


কুমায়ুন ও গাড়োয়াল হিমালয়ের প্রবেশদ্বার, জিম করবেটের স্মৃতিবিজড়িত নৈনিতালের রামনগর কিংবা দেরাদুন, হরিদ্বার, উধম সিং নগর-সহ উত্তরাখণ্ডের বিশেষ জলহাওয়ায় লালিত ‘গোলাপ-গন্ধী’ লিচুর আমদানি কলকাতা বা আমাদের রাজ্যে দেখিনি। উত্তরাখণ্ডে সেই সুস্বাদু লিচুর স্থানীয় পরিচিতি ‘গোলা গুলাব’ নামে। রামনগরের ‘গোলা গুলাব’-এর অপার্থিব সুস্বাদের রহস্য নিহিত রয়েছে হিমালয়ের জলবায়ু ও তার মাটির বৈশিষ্ট্যে। কাজেই সেই লিচুতে ইউরোপ তো মজবেই।
সরস, সুমিষ্ট লিচুতে সুগন্ধি গোলাপের সুবাস! এমন সুস্বাদু, মনোহরা লিচু খেয়েছেন না কি কখনও? এই লিচুর কথা আমি, আপনি হয়তো জানি না, তেমন লিচু হয়তো আগে কখনও দেখিওনি। তবে জিম করবেটের শহরের সেই বিশেষ গোলাপ-গন্ধী লিচু বা ‘গোলা গুলাব’ একেবারে তরতাজা অবস্থায় উত্তরাখণ্ডের পাহাড় থেকে সরাসরি পৌঁছে গিয়েছে ইতালির বাজারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি রোম সফরে গিয়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে ‘মেলোডি’ টফি উপহার দিয়ে বিরাট সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। পরে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে একসঙ্গে ছবি তোলা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলোনির কথা কাটাকাটি যখন অ-কূটনৈতিকসুলভ ব্যক্তিগত ঝগড়ার পর্যায়ে নেমে এসেছে, তখন মোদি-মেলোনি একান্ত আলোচনা থেকে হাসি মুখের যৌথ ছবি কিছুই বাদ যায়নি। আর পারস্পরিক সুসম্পর্কের রসায়নেই এই প্রথম ইতালি তথা ইউরোপের তাজা ফলের বাজারে ভারতের প্রবেশ এক টন লিচু রপ্তানির মাধ্যমে।
মুজাফফরপুরের সুমিষ্ট লিচুর সুখ্যাতির কথা তো সকলের জানা। ছোট, সরু বীজ, পুরু শাঁস। মুখে দিলে মিষ্টি রসে ভরপুর। কিন্তু কুমায়ুন ও গাড়োয়াল হিমালয়ের প্রবেশদ্বার, জিম করবেটের স্মৃতিবিজড়িত নৈনিতালের রামনগর কিংবা দেরাদুন, হরিদ্বার, উধম সিং নগর-সহ উত্তরাখণ্ডের বিশেষ জলহাওয়ায় লালিত ‘গোলাপ-গন্ধী’ লিচুর আমদানি কলকাতা বা আমাদের রাজ্যে দেখিনি। উত্তরাখণ্ডে সেই সুস্বাদু লিচুর স্থানীয় পরিচিতি ‘গোলা গুলাব’ নামে। স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য প্রসিদ্ধ প্রিমিয়াম কোয়ালিটির সেই লিচুর জাতেরও রকমফের আছে। কোনওটির নাম আবার ‘ক্যালকাটিয়া’, কোনওটি ‘বেদানা’। তবে সব লিচুই দেখতেও ভারি লোভনীয় টুকটুকে লাল, পাতলা খোসা ছাড়ালে পুরু শাঁস, মিষ্টি রসে টইটুম্বুর। মুখে ফেললেই স্বর্গীয় অনুভূতি! লিচুতে বিচি নেই। উত্তর ভারতে জনপ্রিয় একটি স্ট্রিট ফুড ‘গুলাব গোলা’– একখণ্ড বরফের ওপরে রোজ সিরাপ ঢেলে তাতে একটু মালাই আর ড্ৰাই ফ্রুটস। উত্তরাখণ্ডের শীতল আবহাওয়ায় পুরোপুরি প্রকৃতির দান এই লিচুর স্বাভাবিক মিষ্টি স্বাদ আর গোলাপের সুগন্ধ, ওই স্ট্রিট ফুডের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও তাতে কৃত্রিম বরফ বা ‘রোজ সিরাপ’ যোগ করার বালাই নেই। সেই লিচু আপনা থেকেই যেন ‘গোলা গুলাব’। আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ও স্বাদের অভিনবত্বে ইতিমধ্যেই তা পেয়েছে জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন (জিআই) ট্যাগ। যেমন পেয়েছে মুজাফফরপুরের ‘শাহি লিচু’।

আরেকটি চমক হল– জিআই পাওয়া অসমের তেজপুরের লিচু। সেই লিচুর কথা জানলেও অবাক হতে হয়। ভরা মরশুমে তেজপুরের ‘লিচু পুখুরি’র বাগানের বড় বড় একেকটি লিচুর ওজনই ৭০-৮০ গ্রাম। বাজারে সেই লিচু একেকটি বিক্রি হয় ১৯-২০ টাকায়। নানা জাতের লিচুর নাম– ‘ইলাচি’, ‘বিলাইতি’, ‘বোম্বাইয়া’, ‘পিয়াজি’ বা ‘হলদিয়া’। বছরে একেকটি গাছে ফলনের পরিমাণ ৩-৪ হাজার লিচু থেকে শুরু করে ৭-৮ হাজার।
আমাদের রাজ্যের মুর্শিদাবাদ ও বারুইপুরের লিচুর জনপ্রিয়তাও কম নয়। তবে ইউরোপে পাঠানোর জন্য কিন্তু মুজাফফরপুর বা তেজপুর বাদ দিয়ে সেরার সেরা লিচু– ‘গোলা গুলাব’কেই বেছে নেওয়া হয়েছে।

গাছ থেকে পাড়ার পর লিচুর তাজা থাকার মেয়াদ মাত্র ৭২ ঘণ্টা! তাহলে উত্তরাখণ্ড থেকে ইউরোপের দীর্ঘ পথ সেই লিচু পাড়ি দিল কীভাবে? ব্যাপারটা সম্ভব হয়েছে উন্নত প্যাকেজিং প্রযুক্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড-চেন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। ইউরোপীয় বাজারে লিচুর গুণমান ঠিক রাখতে ট্রানজিটের সময় প্যাকেজিংয়ের তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়েছিল মোটামুটি ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। উত্তরাখণ্ডের হর্টিকালচার দফতর ও কেন্দ্রীয় সরকারের স্বশাসিত সংস্থা ‘এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (APEDA)-র যৌথ উদ্যোগে এই রপ্তানির সুফল হিসাবে দেরাদুন-রামনগর অঞ্চলের লিচু চাষিরা স্থানীয় বাজারের তুলনায় এবারে ২৫ শতাংশ বেশি দাম পেয়েছেন। ‘আলফানসো’, ‘কেসর’, ‘ল্যাংড়া’-সহ নানা জাতের আমের বিশ্বজয়ের পাশাপাশি ইতালিতে সেরা জাতের লিচু রপ্তানির সাফল্যে বোঝা যাচ্ছে বিদেশে উচ্চমানের ভারতীয় ফলের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশা, দেশের রপ্তানিকারকরা যদি ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক মান এবং ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিষয়ক) মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অন্যান্য কৃষিপণ্য, ভেষজ সামগ্রী ও বিভিন্ন ফল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।

কৌতূহল হয়, পরম সুস্বাদু লিচুর উৎপত্তিটা কোথায়? আলু, কাঁচালঙ্কা, আনারস, পেঁপে, পেয়ারা বা সবেদার মতো লিচুও কি পর্তুগিজরাই নিয়ে এসেছিল আমাদের দেশে? তা মোটেই নয়।
লিচুর চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল চিনে, যার ইতিহাস প্রায় ২,০০০ বছরের পুরনো। চিনা ভাষায় এই ফলটির সবচেয়ে সাধারণ এবং জনপ্রিয় পরিচিতি ‘লি-ঝি’ (Li-zhi) নামে। তবে এর অন্যান্য নামও রয়েছে, যেমন ‘হুও-শান’ (Huo-shan) এবং ‘সুয়ান-ঝি’ (Suan-zhi)। ‘শাং-লিন-ফু’ (Shang-lin-fu) নামের একটি প্রাচীন ধ্রুপদী গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, এর আরেকটি নাম হল ‘লি-ঝি’, যার অর্থ ‘ডালপালা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া’। গাছ থেকে পাড়ার পরপরই লিচু দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় বলে এর এমন নামকরণ। এই কারণেই লিচু সবসময় বোঁটা বা ডাল-সহ সংগ্রহ করা হয়। সুতরাং, ডালপালা-সহ লিচু বিক্রির বিরুদ্ধে আমাদের রাগারাগি করা মোটেই সাজে না। প্রাচীন ওই গ্রন্থে আরও উল্লেখ আছে: গাছ থেকে পাড়ার প্রথম দিনই এর রং বদলে যায়, দ্বিতীয় দিন সুবাস কমে যায়, তৃতীয় দিন স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় এবং চতুর্থ, পঞ্চম ও পরবর্তী দিনগুলিতে এর রং, সুবাস ও স্বাদ– সবই পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
‘ট্যাং’ রাজবংশের ((Tang Dynasty, ৬১৮-৯০৬ খ্রিস্টাব্দ) আমলে সাহিত্য ও শিল্পকলায় লিচুর স্থান ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। চমৎকার ও আকর্ষণীয় ফল হিসেবে রাজদরবার ও অভিজাত সমাজে ছিল তার উদযাপন। সম্রাট শুয়ান-জং-এর (Xuan-zong) প্রিয়তম রক্ষিতা ইয়াং গুই-ফেই (Yang gui-fei) লিচু এত বেশি ভালোবাসতেন যে, সিচুয়ান (Szechwan) প্রদেশ থেকে রাজধানী চ্যাং-আন-এ (Chang-an) লিচু পৌঁছে দেওয়ার জন্য সম্রাট দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার নিয়োগ করেছিলেন। ট্যাং আমলের কবি দু-মু (Du-mu) তাঁর ‘গুও-হুয়া-চিং-গং’ (Guo-Hua-Qing-Gong) অর্থাৎ, ‘হুয়া-চিং প্রাসাদ পেরনো’ নামের একটি কবিতায় তার বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন– ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলা দ্রুতগামী ঘোড়া, শুধু তাঁর প্রিয়তমার মুখে হাসি ফোটাতে; অথচ কে না জানে, এই ছুটে চলা কেবলই লিচু বয়ে আনার জন্য!

‘ট্যাং’ রাজবংশের তিয়ানবাও (Tianbao) আমলের চতুর্দশ বর্ষের পটভূমিতে রচিত মা বোইয়ং (Ma Boyong)-এর ‘দ্য লিচি অব চ্যাং-আন’ (The Lychee of Chang’an) ঐতিহাসিক উপন্যাসটিতে রয়েছে লি শানদে (Li Shande) নামের এক অতি সাধারণ কর্মীর কাহিনি, যিনি নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, সমস্ত ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেও অবশেষে রাজদরবারে তাজা লিচু পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। বইটিতে গল্প বলার ধরন ও কাহিনির বুনোটে এতই উঁচুমানের মুনশিয়ানা যে, ‘ন্যারেটোলজি’ বা আখ্যানতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসটিকে চিনা সাহিত্যে নিবিড় ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

‘সং’ রাজবংশের (Song dynasty, ৯৬০-১২৬০ খ্রিস্টাব্দ) আমলে লিচু কেবল বিখ্যাত কবি সু-শি (Su-shi)-র মতো সাহিত্যিকদের রচনায় উদযাপিতই হয়নি, বরং সেই সময়ে ফল, গাছ সংক্রান্ত কোনও চিনা লেখকের লেখা প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা মনোগ্রাফও প্রকাশিত হয়েছিল। ‘লি-ঝি-পু’ (Li-zhi-pu) শিরোনামের এই বইটি ১০৫৯ খ্রিস্টাব্দে লিখেছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত ও সরকারি কর্মকর্তা কাই-শিয়াং (Cai-xiang), যেখানে ৩০টিরও বেশি জাতের লিচুর বর্ণনা রয়েছে। কৃষিবিষয়ক আর একটি বই ‘নুং-চেং ছুয়ান-শু’ (Nung-chêng ch’üan-shu)-তে অন্য একটি সূত্র ‘চিয়া সাং থুং-ছুয়েহ’ (Chia sang t’ung-ch’üeh)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এই লিচু গাছ ৪০০ বছরেরও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে এবং তখনও তাতে ফল ধরে।
উদ্যানপালন ও কৃষিক্ষেত্রে চিন প্রাচীনকাল থেকেই অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। চন্দ্রমল্লিকা, পিয়োনি (Peony) এবং অন্যান্য অনেক সুন্দর ফুলেরও উৎপত্তি হয়েছিল চিনে। ইউরোপীয় ও চিনা জাতের সংকরায়নের (Hybridization) মাধ্যমে সেগুলির আরও উন্নতি ঘটানো হয়েছে। উদ্ভিদ ও চাষাবাদ নিয়ে চিনেদের গভীর চর্চার মূল্যবান প্রতিফলন রয়েছে সাহিত্যেও। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শতকে ‘জিন’ (Jin) আমলের গোড়ার দিকেই চিনেরা চাষ করা উদ্ভিদের ওপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা মনোগ্রাফ প্রকাশ করা শুরু করেছিল। যেমন– বাঁশের ওপর মনোগ্রাফ ‘ঝু-পু’ (Zhupu), এবং পরে চা গাছের ওপর গবেষণা-গ্রন্থ ‘চা-জিং’ (Chajing)। চিনা রাষ্ট্রনায়ক, ক্যালিগ্রাফার ও কবি কাই-শিয়াং (Cai Xiang)-এর লিচু বিষয়ক গবেষণামূলক বই ‘লি-ঝি পু’ (Lizhi pu) সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি কেবল চিনে লিচুগাছের গঠন ও শ্রেণিবিন্যাস, চাষাবাদ, যত্ন ও লিচু বাগিচার প্রসার, গাছ থেকে লিচু সংগ্রহ, তার সংরক্ষণ এবং লিচু খাওয়ার খুঁটিনাটির নির্ভরযোগ্য বিবরণ ও নির্দেশিকাই ছিল না; বরং এটি ছিল সামগ্রিকভাবে যে-কোনও ফলের ওপর বিশ্বের প্রথম মনোগ্রাফ।

পাশ্চাত্যে লিচুর প্রথম উল্লেখ মেলে জুয়ান গঞ্জালেজ দ্য মেন্ডোজার (১৫৮৫) লেখায়। স্প্যানিশ পাদ্রি, অভিযাত্রী ও চিনা বিশেষজ্ঞ মেন্ডোজা পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে চিনকে পরিচিত করিয়েছিলেন তাঁর লেখা ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য গ্রেট অ্যান্ড মাইটি কিংডম অব চায়না অ্যান্ড দ্য সিচুয়েশন দেয়ারঅব’ বিখ্যাত বইটির মাধ্যমে। সেই বইতে রয়েছে বেশ কিছু স্প্যানিশ পর্যটকের চিন ভ্রমণের বৃত্তান্ত। লিচুর বিবরণ দিতে গিয়ে মেন্ডোজা লিখেছেন– তাদের এক ধরনের প্লাম (বা কুল জাতীয় ফল) রয়েছে, যেটিকে তারা ‘লেচিয়াস’ (lechias) বলে ডাকে। এগুলি অত্যন্ত চমৎকার স্বাদের এবং কেউ সেগুলি প্রচুর পরিমাণে খেলেও তাতে পেট খারাপ হয় না।

নিকোলাস ট্রিগল্ট নামে আর এক খ্রিস্টান মিশনারি তাঁর ‘দ্য ক্রিশ্চিয়ানা এক্সপেডিশনে আপুদ সিনাস’ (De Christiana expeditione apud Sinas) গ্রন্থে লিখেছেন– সমগ্র ইন্ডিয়ার (তৎকালীন প্রাচ্য অঞ্চলের) মধ্যে দক্ষিণের প্রদেশগুলিতে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়; বিশেষ করে ক্যান্টনে। কারণ, সেখানে আনারস ও আম রয়েছে… এবং সর্বোপরি তাদের বিশেষভাবে চমৎকার গুণের কিছু নিজস্ব ফল রয়েছে, যার নাম ক্যান্টনের ‘লিচি’ (licie)। এগুলি বাইরে থেকে দেখতে কমলার মতো।

লিচুর মোটামুটি দু’টি প্রজাতি– ‘লিচি ফিলিপাইনেসিস’ (Litchi philippinensis) ও ‘লিচি চাইনেসিস’ (Litchi chinensis)। ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নিউ গায়ানা এবং দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে লিচু চাষের প্রচলন ছিল। তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ত্রিপুরায় লিচুর প্রথম প্রবেশ চিনের দক্ষিণাঞ্চল থেকে বর্মা (বর্তমান মায়ানমার) হয়ে। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে এর চাষ হিমালয়ের শিবালিক বা তরাই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানকার নাতিশীতোষ্ণ থেকে ক্রান্তীয় আবহাওয়া এবং হিমালয়ের পলিমাটির কারণে পুরো অঞ্চলটি অত্যন্ত উর্বর এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্রের আধার। পরে লিচু চাষের প্রচলন ঘটে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে।
তবে উদ্যানবিদদের গবেষণায় জানা গিয়েছে, রামনগরের ‘গোলা গুলাব’-এর অপার্থিব সুস্বাদের রহস্য নিহিত রয়েছে হিমালয়ের জলবায়ু ও তার মাটির বৈশিষ্ট্যে। কাজেই সেই লিচুতে ইউরোপ তো মজবেই।

সাবেক বাঙালি রান্নায় স্বল্পমেয়াদি মরশুমি ফলের বিশেষ সমাদর ছিল। তেমনই এক বিখ্যাত পদ লিচুর পায়েস। জ্বাল দেওয়া ঘন দুধ ঠান্ডা করে তাতে কিছু লিচুর শাঁস ও বিচি ছাড়ানো লিচু দিয়ে চমৎকার পায়েসের বিবরণ রয়েছে অনেক রান্নার বইয়ে। একালের প্রজন্মের কাছে লিচুর পায়েসের চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লিচুর আইসক্রিম।

লিচুর শরবত ও জেলি ছাড়াও এখন লিচু থেকে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ওয়াইন। উত্তরাখণ্ডের লিচু পেয়ে ইউরোপের রন্ধন বিশেষজ্ঞ কিংবা রসজ্ঞ কালিনারি আর্টিস্টরা হয়তো আরও নানা ‘গুরমে’ ডিশ হাজির করে অদূর ভবিষ্যতে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেবেন!
………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপঙ্কর দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved