘যুগান্তর’-এ অজয় বসু এই সিদ্ধান্তকে ‘নির্বুদ্ধিতা’ বলে অভিহিত করেন। যাই হোক, সংবাদপত্রে এবং পত্রিকায় বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে ঘরের মাঠে ‘ব্রেজিল’ দলের হতাশার হারের কাহিনি ছাপা হয়।

১৯৫৪ কিংবা ১৯৫৮ সালে আরও একটু বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হতে থাকে এই প্রতিযোগিতার খবর। উদাহরণস্বরূপ, ‘দেশ’ পত্রিকায় (আষাঢ় ১৩৬১) ‘একলব্য’-এর কলমে ‘জুলেস রিমেট’ কাপের প্রতিবেদনে উঠে আসে সামগ্রিক প্রতিযোগিতার নির্যাস, ছাপা হয় ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউজ এবং হাঙ্গেরির কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাসের ছবি। ততদিনে অবশ্য অলিম্পিকের সৌজন্যে বাংলা সংবাদপত্রে তাঁরা পরিচিত নাম। তবে ১৯৫৮-এ ১৭ বছরের পেলের বিস্ময়কর আবির্ভাব নিয়ে বাংলায় তৎক্ষণাৎ বিশেষ হইচই হয়নি।

ছয়ের দশক থেকেই তৎকালীন জুলে রিমে কাপ-সহ আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে বাংলার পত্রপত্রিকাতে তথ্যসমৃদ্ধ লেখার চল হল। মতি নন্দী ১৯৬০ সালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় ‘মাঠ-ময়দান’ নামে বিশেষ খেলার পাতার দায়িত্বে এসে পালটে দিলেন খেলাকেন্দ্রিক খবর কিংবা বিষয়বস্তু পরিবেশনের ধরন। ‘ক্রীড়া সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ‘ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস’ ম্যাগাজিন থেকে তিনি পেলের ছবি ছাপার পরে অনেকেই পেলেকে কার্যত প্রথম দেখেন। তাঁর মতে, সে-যুগে দাঁড়িয়ে তথ্যের অপ্রতুলতা সাংবাদিকদের কাছে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাই হোক, মূলত ১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে ফুটবল সাংবাদিকতা ও ক্রীড়ালেখনী নতুন দিশা পায়। ইংল্যান্ডের নিজের দেশে জুলে রিমে ট্রফি জয়ের পরে ‘দেশ’ কিংবা ‘অমৃত’ পত্রিকায় প্রতিযোগিতার একপেশে রেফারিং এবং খেলোয়াড়দের বিশৃঙ্খলার কথা উঠে আসে। আবার, ‘সাপ্তাহিক বসুমতী’–র এক সংখ্যায় পেলে ও ইউসেবিও-র তুলনা টানা হয়। পরের বছরে চিরঞ্জীব (চিত্ত বিশ্বাস)-এর ‘বিশ্ব ফুটবল’ দুই মলাটে তুলে ধরে লেভ ইয়াসিন, দি স্তেফানো, গর্ডন ব্যাঙ্কস-সহ একাধিক কিংবদন্তি ফুটবলারের কৃতিত্ব। তবে ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিলের বিশ্বজয় বাংলার ফুটবল সাংবাদিকতার চোখ দিয়ে পেলেকে এক অন্য আসনে প্রতিষ্ঠা দেয়, পেলে হয়ে ওঠেন ‘ফুটবল সম্রাট’। অন্য দিকে এই দশকেই অমল দত্তের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলের ঝলক দেখে বাঙালি দর্শক এবং খেলোয়াড়রা। ব্যক্তিগত সংগ্রহের ভিডিও ক্যাসেট এবং প্রোজেক্টর নিয়ে তিনি পৌঁছে যান গ্রামে-গঞ্জে-মফস্সলে। স্ট্যানলি ম্যাথিউজ কীভাবে ‘ওভারল্যাপ’ করতেন, সেই প্রথম চাক্ষুষ করে বাঙালি দর্শক।

সাতের দশক থেকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে খেলাকেন্দ্রিক সাহিত্য। মতি নন্দীর ‘স্ট্রাইকার’-এর নায়ক প্রসূন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে ব্রাজিলের ক্লাব স্যান্টোসে খেলার; অরুণ আইনের ‘হলুদে সবুজে’-র নায়ক গোল করে হারায় বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলারের ইউরোপীয় একাদশকে। শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনীমূলক উপন্যাস ‘ধূমকেতু আর সূর্য’-তে ধরা পড়ে আফ্রিকার মোজাম্বিক থেকে পর্তুগালে পাড়ি জমানো ইউসেবিও-র বিশ্বকাপ মাতানোর কাহিনি। জয়ন্ত দত্তের ‘পেলের ডায়েরী’, শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বলের রাজা পেলে’ প্রভৃতি বই পেলেকে কার্যত বাঙালির ঘরের ছেলে করে তোলে। বাঙালি হয়ে উঠতে থাকে ‘ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যান’।
পরবর্তীকালে বোরিয়া মজুমদার কিংবা সৌভিক নাহার মতো গবেষকেরা দেখান, কীভাবে পেলে তথা ব্রাজিলের ফুটবলের মধ্য দিয়ে উপনিবেশের ইতিহাস বয়ে বেড়ানো বাঙালি খুঁজে পাচ্ছে চেতনায় প্রতিরোধের এক ভাষ্যকে। এই ধারাবাহিকতা বেয়েই ১৯৭৭-এ পেলের কলকাতায় খেলতে আসাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে ব্যাপক উদ্দীপনা। ততদিনে বাঙালির ঘরে টেলিভিশনের হাতছানি। কসমস বনাম মোহনবাগান ম্যাচ সম্প্রচার হচ্ছে দূরদর্শনের পর্দায়। বাঙালি প্রবেশ করতে চলেছে ফুটবল ‘দেখা’র এক নতুন যুগে।

১৯৭৮-এর বিতর্কিত আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ছবি এবং খবর আসত চিত্র-সাংবাদিক অমিয় তরফদারের থেকে। আর সেইসব প্রকাশ পেত মূলধারার সংবাদপত্রে নয়তো খেলার পত্রিকায়। ১৯৭৭ থেকে ‘খেলার আসর’ দিয়ে বাংলায় পূর্ণাঙ্গ খেলার পত্রিকার শুরু, একে একে এল– ‘খেলার কথা’, ‘খেলার কাগজ’ এবং ‘খেলা’। নেপথ্যে অশোক দাশগুপ্ত। আর এসব পত্রিকার বড় অংশ জুড়ে রইল ফুটবল। ১৯৭৮-এ বিশ্বকাপের মাসে ‘আনন্দমেলা’-র বিশেষ ফুটবল সংখ্যায় প্রকাশিত হল ‘বিশ্বকাপ ফুটবল: সচিত্র ধারাবিবরণী’ শীর্ষক ধারাবাহিক কমিক স্ট্রিপ, ১৯৩০ থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাস উঠে এল সেখানে। এই বিশ্বকাপে ফাইনাল ম্যাচের চলতি বিবরণী শোনার ব্যবস্থা করল আকাশবাণী। আবার দূরদর্শনের পর্দায় বাঙালি দর্শক দেখল দুটো ম্যাচ (তৃতীয় স্থান নির্ধারক এবং ফাইনাল), তবে সরাসরি সম্প্রচারের বদলে দু’দিন পরে রেকর্ডিং হিসেবে। ‘খেলার আসর’-এর এক সংখ্যায় দূরদর্শনকে অশোক দাশগুপ্ত ধন্যবাদ জানালেও মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না, দূরদর্শন আরও একটু সচেষ্ট হলে পুরো বিশ্বকাপ সরাসরি দেখানোর দায়িত্বও নিতে পারত।
সমালোচনার ফল মিলল পরের বিশ্বকাপেই। দূরদর্শনের উদ্যোগে সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালের সরাসরি সম্প্রচার হলই, আরও কয়েকটা খেলারও বিলম্বিত সম্প্রচার হল। পড়শি দেশে বিটিভি আরও কিছু খেলা দেখানোর বরাত পেয়েছিল। এপারের অনেক ফুটবলপ্রেমীর স্মৃতিতে জেগে আছে অ্যান্টেনায় ‘বুস্টার’ লাগিয়ে বিটিভি-র সিগন্যাল ধরে খেলা দেখার উদ্যোগ। চার বছর পরে ঘটে গেল ‘বিপ্লব’। ১৯৮৬-র বিশ্বকাপের সমস্ত ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার হল দূরদর্শনের পর্দায়। আর বাঙালির ফুটবল সমর্থনের ইতিহাসে ব্রাজিলের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে উঠে আসল দিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্টিনা। পেলের সাম্রাজ্যেও ভাগ বসালেন ফুটবলের রাজপুত্র।

১৯৮৬ থেকে টেলিভিশনে ফুটবল সম্প্রচারের যে বাঁকবদল ঘটল, তাকে উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো বলেছেন– ‘টেলিক্রেসি’-র যুগ, বিপুল অঙ্কের টিভি স্বত্ব নেওয়া মিডিয়া সংস্থারাই খেলা সম্প্রচারের বিষয়ে শেষ কথা। বাংলা সাহিত্যেও ধরা পড়ল টেলিভিশনে ফুটবলের জনপ্রিয়তা। দিব্যেন্দু পালিতের ‘ব্রাজিল’ গল্পের নায়ক মাঝবয়সি কিঙ্কর দত্ত বিশ্বকাপের খেলা দেখতে ছোটে পরিমল বোসের বাড়ি, ফ্রান্সের সঙ্গে খেলার আগে ধার করে বাড়িতে আনিয়ে নেয় রঙিন টিভি। ব্রাজিল-পাগল কিঙ্কর চোখের সামনে দেখে টাইব্রেকারে ফ্রান্সের কাছে ব্রাজিলের পরাজয়, টিভির আলো নিভে যেতে ঘরে নেমে আসে অন্ধকার। ’৮৬-র সেই রাতজাগা বিশ্বকাপের শেষে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী লিখলেন–
‘আমরা তো ভাই দূরদর্শক,
পড়েছি বিষম ধন্দে।
কেননা আমরা জেগে অপলক
দেখেছি যে, এই দ্বন্দ্বে
ওঠানামা করে বাইশটি লোক
কী আশ্চর্য ছন্দে।’ (বিশ্বকাপের পরে)
১৯৮৬ থেকে শুরু হল মারাদোনা যুগ। তিনটে বিশ্বকাপ সেই জাদুকাঠিতে আচ্ছন্ন রইল বাঙালি, সাক্ষী রইল ’৯০-এর আশাভঙ্গের বেদনার, ’৯৪-এর ডোপিংয়ের শাস্তি হিসেবে নির্বাসনের। দর্শকের ভূমিকায় থেকে শিখলেন বাঙালি খেলোয়াড়রাও। সুরজিৎ সেনগুপ্ত ‘খেলা’-র এক সংখ্যায় লিখলেন, মারাদোনা দেখালেন কীভাবে ‘একেবারে টাচ লাইন থেকে সহফুটবলারদের জন্য গড়ে দেওয়া যায় সহজতম গোলের সুযোগ’। মূলত এই মারাদোনা-উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে এবং ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা অগ্রসর হওয়ার পর থেকেই পাড়ায় পাড়ায় বেড়ে গেল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ। অনেকটা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান লড়াইয়ের মতোই। কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সর্বজিৎ মিত্র, সৌভিক নাহাদের গবেষণায় ধরা পড়ে দুই বাংলায় মারাদোনা কীভাবে তাঁর খেলার পাশাপাশি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ফিফার বিরোধিতা করে এক প্রতিস্পর্ধী সাংস্কৃতিক ‘আইকন’ হয়ে উঠলেন। ১৯৯৪-এ মারাদোনার শাস্তিকে ঘিরে আবেগের বিস্ফোরণ হল। প্রতিবাদ মিছিল থেকে লেখালেখি চলতে থাকল। বাংলার বিভিন্ন সংবাদপত্রে একাধিকবার আলোচিত হল এই ঘটনা। রূপক সাহা লিখলেন, ‘মারাদোনার দোষ নেই’, আবার তাঁরই ‘বিদ্রোহী মারাদোনা’-য় উঠে এল তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা।

নয়ের দশক থেকে বিশ্বায়িত দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক ফুটবল আরও ডানা মেলে। বিশেষ করে এই দশকের শেষের দিক থেকেই ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের বাজার তৈরি হতে থাকে এশিয়া, আফ্রিকার কোনায় কোনায়। উদারীকরণের হাত ধরে ফুটবল সম্প্রচার হয় উন্মুক্ত, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমে আসে। গ্লোবাল কর্পোরেট মিডিয়া ফুটবল বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে আগের থেকেও অনেক বেশি করে। তবুও ১৯৯৮ অবধি দূরদর্শন ফিফা বিশ্বকাপ সম্প্রচার করেছিল। নতুন শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নিতে থাকে টেন স্পোর্টস কিংবা পরে ইএসপিএন-স্টার স্পোর্টস নেটওয়ার্কের মতো বহুজাতিক ক্রীড়া-সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান। এরই মাঝে ফুটবল দর্শক খুঁজে পায় রোমারিও, জিদান, রোনাল্ডোর মতো সফল কিংবা বাজ্জিও-র মতো ট্র্যাজিক নায়কদের। ‘আনন্দমেলা’ কিংবা ‘খেলা’ পত্রিকার বিশ্বকাপ সংখ্যায় উঠে আসেন ঝলমলে ছবির এই তারকারা। বাদ যায়নি অন্য পত্রপত্রিকাও। যেমন, ১৯৯৮-এ ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর বিশেষ সংখ্যায় ধরা পড়ল ‘অঘটনের বিশ্বকাপ’-এর ছবি, জয়ন্ত চক্রবর্তীর পাশাপাশি ঠাঁই পেল রুমেনিগে কিংবা রবসনের বক্তব্যের অনুলিখনও। ততদিনে পাড়ায় পাড়ায় জায়েন্ট স্ক্রিনে ভিড় জমেছে সমর্থকদের, বাঙালির আন্তর্জাতিকতা-বোধের চিহ্ন হিসেবে উড়তে শুরু করেছে হরেক দেশের পতাকা।

একুশ শতকের প্রথম দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং আর্জেন্টিনার মেসির মধ্যে যে দ্বৈরথ তৈরি হয় তার রেশ গিয়ে পড়ে বিশ্বকাপেও। তবে বাঙালির চিরায়ত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের দ্বন্দ্বে তার বিশেষ প্রভাব পড়েনি। মোটামুটি দ্বিতীয় দশক থেকেই হইহই করে ফুটবল সংস্কৃতির মাঝে একে একে ঢুকে পড়ল ফেসবুক (মেটা), টুইটার (এক্স) এবং ইনস্টাগ্রাম এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। খেলা দেখার জন্য এল ওটিটি বা স্ট্রিমিং অ্যাপ। এই আন্তর্জালের দুনিয়ায় বাঙালি দর্শকও শরিক হল। বিবিধ খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পেজ, ফুটবল দল (ক্লাব কিংবা দেশ) সমর্থনের গ্রুপে আলোচনা, খুনসুটি, তর্কের নতুন জায়গা তৈরি হল। ‘কন্টেন্ট’ বানাল বাঙালি সমর্থকেরা নিজেদের ভাষায়। সমাজমাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের সুবিধার মাধ্যমে তাও ছড়িয়ে পড়তে লাগল দেশে-বিদেশে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের বাইরে গিয়েও চোখে পড়তে লাগল ফ্রান্স, স্পেন, হল্যান্ড কিংবা ইংল্যান্ডের বাঙালি সমর্থকদের।

আবিশ্ব এই পালটে যাওয়া ফুটবল সংস্কৃতিকে স্টেফান লরেন্স এবং গেরি ক্রফর্ডের মতো গবেষকেরা অভিহিত করেছেন ‘ডিজিটাল ফুটবল কালচারস’ নামে। এখন বাঙালিও তার অংশীদার। না-ছুঁতে পারা ভৌগোলিক দূরত্ব সে মিটিয়ে নিয়েছে সমাজমাধ্যমে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্য কোনও দেশের খেলার খবর, ‘কন্টেন্ট’ যেমন এসে পৌঁছচ্ছে, তেমনই সে তৈরিও করছে নতুন ‘কন্টেন্ট’। তার কন্টেন্ট, তার সমর্থন পৌঁছে যাচ্ছে সেইসব দেশেও। সেই সূত্র ধরেই ২০২২ বিশ্বকাপ-জয়ী আর্জেন্টিনা টের পেয়েছে এই উপমহাদেশে তাদের সমর্থনের বহর। প্রশিক্ষক স্কালোনি-সহ আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের তরফে স্বীকৃতি মিলেছে বাংলাদেশ ও ভারতের সমর্থকদের। এ এক অভিনব ঘটনা। তবে একথা ঠিক, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা সমর্থক হিসেবে কেরল কিংবা বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের সমাজমাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার তুলনায় এখনও পিছিয়েই।

বাঙালির বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় সংবাদপত্র কিংবা পত্রিকার হাত ধরেই। এর পরে ময়দানের ফুটবল পাগল বাঙালি ঘরে বসেই টিভিতে স্বাদ পেয়েছে বিশ্বের উন্নত ফুটবলের। ১০ বিশ্বকাপে পাড়ি জমানো পান্নালাল চ্যাটার্জি এবং চৈতালি চ্যাটার্জির মতো ব্যতিক্রমী চরিত্র বাদ দিলে টিভির পর্দায় চোখ রেখেই পাঁচ মহাদেশের বিশ্বকাপ দেখেছে বাঙালি, খানিকটা ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ হিসেবেই। আজকের সমাজমাধ্যম তার কাছে এনে দিয়েছে ‘সক্রিয় দর্শক’ হওয়ার সুযোগ, যার সাহায্যে এমবাপে-ইয়ামাল-নেমারকে নিয়ে লেখালেখি থেকে শুরু করে বিবিধ কন্টেন্ট পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বের আঙিনায়। আন্তর্জাতিকতার এ হেন অর্জনের প্রেক্ষিতে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাঙালির বিশ্বকাপ দর্শনে কোনও নতুন পরিবর্তনের সূচনা করে কি না, সেটাই দেখার।
… পড়ুন বিশ্বকাপ নিয়ে ‘গোলগপ্পো’ সিরিজের অন্যান্য লেখা …
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved