use of rabindra sangeet by satyajit ray and ritwik ghatak | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঋত্বিক-মানিক রবীন্দ্রসেতু

ব্রাহ্মসমাজের যে গায়নধারা প্রতিষ্ঠিত থাকে সত্যজিতের ছবিতে, ঋত্বিক যেন সচেতনভাবেই সরে যান তা থেকে। ওঁর ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে আজ ‘জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’ গানটি তিনি গাওয়ান সুমিত্রা সেনকে দিয়ে, যাঁর কণ্ঠ সে সময় কোনও ‘ঘরানার’ অধীনে নয়। ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ছবিতে ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায়’ গানটিতে ব্যবহৃত হয় আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। রবীন্দ্র-শতবর্ষের সময় থেকে রবীন্দ্রসংগীতের গায়নভঙ্গির যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব নির্মিত হচ্ছিল, আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো গাইয়ের প্রতিষ্ঠান-নিরপেক্ষ কণ্ঠ এই অবয়বকে অনেকটাই দ্রব করে দিতে থাকে।

শেষ আপডেট: জুলাই ৫, ২০২৬, ১৯:৩৭   
Facebook WhatsApp Messenger

রবীন্দ্রসংগীতের গায়কি নিয়ে বাঙালির আবহমানের সন্ধান, সংশয় এবং সংকট। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে রবীন্দ্রসংগীতের প্রয়োগ সেই গায়কি-বিষয়ক আমাদের সন্ধানকে গাঢ়তর করে তুলতে পারে। ব্রাহ্ম পরিবারে সত্যজিৎ রায়ের জন্ম। তাঁর পিতৃদেব ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সুহৃদ। রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়ের মৃত্যুশয্যার পাশে বসে তাঁর অন্তদিনের ইচ্ছাকে সম্মান করে স্বকণ্ঠে গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন, একথা আমরা জানি। সত্যজিতের মা সুপ্রভা, মাসি কনক দাশ (বিশ্বাস), মামাতো-দিদি সতীদেবী প্রত্যেকেই ছিলেন সুগায়িকা এবং সরাসরি গান শিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। বিজয়া রায়ের গান শুনে তারিফ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিজয়ার কণ্ঠের যে একটিমাত্র রবীন্দ্রগান ইউটিউবে পাওয়া যায় (‘স্বপ্নে আমার মনে হল’) তা শুনলে আন্দাজ করা যায় রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, অমলা দাশ, সাহানা দেবী, অমিয়া ঠাকুর প্রমুখ গাইয়ের গায়নভঙ্গির সঙ্গে বিজয়ার গায়নভঙ্গির গভীর মিল। আজন্ম এই পরিবেশে লালিত সত্যজিতের শ্রবণ ছিল এঁদের গানের গভীর সুরে মগ্ন। তাই তাঁর ছবিতে একক গানের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ শিল্পী বেছে নেওয়ার কালে প্রাধান্য দিয়েছেন ব্রাহ্মসমাজের গাইয়েদের এবং ব্রাহ্মসমাজে প্রচলিত গায়ন-রীতিকে। ব্রাহ্মসমাজে গানের সঙ্গে তবলা বাজত না, (সাহানা দেবী যেমন একটি সাক্ষাৎকারে সুভাষ চৌধুরীকে বলেছিলেন– ‘তবলার অ্যাসোসিয়েশনটাই খারাপ’। রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের ব্রাহ্মসমাজের কোনও গাইয়ের রেকর্ডে তবলা বাজেনি। সত্যজিতের ছবিতে ব্যবহৃত কোনও রবীন্দ্র-গানেই তবলা বাজেনি, আরও অনুপুঙ্খভাবে বলা যায় যে, একক কণ্ঠের গানে কোনও তালবাদ্য বাজেনি। রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক ওঁর তথ্যচিত্রে (১৯৬১) একটি সম্মেলক গানে (‘হৃদয়ে মন্দ্রিল’) বেজেছে পাখোয়াজ ও আরেকটিতে (‘বাংলার মাটি বাংলার জল’) বেজেছে শ্রীখোল। এই সম্মেলক গানগুলি গেয়েছিলেন গীতবিতানের শিল্পীরা এবং সেই সময় গীতবিতানের মুখ্য শিক্ষক ছিলেন অনাদিকুমার দস্তিদার, কনক দাশ এবং নীহারবিন্দু সেন– এঁদের প্রত্যেকেরই রবীন্দ্রনাথ-দিনেন্দ্রনাথের গায়নভঙ্গির সঙ্গে ছিল আপন কণ্ঠের সংযোগ। এই তথ্যচিত্রটির সূচনায় কবিপ্রয়াণ ও একটি জ্বলন্ত চিতার আগুনের দৃশ্য fade out করে যখন ভেসে আসে ‘জয় হোক, জয় হোক’, গানের সম্মেলক স্বর ‘হোক–’ শব্দটির উচ্চারণ, চড়ার সা-তে সমবেত স্বরন্যাস করার ধরন, আমাদের মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ-দিনেন্দ্রনাথের আন্তরিক গভীর মুক্তস্বর। এই সহজ, অকৃত্রিম মুক্তস্বরটি সত্যজিৎ আমাদের উপহার দিলেন কিশোরকুমারের কণ্ঠকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে ‘চারুলতা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে।

zoom
সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক তথ্যচিত্রের (১৯৬১) শুটিং-এর দৃশ্য

‘চারুলতা’ ছবি তৈরির সময় কিশোরকুমারকে [সত্যজিতের বড়দি সতীদেবীর কন্যা রুমার (পরে গুহঠাকুরতা) স্বামী] গানটি টেপে রেকর্ড করে দিয়েছিলেন বিজয়া রায়, এই কথা রুমা গুহঠাকুরতা এই লেখককে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। (‘এইমন’, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণ সংখ্যা, এপ্রিল ২০০৩, জলপাইগুড়ি, ‘ইমন’ প্রকাশিত)। দু’টি গানেই দৃশ্যত পিয়ানো বাজে। ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানটিতে পিয়ানোর হারমোনাইজেশনটা কম্পোজ করেছিলেন সত্যজিৎ, ঠাকুরবাড়ির ঘরানায়। বাজিয়েওছিলেন তিনি। (একথা জানালেন শ্রী সন্দীপ রায়, এই লেখককে টেলিফোনে ২২.০৬.২০১৬ তারিখে)। ‘মণিহারা’ ছবিতে রুমা গুহঠাকুরতার কণ্ঠে ‘বাজে করুণ সুর’ গানটির যে রূপটি আমরা শুনি, দ্রুত চালের অলংকার ও তানপ্রধান সেই গানের ভঙ্গিটি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্ণাটী সাংগীতিক শ্রুতি-সমৃদ্ধ গায়কিটির চেয়ে আলাদা। সত্যজিৎ রায়ের ভাগ্নি রুমা এ-বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন–

‘মানিকমামা আমায় গানটি গাইতে বললেন। গানটি আমায় শিখিয়েছিলেন আমার স্বামী অরূপ গুহ ঠাকুরতা। গানটি আমায় গাইতে হয়েছিল অনেকটা দূরে বাজতে থাকা একটি তানপুরার সঙ্গে। ছবি রিলিজ করার পর মানিকমামা ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন গানটি আমি গ্রামাফোন কোম্পানিতে রেকর্ড করি। সেই মতো কথা হয়েছিল গ্রামাফোন কোম্পানীর সঙ্গে এবং রেকর্ডিং-এর তারিখও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় তড়িঘড়ি শৈলজাবাবু শান্তিনিকেতন থেকে মোহরদিকে (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) নিয়ে এসে গানটি রেকর্ড করালেন। তখন গ্রামাফোন কোম্পানীর নিয়ম ছিল যে, একটি গান একজন শিল্পী রেকর্ড করতে পারবেন। ফলে আমার আর ঐ গানটির রেকর্ড বের হল না। তবে মোহরদি গানটি আমার চেয়ে অনেক ভালো গেয়েছেন।’ (‘এইমন’, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণ সংখ্যা, ২০০৩, জলপাইগুড়ি, ইমন প্রকাশিত)

zoom
সত্যজিতের সংগীত পরিচালনা, রয়েছেন রুমা গুহঠাকুরতা

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ডটি হওয়ায় শ্রোতা হিসাবে আমরা আরও ধনী হলাম, কারণ দু’জন ডাকসাইটে শিল্পীর কণ্ঠে দু’টি শৈলীতে আমরা গানটি শুনতে পেলাম। আমাদের মনে হয়, রুমার গাওয়া গানটিতে যে দ্রুতচালের তার ও ছোটদানার কাজ আছে, তার ঘরানাটি ব্রাহ্মসমাজের। অলংকরণের এই চরিত্রটি দিনেন্দ্রনাথ, অমিয়া ঠাকুর, কনক দাশ প্রমুখ গাইয়েদের শ্রবণ-স্মৃতি জাগিয়ে তোলে আমাদের ভিতরে। কণিকার গানটিতে এই গানের মূল গানের সাবিত্রী দেবীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের পাওয়া ‘নিতু চরণমূলে’– দক্ষিণী শ্রুতির যে প্রকাশ সেটি লক্ষণীয়, আর লক্ষণীয় অপেক্ষাকৃত গোল দানার এবং অপেক্ষাকৃত মন্থরগতির কারুকাজ। সাধারণ শ্রোতার কাছে শান্তিনিকেতনের আশ্রমকন্যা, অতুলনীয় কণ্ঠ-সম্পদের অধিকারী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানটি বিপুল সমাদর লাভ করেছে এবং গানটির সঙ্গে ওঁর নামটি একাত্ম হয়ে গিয়েছে। রুমা গুহঠাকুরতার গায়নটি সম্পূর্ণ অনুসরণ করে একদা শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, উত্তরকালে মুম্বই-নিবাসী স্বল্পশ্রুত গাইয়ে সায়ন্তনী গুপ্ত ‘বাজে করুণ সুরে’ গানটি একটি নৃত্যানুষ্ঠানের জন্য গেয়েছিলেন ২০১৭ সালে। কলকাতা শহরের রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত সেই নৃত্যায়োজনে এই গানটি শুনে বহু শ্রোতা বলেছিলেন, গানটি ঠিক গাওয়া হয়নি এবং ‘কোথায় বেঠিক?’– এই প্রশ্ন তাদের নিক্ষেপ করায়, তাঁরা গানটি নিয়ে ঠিক যা বলেছিলেন বলেছিলেন তার সারাৎসার হল: ‘রবীন্দ্রসংগীতের মতো করে গাওয়া হয়নি’। অর্থাৎ এখানেও শ্রোতার ‘রবীন্দ্রসংগীতের মতো করে’ এই ধারণাটির সূচক আর যাই হোক, রুমা গুহঠাকুরতার গায়নটি নয়। ‘গণশত্রু’ ছবিতে মায়া চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রুমা এবং ‘এখনো গেল না আঁধার’ গানটির আস্থায়ী অংশটি আংশিক গেয়েছিলেন স্বকণ্ঠে। খেয়াল করার বিষয়, গানের এখানে ‘মরণব্রত’ অংশটির সুর গুনগুন করে গাইছেন রুমা– ‘ব্রত’ শব্দটির ‘ত’-তে যোগ করেছেন একটি ছোট দানার টপ্পার অলংকার (স্বরলিপির স-ন-দ-এর বদলে)। ঠিক এই অলংকরণটি রেকর্ডে গাওয়ার সময় এ গানে এই জায়গাতেই প্রয়োগ করেছেন গীতা ঘটক। এইরকমই স্বরলিপি-রহিত একটি টপ্পার অলংকার পাই ‘জনঅরণ্য’ ছবিতে শর্মিলা রায়ের কণ্ঠে ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ গানের ‘গগনে গগনে ডাকে দেয়া’-র ‘দেয়া’-তে। শর্মিলা রায় ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে, শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-ঘনিষ্ঠ ক্ষিতীশ রায় ও উমা রায়ের কন্যা, রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক তথ্যচিত্রটি নির্মাণকালে নথিপত্রের সন্ধানে সত্যজিৎ ওঁদের শান্তিনিকেতনের বাড়িতে এসেছেন এবং দু’টি পরিবারের মধ্যে নিবিড় সাংস্কৃতিক বিনিময় ছিল। রুমা ও শর্মিলার গায়নের মিল আকস্মিক নয়, দু’জনের পরিবারেই ঠাকুরবাড়ি ও ব্রাহ্মসমাজের সংস্কৃতি ও গায়নরীতির গাঢ় প্রভাব এই মিলের নেপথ্যে। ‘চারুলতা’ ছবিতে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গানটি গেয়েছিলেন মাধবী মুখ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। এই লেখককে টেলিফোন-কথালাপে তিনি জানালেন, গানটি তাঁকে শিখিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় নিজেই। তাঁর গাওয়া গানটি লক্ষ করলে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় চোখে পড়ে। স্বরলিপির অনেক অলংকরণ মাধবীর গাওয়া গানটিতে নেই, যেমন নেই ‘তটিনী’ শব্দের ‘স-র-ম’-র তিনটি স্বর। কিন্তু স্বরলিপির একটি উল্লেখ্য স্বর সত্যজিৎ তাঁকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়েছেন। ‘কুহু কুহু গায়’-এর ‘য়’ এসে নামে ‘সা’ তে, সেটি এমন একটি স্বরবিন্যাস সৃষ্টি করে, এই গানের মূল গান তার চেয়ে আলাদা। সাধারণত ‘গায়’ শব্দটিতে অধিকাংশ শিল্পীই পঞ্চমে ন্যাস করেন (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রাণী সেনের জনপ্রিয় রেকর্ডে তাইই রয়েছে) কিন্তু মাধবী স্বরকে নামিয়ে আনেন ‘পা’ থেকে ‘সা’-তে, কোকিলের কুহুতান আর প্রাণের হাহাকার– উভয়ের জন্যেই এ গানের কম্পোজার এবং ছবির নির্দেশক ‘সা’ পেতে রাখলেন যেন।

zoom
‘চারুলতা’ ছবির একটি দৃশ্য

রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার ভঙ্গি, যন্ত্রের ব্যবহার, তালবাদ্যের প্রয়োগ– এই সব কিছু নিয়ে ঋত্বিক ঘটক তাঁর ছবিতে একটি নতুন বয়ান নির্মাণ করেন। তাঁর এই নির্মাণের অন্যতম কুশলী কারিগর জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। তাঁর ছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহৃত হয় অনেক আবেগঘন মুহূর্তে। অনেকটা নাটকীয়ভাবে, এবং তাঁর শিল্পীচয়নের নীতিটি সত্যজিতের চেয়ে আলাদা। ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে দেবব্রত বিশ্বাসের খোলা দরাজ গলার গায়নের ভূয়সী প্রশংসা করলেও (ইউটিউবে এই সাক্ষাৎকারটি পাওয়া যায়) নিজের কোনও ছবিতে তাঁর ‘জর্জদা’কে দিয়ে গান গাওয়াননি সত্যজিৎ। দেবব্রত ব্রাহ্মসমাজেরই একজন, সম্পর্কে সত্যজিতের ছোটমাসি কনক দাশের (বিশ্বাস) দেওর। তবুও দেবব্রতর গান গাওয়া একটি সময়ের পর ব্রাহ্মসমাজের সমাহিত শান্ত গায়নরীতিকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে অনেকটাই নাট্যগুণসম্পন্ন এবং অভিনয়ধর্মী। ঋত্বিকের ছবির অন্যতম-সংগীত পরিচালক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দেবব্রত বিশ্বাসের সহধর্মী ও রাজনৈতিক সুহৃদ এবং গণনাট্য আন্দোলনের সৈনিক। সত্যজিৎ বিশ্বাস করতেন, রবীন্দ্রসংগীত বিশিষ্ট শিক্ষিত শ্রোতার শ্রবণের একান্ত বিষয় (সাক্ষাৎকার, সুভাষ চৌধুরী); অপরদিকে গণনাট্য আন্দোলনের কর্মী হিসেবে ঋত্বিক, জ্যোতিরিন্দ্র, দেবব্রত প্রমুখ রবীন্দ্রনাথের গানকে জনসমাজে ছড়িয়ে দেবার পন্থী। স্বভাবতই কম্যুনিকেশনের দর্শন ও ‘পলিসি’টি তাঁদের অন্যরকম। সেই কারণেই ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ (মেঘে ঢাকা তারা), ‘আকাশভরা সূর্য তারা’ (কোমল গান্ধার), ‘কেন চেয়ে আছো গো মা’ (যুক্তি তক্কো আর গপ্পো: গানটির ধরতাইটি গেয়েছিলেন দেবব্রত ও বাকি অংশটি সুশীল মল্লিক) গাওয়া হয় এবং দৃশ্যায়িত হয় অনেকটাই নাটকীয় ভঙ্গিতে, অনেক সময় সংলাপের প্রসারণ হিসাবে, গানে মধ্য লয়ে পাখোয়াজ বাজে। যে দেবব্রত বিশ্বাস নিজের রেকর্ডে তালবাদ্য ব্যবহার থেকে দূরেই থাকতেন, এই গান তালসঙ্গতে তাঁর গায়কিকে শুনতে পাওয়ার সুযোগ করে দেয় আমাদের। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে একক গানে যেমন তালবাদ্য বাজে না কখনও, ঋত্বিকের ছবিতে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র তালবাদ্যকে ব্যবহার করেন। ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ গানটিতে খুব বড় মুখের আনদ্ধবাদ্যে নানা স্বরগ্রামে ‘লয়টি’ রেখে তালের কোনওরূপ প্রকাশ না করে এক-একটি করে ‘ঠেকা’ বাজানো হয়, গানে অন্য একটি ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়।

zoom
গণনাট্যের সঙ্গীদের সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস

ব্রাহ্মসমাজের যে গায়নধারা প্রতিষ্ঠিত থাকে সত্যজিতের ছবিতে, ঋত্বিক যেন সচেতনভাবেই সরে যান তা থেকে। ওঁর ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে আজ ‘জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’ গানটি তিনি গাইয়েছিলেন সুমিত্রা সেনকে দিয়ে, যাঁর কণ্ঠ সে সময় কোনও ‘ঘরানা’র অধীনে নয়। ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ছবিতে ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায়’ গানটিতে ব্যবহৃত হয় আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। রবীন্দ্র-শতবর্ষের সময় থেকে রবীন্দ্রসংগীতের গায়নভঙ্গির যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব নির্মিত হচ্ছিল, আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো গাইয়ের প্রতিষ্ঠান-নিরপেক্ষ কণ্ঠ এই অবয়বকে অনেকটাই দ্রব করে দিতে থাকে। উত্তরকালে বাংলা ছবিতে মূলত তরুণ মজুমদারের হাত ধরে রবীন্দ্রসংগীতে আসে বাংলা বেসিক গান ও ছায়াছবির গানের জনপ্রিয় কণ্ঠস্বরগুলি, সেই স্বরগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য ‘মিষ্টত্ব’ এবং গায়নের প্রধান লক্ষ্য তৎকালীন বোম্বাই ও কলকাতার মুখ্য প্লে-ব্যাক সিঙ্গারদের স্বরক্ষেপণের ভঙ্গিটিকে প্রয়োগ করা। বাংলা ছবিতে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কণ্ঠ বেয়ে তৈরি হয় একধরনের সমান্তরাল রবীন্দ্রসংগীত গায়কি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে যান তার প্রধান মুখ হিসাবে।

zoom
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র

ফিরে আসি ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে। মূলত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র এবং উস্তাদ বাহাদুর খানের যে যন্ত্রায়োজন, তার আধারটি হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সংগীত। কিন্তু তাঁরা কখনও রবীন্দ্রসংগীতকে ধ্রুপদায়িত (ক্ল্যাসিক্যালাইজ) করতে চাননি, তাঁরা ভারতীয় রাগসংগীতের অমিত শক্তিকে গানের সার্থক স্ফুরণের নেপথ্যে গভীর আবহ হিসেবে রেখেছেন, গানই হয়ে উঠেছে মুখ্য। ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ গানটির শেষ পঙ্‌ক্তিটিতে ‘ভাঙল’ শব্দটি গায়কের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় না, কেবল সেখানে পড়ে বাহাদুর খানের সরোদের একটি অমোঘ আঘাত। রবীন্দ্রনাথের পুরো কম্পোজিশনটি বাঙ্‌ময় হয়ে ওঠে। এখানে গায়কের স্বর আর সরোদের ধ্বনি হয়ে ওঠে পরস্পরের পরিপূরক। যে ঋত্বিক ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে ‘আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায়’ গানে দুই হাতের করতালিকে গানের সঙ্গত হিসাবে ব্যবহার করেন, তিনি যে কালের মন্দিরা শুনতে পান, সে বিষয়ে আর কোনও সংশয় থাকে না আমাদের।

charulata Debabrata Biswas Jyotirindra Maitra Kishore Kumar Meghe dhaka tara Rabindranth Tagore Ritwik Ghatak Ruma Guha Thakurata Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray

Share this article on