Robbar

ইতিহাসের রসচক্র

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 23, 2026 9:40 pm
  • Updated:July 23, 2026 9:40 pm  

ভারতে জিলিপি জনপ্রিয়তা পায় পনেরো শতকে মোগলদের হাত ধরে। ভোজনরসিক ছিলেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর। তার সামনে একবার এক রসবিশিষ্ট, গোলাকৃতি, চক্রাকার প্যাঁচবিশিষ্ট মিষ্টি খাবার হাজির করা হয়েছিল। সেই মিষ্টি খেয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর এতটাই বিমোহিত হয়ে যান যে, এর সঙ্গে তিনি নিজের নাম জুড়ে দেন। মিষ্টিটির নাম দেন ‘‌জাহাঙ্গিরা’। এভাবেই খাবারটির সংযুক্তি ঘটে মোগল বাদশাহদের খাদ্যতালিকায়। তাঁরা সুস্বাদু এবং ভারী খাবারের পর মিষ্টিমুখ করতে ভালোবাসতেন। ঘিয়ে ভাজা এবং সুগন্ধি জাফরান ও গোলাপ জলে ডোবানো জিলিপি মোগল দরবারের অন্যতম প্রধান মিষ্টান্ন হয়ে উঠেছিল।

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

‘রথ’ টানলেই ‘জিলিপি’ আসে। রথ, বর্ষা আর জিলিপি যেন এক সুতোয় বাঁধা। মজার এক মিষ্টি এই জিলিপি। রথের মেলা থেকে শুরু করে দুর্গাপুজো, ইদ বা যে কোনও আনন্দ অনুষ্ঠানে গরম গরম জিলিপি বাঙালির অন্যতম পছন্দের একটি খাবার। আমাদের আদি লোকসংস্কৃতিতে জিলিপিকে অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সাধারণ মানুষের খাবার হিসেবেই দেখা হয়েছে। সন্দেশ বা রসগোল্লার মতো মিষ্টিগুলো যখন জমিদার, বাবু বা উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমের আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, জিলিপি তখন রাজত্ব করেছে হাটে, মাঠে আর মেলায়। মেলায় দামি খেলনা বা দামি মিষ্টি কেনার সামর্থ সবার থাকত না। কিন্তু জিলিপি এতই সাশ্রয়ী ছিল যে, সবচেয়ে দরিদ্র বাবাটিও মেলা থেকে ফেরার সময় সন্তানের জন্য অন্তত চার আনা বা আট আনার জিলিপি কিনে বাড়ি ফিরতে পারতেন। সেই রীতি শহর থেকে গ্রামে আজও অমলিন।

পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনও এলাকা নেই, যেখানে জিলিপি পাওয়া যায় না। রসে পরিপূর্ণ, স্বাদে-গন্ধে মনমাতানো এই জিলিপি শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই পাওয়া যায়। এমনকী প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালেও জিলিপি সহজলভ্য একটি মিষ্টি। পণ্ডিতেরা বলছেন, ‘জিলিপি’ শব্দটা নাকি এসেছে ফারসি শব্দ ‘যবালিয়া’ থেকে। মানে, গোল হয়ে পাক খেতে খেতে যাওয়া থেকেই জিলিপি।

জিলিপির ইতিহাস কিন্তু তার প্যাঁচের মতোই– একটু জটিল কিন্তু মিষ্টি। ইতিহাস বলছে, জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা জিলিপির জন্ম কিন্তু এই উপমহাদেশে হয়নি। ঐতিহাসিকদের মতে জিলিপির জন্ম হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইরানে। সেখানে অবশ্য এর নাম ছিল ‘জালবিয়া’ বা ‘জুলবিয়া’। ইরানে ঐতিহ্যগতভাবেই ‘জুলবিয়া’ নামের এই মিষ্টিটি বিশেষ উপলক্ষে কিংবা রমজান মাসে তৈরি করে ফকির-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হত। তেরো শতকে লেখা বিখ্যাত লেখক মুহাম্মদ বিন হাসান আল-বাগদাদির রান্নার বইতে ‘জালবিয়া’-র উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে, মিশরীয়-ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক ও মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্যবিষয়ক গবেষক ক্লডিয়া রডেনের দাবি, তেরো শতকের আগেই মিশরের ইহুদিরা ‘হানুকা’ পালনের জন্য ‘‌জালাবিয়া’ তৈরি করত। ক্লডিয়া রডেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য বুক অব জিউশ ফুড’-এ লিখেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সেফার্দি ও মিজরাহি ইহুদিরা, বিশেষ করে মিশরের ইহুদিরা তাদের আলোর উৎসব ‘হানুকা’-র বিশেষ মিষ্টি হিসেবে এই ‘জালাবিয়া’ তৈরি করত। তবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই আদি জালাবিয়া বা জালবিয়া আজকের জিলিপির মতো নিখুঁত আড়াই প্যাঁচের গোল চাকতির আকারে ছিল না। এগুলো ছিল মূলত ময়দার খামির তেলের মধ্যে চিপে বা ছোট ছোট গোল্লা বানিয়ে, অনেকটা আমাদের দেশের ল্যাংচা বা পান্তুয়ার মতো গোল বা লম্বাকৃতির ভাজা বড়ার মতো করে কড়া করে ভেজে, চিনির সিরায় বা মধুতে ডোবানো। গ্রিস ও তুরস্কের ইহুদিদের মধ্যে এটি আবার ‘লোকোমাডেস’ নামেও পরিচিত ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের সেই গোল বা আঁকাবাঁকা ভাজা পিঠা বা ‘জালাবিয়া’ই ভারতে এসে কারিগরদের হাতের জাদুতে আরও মচমচে, রসালো এবং নিখুঁত আড়াই প্যাঁচের ‘জিলাপি’ বা ‘জিলিপি’-তে রূপান্তরিত হয়।

ইতিহাস অনুসারে, তেরো শতকেই তুর্কি এবং পারস্যের বণিকদের হাত ধরে এই মিষ্টি ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। সুলতানি আমলেই প্রথম সুফি সাধক এবং সাধারণ মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে জালবিয়া খাওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়, যা আজও সমানভাবে প্রচলিত। সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় উচ্চারণে সেই ‘জালবিয়া’ পরিবর্তিত হয়ে আজকের ‘জিলিপি’, ‘জিলাপি’ বা ‘জলেবি’ নাম ধারণ করেছে।

চোদ্দ শতকের ভারতে জিলিপিকে অবশ্য ‘কুণ্ডলিকা’ বা ‘জলবল্লিকা’ বলা হত। চোদ্দ ও পনেরো শতকে লেখা ভারতীয় জৈন গ্রন্থে যেমন ‘জলবল্লিকা’ নামে এই মিষ্টির গুণের কথা বলা হয়েছে, তেমনই, পনেরো শতকে ভারতে জিলিপির মতো এক মিষ্টান্নকে যে বলা হত ‘কুণ্ডলিকা’ তার উল্লেখ পাওয়া যায় সংস্কৃত গ্রন্থগুলিতে। সংস্কৃত পণ্ডিত ও কবিরা সম্ভবত এর বৃত্তাকার আকৃতির জন্যেই একে ‘কুণ্ডলিকা’ বা ‘জলবল্লিকা’ বলতেন। ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ পরশুরাম কৃষ্ণ গোড়ে ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি’ জার্নালে দাবি করেছিলেন, তিনি ষোল শতকের পূর্বে সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘গুণ্যগুণবোধিনী’ পুথিতেও জিলিপির উল্লেখ পেয়েছেন। পয়ার ছন্দে লেখা সেই পুথিতে জিলিপি বানানোর জন্য কী লাগে আর কীভাবে বানাতে হয়– এই দু’টি বিষয়েরই বর্ণনা পাওয়া গিয়েছিল, যার উপকরণ ও প্রক্রিয়ার সাথে এখনকার সময়ের জিলিপির সাদৃশ্য রয়েছে। গোড়ে সেই জার্নালে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য জানিয়েছেন। সেগুলো হল, ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জৈন সাধু জিনসূর রচিত ‘প্রিয়ংকর-রূপকথা’ গ্রন্থে ধনী বণিকদের নিয়ে আয়োজিত একটি নৈশভোজের বর্ণনায় জিলিপির উল্লেখ ছিল।

ভারতে জিলিপি জনপ্রিয়তা পায় পনেরো শতকে মোগলদের হাত ধরে। ভোজনরসিক ছিলেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর। তার সামনে একবার এক রসবিশিষ্ট, গোলাকৃতি, চক্রাকার প্যাঁচবিশিষ্ট মিষ্টি খাবার হাজির করা হয়েছিল। সেই মিষ্টি খেয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর এতটাই বিমোহিত হয়ে যান যে, এর সঙ্গে তিনি নিজের নাম জুড়ে দেন। মিষ্টিটির নাম দেন ‘‌জাহাঙ্গিরা’। এভাবেই খাবারটির সংযুক্তি ঘটে মোগল বাদশাহদের খাদ্যতালিকায়। তাঁরা সুস্বাদু এবং ভারী খাবারের পর মিষ্টিমুখ করতে ভালোবাসতেন। ঘিয়ে ভাজা এবং সুগন্ধি জাফরান ও গোলাপ জলে ডোবানো জিলিপি মোগল দরবারের অন্যতম প্রধান মিষ্টান্ন হয়ে উঠেছিল।

রাজকীয় এই মিষ্টিটিই পরে আমাদের কাছে ‘জিলিপি’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

তবে পশ্চিম এশিয়াতে উদ্ভূত জিলিপি আর আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের জিলিপির মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত বেশ কিছু পার্থক্য আছে। মূলত পশ্চিম এশিয়াতে জিলিপি তৈরি করা হয় দুধ, মধু ও গোলাপজলের ব্যবহার করে। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে এসে জিলিপি হয়েছে ঘি বা তেলে ভাজা মুচমুচে, রঙিন ও রসে আঠালো।

সতেরো শতকের দিকে তাঞ্জাভুরের মারাঠা শাসক একোজির স্ত্রী রানি দীপাবাইয়ের সভাকবি রঘুনাথ নবহস্তে দক্ষিণ ভারতের খাবার নিয়ে ‘ভোজন কুতূহল’ নামের রন্ধন বিষয়ক যে ধ্রুপদী গ্রন্থ রচনা করেন, সেখানেও তিনি জিলিপি তৈরির পদ্ধতি উল্লেখ করেন। রেশমি কাপড়ের মতো দামি পাতায় সংস্কৃতে রচিত এই গ্রন্থটি কেবল একটি রন্ধন প্রণালীর বই ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন ভারতীয় খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টিবিজ্ঞান এবং আয়ুর্বেদীয় ভেষজ গুণের এক অসাধারণ মিশ্রণ। রঘুনাথ রচিত এই গ্রন্থটি প্রমাণ করে যে, উত্তর ভারত জয় করে জিলিপি ততদিনে দক্ষিণ ভারতের রাজকীয় রান্নাঘরেও নিজের স্থান পাকা করে নিয়েছিল। রাজকীয় রন্ধনগ্রন্থে ‘কুণ্ডলিকা’ হিসেবে রেসিপি লেখা হলেও, মারাঠি ও স্থানীয় কন্নড়ভাষী প্রজারা সেই সময়েই এটিকে তাদের নিজস্ব উচ্চারণে ‘জিলবি’ হিসেবেই ডাকতে শুরু করেছিল। এই ‘জিলবি’ নামটি এসেছিল মূলত তার আদি আরবি-ফারসি নাম ‘জালবিয়া’র আঞ্চলিক উচ্চারণের সহজ রূপান্তর থেকে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে সাহেবরা যখন কলকাতার ‘বাবু সংস্কৃতির’ সংস্পর্শে আসেন, তখন তারাও এই কুড়মুড়ে মিষ্টির প্রেমে পড়ে যান।

ছানার জিলিপি

ভারতীয় উপমহাদেশে এই জিলবি বা জিলিপি প্রায় ৫০০ বছর ধরে তার প্যাঁচ অপরিবর্তিত রেখেই তুর্কি, মোগল, ইংরেজ শাসকদের সময় অতিক্রম করে আজও স্বমহিমায় অলিতে-গলিতে বিরাজ করছে। জিলিপির যতটুকু পরিবর্তন হয়েছে, সেটুকু কেবল তার ফিগারে হয়েছে, প্যাঁচে নয়। আমাদের চেনা অলিতে-গলিতে যে জিলিপি, তা মূলত স্লিম ও ছিপছিপে গড়নের। ময়দা আর চালের গুঁড়োর পাতলা ব্যাটার দিয়ে তৈরি এই জিলিপিগুলো তেলে ভাজার পর একদম মুচমুচে থাকে। এদের ফিগার যতই হালকা হোক না কেন, কামড় দিলেই ভেতর থেকে রস ছিটকে বের হয়। জিলিপি যখন ময়দা ছেড়ে ছানা দিয়ে তৈরি হয় তখন বডি-বিল্ডারদের মতো ভারি রূপ নেয়, তখন তাকে আমরা বলি ছানার জিলিপি। এর গায়ের রং ধবধবে ফ্যাকাশে না হয়ে চকোলেট বা কালচে রঙের হয়। আবার জিলিপি যখন মুগডাল দিয়ে তৈরি হয় তার নাম হয় মুগের জিলিপি। জিলিপির ফিগারে যদি একটু অতিরিক্ত অলংকার বা ‘সিক্স প্যাক’ যোগ করা যায়, তবে তা হয় অমৃতি। মাসকলাইয়ের ডাল দিয়ে তৈরি এই মিষ্টির প্যাঁচটি জিলিপির মতোই, তবে এর গায়ে বাড়তি ছোট ছোট কুঁচি বা নকশা থাকে। ফিগার ধরে রাখার জন্য জিলিপি কখনও কখনও দুধ বা রাবড়ির সাগরেও ডুব দেয়। উত্তর ভারতের ‘জালেবি-রাবড়ি’ এর অন্যতম উদাহরণ।

উত্তর ভারতের ‘জালেবি-রাবড়ি’

পশ্চিমবঙ্গে ওজনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় জিলিপি তৈরি হয় বাঁকুড়া জেলার দ্বারকেশ্বর নদীর তীরের প্রাচীন জনপদ কেঞ্জাকুড়া গ্রামে। এখানকার এক-একটি জিলিপির ওজন শুরুই হয় ৫০০ গ্রাম থেকে, যা সর্বোচ্চ ২ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত ভারী হতে পারে। প্রতি বছর ভাদু উৎসব এবং বিশ্বকর্মা পুজোর সময় এখানকার ময়রাদের মধ্যে কে কত বড় ও কত ওজনের জিলিপি বানাতে পারেন– তার এক অলিখিত প্রতিযোগিতাও চলে।

জিলিপি নিয়ে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মজার তথ্যটি দিয়েছেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রানী চন্দের লেখা বই থেকে জানা যায়, তরুণ বয়সে কবি রান্না নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তিনি একবার কচু দিয়ে জিলিপি বানানোর এক অনন্য রেসিপি আবিষ্কার করেছিলেন। কবি নিজেই দাবি করতেন যে, এই কচুর জিলিপি সাধারণ জিলিপির চেয়েও অনেক বেশি সুস্বাদু হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত বাঙালির ঐতিহাসিক রান্নার বই ‘মিষ্টান্ন পাক’-এ লেখক বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় জিলিপি তৈরির দারুণ রসালো একটি বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে সবেদার সাথে সুজির খামি মিশিয়ে কীভাবে নিখুঁত আড়াই প্যাঁচের জিলিপি বানাতে হয়, তা একবারে সাহিত্যিক ঢঙে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আধুনিক বাংলা গানেও জীবনের ফেলে আসা অভ্যাস বা নস্টালজিয়া বোঝাতে জিলিপি এসেছে বারে বারে।

রেশমী জিলিপি

জিলিপি শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি আমাদের বাঙালি জীবনের এক টুকরো স্মৃতিমেদুরতা, যা ছড়িয়ে থাকে শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত।