how world politics is encroaching fifa worldcup 2026 | Robbar
Robbar
  • ১ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ১৮ আগস্ট ২০২৬

বিশ্বকাপ ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ নয়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 14, 2026 3:29 pm
  • Updated:June 16, 2026 5:32 pm  

আমেরিকায় খেলতে যাওয়ার মুহূর্তে ইরানি খেলোয়াড়দের কি ভয় করবে? এই প্রশ্ন করা হলে মেহেদি তারেমি সাংবাদিককে পালটা প্রশ্ন করেন যে, তিনি তো আমেরিকার মানুষ, তার কি মনে হয় যে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ আছে? ট্রাম্পের হুমকির কথা বললে, মেহেদি পালটা জবাব দেন যে, তাদের দেখে কি রাজনীতিবিদ মনে হয়? মেহেদির সাক্ষাৎকারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বিশ্বকাপের প্রারম্ভে কথা বলা উচিত ছিল খেলার স্ট্র্যাটেজি, টিম স্পিরিট বা ট্রেনিং পিরিয়ড নিয়ে– সেখানে তাদের কথা বলতে হচ্ছে নিজেদের নিরাপত্তা বা যুদ্ধের কূটনীতি নিয়ে। 

সম্প্রীতি চক্রবর্তী

যুদ্ধের মাঝে বিশ্বকাপ। ১১ জুন মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে পেশ করা হল উদ্বোধনী সংগীত। আন্তর্জাতিক পপস্টার শাকিরা আর নাইজেরিয়ার বার্না বয় গাইছে ‘দাই দাই’, সকলেই প্রস্তুত নিজের পছন্দের দলকে সর্মথন করতে। তাদের হোমগ্রাউন্ডে মেক্সিকো যখন হারাল দক্ষিণ আফ্রিকাকে, হুলিয়ান কিনিওনিসের প্রথম গোলে মাতোয়ারা সব ভক্তরা, তখন স্টেডিয়াম থেকে ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে পরিবেশটা খানিক থমথমে। আমেরিকা ঘোষণা করেছে যুদ্ধবিরতি; তারা না কি আপাতত ইরানে বোমাবর্ষণ করবে না, তেহরানের সাথে চুক্তি নিয়ে তারা আশাবাদী। এদিকে ইরান সেই মীমাংসার পথে মোটেই হাঁটছে না। তারা বন্দর আব্বাসের কাছে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনেছে এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনও সমঝোতায় এখনও আসা যায়নি বলে জানিয়েছে। সকলে বলছে, এ এক অভূতপূর্ব বিশ্বকাপ– যুদ্ধরত দেশগুলি একে অপরের সামনে খেলার মাঠে দাঁড়াবে, রাজনীতি যে শুধু রণাঙ্গনেই আবদ্ধ, তা তো নয়। হরমুজ প্রণালীর সংঘর্ষ যে ফুটবল স্টেডিয়ামেও তার করাল ছায়া ফেলবে, সেটা বেশ কিছুদিন আগেই বোঝা গিয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে:
‘আমার মনে হয় না ওরা (ইরানি ফুটবলার) এখানে থাকলে বিষয়টা খুব ভালো হবে, ওদের নিরাপত্তার জন্যই বলা।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প

এই বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খেলা আর যুদ্ধকে একই কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করায়। অনেকে বলেন, এ তো সরাসরি হুমকি। ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হলেই ইরানের ফুটবলারদের ট্রেনিং বেস অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় মেক্সিকোতে। যুদ্ধের আহ্বানে যিনি সবচেয়ে সিদ্ধহস্ত, তাঁকে যখন ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়া হয় গত ডিসেম্বরে, তখন পুরো বিষয়টি আদ্যপ্রান্ত প্রহসনের মতো ঠেকে। ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টারের মতে, এটা একেবারেই ‘ট্রাম্পের বিশ্বকাপ’। ইরানি ফুটবলারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, সেখানকার ফুটবলপ্রেমীদের আমেরিকায় ঢুকতে না দেওয়া, ‘আতঙ্কবাদী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া, মুসলিম ও আফ্রিকান রেফারিকে নানা আইনি জটিলতায় নাকাল করার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এবারের বিশ্বকাপ বর্ণবিদ্বেষবাদ, যুদ্ধ বা পক্ষপাতদুষ্টতাকে সঙ্গে নিয়েই চলবে। কিছুদিন আগে ইরানের টিমকে আমেরিকায় একদিনও রাত্রিবাস করা থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। ইউএস সরকার সর্বসমক্ষে বিবৃতি দেয়:
‘আমরা ইরানিদের এই সুযোগ নিতে দেব না, তারা এখানে থাকার নাম করে দেশে টেররিস্ট ঢোকাবে, তা হবে না।’

ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ ছাড়াও, আমরা দেখতে পাই কীভাবে সোমালিয়ান রেফারি ওমার আর্তানকে আমেরিকার এয়ারপোর্টে আটকে দেওয়া হয়। আফ্রিকার জনপ্রিয় এই রেফারিকে অপদস্থ করার কারণ ছিল ট্রাম্প সরকারের ‘ট্রাভেল ব্যান লিস্ট’। ২০২৫ সালে আফগানিস্তান, মায়ানমার, সোমালিয়া, হাইতি, ইরান-সহ প্রায় ১২টি দেশকে আমেরিকা নিষিদ্ধ করে যাতায়াতের ক্ষেত্রে। বেছে বেছে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, পশ্চিম এশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলো নির্বাচন করার পিছনে যে প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবিদ্বেষভাব লুকিয়ে রয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এরই প্রভাব যে বিশ্বকাপে পড়বে তা অচিরেই বোঝা যাচ্ছিল। খেলা হবে আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, সিয়াটেল বা নিউ ইয়র্কে। ট্রাম্পের কড়া নজরদারিতে এই বিশ্বকাপও যে জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য ডেকে আনবে, সেটা স্বাভাবিক। সোমালিয়ান রেফারি ওমারকে যখন হেনস্তা করা হল মায়ামি এয়ারপোর্টে, তখন উয়েফা তাকে তড়িঘড়ি সুপার কাপের দায়িত্ব দিল। এ যেন বিশ্বকাপ নিয়ে মশকরা দেখে খানিক ক্ষতিপূরণের চেষ্টা। দেশ, নাগরিকত্ব, গায়ের রং দেখে বেছে বেছে যখন আমেরিকার বিমানবন্দরগুলিতে খেলোয়াড়, রেফারি বা দর্শকদের প্রতি অসম আচরণ করা হচ্ছে; তখন ইউরোপিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার সেফেরিন বলেন:
‘Football is made to connect people and UEFA wants to show its respect to Omar and his outstanding officiating skills.’ 

সোমালিয়ান রেফারি ওমার আর্তান

ফুটবল যে ভ্রাতৃত্ববোধ বা দলগত ঐক্যের প্রতীক ছিল, তা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে হিংসা, ম্যানিপুলেশন বা যুদ্ধের অসম সম্পর্কে। বিশ্বকাপ কিন্তু আগেও যুদ্ধের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাও আবার যে সে যুদ্ধ নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে আয়োজিত হয় ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ, বিশ্ব রাজনীতিতে তখন হিটলার, মুসোলিনি বা চেম্বারলেনের দাপট। কয়েকমাস পরেই সরাসরি যুদ্ধে নামবে তারা। ১৯৪২ ও ’৪৬-এ বিশ্বকাপ বাতিল হয়। পরমাণু যুদ্ধ আর প্রবল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিতে ইউরোপ তখন ভারাক্রান্ত। আজকের বিশ্বকাপ পিছিয়ে যায়নি, বাতিল হয়নি, বরঞ্চ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ইরান পৃথিবীর প্রথম দেশ, যে যুদ্ধ চলাকালীন তার আক্রমণকারী দেশের মাটিতে গিয়ে ফুটবল খেলবে। প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, জুলস বয়কফ বলছেন:
“ফুটবলকে অরাজনৈতিক ভাবা একেবারেই ঠিক না, এই বিশ্বকাপের রাজনীতিকরণ প্রত্যক্ষ করার মতো… আগে কখনও এমন খেলা হয়নি, যেখানে হোস্ট কান্ট্রি আর এক পার্টিসিপেটিং কান্ট্রিতে ঢুকে ‘ওয়ার ক্রাইম’ করেছে…” 

ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরান

‘ওয়ার ক্রাইম’ অর্থে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের নিয়মাবলি লঙ্ঘন করা; যেমন এক্ষেত্রে ইরানের মুখ্য ‘water reservoir’-এ বোমাবর্ষণ করে আমেরিকা ২০ হাজার সাধারণ মানুষের মানবাধিকার বা বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এমন ভয়ংকর অপরাধের পরেও ইরানি খেলোয়াড়রা লস অ্যাঞ্জেলসে গিয়ে ম্যাচ খেলবে। যুদ্ধনীতি একরকম, সেখানে সীমান্তে অবস্থিত সৈন্যরা গোলাবর্ষণ করে। কিন্তু কোন রণনীতিতে আমেরিকা, দক্ষিণ ইরানের মেয়েদের স্কুল টার্গেট করে ১৬৮ জন শিশুকে হত্যা করে, সেটা যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করা– তা নিয়ে ইতিমধ্যেই চর্চা হয়েছে। এই বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে ইরানি ফুটবলারদের #168 ব্যাচ পরে মেক্সিকো বিমানবন্দরে নামতে দেখা যায়। এরপরেই নাইজেরিয়ার বিপক্ষে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলার আগে তাঁরা বোমায় নিহত শিশুদের স্কুলব্যাগ (স্মারক হিসেবে) হাতে নিয়ে মাঠে দাঁড়ান। এই ইঙ্গিতগুলি মার্কিন ওয়ার ক্রাইমকে চোখে আঙুল দিয়ে সমালোচনা করে। যুদ্ধ যুদ্ধের জায়গায় হবে, সেখানে দায়বদ্ধ থাকবে শাসক, সৈন্য বা আমলারা, কিন্তু ১০ বছরের শিশুরা সেই মৃত্যুমিছিলে কেন হাজির থাকবে; এবং এই নিয়ে ইউনাইটেড নেশনসের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কেবল একটি অ্যাপোলজি পোস্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনও বড় পদক্ষেপ কেন নেয় না, সেকথাই খেলার মাঠে বলতে চেয়েছিল ইরানিরা। এর বিপক্ষে আমেরিকার সরকার বলে যে ইরানি ফুটবলাররা যেন বিশ্বকাপের সময়ে রাতারাতি ফিরে যায় মেক্সিকোয়। প্রশ্ন উঠছে যে, ঠিক কাকে তুষ্ট করার জন্য খেলায় অংশগ্রহণকারী একটি দেশকে প্রতিটি ম্যাচের পর ২,০০০ কিলোমিটার যাত্রা করে আবার ফিরে যেতে হবে? কথায় বলে, ‘football unites the world’: কিন্তু এই উদ্ধৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এমন পক্ষপাতদুষ্ট আয়োজনের বহর দেখে যারপরনাই বিরক্ত ফুটবল-ভক্তরা। ইরানি সরকার জানিয়েছে, তাদের দলকে যদি কোনওভাবে খেলার মাঠে অপদস্থ করা হয়, দেশবিরোধী স্লোগান বা পতাকা নিয়ে অসম্মানের চেষ্টা হয়– তাহলে আপৎকালীন অবস্থা ভেবে তখনই বন্ধ করে দেওয়া হবে খেলা। আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলসে ইরান মুখোমুখি দাঁড়াবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এর আগে আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ইরানকে খেলা থেকে বহিষ্কার করবার জন্য মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। তাদের দাবি ছিল যে, ইরানের ফুটবল দল সেখানকার সাধারণ মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং ইসলামিক বিপ্লবী দলের প্রতিভূ। ইএসপিএন-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ইরানি খেলোয়ার মেহেদি তারেমি বলেন:
‘আমরা শান্তিপূর্ণ মানুষ… কিন্ত এই ঘটনাগুলো আমাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে, ফোনের থেকে দূরে থাকি, নিউজ দেখি না খুব বেশি।’

ইরানি ফুটবলার মেহেদি তারেমি

আমেরিকায় খেলতে যাওয়ার মুহূর্তে ইরানি খেলোয়াড়দের কি ভয় করবে? এই প্রশ্ন করা হলে মেহেদি তারেমি সাংবাদিককে পালটা প্রশ্ন করেন যে, তিনি তো আমেরিকার মানুষ, তার কি মনে হয় যে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ আছে? ট্রাম্পের হুমকির কথা বললে, মেহেদি পালটা জবাব দেন যে, তাদের দেখে কি রাজনীতিবিদ মনে হয়? মেহেদির সাক্ষাৎকারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বিশ্বকাপের প্রারম্ভে কথা বলা উচিত ছিল খেলার স্ট্র্যাটেজি, টিম স্পিরিট বা ট্রেনিং পিরিয়ড নিয়ে– সেখানে তাদের কথা বলতে হচ্ছে নিজেদের নিরাপত্তা বা যুদ্ধের কূটনীতি নিয়ে। 

মেক্সিকোতে ট্রেনিংয়ে ইরানি ফুটবল টিম

ফুটবল যেন আগ্রাসনের আখ্যানে পরিণত হচ্ছে। খেলার মাঠে আগ্রাসন বা উদ্দীপনার কথা হচ্ছে না, বরং যে দেশ যত বেশি শক্তিশালী তার ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা হয়ে উঠেছে ফুটবল মাঠ। যেমন দু’দিন আগে হাইতির ওয়ার্ম আপ ম্যাচে তাদের জার্সি নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়। খেলোয়াড়দের জার্সিতে ১৮০৩ সালে সংঘটিত ভার্টিয়ের্স যুদ্ধের একটি ছবি এবং হাইতির জাতীয় পতাকা আঁকা ছিল। এই যুদ্ধ ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হাইতিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্বের কথা বলে। ফ্লোরিডা, পেরু ও নিউজিল্যান্ডে ইতিমধ্যে খেলা হয়েছে এই জামা পরে, ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগেই ফিফা প্রশাসন হাইতির এই টুল কিট নিয়ে আপত্তি জানায়; কারণ এতে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। হাইতির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, এই প্রতীক তাদের দেশজ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যারা দেশে স্বাধীনতা আনতে সচেষ্ট হয়েছে তাদেরকে সম্মান জানিয়েই এমন চিহ্ন ব্যবহার। কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত একে কাটছাঁট করে নতুন জার্সি তৈরি করা হল। এখানে প্রশ্ন ওঠে, যেহেতু ফ্রান্স বা ইউরোপীয় দেশগুলি ফিফার পরিচালকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য, তাই জন্যই কি এই সিদ্ধান্ত? অনেকে হয়তো এটিকে ছোট ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে পারেন, সামান্য প্রতীক পরিবর্তন হয়েছে কেবল; কিন্ত রাজনীতিকরণের প্রসঙ্গ উঠলে আমরা আমেরিকা বা ফিফার কার্যপদ্ধতির দিকেও কি দৃষ্টিপাত করব না?

ফিফার হেড কোয়ার্টার সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত। তাদের পরিচালকমণ্ডলীর প্রচুর সদস্যের নাগরিকত্ব সুইস হওয়ার পরেও আমরা দেখেছি সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের ভিসা আটকে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন। ইরাকের খেলোয়ারদের আমেরিকার বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকে রাখা হয়েছে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা। বর্ণবিদ্বেষবাদ, বিধর্মীদের প্রতি অসম আচরণ, নাগরিকত্ব দেখে অপদস্ত করা– এগুলো কেন রাজনীতিকরণ হিসেবে পরিগণিত হয় না, তা আমরা স্পষ্টতই বুঝি।

ফুটবলকে বলা হত ‘পিপলস গেম’, কিন্তু এই অভিধা আজ আর প্রাসঙ্গিক কি না সেটা ভাবা উচিত। বিশ্বকাপ টিকিটের আকাশ-ছোঁয়া দাম আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, কোন শ্রেণি মাঠে গিয়ে দর্শকাসনে বসতে পারবে, আর কারাই বা ব্রাত্য থাকবে। ব্রিটিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রাক্তন ফুটবলার ইয়ান রাইট এবারের বিশ্বকাপকে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ অফ কেওস’ বলেছেন। তিনি বলেন:
‘ফিফার ইতিহাসে সবথেকে দামি টিকিট, ব্যয়বহুল অ্যাকোমডেশন, পরিবহন ব্যবস্থার গাফিলতি … এভাবেই কি হোস্ট কান্ট্রি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ টুর্নামেন্টকে পরিচালনা করবে?’ 

প্রাক্তন ফুটবলার ইয়ান রাইট

গত কয়েকদিনে টিকিট স্ক্যান্ডেল নিয়ে জনরোষ ছিল তুঙ্গে। টিকিটের দাম ছুঁয়েছে ৮,৬৪০ ডলার, ভারতীয় টাকার হিসেবে যা দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে আট লক্ষের কাছাকাছি। বিবিসির ১২ জুনের রিপোর্ট বলছে, বেশ কিছু খেলায় (দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক রিপাবলিকের ম্যাচ) গ্যালারিতে বেশিরভাগ সিট ছিল ফাঁকা। অনেকে টিকিটের অতিরিক্ত দামকে এই জন্য দায়ী করেছেন। দিকে দিকে প্রতিবাদের স্বর, বলা হচ্ছে যে, ফুটবলকে যেভাবে পুঁজিবাদী, শ্বেতাঙ্গ বা সাম্প্রদায়িকতায় জড়িয়ে ফেলা হল, এমন নজির আগে কখনও তৈরি হয়নি। এত অনুযোগ, বিক্ষোভের পর এটাই দেখার যে, আগামী এক মাস খবরের শিরোনামে যেন প্রিয় স্ট্রাইকারদের শট, ডিফেন্ডারের কেরামতি কিংবা ফ্রি-কিক নিয়েই কথা হয়। যে ফুটবলের উত্থান শ্রমিকশ্রেণিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে হয়েছিল (প্লেবিয়ানস গেম); কারখানা, খনিমজুর বা জাহাজের খালাসিদের মনোরঞ্জন হিসেবে, সেই ফুটবল যেন মানুষের ভিড়েই আবার ফিরে যায়, এটাই প্রত্যাশা।

… পড়ুন বিশ্বকাপ নিয়ে ‘গোলগপ্‌পো’ সিরিজের অন্যান্য লেখা …

১. বৈষম্যের পৃথিবীতে ফুটবল আজও প্রতিরোধ

২. বাঁধভাঙা উত্তাপে কি পুড়বে বিশ্বকাপ?

৩. ফুটবলের আয়নায় বাঙালির বিশ্বদর্শন

৪. মৃত্যুর ডিফেন্স ভেঙে গোল

Share this article on