Robbar

উল্টোরথযাত্রা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 24, 2026 4:08 pm
  • Updated:July 24, 2026 4:08 pm  

সমসাময়কি ঘটনাবলি, ক্রীড়াজগৎ ইত‌্যাদি বিষয় নিয়ে নানান ধরনের নিয়মিত বিভাগ প্রথম সংখ‌্যা থেকেই শুরু হয়। পরবর্তীকালে নানান নামে বিবিধ বিষয়ভিত্তিক নিয়মিত বিভাগ এই পত্রিকার শেষের দিক পর্যন্ত যাতে থাকত। সম্পাদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “‘সবিনয় নিবেদন’ বা ‘চিঠিপত্রের জঞ্জাল’ বা ‘মেলব‌্যাগ’ যাই হোক এইরকমের নামের একটা বিভাগে আসছে মাস থেকে পাঠকদের প্রশ্নোত্তর দেওয়া হবে। পাঠকদেরও অনুরোধ করা হচ্ছে– ওই বিভাগটির জন‌্য একটি নতুন নামকরণ করতে।” পরের সংখ‌্যাগুলিতে দেখা যায় এই বিভাগটির নাম বেছে নেওয়া হয়েছে শেষেরটি– ‘মেলব‌্যাগ’, বিভিন্ন সময়ে নানান ব‌্যক্তি বিভাগটি পরিচালনা করেছেন– পাঠকের চিঠির মনোরম রসালো উত্তর দেওয়া হত, সে সময়ের অনেক পত্রিকাতেই এই ধরনের বিভাগের চল ছিল।

দেবাশিস গুপ্ত

“আষাঢ়ে ‘উল্টোরথে’র যাত্রা শুরু হল। রথ উল্টেই আমরা ‘উল্টোরথ’ প্রকাশ করলুম– যে কোন দিন গণেশ উল্টোব বলে। ‘উল্টোরথ’ প্রকাশের পেছনে কোন বিশেষ কারণ নেই– এর পিছনে কোন ‘ইজম’ নেই বা নেই কোন বিরাট সাহিত‌্যিক গোষ্ঠী গড়ে তোলার স্পর্ধা। শুধু ব‌্যক্তিগত খেয়াল খুশির জন‌্য এর সৃষ্টি।…”

আজ থেকে প্রায় পৌনে এক শতাব্দী আগে ১৯৫২ সালে (আষাঢ়, ১৩৫৯, সম্পাদক: মনোজ দত্ত) ‘উল্টোরথ’ পত্রিকার প্রথম সংখ‌্যার সম্পাদকীয়তে উপরোক্ত মন্তব‌্য করা হয়েছে। সম-চরিত্রের আরও বেশ কয়েকটি পত্রিকার ক্ষেত্রে যেমন, ‘উল্টোরথ’ পত্রিকা উক্ত আশঙ্কা অনুযায়ী ‘যে কোন দিন গণেশ’ উল্টোয়নি, পরবর্তী প্রায় তিন দশক– হয়তো বা আরও বেশি সময় ধরে অতি জনপ্রিয় পত্রিকা ছিল ‘উল্টোরথ’। প্রথম সংখ‌্যার প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন শৈল চক্রবর্তী। আট আনা মাত্র দামের সাধারণ নিউজপ্রিন্টে ছাপা মাত্র ৮০ পাতার এই পত্রিকাটির প্রথম সংখ‌্যা চেহারায় ছিল অত‌্যন্ত সাদামাটা। অবশ‌্য পরবর্তী সংখ‌্যাগুলিতে ক্রমান্বয়ে তার আকার পুষ্টতর এবং লেখা বা ছাপার মানের উন্নতি লক্ষ করা যায়। পত্রিকার এই প্রথম সংখ‌্যায় শিবরাম চক্রবর্তীর ‘একটি মেয়ের জন‌্য’র সঙ্গে ছিল শচীন ভৌমিকের লেখা আরেকটি গল্প। রম‌্যরচনা ‘ইয়ে’-র লেখক অননুকরণীয় দীপ্তেন্দ্রকুমার সান‌্যাল– অযাচিতভাবে খানিকটা খোঁচা মারা যাঁর কর্তব‌্যের মধ‌্যেই পড়ত সম্ভবত। “…রবীন্দ্রনাথ-কে বরবাদ করে বাংলা গানের কথা ভাবা যেমন পাগল কিম্বা দিলীপকুমার রায়ের পক্ষেও আজকের দিনে অসম্ভব, ‘ইয়ে’ বাদ দিয়ে বাংলা কথাবার্তা চালানোর কথাও তেমনি।…” অকস্মাৎ কোথা থেকে, কেন দিলীপকুমার রায়ের উপমাটি আনা হল, আজ অথবা তখনও আর তার কারণ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। দীপ্তেন্দ্র কুমারের লেখার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁদের লেখার খাঁজে খাঁজে এমন সব অপ্রত‌্যাশিত চমক পাওয়ার অভ‌্যাস আছে!

উল্টোরথ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা, প্রচ্ছদ: শৈল চক্রবর্তী

উল্লেখ‌্য, দিলীপকুমার রায়ের লেখাও পরবর্তীকালে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

সমসাময়কি ঘটনাবলি, ক্রীড়াজগৎ ইত‌্যাদি বিষয় নিয়ে নানান ধরনের নিয়মিত বিভাগ প্রথম সংখ‌্যা থেকেই শুরু হয়। পরবর্তীকালে নানান নামে বিবিধ বিষয়ভিত্তিক নিয়মিত বিভাগ এই পত্রিকার শেষের দিক পর্যন্ত যাতে থাকত। সম্পাদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “‘সবিনয় নিবেদন’ বা ‘চিঠিপত্রের জঞ্জাল’ বা ‘মেলব‌্যাগ’ যাই হোক এইরকমের নামের একটা বিভাগে আসছে মাস থেকে পাঠকদের প্রশ্নোত্তর দেওয়া হবে। পাঠকদেরও অনুরোধ করা হচ্ছে– ওই বিভাগটির জন‌্য একটি নতুন নামকরণ করতে।” পরের সংখ‌্যাগুলিতে দেখা যায় এই বিভাগটির নাম বেছে নেওয়া হয়েছে শেষেরটি– ‘মেলব‌্যাগ’, বিভিন্ন সময়ে নানান ব‌্যক্তি বিভাগটি পরিচালনা করেছেন– পাঠকের চিঠির মনোরম রসালো উত্তর দেওয়া হত, সে সময়ের অনেক পত্রিকাতেই এই ধরনের বিভাগের চল ছিল।

উল্টোরথ পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যার প্রচ্ছদ

পরবর্তীকালে যিনি সুখপাঠ‌্য নির্মেদ কাব‌্যগন্ধী গদ‌্য লেখায় দক্ষ হন সেই পূর্ণেন্দু পত্রী, প্রবোধকুমার সান‌্যাল রচিত নিউ থিয়েটার্সের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ ছবির যে সমালোচনা করেছিলেন, তার অতি আবেগময় উচ্ছ্বসিত ভাষাভঙ্গি পরবর্তীকালে নিশ্চিত তাঁর নিজেরও কৌতুকের কারণ হয়ে উঠতে পারত– “…মহাপ্রস্থানের পথে দেখে সেই কথাটা আবার চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে হল: ‘ভারতবর্ষ, চেয়ে দেখ, বাংলাদেশ আজও মরেনি। অবিস্মরণীয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে, বিষয়বস্তুর নব-নব বৈচিত্রে সে আজও তোমার পথপ্রদর্শক হয়েই বেঁচে আছে। বাংলাদেশ মরেনি।…’”

বিশ্বজিৎ এবং শিশু অভিনেতা হিসেবে প্রসেনজিতের প্রথম ছবি সম্বলিত উল্টোরথের প্রচ্ছদ

চলচ্চিত্র-নাটক-বিনোদনমূলক নানান পত্র-পত্রিকায় সেই ‘নাচঘর’ বা তারও আগে থেকে ‘রূপ-মঞ্চ’, ‘চিত্রবাণী’-র পর গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে ক্রমান্বয়ে ‘প্রসঙ্গ’, ‘জলসা’, ‘সিনেমা জগৎ’ বা ‘উল্টোরথ’ হয়ে ‘উত্তম’, ‘মৌসুমী’ ইত‌্যাদি অথবা অতি ক্ষণজীবী ‘জলসাঘর’, ‘এলোমেলো’ বা ‘চিত্রাঙ্গদা’ পত্রিকাগুলিতে সাহিত‌্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ‘উল্টোরথ’ পত্রিকার কথাই ধরা যাক। ৮০ পাতার প্রথম সংখ‌্যা থেকে সাতের দশকে সাধারণ সংখ‌্যাগুলি ৩০০ পাতার বেশি এবং শারদীয়া সংখ‌্যাগুলি অবলীলাক্রমে ৮০০ পাতা ছাড়িয়ে যেত। সেইসব বিপুলায়তন সংখ‌্যায় ছায়াছবি (প্রধানত বাংলা ছবি এবং কিছু হিন্দি ছবি) বিষয়ক নানান চিত্তাকর্ষক বিভাগ, নির্মীয়মান ছায়াছবির সচিত্র বিবরণ, চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে বিশেষভাবে নির্মিত নানান বিচিত্র ফিচার ছাড়াও পত্রিকার বৃহত্তম অংশ অধিকার ধরে থাকত সাহিত‌্য– উপন‌্যাস, বড় এবং ছোটগল্প, রম‌্যরচনা, প্রবন্ধ ইত‌্যাদি। সাধারণ সংখ‌্যাগুলিতে একাধিক উপন‌্যাস এবং শারদীয়া সংখ‌্যাগুলিতে চার-পাঁচটি উপন‌্যাস প্রকাশিত হত নিয়মিত। সেইসঙ্গে প্রথম দিকে বেশ কয়েক বছর থাকত উপাদেয় সব ব‌্যঙ্গচিত্র– জনপ্রিয় শিল্পী রেবতীভূষণ এবং শৈল চক্রবর্তী ছাড়াও নিয়মিত ছাপা হত কুমার অজিত (অজিত কুমার দাস), কে. সরকার (কমল সরকার), শ্রীমতী (নরেন রায়), শ্রীরামকৃষ্ণ (রামকৃষ্ণ ভাদুড়ি) বা Omio (অমিয় ঘোষ)-র কার্টুন। ব‌্যঙ্গচিত্রশিল্পীদের আসল নাম আমি জানতে পেরেছি ‘বিষয় কার্টুন’ পত্রিকার সম্পাদক বিশ্বদেব গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। পরের দিকে অবশ‌্য ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় ব‌্যঙ্গচিত্র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি পরিবর্তন– পত্রিকার মুদ্রণকাল বঙ্গাব্দের পরিবর্তে শকাব্দতে রূপান্তরিত হয়। এছাড়া সাহিত‌্যবিষয়ক বিশেষ বিভাগ ‘সাহিত‌্যিক পরিচিতি’, ‘সঙ্গীত শিল্পী’ বিভাগে উচ্চাঙ্গসংগীত এবং আধুনিক গানের প্রখ‌্যাত গায়কদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, ‘স্পোর্টস ডায়েরি’ বিভাগে সাম্প্রতিক ক্রীড়াজগতের বিবরণী দিয়ে পত্রিকাকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করা হত। কবিতা চোখে পড়েনি, তবে সাম্প্রতিক জনপ্রিয় গানের কথা ছাপা হত প্রায়শই।

(বাঁ-দিক থেকে) রেবতীভূষণ ও নরেন রায়ের আঁকা ব্যঙ্গচিত্র

সাহিত‌্যের কথায় ফেরা যাক, দশকের পর দশক ধরে যেসব লেখকের গল্প-উপন‌্যাস-রম‌্যরচনা-প্রবন্ধ এখানে নিয়মিত ছাপা হয়ে এসেছে তার একটি এলোমেলো নাতিহ্রস্ব তালিকা উপস্থিত করা যাক। লেখকদের মধ‌্যে ছিলেন অচিন্ত‌্যকুমার সেনগুপ্ত, সেই প্রথম সংখ‌্যা থেকেই শিবরাম চক্রবর্তী, বনফুল, তারাশঙ্কর বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ‌্যায়, সুবোধ ঘোষ, বিমল মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ‌্যায়, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ‌্যায়, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র (একটি ঘনাদা উপন‌্যাস-সহ), আশাপূর্ণা দেবী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ, প্রণব রায়, বিধায়ক ভট্টাচার্য, শক্তিপদ রাজগুরু। মনোজ বসু, রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর, জরাসন্ধ, প্রমথনাথ বিশী, পঞ্চানন ঘোষাল, অবধূত, সৈয়দ মুজতবা আলী, সমরেশ বসু (গোয়েন্দা অশোক ঠাকুর সমেত), চাণক‌্য সেন, দীপ্তেন্দ্রকুমার সান‌্যাল, মণি বর্মা এবং সাতের দশকে সুনীল গঙ্গোপাধ‌্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপ‌াধ‌্যায়, মতি নন্দী, বরেন গঙ্গোপাধ‌্যায় বা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। এখানে অনেকের নাম নিঃসন্দেহে বাদ পড়ে গেল; কিন্তু তা সত্ত্বেও তালিকাটি সম্ভ্রম উদ্রেককারী, বলাই বাহুল‌্য।

উল্টোরথের আরও প্রচ্ছদ

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ‌্য। যেসব লেখকরা সমালোচকদের কাছে দীর্ঘদিন মূলধারার সাহিত‌্যের সমান্তরালে অবস্থিত থাকার কারণে সশ্রদ্ধভাবে স্মৃত হন, যাঁদের লেখার ব‌্যতিক্রমী বৈশিষ্ট সম্বন্ধে পত্রিকার বিশেষ সংখ‌্যায় নিবিড় শ্রদ্ধার্ঘ‌্য– কেবলমাত্র এই কারণেই নয় যে তাঁরা মহান লেখক, প্রধানত এই কারণেও যে নিছক বাণিজ‌্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পত্রিকাগুলির উজ্জ্বলতর সমান্তরালে তাঁদের অবস্থান, তাঁদের স্ব-চিহ্নিত রচনাবলি নিশ্চিত বাণিজ‌্যিক জনপ্রিয়তাকামী বহুনিন্দিত সাহিত‌্যধারার বিপরীতমুখী– সেই লেখকদের অনেকেই ‘উল্টোরথ’ (বা অন‌্যান‌্য সমসাময়িক ‘লঘু’ সিনেমা পত্রিকায়) নিয়মিত লিখে এসেছেন। বুদ্ধদেব বসু, জ‌্যোতিরিন্দ্র নন্দী, অন্নদাশঙ্কর রায় বা এমনকী সঞ্জয় ভট্টাচার্যের লেখাও সেখানে দেখা গেছে। বস্তুত, বুদ্ধদেব বসুর ‘আজ সেই তারিখ’ উপন‌্যাস (উল্টোরথ, বৈশাখ, ১৮৯৫ শকাব্দ, ১৯৭৩) স্বভাবতই অতি সুনির্মিত লেখা হওয়া সত্ত্বেও গ্রন্থাকারে সম্ভবত কখনওই প্রকাশিত হয়নি। অন্তত বুদ্ধদেব বসুর বিভিন্ন গ্রন্থ-তালিকায় এই উপন‌্যাসের উল্লেখ দেখা যায়নি। নিজস্ব সাহিত‌্যধারা সযত্নে রক্ষা করলেও পেশাদারী লেখক হিসাবে লঘু পত্রিকায় লেখা দিয়ে তাঁরা স্বভাবতই কোনও অপ্রত‌্যাশিত কাজ করেননি। পরবর্তীকালে প্রাজ্ঞ এবং প্রতিপক্ষসন্ধানী সমালোচকরা সারগর্ভ রচনার পর রচনায় তাঁদের যতই জনশূন‌্য একক স্বর্গের বাসিন্দা হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করুন না কেন!

আরও কিছু প্রচ্ছদ

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যাক, পত্রিকাগুলির নানা সংখ‌্যায় যেসব উপন‌্যাস প্রকাশিত হচ্ছে, নিয়মিতভাবে তার অনেকগুলিই দেখা যাচ্ছে বছর না পেরতেই দ্রুত চলচ্চিত্রায়িত হচ্ছে এবং জনপ্রিয়ও হচ্ছে অবিলম্বেই। সমরেশ বসুর ‘তিন ভুবনের পারে’ (উল্টোরথ, বৈশাখ ১৮৮৮ শকাব্দ, ১৯৬৬), ‘এপার ওপার’ (উল্টোরথ, শারদীয়া সংখ‌্যা, আশ্বিন, ১৮৮৯ শকাব্দ, ১৯৬৭) বা আশুতোষ মুখোপাধ‌্যায়ের ‘সাবরমতী’ (উল্টোরথ, শারদীয়া সংখ‌্যা, আশ্বিন, ১৮৮৭ শকাব্দ, ১৯৬৫) এরকমই তিনটি এলোমেলো উদাহরণ, এই পত্রিকা এবং সমগোত্রীয় অন‌্যান‌্য পত্রিকার সংখ‌্যাগুলি ধারাবাহিকভাবে নিবিড় অধ‌্যবসায়ের সঙ্গে খুঁজে দেখলে এরকম অজস্র উদাহরণ নিঃসন্দেহে খুঁজে পাওয়া যাবে, যা থেকে বোঝা যাবে সে যুগের চিত্রপরিচালকরাই কেবল নয়, সাধারণ দর্শকও কতখানি সাহিত‌্যরসিক ছিলেন।

সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গ এ কাগজে এসেছে বহুবার

অবশ‌্য শুধু সাহিত‌্যই বা কেন? সত‌্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকরাও সমপেশাভুক্ত পরিচালকদের সঙ্গেই পাশাপাশি স্টুডিওতে সারাজীবন কাজ করে গেছেন। কেবলমাত্র চলচ্চিত্র-বিষয়ক তাত্ত্বিক পত্রিকায় যখন তাঁদের ছবি নিয়ে দীর্ঘ জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তার আগে থেকেই এই ‘প্রসাদ’, ‘উল্টোরথ’, ‘সিনেমা জগৎ’, ‘জলসা’ পত্রিকায় এইসব পরিচালকের নির্মীয়মান অথবা সদ‌্য-মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবি নিয়ে অতি বিশদ বিবরণ বছরের পর বছর প্রকাশিত হয়েছে। ১৩৬২ (১৯৫৫) সালের বৈশাখ সংখ‌্যা ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় নির্মীয়মান ‘পথের পাঁচালী’ বিষয়ক বিস্তৃত এবং বিশদ রচনা প্রকাশিত হয়েছে ‘বিভূতিভূষণ বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবির সচিত্র কাহিনী’ শিরোনামে। একই সংখ‌্যায় প্রকাশিত হচ্ছে মৃণাল সেনের প্রথম ছবি ‘রাতভোর’-এর সচিত্র কাহিনিও।

সত‌্যজিৎ রায় বিষয়ক অজস্র রচনা প্রকাশিত হয়েছে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায়, ছাপা হয়েছে পৃথক ফটো ফিচার। তাঁর সাক্ষাৎকার নির্ভর রচনাও প্রকাশিত হয়েছে ‘কী পাইনি’ শিরোনামে। ওই একই নামে একইসঙ্গে কানন দেবী, উদয়শঙ্কর এবং রবিশঙ্করের সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছে (উল্টোরথ, পূজা সংখ‌্যা, চতুর্দশ বর্ষ, সপ্তম সংখ‌্যা আশ্বিন, ১৮৮৭ শকাব্দ, ১৯৬৫)। সন্ধ‌্যা সেন অনুলিখিত এই সাক্ষাৎকারে সত‌্যজিৎ রায় বলছেন, ‘…আমার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, আমি নাকি ইনটেলেকচুয়াল স্নব। নিজেকে অত‌্যন্ত বুদ্ধিমান এবং দর্শকসমাজকে নির্বোধ মনে করি। এর চেয়ে বড় ভুল আর কিছু নেই। যদি আমার দর্শকবৃন্দকে আমি নির্বোধই মনে করতাম, তাহলে সৃষ্টির প্রেরণা পেতাম কোথা থেকে? আমি যা রচনা করব, অন্যে তা গ্রহণ করতে পারবে না– তাই যদি ভাবব, তাহলে তো সৃষ্টি থেমে যেত। … কিভাবে ছবি তৈরি করলে Box Office হবে আমি জানি। কিন্তু সস্তা দাম দিয়ে box-office-এর নগদ বিদায়ের মূল‌্য আমি চাই না, একটা বিশেষ যুগ ও কালের মধ‌্যেই যার আয়ু ফুরিয়ে যায়।…’

এছাড়া ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবির আশ্চর্য সব বিজ্ঞাপন। এই সমস্ত কিছুই প্রকাশিত হচ্ছে সশ্রদ্ধভাবে দূর থেকে প্রণত হওয়ার মতো অলৌকিক সৃষ্টি হিসাবে নয়, আর পাঁচটা ছবির মতোই। উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ‌্যায়, ভানু বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়, জহর রায় অভিনীত ছবির বিজ্ঞাপনের সঙ্গেই। এই সমস্ত ছবির অনেকগুলিই পাঁচ-ছয়-সাত দশক পরেও আমরা মনে রেখেছি, আবার সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে অসংখ‌্য ছবি– ওই বিজ্ঞাপনগুলির মধ‌্যে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সেইসব ছবির কথা আবার দেখলে অনেকেই ক্ষীণভাবে মনে করতে পারবেন।

গ্রন্থাগারগুলিতে এইসব পত্রিকার চিহ্ন সম্ভবত পাওয়া যাবে না। পুরনো বইয়ের দোকানে দীর্ঘদিন যাতায়াত করলে কখনও একটি-দু’টি হাতে এসে যেতেও পারে। সম্ভবত আটের দশকের কোন সময় যে এইসব পত্রিকার প্রকাশনা একে একে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল আজ আর তা জানারও তেমন কোনও উপায় নেই, যদি না কোনও ব‌্যক্তিগত সংগ্রহে তাদের জরাজীর্ণ কীটদষ্ট অস্তিত্ব এখনও থেকে থাকে। পৌনে এক শতক আগের এক আষাঢ়ে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকা প্রথম পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়েছিল এবং তার সামান‌্য আগে-পরে একই চেহারার এবং চরিত্রের বেশ কয়েকটি পত্রিকা, তারা যে কবে বিলুপ্ত হয়ে গেল তা কি আজ আর কেউ বলতে পারবেন? জানতে পারলে এই নিবন্ধকারের দীর্ঘদিনসঞ্চিত কৌতূহল চরিতার্থ হবে।