Robbar

কলাভবনের ফ্রেস্কোর ক্লাস শুরু করেছিলেন প্রতিমা দেবী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 2, 2026 5:36 pm
  • Updated:July 2, 2026 7:14 pm  

প্রতিমা দেবীর গুরু ছিলেন Monfague– একদা ফ্রেস্কো পেইন্টিং বিষয়ে যাঁর বই নিয়ে কলাভবনে বিশেষ চর্চা হয়েছে। হাতে-কলমে ফ্রেস্কো শিখে আসার পরে প্রথম যুগের কলাভবনে ছাত্রছাত্রীদের ফ্রেস্কোর কাজ শেখাতেন প্রতিমা। যদিও ১৯২৩ সালে আন্দ্রে ও প্রতিমার মিলিত উদ্যোগে কলাভবনে বাটিকের ওয়ার্কশপ আয়োজিত হলেও পদ্ধতিগত জটিলতায় তেমন সাড়া মেলেনি। 

সুশোভন অধিকারী

১০.

কলাভবনের সূচনায় এই বিভাগটিকে গড়ে তুলতে কে না এগিয়ে এসেছেন! সে কেবল নন্দলাল, অসিত হালদার বা সুরেন কর নন–  এখানে প্রতিমা দেবীর অবদানও কিছু কম ছিল না। সময়টা ১৯২১ সালের শেষ, সবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী পরিষদ-সভার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তার আগেই রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ বিদেশ সফর থেকে ফিরেছেন। এই সফরে অন্যান্যদের সঙ্গে ছিলেন পুত্র রথী এবং বধূমাতা প্রতিমা দেবী। সেবারে খুবই দৌড়োদৌড়ি চলেছিল। রবীন্দ্রনাথ যাত্রা করেছেন মে, ১৯২০, আর দেশে ফিরেছেন ১৯২১ সালে জুলাইয়ের মাঝামাঝি। প্রায় একটানা বছর দেড়েক তিনি সেবারে বিদেশের মাটিতে কাটিয়েছেন। বিশ্বভারতীর প্রচার, তার জন্য অর্থ সংগ্রহ, অজস্র বক্তৃতার নিমন্ত্রণ মিলে কাজে ঠাসা সেই সফরসূচি। তার মধ্যে জার্মানিতে বেশ কিছু জরুরি কাজ ও সুইডিশ আকাডেমিতে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা সবিশেষ উল্লেখ্য– যা নোবেলপ্রাপক হিসেবে তাঁর জন্যে নির্ধারিত ছিল।

পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

এছাড়াও অসংখ্য কাজের লম্বা তালিকা নিয়ে এ শহর থেকে ও শহর, এদেশ থেকে ওদেশ ছুটে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে। তাই ঠিক হয়েছিল প্রতিমা দেবী এই ফাঁকে কিছুদিন প্যারিসে আন্দ্রে কারপেলেসের তত্ত্বাবধানে রয়ে যাবেন। আর রথী থাকবেন বাবার সঙ্গে। এর অন্যতম কারণ, প্রতিমা দেবী সেই সফরে একটু অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর খানিক বিশ্রামের প্রয়োজন। আর এই সুযোগে বিশ্বশিল্পের সেরা তীর্থক্ষেত্রে প্রতিমা যদি কিছু শিখে নিতে পারেন এবং তা কলাভবনের কাজে লাগানো যায়– তবে এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে? প্রতিমার প্যারিসে থেকে যাওয়ার এ-ও এক জরুরি কারণ। বাস্তবিক হয়েও ছিল তাই। প্রতিমা শিখেছিলেন বাটিকের কাজ, ভিত্তিচিত্র বা মুরাল পেইন্টিং, সেইসঙ্গে পটারি। যেগুলো পরবর্তী কালে কলাভবনের সিলেবাসে সংযুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। এইসব বাদে প্রতিমা নিজের জন্যেও ছবি আঁকার ক্লাসে ভর্তি হয়ে আরেকটু শিল্পচর্চা করে নিতে পারবেন, এমনটাও ভাবছিলেন রবীন্দ্রনাথ। হয়তো তাঁরও ইচ্ছে ছিল কিছুকাল আন্দ্রের আতিথ্যে কাটানোর। এমনটা অনুমান করা যায়, যখন দেখি আন্দ্রের আতিথ্যে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে স্নেহের পুত্রবধূকে রসিকতার সুরে লিখছেন– ‘আন্দ্রেকে বোলো, কল্পনা করচি তোমরা তাঁর ভালোবাসা প্রচুর পরিমাণে ভোগ করচো– দূর থেকে আমি কেবল ঈর্ষা করে মরচি’।

আন্দ্রে কারপেলেস

ফরাসি শিল্পী আন্দ্রে কারপেলেস এবং তাঁর স্বামী ডাল হগম্যান কেবল কবি ও কবিপুত্র রথীর আন্তরিক বন্ধু ও শুভার্থী ছিলেন না, কলাভবনের জন্যও তাঁদের অবদান কম নয়। অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গেও তাঁর শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্বে মেশানো স্নিগ্ধ সম্পর্ক ছিল। তাঁর মতে, অবন ঠাকুর ছিলেন ‘Old friend and Guru’। যাই হোক,  প্রতিমা সেবারে প্যারিসে আন্দ্রের সহযোগিতায় ফরাসি শিল্পী Mon. Mieux-এর কাছে শিখলেন বাটিকের কাজ। যদিও সেই পদ্ধতি কিছু জটিল হওয়ায় শান্তিনিকেতনে তা জনপ্রিয় হতে পারেনি। ১৯২৩ সালে আন্দ্রে ও প্রতিমার মিলিত উদ্যোগে কলাভবনে বাটিকের ওয়ার্কশপ আয়োজিত হলেও পদ্ধতিগত জটিলতায় তেমন সাড়া মেলেনি।

আন্দ্রে কারপেলেসের আঁকা শান্তিনিকেতনের ছবি

এর বেশ কয়েক বছর পরে ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন জাভা গেলেন, সেই যাত্রায় কবির সঙ্গে ছিলেন দুই শিল্পী। একজন কলাভবনের শিক্ষক সুরেন কর, অন্যজন সদ্য কলাভবন থেকে পাঠ নেওয়া ছাত্র, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মা। সেখান থেকে এঁরা দু’জনে বাটিকের কাজ শিখে এলেন। তারপরে সমবেতভাবে কলাভবনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আজকের শান্তিনিকেতন বাটিকের জন্ম হল। সেই যৌথ উদ্যোগে যাঁরা ছিলেন, তাদের মধ্যে গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেন এবং কবি অমিয় চক্রবর্তীর বিদেশিনী স্ত্রী হৈমন্তী দেবী অন্যতম। তিনি ওলন্দাজ ভাষায় লেখা একটা বই থেকে বাটিকের ক্রিয়াকৌশলের ব্যাখ্যা করে, তা ইংরেজিতে অনুবাদ করে সবাইকে বুঝিয়ে দেন। বাটিকের সেই পদ্ধতির সঙ্গে জাভা বাটিকের টেকনিক আর ক্রিয়াকৌশল মিলিয়ে নতুন আঙ্গিকে সূচনা হয় শান্তিনিকেতনের বাটিক। এই কাজে নন্দলাল ছিলেন সবার মাথার ওপরে।

জাভা বাটিক তৈরির সময় যেভাবে গরম মোমকে একটা সরু ফানেলের মধ্যে নিয়ে কাপড়ে ডিজাইন করতে হয়, তা বেশ কঠিন কাজ। অনেকদিনের অভ্যেসে তা গড়ে ওঠা সম্ভব। শুনেছি, নন্দলাল সেই পদ্ধতির বদলে গরম মোমের পাত্রে তুলি ডুবিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন।

বাটিকের চাদর গায়ে নন্দলাল বসু

সেইভাবে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে আজকের শান্তিনিকেতনের বাটিক তার নিজস্ব আঙ্গিক ফিরে পেয়েছে। সে এক রূপান্তরিত রূপ, টেকনিকে আর ডিজাইন উভয়দিক থেকে।

জাভা বাটিকের ডিজাইন অনেকাংশে জ্যামিতিক, অন্যদিকে শান্তিনিকেতন বাটিকের নকশায় এসেছে পল্লবিত লতার প্যাটার্ন–  যার অনেকখানি অজন্তার গুহাচিত্র থেকে এসেছে। তাই পদ্মলতা বারবার ঘুরে এসেছে কলাভবনের বাটিকের নকশায়, যা শান্তিনিকেতনের আলপনাতেও বহুল প্রচলিত। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন, ইতিহাসের বিচারে বাটিক শিল্পকে আশ্রমের মাটিতে প্রথম এনেছিলেন প্রতিমা দেবী, সে-কথা ভুললে চলবে না। নন্দলাল বা অসিত হালদার বা সুরেন করের মতো প্রত্যক্ষভাবে তিনি কলাভবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে ফ্রেস্কোর কাজ শেখাতেন। বাটিকের পাশাপাশি প্যারিস থেকে তিনি ফ্রেস্কোও শিখে এসেছিলেন। প্রতিমা দেবীর গুরু ছিলেন Monfague– একদা ফ্রেস্কো পেইন্টিং বিষয়ে যাঁর বই নিয়ে কলাভবনে বিশেষ চর্চা হয়েছে। হাতে-কলমে ফ্রেস্কো শিখে আসার পরে প্রথম যুগের কলাভবনে ছাত্রছাত্রীদের ফ্রেস্কোর কাজ শেখাতেন প্রতিমা।

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রতিমা দেবী

তবে নন্দলাল প্রথম দেওয়ালের গায়ে বড় আকারে ফ্রেস্কো করেছেন। সহকারী হিসেবে কলাভবনের দুয়েকজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেই কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন লাইব্রেরির পশ্চিমদিকের ঘরের একটি দেওয়ালে ভিত্তিচিত্রের প্রত্যক্ষ সূচনা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বিনোদবিহারী জানিয়েছেন– ‘একদিন সকালে এসে দেয়ালের নিচের অংশে আচার্য নন্দলাল বাঁশঝাড় এবং কাকের ঝাঁক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করলেন। বারান্দা জোড়া সেই ছবি এক সকালের মধ্যে করতে দেখে আমি যে কি রকম বিস্মিত হয়েছিলাম তা বলাই বাহুল্য’।

বিনোদের কথা অনুসারে, সেই-ই শান্তিনিকেতনের প্রথম মিউরাল। নন্দলাল অবশ্য বেশি আগ্রহী ছিলেন দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি ফ্রেস্কো রচনায়। অবশেষে ইউরোপীয় পদ্ধতি আর জয়পুরের পদ্ধতি মিলিয়ে মিশিয়ে কলাভবনে গড়ে উঠেছে ভিত্তিচিত্রের ঘরানা। এখানেও প্রতিমা দেবীর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। প্যারিস থেকে তাঁর ইউরোপীয় টেকনিকের কথা ভুললে চলবে না। সেই সঙ্গে আরও একটি জরুরি কথা না বললেই নয়। আরেকটি কথাও বলা দরকার। প্যারিসে আন্দ্রের আতিথ্যে থাকাকালীন ফ্রেস্কো আর বাটিক ছাড়াও প্রতিমা আরেকটি কাজ শিখেছিলেন, তা হল ইউরোপীয় পটারি। আজ শ্রীনিকেতনের শিল্পসদনে পটারি বিভাগের যে বিস্তার অথবা এই মুহূর্তে কলাভবনের সিলেবাসে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে সিরামিক পটারির যে কোর্স চালু হয়েছে– তার সুদূর নেপথ্যেও প্রতিমা দেবী।

অমিয় চক্রবর্তী ও হৈমন্তী চক্রবর্তী

ভেবে দেখলে প্রতিমা দেবীকে আমাদের একাধিক প্রেক্ষাপটে মনে রাখতে হবে। এগুলির অন্যতম শান্তিনিকেতন,  শ্রীনিকেতন তথা কলাভবনের কারুশিল্প। এখানেও তাঁর অবদান কিছু কম নয়। আজকের কলাভবনে কারুশিল্প কিছুটা কোণঠাসা হয়ে গেলেও একদা তার এমন দৈন্যদশা ছিল না। সেদিনের কলাভবন বলতে সে কেবল ছবি আঁকা আর মূর্তি গড়ার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। প্রতিদিনের জীবনকে শ্রী এবং সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলার কাজে শিল্পের যে ভূমিকা, একদা সেদিকেও প্রখর দৃষ্টি ছিল। নন্দলাল গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, ফাইন আর্ট আর ক্রাফট পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে না চললে, সামাজিকভাবে শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মাতে পারে না। শিল্পীর স্টুডিও-র বাইরে এসে নিজেদের আবাস ও অন্দরমহলকে রুচিপূর্ণ করে তুলতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কারুশিল্প। সেই উদ্দেশে শ্রীনিকেতনে শিল্পভবনের প্রতিষ্ঠা– যা পরবর্তী কালে ‘শিল্পসদন’ বলে খ্যাত।

শান্তিনিকেতন বাটিকের চাদর ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রিয়

এই শিল্পসদনের কাজে প্রতিমা আর রথীর সঙ্গে ওতপ্রোত যুক্ত হয়েছিলেন আন্দ্রে কারপেলেস– যে বিদেশিনীর কথা এখানে বারবার উঠে আসছে। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে শিক্ষিকা হিসেবে আন্দ্রে কলাভবনে যোগ দিয়েছিলেন ১৯২২ সালের নভেম্বরে। কিন্তু খুব বেশিদিন তাঁর শান্তিনিকেতনে থাকা হয়নি, কয়েক মাস পরেই তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছিল। বলা বাহুল্য, তাঁর চলে যাওয়ায় কলাভবনের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন। আন্দ্রের বিদায়সভা উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন– ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি’ গানটি। এই জনপ্রিয় গান তিনের দশকের ‘শাপমোচন’ গীতিনাট্যে সংযোজিত, সে আমরা জানি। তবে এই মন ছুঁয়ে যাওয়া গান যে এক বিদেশিনীর কলাভবন থেকে বিদায়বেলার ক্ষণে রচিত– সে-কথা আমরা অনেকেই জানি না। এমন করেই কলাভবন ইতিহাসের পরতে পরতে গাঁথা হয়েছে রবীন্দ্রজীবনকাব্যের আশ্চর্য কথামালা।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন গল্পকলা-র অন্যান্য পর্ব

………………………