


মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষ। শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন একাধিকবার। এ সাক্ষাৎকারটি তাঁর জীবনাবসানের ক’বছর আগে নেওয়া, শুভরঞ্জনের সঙ্গে মহাশ্বেতার শেষ সাক্ষাৎকার। সাহিত্য এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গীকার তাঁর ক্ষেত্রে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দুই প্রসঙ্গই বারবার উঠে এসেছে এই কথোপকথনে। উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার স্বরও। অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েই জন্মশতবর্ষে রোববার.ইন-এর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।
যখনই আপনার সুলিখিত, সুগঠিত এবং জনপ্রিয় উপন্যাসগুলি পড়ি, যথা– ‘লায়লী আশমানের আয়না’ (১৯৬০), ‘ঝাঁসির রানি’ ১৯৫৬, ‘অরণ্যের অধিকার’ (১৯৭৭), ‘বাসাই টুডু’ (১৯৭৮), তখনই মনে হয় আপনি শুধু নিটোল একটি গল্প লেখেননি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্য অনেক কিছু, যেমন– ইতিহাস-চেতনা, লোকমানস, উপকথা-পুরাণ, চরিত্রগুলির স্মৃতি-স্বপ্ন…
শুভ, তুমি সাহিত্যতত্ত্বের ছাত্র। এত কথা না বলে, বলতেই পারতে মাত্র দু’টি শব্দে, আমি magic realism বা জাদুবাস্তবতা নির্দেশিত শৈলী অনুসরণ করি, অনেকটা লাতিন আমেরিকার উপন্যাসিকদের মতো বা মিলান কুন্দেরা, সলমন রুশদি ও গুন্টার গ্রাসের মতো। তুমি ‘ঝাঁসীর রানি’ উপন্যাসটিকেই বেছে নাও। আমার এই প্রথম প্রয়াস প্রচলিত জীবনভিত্তিক কাহিনি আদৌ নয়। লেখার আগে আমি বিস্তর গবেষণা করেছিলাম, একেবারে ইতিহাসের ছাত্রের মতন। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে গিয়েছিলাম। গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেরিয়েছি। মানুষজনের সঙ্গে অকাতরে মিশেছি। আঞ্চলিক উপকথা বা folk ballads, লোকপুরাণ আত্মস্থ করেছি। সেই নির্ভীক রানি তাদের মন জুড়ে কতটা রয়েছে, কীভাবে রয়েছে– তা জানার চেষ্টা করেছি। এবং এই ব্যাপক ক্ষেত্রসমীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে দলিল-দস্তাবেজ ও নথিপত্র ঘেঁটেছি। এতসব কিছু করার পরই বইটি লিখেছি, যা এক কথায় মানব-ইতিহাস বা human history-র অঙ্গবিশেষ।

আপনার পরবর্তী রচনাগুলিও অর্থাৎ ‘তিতুমীর’ এবং ‘অরণ্যের অধিকার’ একই অভিন্ন শৈলীর ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে…
নিঃসন্দেহে। আসলে, আমি একটি নতুন ধরনের ঐতিহাসিক আখ্যান বা historical fiction লিখতে চেয়েছি, যেখানে আমি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছি নিপীড়িত, শোষিত নিম্নবর্গের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-বিদ্রোহের ওপর। আরও সহজ করে বললে, নিম্নবর্ণ, আদিবাসী বা উপজাতিদের জীবনসংগ্রামের ওপর। না, শহুরে মধ্যবিত্তদের ছিঁচকাদুনে প্রেম এবং মেকি ভোগবিলাস আমার বিষয় নয়।
আমি স্বীকার করছি, বহুপঠিত ‘অরণ্যের অধিকার’-এর প্রতি আমার বিশেষ দৌর্বল্য রয়ে গিয়েছে। কেন জানো? এখানে আমি Documentation বা নথিপত্র এবং আদিবাসীদের মরণজয়ী সংগ্রামকে গ্রথিত করতে পেরেছি। অর্থাৎ, প্রচলিত ইতিহাসময় বা Historiography-কে কাঁচকলা দেখিয়েছি! তার বিশেষ প্রয়োজনও ছিল, কারণ তোমাকে মানতেই হবে ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে যে পাঠ্যপুস্তকগুলিতে সাঁওতাল অভ্যুত্থানের বীরত্ব অনেকদিন প্রায় অনুচ্চারিত থেকে গিয়েছে– বীরসা মুন্ডা, সিধু-কানহোর ‘উলগুলান’ বা বিদ্রোহ এই মাত্র ক’বছর হল গুরুত্ব পাচ্ছে, তাঁদের স্মরণ করা হচ্ছে থেকে থেকে। জানি না, আমার বইগুলির জনপ্রিয়তাই কি এই স্মৃতি-উত্থানের মূলে!

আর ‘তিতুমীর’– তুমি বলো, তার সেই বাঁশের কেল্লা আর প্রতিরোধ, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত জেহাদ, আর কী দারুণ প্রাসঙ্গিক! উৎপল (দত্ত) এই শহিদকে তাঁর নাটকের নায়ক করেছে। আমি তাঁর এই প্রয়াসকে স্বাগত জানাই।
আচ্ছা, সরাসরি একটা প্রশ্ন করছি– আপনার ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) আর ‘বাসাই টুডু’ কী প্রমাণ করে? আপনি কি সংসার-বহির্ভূত সশস্ত্র আন্দোলনের সমর্থক?
ভালো প্রশ্ন করেছ। প্রথমেই বলি, ওই দু’টি রচনাই সর্বাগ্রে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় একটি তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র কতটা স্বৈরাচারী ও নিপীড়ক হতে পারে। এই ধরনের রাষ্ট্র এবং দিগন্তবিস্তারী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য সশস্ত্র আন্দোলনকে উসকে দেয়। অর্থাৎ, অনৈক্য কমাও, গ্রামাঞ্চলে আধাসামন্ত্রতন্ত্র ঘুচিয়ে দাও, শহরে শহরে বস্তিবাসীর আধিক্য হ্রাস করো, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করো। তাহলে, আপসে চরমপন্থা কমে আসবে। আর যদি তা না করতে পারো– নিপীড়িতরা তাদের প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে। বাসাই টুডু মরেও মরবে না, বারবার ফিরে আসবে নাছোড় আতঙ্কের মতো।

এতক্ষণ আমরা বলছিলাম আপনার সাহিত্যসৃজনের বিষয়ে, তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে… সেখান থেকে আমরা অনায়াসে চলে আসতে পারি আপনার social activism বা সামাজিক সক্রিয়তায়; এমনকী আপনার political engagement বা রাজনৈতিক অঙ্গীকারে। তাই না?
অবশ্যই। এই দু’টিই পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যতায় গ্রথিত। আমি আমার লেখায় শুধু শহরে-সীমায়িত মধ্যবিত্ততাকে পরিহার করি, তাই নয়। আমি আমার জীবনেও গ্রামাঞ্চল, নদী, অরণ্য, পর্বতকে বেছে নিয়েছি। মাঝেমধ্যেই আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাই। দীর্ঘসময় কাটিয়ে আসি আদিবাসী আর উপজাতিদের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে দিনরাত কাটিয়েই আমি বুঝতে পেরেছি যে, ওরা প্রকৃত অর্থে শ্রদ্ধার যোগ্য, ওরা আমাদের নিখাদ সম্মান দাবি করে। আমি সোজাসুজি বলব, ওদের সমাজ আমাদের নাগরিক-মেট্রোপলিটান সমাজ থেকে অনেক বেশি সভ্য। ওদের বোধ ও জ্ঞান নগরবাসীদের থেকে কোনও অংশে কম নয়। সর্বোপরি, তুলনায় ওরা অনেক অনেক কম শঠ, প্রবঞ্চক ও দ্বিরাচারী। আমি ওদের কোনও কিছু শেখাতে যাইনি, পক্ষান্তরে আমি ওদের কাছ থেকে শিখতে গিয়েছি। ওরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, ওদের নিরাভরণ সহজতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সত্যি বলছি, আমি লোধা ও শবর, এই দু’টি উপজাতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলাম।

কিন্তু আপনার এই ক্রমবর্ধমান মানবিক সক্রিয়তা, এসবে গ্রাম বেছে নেওয়া জীবন নির্বাহের জন্য– এর ফলে কি আপনার সাহিত্যসৃষ্টি ব্যাহত হয়নি? আপনি যখন এদের উন্নয়ণের জন্য প্রাণপাত করেছেন, এদের তৈরি সামগ্রী বিক্রি করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন, তখন তো আর আপনি লিখতে পারেননি?
আচ্ছা বলো তো– কবে, কোথায় রচনার পরিমাণ বা সংখ্যা রচনার গুণকে প্রভাবিত করেছে? শহরগুলিতে শত শত লেখক অক্লান্ত গতিতে শত শত বই লিখে যাচ্ছে, সেই একই বিষয় একই সমাজ। এই চর্বিতচর্বণ কি আদৌ কালজয়ী হয়? ‘কালজয়ী’ তো বড় একটি দাবির মতো শোনায়। কেউ কি এসব আদৌ মনে রাখে? অন্যদিকে আমি বিশ্বাস করি, পাঠকেরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়ারনামা’ (২০১০), দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ (১৯৯০), হাসান আজিজুল হকের গল্প, আমার ‘বুধান, একটি রাতের কাহিনী’ (১৯৯৫)-কে মনে রাখবে যত্ন করে, ভালোবেসে। আমি ইচ্ছা করে অন্য কয়েকজন লেখকের নাম করলাম, যাতে তুমি মনে না করো– আমি, যাকে বলে, দুই বাংলায়, একমেবাদ্বিতীয়ম। আদৌ নয়। আমি মুক্ত কণ্ঠে দাবি করব, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাদের সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী এবং সে উপন্যাস লিখেছে ক’টি? মাত্র দু’টি– ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) আর ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬)– কী দারুণ বই! এবং দু’টির বিষয়ই নিম্নবর্গের চরম-চূড়ান্ত প্রতিরোধ– শহরে ও গ্রামে।

আপনার পরম স্নেহধন্য ইলিয়াস এবং হাসান আজিজুল হক ও দেবেশ রায়ের নাম শুনে পরের প্রশ্নটি, যাকে বলে, অবধারিত হয়ে দাঁড়ায়। আপনি কি মার্কসবাদে বিশ্বাস করেন?
বড় দুরূহ ও স্পর্শকাতর প্রশ্ন! তুমি খুব ভালো করে জানো, আমার পারিবারিক প্রেক্ষাপটটি কীরকম! আমার বাবা মণীশ ঘটককে ‘রেবেল-পোয়েট’ বলা হত। আমার পরম আত্মীয় ঋত্বিক ঘটকের রাজনীতি নিয়ে আমি আর কী বলব! আর আমার প্রথম স্বামী বিজন ভট্টাচার্যের হাত ধরে নবনাট্য আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমি তাঁর লেখা নাটক ‘নবান্ন’-র কথা বলছি। সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমার মতিগতি কীরকম! তবে আমার কোনও বামপন্থী পার্টির সঙ্গে যোগ নেই, কারণ আমি মনে করি এই দলগুলি বড় বেশি সংসদীয় বা Parliamentarised হয়ে গিয়েছে। এবং তার পরিণাম হল, বুঝতেই পারছ– নন্দীগ্রাম। অন্যদিকে, আমি সেই সমাজব্যবস্থা চাই যেখানে বাসাই টুডুকে বারবার ফিরে আসতে হবে না, আর জননীকে দশদিক ঘুরতে হবে না শহিদ সন্তানকে শনাক্ত করার জন্য, স্রেফ লাশের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে।
কি– স্পষ্ট উত্তর দিয়েছি?

আমি এখনও সঠিক সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজে চলেছি। জানো, আমাকে কী সবথেকে বেশি বিস্মিত করে? এত অবহেলিত-অত্যাচারিতদের বিষয়ে লিখলাম, এত প্রতিবাদ করলাম, তবু সেই আমাকেই রাষ্ট্র বেছে নেয় সর্বোচ্চ সম্মানের জন্য। শুধু তাই নয়, সেই আমাকেই দেশ বেছে নেয় প্রতিনিধিদলের নেত্রী হিসেবে, ২০০৬ সালে। সে বছরে ভারত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় সহযোগী দেশের সম্মানিত ভূমিকা পালন করেছিল। জানো, আমি ফ্রাঙ্কফুর্টে সেই বিরাট সমাবেশে উদ্বোধনী ভাষণে কী বলেছিলাম, হ্যাঁ, ইংরেজিতে, যাতে সবাই বুঝতে পারে: ‘My country is torn, tattered, proud, beautiful, hot, humid, cold, sandy, my Country.’
শেষ, অনিবার্য প্রশ্ন– এই শতছিন্ন, আতপ্ত, ভ্যাপসা, বালুকাময় দেশে যে সর্বাত্মক সামাজিক মুক্তি আপনি চাইছেন, সেই চাওয়ায় নারীর ভূমিকা বা অবস্থান কোথায়? বুঝতেই পারছেন, আপনার ‘রুদালি’ (১৯৭৯), ‘স্তন্যদায়িনী’ (১৯৭৭), ‘গোহুমানি’ (২০১০) পাঠ করে আমি এই প্রশ্ন রাখছি?
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, আধাসামন্ততান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। তাঁদের বাঁচতে হবে এবং লড়াইয়ে জিততে হবে। বুঝতেই পারছ, ‘গোহুমানি’র প্রতি আমার একটা বিশেষ দৌর্বল্য রয়েছে, কারণ এর সঙ্গে bonded labour বা ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী প্রথার যোগ অঙ্গাঙ্গী। ১৯৭৬ সালে এই প্রথা আইনের নির্দেশে রদ করা হয়। কিন্তু পালামৌ অঞ্চলের ভূস্বামীরা তাদের দুর্বৃত্তায়ন চালিয়ে যায়। ১৯৭৯ সালে ক্রীতদাস-ক্রীতদাসীরা রুখে দাঁড়ায়, আমি তাদের সংগ্রামে যোগ দিই। বালক-বালিকা ও মহিলাদের ওপরই সবথেকে বেশি নির্যাতন করা হত।

আমার ‘গোহমানি’ এই অভিজ্ঞতা, এই সংগ্রামের প্রত্যক্ষ ফসল। আর ‘রুদালি’ তো তোমরা সবাই দেখেছ এই কলকাতায়। ঊষা গাঙ্গুলির প্রযোজনা অনবদ্য। ‘স্তন্যদায়িনী’ গল্পসংগ্রহ আমাকে আন্তর্জাতিক স্তরে সুখ্যাতি দিয়েছে। এর পিছনে সুপণ্ডিত অনুবাদক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ভূমিকা স্মরণ করব। আমার এই গল্পগুলিতে যে এত কিছু আছে, তা জানতাম না। গায়ত্রীই দেখিয়ে দিয়েছে। আসলে ‘নারীর মুক্তির অর্থই হল অর্ধেক আকাশের মুক্তি।’– কে এই অসাধারণ উক্তিটি করেছিল, তাঁর নাম উহ্য থাক।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved