Robbar

ত্রৈলোক্যনাথের ভূতুড়ে ঠিকানায় আপনাকে স্বাগত

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 22, 2026 6:09 pm
  • Updated:July 22, 2026 6:09 pm  

ত্রৈলোক্য়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বসতবাড়ির বর্তমানে বেহাল দশা। কঙ্কাবতী, ডমরু-চরিত, লুল্লু, কুম্ভীর বিভ্রাট ছাড়াও আরও কত যে স্মরণযোগ্য সাহিত্যের জনক তিনি! বাস্তব, কল্পনা আর বিজ্ঞান মিশিয়ে যে আজগুবি দোয়াত, তাতেই কলম ডোবাতেন ত্রৈলোক্যনাথ। এমন লেখক বিস্মৃত হয়েছেন বাঙালি পাঠকের কাছে, তাও কি আজগুবি নয়? তাঁর ভাঙাচোরা বসতবাড়িটি সংরক্ষণের দায় কার? 

পঙ্কজ চক্রবর্তী

নয়ের দশকে যাঁরা বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তাঁদের হয়তো মনে পড়বে, পাঠ্যসূচিতে ‘কুম্ভীর বিভ্রাট’ নামক একটি গল্পের মাধ্যমে তাঁরা ডমরুধরের মুখোমুখি হয়েছিলেন। হয়তো তাঁদের স্মৃতিতে আছে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন লেখকের কথা। কিন্তু পাঠ্যক্রম পেরিয়ে বাঙালির মন হয়তো আজও ছুঁয়ে দেখেনি ‘কঙ্কাবতী’ বা ‘নয়নচাঁদের ব্যবসা’র মতো রচনা। ‘ফোকলা দিগম্বর’ আজ বাঙালির দূরের অতিথি। বিদ্যাধরী বা বাঙ্গাল নিধিরামের কোনও খবর তাঁরা আজ আর রাখেন না। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় এখন সম্পূর্ণ বিস্মৃত একজন লেখক।

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

কোনও লেখকের জন্মশতবর্ষে যখন সেরিব্রাল হেঁচকি ওঠে, তখন নিঃশব্দে এসে পড়ল ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের আরেকটি জন্মদিন । আর দু’দশক পরে, দ্বিশতবর্ষে পড়বেন তিনি। তখন হয়তো হুজুগে বাঙালি, কিছুদিনের জন্য নড়েচড়ে বসবেন। তারপর ফের বিস্মৃতির অতলান্ত অন্ধকার। লেখক যেমন বিস্মৃত, তেমনই তাঁর বসতবাড়িটি এই মুহূর্তে পোড়ো এক বাড়িতে পরিণত হয়েছে। শ্যামনগরের নিকটবর্তী রাহুতার মতো এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে তিনি জন্মেছিলেন। আজ সেই বাড়ি সম্পূর্ণ এক ভগ্নস্তূপ! শুনেছি মাঝখানে বাড়িটি সংস্কার করে দোতলায় থাকতেন তাঁর বংশধরের কয়েকজন। এখন যাঁরা স্টেশনের কাছে থাকেন। আর তাঁর ঘরটিতে কিছুদিন বসতেন একজন হোমিওপ্যাথির ডাক্তার।

ত্রৈলোক্যনাথের এই ঘরটিতে একদা বসতেন এক হোমিওপ্যাথ ডাক্তার

এর বেশ কিছুদিন পর গিয়ে দেখেছি দোতলাটি ভেঙে পড়েছে, কিন্তু একতলাটি মেরামত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে। দরজায় স্থানীয় উদ্যোগে তৈরি একটি স্মৃতিফলক। লেখা ‘বিশ্বকোষ ভবন’ এবং ত্রৈলোক্যনাথ-সহ পাঁচ ভাইয়ের নাম খোদিত রয়েছে। আরও ২৫ বছর পর কিছুদিন আগেই গিয়ে দাঁড়ালাম রাহুতার সেই বাড়িটায়। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো জোড়া মন্দির পেরিয়ে, পুকুর পেরিয়ে শেষ মাথায় সেই বাড়ি। চারপাশে ঢালাই রাস্তা হয়েছে। কিন্তু বাড়িটি প্রায় ভেঙে পড়েছে। ছাদ ভাঙা। দেওয়াল ভাঙা। ভেতরে গাছপালার জঙ্গল। ছবি তোলার উপায় নেই। যে কোনও মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে পারে বিষধর সাপ। সম্পূর্ণ উপেক্ষায় পড়ে আছে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। হয়তো সেখানে এখন লুল্লু ভূতের বাসা। কিংবা ফোকলা দিগম্বরের বিয়ের বাসর বসেছে। কে বা বলতে পারে সেখানেই হয়তো রয়ে গিয়েছে জ্ঞানবান সর্পটি। এখন তাঁর বসতবাটি রীতিমতো ভূত-প্রেত আর সাপখোপের আড্ডা। আড্ডাধারী বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু আমরাও উত্তরাধিকারী হিসেবে দায় ঝেড়ে ফেলেছি। অথচ যে পথ তিনি নির্মাণ করেছেন, আজও তার সার্থক কোনও উত্তরসূরি নেই। তিনি একক ও স্বতন্ত্র। একমেবাদ্বিতীয়ম। তবুও শিশুপাঠ্য ছাড়া তাঁর কোনও অস্তিত্ব রাখেনি বাংলা সাহিত্যের সিলেবাস কিংবা গবেষকগণ।

ভেঙে পড়া দ্বিতলে এক সময় থাকত তাঁর বংশধর

ত্রৈলোক্যনাথ জন্মগ্রহণ করেন ১২৫৪ বঙ্গাব্দের ৬ শ্রাবণ (২২ জুলাই, ১৮৪৭) উত্তর ২৪ পরগনার নিকটবর্তী শ্যামনগরের রাহুতা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম বিশ্বম্ভর মুখোপাধ্যায়। খড়দার মুকুটী কামদেব পণ্ডিতের সন্তান। শৈশবে ত্রৈলোক্যনাথ অত্যন্ত দুরন্ত ছিলেন। তাঁর ভয়ে গ্রামের অনেকে শশব্যস্ত থাকত! অথচ ক্লাসে ত্রৈলোক্যনাথ প্রথম হতেন। বাল্যকাল থেকেই তাঁর মধ্যে নানা উদ্ভাবনী শক্তির লক্ষণ দেখা যায়। তিনি নিজেই মনগড়া এক বর্ণমালা আবিষ্কার করেছিলেন এবং কাঠের ফলকে ও মাটির চাকতিতে সেই বর্ণমালা খোদিত করে গান, হেঁয়ালি, শ্লোক রচনা করেছিলেন। তখন তার আনুমানিক নয় বছর বয়স। গ্রামের স্কুলে ও পাঠশালায় ত্রৈলোক্যনাথের শিক্ষারম্ভ। ১৮৫৯ সালে গ্রামের স্কুলটি উঠে গেলে তিনি হুগলি-চুঁচুড়ার ডব সাহেবের স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং ডবল প্রমোশন পেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ১৮৬১ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য ভদ্রেশ্বরের নিকটবর্তী তেলিনিপাড়ার স্কুলে পড়ে পুনরায় ডফ সাহেবের স্কুলে এসে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৮৬২ সালে গ্রামে অত্যন্ত ম্যালেরিয়া হয়। প্রথমে পিতামহী তারপর মাতা এবং পিতা পরলোক গমন করেন। এখানেই তাঁর লেখাপড়ার সমাপ্তি। পিতার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাঁর দাদা রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায়। তিনি মধ্যম। তাঁর নিচে আরও চারটি ভাই। সকলেই এই সময় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত। তাঁদের পৈতৃক জমিসমূহ ছিল, বাগান-বাগিচা গাছপালাও কিছু ছিল। কিন্তু ১৮৬৪ সালের ঝড়ে তা বিনষ্ট হয়। এদিকে সংসারে হাঁড়ি চড়ে না। এই দুঃখে ত্রৈলোক্যনাথ ১৮৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হলেন। তিনি মানভূম-পুরুলিয়ার আত্মীয় শশীশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করেন। রানীগঞ্জ পর্যন্ত রেলে গেলেন। ইতোমধ্যে পয়সা ফুরিয়ে গেল। রানীগঞ্জ থেকে মানভূম তিনদিনের পথ। বন, জঙ্গল, পাহাড় অতিক্রম করে যেতে হয়। ত্রৈলোক্যনাথ এই পথ হেঁটে যাবেন। রানীগঞ্জে দামোদর নদ যখন পার হন, তখন একটি হিন্দুস্থানী চাপরাশির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ত্রৈলোক্যবাবু বলেন, ‘আমায় চাপরাসী বলিল, আসামে গেলে তোমার ভাল চাকরি হয়, এবং আমি তোমায় পাঠাইতে পারি।’ কিন্তু সেই চাপরাশি ছিল কুলির দালাল। কুলির রক্ষিতার পরামর্শে শেষ পর্যন্ত তিনি পালিয়ে বাঁচলেন। এরপর নানাভাবে পথে পথে কেটেছে তাঁর। না খেয়ে, কখনও গাছের কুল বা তেঁতুলপাতা চিবিয়ে ক্রোশের পর ক্রোশ পায়ে হেঁটে ফিরেছেন তিনি। তবু আত্মীয়স্বজনের কাছে কোনওদিন হাত পাতেননি। কিছুদিন তিনি বীরভূম জেলার দ্বারকা নামক স্থানে স্কুলমাস্টারি করলেন। পরে রানীগঞ্জের উখড়ায় বদলি হন। সেখানে দ্বিতীয় স্কুল শিক্ষক হলেন, বেতন ১৮ টাকা। এই সময় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। তাঁর জীবন দিয়ে তিনি অনুভব করলেন স্বদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের জন্য কিছু একটা করতে হবে। ইতিপূর্বে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথের পরিচয় ছিল। উখড়ায় থাকতে তাঁর কাছ থেকে হঠাৎ একটি পত্র পান। পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জের অধীন শাহজাদপুরে তাঁর জমিদারিতে স্কুল-মাস্টারের পদ খালি আছে। বেতন ২৫ টাকা। ত্রৈলোক্যনাথ যেখানে গমন করলেন, বর্ষাকালে এই অঞ্চল জলে ডুবে যায় এবং রীতিমতো কুমিরের ভয় আছে। পথে কুমিরের আক্রমণ থেকে কোনওরকমে বাঁচলেন ত্রৈলোক্যনাথ। তারপর এক দীর্ঘ পথযাত্রার বর্ণনা আমরা তাঁর মুখ থেকে শুনব:

‘ইতিপূর্বে বাদলা হইয়াছিল। টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছিল, পূর্ব্বদিক্ হইতে প্রবলবেগে বায়ু বহিতেছিল। পদ্মায় অতিশয় তুফান উঠিয়াছিল। কিছুদুর গিয়া আমরা আর অগ্রসর হইতে পারিলাম না। এক স্থানে তিনখানি বড় নৌকা ও একখানি ছোট নৌকা লাগিয়াছিল; আমরা সেইখানে গিয়া নৌকা লাগাইলাম। পদ্মার নিজ ধারেই প্রায় এক ক্রোশ মাঠ; তাহার পরে গ্রাম। সন্ধ্যাবেলা বাতাস উত্তরদিক্ হইতে বহিতেছিল। তুফানও অতিশয় বাড়িল। কত রাত্রি হইয়াছিল, জানি না। কিন্তু ঘোর কোলাহলে আমার নিদ্রাভঙ্গ হইল। উঠিয়া দেখিলাম যে, তুমুল ঝড় আরম্ভ হইয়াছে। উত্তর দিকের ঝড়ে আমাদের নৌকাকে ক্রমাগত পদ্মার মাঝখানে লইয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছে। লগী পুতিয়া, দড়ী বাঁধিয়া আমরা নৌকা রক্ষা করিতে ক্রমাগত চেষ্টা করিতে লাগিলাম। কিন্তু লগী উঠিয়া যায়, দড়ী ছিঁড়িয়া যায়। আমাদের নিকট যে কয়খানি নৌকা ছিল, ঝড়ে একে একে তাহাদিগকে দূরে লইয়া ডুবাইয়া দিল। শেষ বড় নৌকাখানি বায়ুবেগে আমাদের নৌকার উপর আসিয়া পড়িল। দুইখানি নৌকাই একবারে নক্ষত্রবেগে পদ্মার মাঝখানে চলিল। অল্পক্ষণ পরেই নৌকা দুইখানি ছাড়াছাড়ি হইয়া গেল। আমাদের নৌকাখানি ডুবিয়া গেল। নিবিড় অন্ধকার। কোন্ দিক্ উত্তর, কোন্ দিক্ দক্ষিণ, কোন্ দিক্ স্থল, কোন্ দিক্ জল, তাহার কিছুই জানিবার উপায় রহিল না; সুতরাং কোন মতে কেবল জলের উপর ভাসিয়া থাকিতে চেষ্টা করিতে লাগিলাম। কিন্তু তাহাও দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল। তরঙ্গের আঘাতে শরীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হইতে লাগিল। ক্রমেই শরীর অবশ হইয়া পড়িতে লাগিল। অজ্ঞান হইয়া পড়িবার উপক্রম হইল। শেষ ঈশ্বরেচ্ছায় মাটী পাইলাম। পাড়ের নীচে আসিয়া বসিলাম।

কিন্তু চারিদিক্ হইতে মাটী ভাঙ্গিয়া পড়িতেছিল। একবার আমার নিকটেই দশ বার হাত মাটী ভাঙ্গিয়া পড়িল। তখন মাটি-চাপা পড়িবার ভয় হইল। কষ্টে পাড়ের উপর উঠিলাম। উঠিতেই ঝড়ে আমাকে, ঠিক উড়াইয়া না হউক, ঠেলিয়া লইয়া চলিল। আর একবার পদ্মার ভিতর ফেলিয়া দিল। অতিকষ্টে পুনরায় তীরে উঠিলাম। পুনরায় বাতাসে ঠেলিয়া লইয়া চলিল। আমিও বায়ুর সহিত তুমুল সংগ্রাম করিতে লাগিলাম। সম্মুখে একটি ছোট গাছ দেখিতে পাইলাম। আগ্রহের সহিত গাছটী ধরিলাম। হাতের চারিদিকে কাঁটা ফুটিয়া গেল। বুঝিলাম, গাছটী চারা বাবলা গাছ। সে গাছ ছাড়িয়া দিয়া পুনরায় চলিলাম। অল্পক্ষণ পরে একটী ঝোপ পাইলাম। সে স্থানে অনেকগুলি বড় বড় গাছ ছিল। তাহার ভিতর শুইয়া পড়িলাম। অতিশয় কম্প উপস্থিত হইল। আর কিছুই জানি না।’

‘যখন পুনরায় জ্ঞান হইল, তখন দেখিলাম যে, দিন হইয়াছে। এক জনদের বাটীতে পড়িয়া আছি। বাটীর স্ত্রীলোকেরা আমার গায়ে, আগুনের সেক দিতেছে। ক্রমে যখন জ্ঞান হইল, তখন শুনিলাম যে, যাহাদের বাটীতে আছি, তাহারা জাতিতে চণ্ডাল। গ্রামের নাম বুলচন্দরপুর। পাবনা হইতে প্রায় চৌদ্দ ক্রোশ। প্রাতকালে বাটীর পুরুষেরা, জলনিমগ্ন নৌকার দ্রব্যাদি পাইবার প্রত্যাশায় পদ্মার ধারে গিয়াছিল। ঝড় তখন দক্ষিণ দিক হইতে চলিতেছিল। বায়ুবেগে পদ্মা হইতে জল উঠিয়া, তুমুল বৃষ্টির ন্যায়, উপরে অনেক দূর পর্য্যন্ত পড়িতেছিল। যে ঝোপের ভিতর আমি পড়িয়াছিলাম, আশ্রয়ের নিমিত্ত চণ্ডালেরা সেই স্থানে প্রবেশ করে। মৃত অবস্থায় আমি পড়িয়া রহিয়াছি, দেখিতে পায়। গলায় পৈতা দেখিয়া, ধরাধরি করিয়া, মাঠ পার হইয়া তাহারা আমাকে তাহাদের বাটীতে লইয়া আইসে। তাহার পর যত্ন করিয়া আমার পুনরায় চৈতন্য উৎপাদন করে। তিন চারি দিন পরে যখন কিঞ্চিৎ সবল হইলাম, তখন পাবনার দিকে যাত্রা করিলাম।’

এরপর কিছুদিন ত্রৈলোক্যনাথ উড়িষ্যায় দারোগাগিরি করেন এবং ‘উৎকল শুভকরী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

স্যর উইলিয়াম হান্টার

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত থেকে ত্রৈলোক্যনাথ শিক্ষা পেয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি। শুধুমাত্র সাহিত্যিক ভাবলে আমরা তাঁর সম্পর্কে ভুল ভাবব। তিনি ছিলেন যথার্থ একজন উদ্যোগপতি। বহুভাষাবিদ। জীবনের ঝড় উপেক্ষা করে বিভিন্ন বিষয়ে নিজের কর্মদক্ষতা তিনি প্রমাণ করেছেন। তিনি যে কতখানি ভরসাযোগ্য ছিলেন, কতখানি দায়িত্বসম্পন্ন– তার প্রমাণ আমরা পাই কটকে যখন তিনি স্যর উইলিয়াম হান্টারের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি একজন দয়াবান সাহেব। বিলেতে থেকেও ভারতের দীন-দরিদ্রদের জন্য তিনি যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর সেসব কথায় ইংল্যান্ড পর্যন্ত কম্পিত হয়। হান্টার সাহেব কলকাতায় ফিরে আসলেন। কিছুদিন পর ত্রৈলোক্যনাথ তাঁর কাছ থেকে একটি পত্র পেলেন। ১২৫ টাকা বেতনে তিনি একটি চাকরি দিয়ে তাঁকে কলকাতায় আসতে অনুরোধ করলেন। এরপর ঠিক কী ঘটছে? ত্রৈলোক্যনাথ ঠিক কতখানি বিচক্ষণ মানুষ, প্রধানত ভারতের ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রীবৃদ্ধিতে কতখানি তৎপর ছিলেন, তার পরিচয় আমরা নেব তাঁর জীবনী অনুসারে। সারাজীবন ত্রৈলোক্যনাথ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের ভেষজ শিল্পের বাজার তৈরি করতে নিজের জীবন নিয়োগ করেছেন। দেশে এবং বিদেশে সাফল্য লাভ করেছেন। সেই সাফল্যের কথা একটু বিস্তৃতভাবে তাঁর জীবনী অনুসারে তুলে ধরি:

‘১৮৭০ সালের মে মাসে হণ্টার সাহেবের আফিসে কর্ম করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। হণ্টার সাহেব ও তাঁহার মেম আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহ করিতেন। আমি ঠিক তাঁহাদের ঘরের লোকের মত ছিলাম। তাঁহারা আমার কত আবদার, কত উপদ্রব যে সহ্য করিয়াছেন। তাহা বলিতে পারি না। ১৮৭৫ সালে হণ্টার সাহেব বিলাত গেলেন। তিনি আমাকে বিলাত যাইতে অনুরোধ করিলেন। আত্মীয় স্বজনের মত না হওয়ায় আমি সে বার বিলাত যাইতে পারিলাম না। যদি যাইতাম, তাহা হইলে বোধ হয় ভাল হইত।

ইংলিশম্যান আফিসে সন্ডার্স ও বার্কেলে সাহেব আমাকে লইবার জন্য উৎসুক ছিলেন। সদাশয় হণ্টৈর সাহেবও আমাকে ডেপুটী মাজিষ্ট্রেটী দিবার চেষ্টা করেন। এই সময় উত্তর-পশ্চিমে কৃষি বাণিজ্য অফিস হইতেছিল। পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞানুসারে দরিদ্রের দুঃখমোচনে সমর্থ হইব, এই উদ্দেশ্যে অন্যান্য আশা ছাড়িয়া দিয়া, এখানে হেডক্লার্কের পদ গ্রহণ করি। সার এডওয়ার্ড বক্ এই আফিসের কর্তা। পৃথিবীতে তাঁহা অপেক্ষা সুহৃৎ আমার আর নাই। সৌভাগ্যক্রমে আমি যে দুই তিন ইংরেজের কাছে কাজ করিয়াছি, তাহারা সকলেই উদারচরিত্র। বক্ সাহেবের আফিসে থাকিতে আমি দেশের উপকারের নিমিত্ত নানরূপ কার্য্য করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম। একটি দৃষ্টান্ত দিই;–

উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বহুকাল হইতে নানারূপ কারুকার্য্য গঠিত হইত। যথা-কাশীর রেশমের কাপড়, গোটা পিত্তলের কাজ ইত্যাদি; লক্ষ্মৌয়ের– গোটা, চিকণ, সূচের কর্ম্ম, সোনারূপার কাজ, বিদরীর কাজ; মুরদাবাদের পিত্তলের উপর মিয়া কলম; নগীনার কাঠের কাজ ইত্যাদি। হিন্দু-রাজাদের সময়ে এবং মুসলমানদের আমলে বাদশাহ, নবাব, আমীর, ওমরাও এই সকল দ্রব্যের আদর করিতেন। ইংরেজের অধিকারে এই সকল শিল্প কারুকার্য্য লোপ পাইতে বসিয়াছিল। দেখিলাম, ইংরেজ কর্মচারিগণ এই সকল দ্রব্য ভালবাসেন; কিন্তু কোথায় পাওয়া যায়, ও কিরূপে পাওয়া যায় তাহা জানেন না। এদিকে খরিদদার অভাবে কারিকরগণ অতিশয় অন্নকষ্ট পাইতেছিল। শিল্পকাজ ছাড়িয়া ভিক্ষা কিংবা কৃষিকার্য্যে অগ্রসর হইতেছিল। এই কারিকরদিগের ঘোরতর অন্নকষ্ট দূর করিবার নিমিত্ত বক্ সাহেবের নিকট অনুরোধ করিলাম। বক্ সাহেব গবর্ণমেন্টের নিকট হইতে পাঁচ সহস্র টাকা ঋণ গ্রহণ করেন, ইহার দ্বারা অতি উৎকৃষ্ট শিল্পদ্রব্য ক্রয় করিয়া এলাহাবাদ ষ্টেশনের নিকট একটি বড় হোটেলে রাখিয়া দিলাম। আমি নিজে হোটেল-স্বামী সাহেবের সহিত সদ্ভাব করিয়া তাঁহাকে এই সকল জিনিস বিক্রয় করিতে অনুরোধ করি। এই হোটেলে বিলাতযাত্রী সাহেব-মেমগণ দুই এক দিন অবস্থিতি করিতেন। দেশে বন্ধুবান্ধবগণকে উপহার দিবার নিমিত্ত সাহেববিবিরা এই সকল দ্রব্য অতি আগ্রহের সহিত কিনিতে লাগিলেন। হোটেল-স্বামী একজন ধনবান্ লোক। তাঁহার চক্ষু ফুটিল, গবর্ণমেন্টের পাঁচ হাজার টাকা ফিরাইয়া দিয়া, তিনি নিজে অনেক দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় করিতে লাগিলেন।’

স্থানীয় উদ্যোগে ত্রৈলোক্যনাথের পোড়ো বাড়িতেই ‘বিশ্বকোষ ভবন’ ফলক

ত্রৈলোক্যনাথ হয়তো আরও বড় চাকরি করতে পারতেন। কিন্তু বাংলা ভাষা এবং বাঙালি কর্মচারীদের পাশে থাকার জন্য তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ভালো কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় বিপন্ন হতে হয়েছে। তবু তাঁর দূরদর্শিতার অভাব হয়নি। ১৮৭৭ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দুর্ভিক্ষ হয়। ত্রৈলোক্যনাথ জানতে পারেন গাজরের চাষ করে এবং গাজর খেয়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত নরনারীগণ প্রাণ বাঁচতে পারেন। এরপর তিনি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কোনও কোনও গ্রাম ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের নানা তথ্য নেন। দুর্ভিক্ষের সময়ে গাজর যে উপকারী সামগ্রী, তা গভর্নমেন্টকে তিনি জানান। গভর্নমেন্ট তা গেজেটে ছাপায় এবং যথারীতি উদ্যোগ নেয়।

ভারতে দুর্ভিক্ষের ছবি। ১৮৭৬-’৭৭

দুই বছর পর রায়বেরেলি সুলতানপুর প্রভৃতি জেলায় দুর্ভিক্ষের সূচনা হয়। সে সময় হাজার লোক দুর্ভিক্ষের সময় প্রাণে বেঁচে ছিল তাঁরই উদ্যোগে। একজন কর্মবীর হিসেবে এ বড় কম কথা নয়। এরপর নানাভাবে তাঁর দিন কেটেছে। ১৮৮২ সালে তিনি সরকারের রাজস্ব বিভাগে চাকরি করেন। এখানেও তিনি ভারতের শিল্পকার্যের যাতে উন্নতি হয়, তার চেষ্টা করতে লাগলেন এবং অনেকখানি সফল হলেন। ১৮৮২ সালে হল্যান্ডের আমস্টার্ডাম শহরে যে মহামেলা হয়, ত্রৈলোক্যনাথ তার ভার পান। সরকার তাঁকে ওই মেলায় যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের মত না-থাকায় তিনি কালাপানি পেরতে পারলেন না। এরপর ১৮৮৩ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে কিছু কিছু বিভাগের অধ্যক্ষভার তাঁর প্রতি দেওয়া হয় এবং তিনি বিচারকের পদেও ছিলেন। এর কিছুদিন পর বিলেতে আবার প্রদর্শনী হয় এবার আর আত্মীয়স্বজনের জারিজুরি খাটল না। তিনি বিলেতে গেলেন। সেকথা নিজে লিখেছেন ত্রৈলোক্যনাথ:

‌‘১৮৮৬ সালের বিলাতের প্রদর্শনী কার্য্য আরম্ভ হয়। এইবার ত্রৈলোক্য বাবুকে বাধ্য হইয়া বিলাত যাইতে হইল। দেশের বহু উপকারের সম্ভাবনায় তিনি গেলেন। বিলাতে ইতর ভদ্র সকলেই তাঁহাকে সমাদর করিয়াছিল। স্বয়ং মহারাণী ও রাজপুত্রগণ এবং রাজ-পরিবারস্থ ব্যক্তিবর্গ তাহার প্রতি অনেক অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। লর্ড প্রভৃতি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণও তাঁহাকে অনেক আদর করিয়াছিলেন। বিলাত গমনকালে কয়েকজন উদার-হৃদয় সন্ন্যাসী সাধুর নিকট তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিলেন যে, বিলাত গিয়া নিজের স্বার্থের দিকে তিনি একবারে দৃষ্টি রাখিবেন না। বিলাতের কোন কোন বড় লোক তাঁহাকে উচ্চ পদ পাইবার নিমিত্ত ভারতের গভর্ণর জেনারলের নিকট চিঠী দিবার নিমিত্ত ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন, কিন্তু তিনি তাহা লইলেন না। এ যাত্রায় বিলাতে তিনি দশমাস কাল অবস্থান করেন।’

১৮৮৬ সালে রাজস্ব বিভাগের কাজ ছেড়ে তিনি জাদুঘরে চাকরি গ্রহণ করেন এবং শারীরিক অসুস্থতার জন্য ১৮৯৬ সালে অবসর নেন। একদিন তিনি এবং তার অগ্রজ রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় বিশ্বকোষ রচনায় নিযুক্ত হয়েছিলেন। বিশ্বকোষের অনেকখানি অংশ ত্রৈলোক্যনাথের রচনা। আগেই বলেছি তিনি ছিলেন বহু ভাষায় দক্ষ। ইংরেজি, বাংলা ছাড়াও উড়িয়া, হিন্দি,পারসি, উর্দু, সংস্কৃত– সকলই জানতেন। সাহিত্যের পাশাপাশি ভূতত্ত্ব, রসায়ন, জীবতত্ত্ব, নরতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব প্রভৃতি নানাবিধ বিজ্ঞানে তাঁর অধিকার ছিল। রুগ্ন অবস্থায় ‘ওয়েলথ অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি ইংরেজি মাসিকের সম্পাদনা কার্যেও তিনি নিযুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞানবোধ নামে একটি উৎকৃষ্ট স্কুলপাঠ্য গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন। যাঁর কর্ম এতখানি বিস্তৃত তার সাহিত্যজীবন খুব বেশি বিস্তৃত হওয়ার অবকাশ নেই। তবুও ত্রৈলোক্যনাথ বাংলা এবং ইংরেজি গ্রন্থে যে সাহিত্য সামগ্রী আমাদের দিলেন তা অবিস্মরণীয়, তুলনারহিত।

শুধুমাত্র বিস্মৃতির গৌরব দিয়ে ত্রৈলোক্যনাথকে মাপতে চাইছি, তা অবশ্য নয়। বরং বলতে চাইছি তাঁর অতুলনীয় সাহিত্যকীর্তির কথা। সাহিত্যে বিস্মৃতি সবসময় অমূলক নয়। কিন্তু ত্রৈলোক্যনাথের ক্ষেত্রে বিস্মৃতি এক ধরনের জাতীয় অপরাধ। তাঁর আশ্চর্য ভাষা ও সাহিত্যবোধ কোনও উত্তরাধিকারী রেখে যায়নি। হয়তো তা সম্ভব ছিল না। তবুও ঔপনিবেশিক যুগে ত্রৈলোক্যনাথ কীভাবে এমন দেশীয় ভাষার সন্ধান পেলেন এবং তাকে আশ্চর্য উপায়ে সজীব করে তুললেন, তা আজ গবেষণার বিষয়। শুধু ভূতপ্রেত, রম্যতা দিয়ে নয়, ত্রৈলোক্যনাথ সামাজিক জীবনকেও নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। দু’টি ক্ষেত্রেই তাঁর সমান অধিকার। দু’টি ক্ষেত্রেই তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। ভাবতে অবাক লাগে বঙ্কিম উত্তরাধিকার পেয়েও কেমন হেলায় তাকে পাশ কাটিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ বেছে নিলেন রূপকথার জগৎটিকে। চণ্ডীমণ্ডপের আড্ডার মৌতাতকে করে তুললেন সাবলীল। সেখানে বিশ্বাস অচল। অবিশ্বাসের জায়গা নেই। কার্যকারণ কোনওভাবেই মাথাচাড়া দেয় না। শুধু পাঠক বোঝেন, তিনি এমন এক স্রোতে ভেসে গিয়েছেন যেখানে উদ্ভটই আশ্চর্য বাস্তবতা। যা হয়নি তার অনেকরকম সম্ভাবনা ঘিরে আছে এসব রচনায়। তাকে কল্পদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করা যায়, কিন্তু বাস্তব দৃষ্টিতে এড়ানো যায় না। এখানে ত্রৈলোক্যনাথ শুধুমাত্র একজন কথক ঠাকুর। অমঙ্গলের ভার তাঁর হাতে নেই। শাস্তির ভাবনাটি অপ্রয়োজনীয়। বরং নির্মম এক উপহাস কোনও বক্তব্য ভার না-রেখেই এগিয়ে চলে। এইসব রচনায় ত্রৈলোক্যনাথ প্রতারণার প্রশ্নে নির্মম অথচ উদাসীন, অনিবার্য অথচ বক্তব্যভারে আক্রান্ত নয়। তাই বিদ্যেধরি, নয়নচাঁদ, ছকু, ডমরুধর নানা প্রতারণার পরেও বেঁচেবর্তে থাকে। তার কারণ এসব কেবলই এক নির্দোষ বাঙালির লক্ষণ। সামন্ততন্ত্র আর উপনিবেশের প্রত্যক্ষ বিরোধ। এখানে সে অসহায়, নিরুপায়, কিন্তু হননপ্রত্যাশী নয়। তাই ত্রৈলোক্যনাথ যথোচিত শাস্তির ভাবনাটিকে এড়িয়ে চলেন। তার কোনও প্রয়োজন অনুভব করেন না। এমনকী, পাঠকও চান তাঁরা তাঁদের ছোটখাটো আত্মপ্রতারণা সমেত বেঁচে-বর্তে থাকুক। যদি একান্তই বাস্তবের কোনও চাহিদা এসে পড়ে তখন একটান গাঁজার মৌতাত সমস্ত কিছুকে নস্যাৎ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। ত্রৈলোক্যনাথ তা জানতেন। তাই ভূত এবং গ্রাম্য মানুষ তারা তাদের নীচতা এবং ভালোমানুষি নিয়ে পাশাপাশি বাস করে। বাস্তব আর কল্পনাকে এমনভাবে ঘষে দেয় যেন তৃতীয় এক পরিসর তৈরি হয় মাঝখানে। সেই পরিসরটি ত্রৈলোক্যনাথের একার জগৎ। সেখানে কোনও পূর্বসূরি নেই, উত্তরসূরির পক্ষে প্রবেশ দুঃসাধ্য!

আর সব ছেড়ে দিলেও তিনটি গ্রন্থের জন্য ত্রৈলোক্যনাথ বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিন স্মরণযোগ্য হয়ে থাকবেন। ‘কঙ্কাবতী’ (১৮৯২), ‘ভূত ও মানুষ’ ( ১৮৯৬), ‘ডমরু-চরিত’ (১৯২৩)। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ ‘ফোকলা দিগম্বর’ (১৯০১), ‘মুক্তা- মালা’ (১৯০২ ), ‘ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা’ (১৯০৩ ) ‘ময়না কোথায়!’ (১৯০৪), ‘মজার গল্প’ ( ১৯০৬), ‘পাপের পরিণাম’ ( ১৯০৮) ইত্যাদি। তাছাড়া অগ্রজ রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় প্রণীত বিশ্বকোষ গ্রন্থের বেশ কিছুটা অংশ তাঁর রচনা। এর বাইরে তিনি লিখেছেন বিজ্ঞানবোধ, নীতিশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা প্রভৃতি কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক। ইংরেজি ভাষায় ত্রৈলোক্যনাথ অত্যন্ত দক্ষ লেখক ছিলেন। জীবৎকালে তিনি পাঁচটি ইংরেজি গ্রন্থ রচনা করেন। এবং আশ্চর্যের বিষয় সবই তাঁর জীবনের প্রথমার্ধে, উনিশ শতকে। এর মধ্যে তাঁর যে গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয় তাঁর নাম ‘এ ভিজিট টু ইউরোপ’ ( ১৮৮৯)। বাকি গ্রন্থগুলি প্রধানত স্বদেশের শিল্পভাবনার সঙ্গে জড়িত এবং এই গ্রন্থগুলি কর্মদ্যোগী ত্রৈলোক্যনাথের শিল্প উদ্যোগের ফসল। এখানে আরেকটি কথা বলা যায়, তাঁর গোটা জীবন নানা কর্মদক্ষতায় এবং সাহিত্য সৃষ্টিতে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র সাহিত্য রচনা করেই তিনি নিজের দায় সারেননি। পরাধীন ভারতবর্ষের দুঃস্থ দরিদ্র মানুষের কীসে মঙ্গল হয়, কীভাবে ভারতবর্ষের অর্থনীতি ক্ষুদ্র শিল্পের মাধ্যমে সমৃদ্ধির দিকে এগতে পারে, সে বিষয়ে সারাজীবন তিনি সজাগ ছিলেন। এই কাজটি তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতা সূত্রে হাতে-কলমে করে দেখিয়েছেন। কলকাতা মিউজিয়ামে কর্মরত অবস্থায় সরকারের অনুরোধে তিনি ‘আর্ট ম্যানুফ্যাকচারস অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি বৃহৎ গ্রন্থ রচনা করেন। কলকাতা, বোম্বাই প্রভৃতি বড় বড় নগরে, এমনকী, বড় বড় রেল স্টেশনে ভারতীয় কারুকার্যের যেসব দোকান দেখতে পাওয়া যায় ত্রৈলোকনাথের উদ্যোগেই তার শুভ সূচনা হয়। কী সাহিত্যে, কী জীবনে, ত্রৈলোক্যনাথের মতো বাঙালি সাধক পুরুষ বিরল দৃষ্টান্ত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

বাংলা সাহিত্যে ‘নয়নচাঁদের ব্যবসা’ গল্পের বিকল্প নেই। শুধু এই একটি গল্পের জন্যই ত্রৈলোক্যনাথ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারেন। এই গল্পটিতে রয়েছে ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি কটাক্ষপাত অথচ কোথাও সমালোচনার চিহ্নটি নেই। মৃদু হাস্যে পরিস্থিতির ওপর থেকে চোখ বুলিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ সরে যাচ্ছেন। তাই রাজশেখর বসুর ‘বিরিঞ্চিবাবা’র চেয়ে এর জাত আলাদা। ত্রৈলোক্যনাথ জানতেন, আমাদের দেশে দেবতাদেরও কেরিয়ার আছে। তাই মাঝে মাঝে বিভিন্ন দেব-দেবী জাগ্রত হয়ে ওঠেন। আজ বাঙালির ঘরে ঘরে হনুমান পুজাের হিড়িক। ত্রৈলোক্যনাথ যে শ্যামনগরে জন্মেছিলেন সেখানে জাগ্রত দেবী মূলাজোড়ের ব্রহ্মময়ী কালীর মাহাত্ম্য ইদানীং কমে পার্শ্ববর্তী নৈহাটিতে বড়মার চরণে নিবেদিত। সেই ধর্মব্যবসাটি ত্রৈলোক্যনাথ অবশ্য দেখে যেতে পারলেন না। কিন্তু যুগে যুগে তার সম্ভাবনার হিড়িকটি স্নিগ্ধ পরিহাসে চিহ্নিত করে দিয়ে গেলেন। আবার ‘কঙ্কাবতী’ উপন্যাসে কঙ্কাবতীকে উদ্ধারের জন্য মশাদের যে বক্তৃতা, সেখানে পরাধীন ভারতবর্ষের বেদনা চিত্রিত করে দেন তিনি, যা আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। এখানে ‘বাঙ্গাল নিধিরাম’ গল্পটির কথা বলতে চাই। নিধিরাম প্রতারিত হয়েছে রূপসী হিরন্ময়ীর কাছে। তার মৃত্যুর সময়ে যখন স্বামীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে হিরণ্ময়ী, তখন সেই কটাক্ষপাত: ‘বাঙ্গাল কি করিতেছে দেখ! আবার ঠাট করিয়া বাবার কোলে শোওয়া হইয়াছে।’ আমাদের মনে আছে। আশ্চর্য যে, এই গল্পটির আরেকটি অংশ লিখেছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ ‘জন্মভূমি’ পত্রিকায় ‘রূপসী হিরণ্ময়ী’ নামে।সেখানে হিরণ্ময়ীর যথোচিত শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। গল্পটি তাঁর কোনও গ্রন্থে নেই। এই একবারই ত্রৈলোক্যনাথ শাস্তির প্রশ্নে নীতিবাদী বঙ্কিমের পথ অনুসরণ করেছেন।

‘ডমরুচরিত’ ত্রৈলোক্যনাথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ডমরুচরিত আসলে বাঙালির আত্মদর্পণ। ত্রৈলোক্যনাথ যে কত বড় জীবনরসিক ছিলেন এবং সামাজিক সমস্ত বিষয়ে তাঁর যে গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছিল, তার প্রমাণ ডমরুচরিত। আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের প্রথমভাগ বাঙালি জীবন এত তাৎপর্যপূর্ণভাবে আর কোনও গ্রন্থকার দেখিয়েছেন কি না সন্দেহ এবং তা কিশোর পাঠের ছদ্মবেশে। তাঁর তির্যক দৃষ্টিভঙ্গি, মনুষ্যত্বের পাঠ মনোবিশ্লেষণের আপাতজটিল বিন্যাস এবং সামাজিক জীবনের প্রতি পরিহাসময় ব্যঙ্গের এক দলিল ডমরুচরিত। এই গ্রন্থে ত্রৈলোক্যনাথ বাঙালির মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন। বাঙালির মনকে তার অন্ধকার এবং আলোকে চিহ্নিত করেছেন। বিজ্ঞানের উপরি ধারণা নিয়ে সেখানে আজগুবি গল্প আর উদ্ভটের কারবার এবং ‘বিশ্বাস’ শব্দটির প্রবেশ নিষিদ্ধ। যুক্তির কাঠামোটি স্নিগ্ধ হাসিতে ভেঙে পড়ে। যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে যায় ডমরুধর। এমন একটি চরিত্রের প্রয়োজন ছিল উনিশ শতকে কিংবা বিশ শতকের শুরুতে শুধুমাত্র বাঙালির সমাজ ও মনকে বোঝার জন্য। ইংরেজের কলের বরফ খাওয়ার জন্য সমাজচ্যুত হওয়ার সামন্ত্রতান্ত্রিক অবস্থানের পাশাপাশি স্বদেশি যুগের ভণ্ডামি, স্বদেশের নামে বাক্যবিন্যাসের বিলাস, সেই ধূর্ত ছদ্মবেশকে চিহ্নিত করতে ভোলেননি ত্রৈলোক্যনাথ। ডমরুধরের কিছু টাকাপয়সা হয়েছে। সে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর পঞ্চমীর দিন ঠাকুরের দালানে বসে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মৌতাত জমায়। আজগুবি গল্পে ভরে তোলে আসর। তার বর্ণনা দিয়েছেন ত্রৈলোক্যনাথ:

‘‘গত তিন বৎসর যাঁহারা পূজার ‘বঙ্গবাসী’ পাঠ করিয়াছেন, ডমরুধর তাঁহাদের নিকট অপরিচিত নহেন। ডমরুধরের বাস কলিকাতার দক্ষিণ, যে স্থানে অনেক কাটিগঙ্গা আছে। প্রথম অবস্থায় ইনি দরিদ্র ছিলেন। নানা উপায় অবলম্বন করিয়া এক্ষণে ধনবান্ হইয়াছেন। এলোকেশী ইঁহার তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী। ডমরুধর বৃদ্ধ, সুপুরুষ নহেন। তথাপি এলোকেশীর সর্ব্বদাই সন্দেহ। গত বৎসর দুর্লভী বাগ্দিনী ডমরুধরকে ঝাঁটাপেটা করিয়াছিল। সেই উপলক্ষে এলোকেশীও তাঁহাকে উত্তম মধ্যম দিয়াছিলেন। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে ডমরুধর সন্ন্যাসী-বিভ্রাটে পড়িয়াছিলেন। সেই অবধি ইনি দুর্গোৎসব করেন। সুন্দরবনে ডমরুধরের আবাদ আছে। প্রজাদিগের নিকট হইতে চাউল, ঘৃত, মধু, মৎস্য প্রভৃতি আদায় করেন। প্রতিমাটী গড়া হয়, কিন্তু পূজার উপকরণ, প্রায় সমস্তই কাটিগঙ্গার জল। আজ পূজার পঞ্চমীর দিন, দালানে প্রতিমার পার্শ্বে বন্ধুগণের সহিত বসিয়া ডমরুধর গল্পগাছা করিতেছেন।’’

যে কথা বলছিলাম, বাঙালি মন ও তার স্বভাব সম্পর্কে এমন গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দুর্লভ। সেখানে ব্যঙ্গের ভার নেই, সমালোচনার দৃষ্টি নেই, শুধু স্মিত হাস্যে চোখ বুলিয়ে চলে যাওয়া এবং পাঠকের হৃদয়ে অঙ্কিত করে দেওয়া গভীর এক চিন্তার বীজ– যাকে চেনা তত সহজ নয়। ডমরুধর একবার এক সন্ন্যাসীর পাল্লায় পড়েছিলেন। তারপর কী হল একটু বর্ণনা দেওয়া যাক:

‘কোন দিন চারি টাকা, কোন দিন পাঁচ টাকা আমার লাভ হইতে লাগিল। সন্ন্যাসীর প্রতি আমার প্রগাঢ় ভক্তি হইল। যাহাতে তাহার পসার প্রতিপত্তি আরও বৃদ্ধি হয়, দেশের যত উজবুক যাহাতে তাহার গোঁড়াভক্ত হয়, সে জন্য আমি চেষ্টা করিতে লাগিলাম। মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম যে, দুগ্ধবতী গাভীর ন্যায় সন্ন্যাসীটাকে আমি পুষিয়া রাখিব। কিন্তু একটা হুজুগ লইয়া বাঙ্গালী অধিক দিক থাকিতে পারে না। হুজুগ একটু পুরাতন হইলেই বাঙ্গালী পুনরায় নূতন হুজুগের সৃষ্টি করে। অথবা এই বঙ্গভূমির মাটির গুণে আপনা হইতেই নূতন হুজুগের উৎপত্তি হয়।’

আজগুবি গল্প আমরা অনেক পড়েছি কিন্তু এমন বিশ্বাসযোগ্য মৌলিক আজগুবি গল্প বাংলা সাহিত্যে আর দ্বিতীয় নেই। এমন উদ্ভট রচনায় ত্রৈলোক্যনাথ একক কৃতিত্ব স্থাপন করেছেন। কল্পনা শক্তি যে এত ঊর্বর হতে পারে, বিজ্ঞানমনস্ক, এমন তীব্র সম্ভাবনাময়, তা ত্রৈলোক্যনাথ না-থাকলে আমরা টের পেতাম না।

‘‘লম্বোদর বলিলেন, ‘মশার শুঁড় পচিয়া জোঁক হইতে পারে না!’’’
শঙ্কর ঘোষ বলিলেন, ‘কেন হইবে না? স্বেদ হইতে স্বেদজ জীব হয়। বাদা বনের পাতা পচিয়া চিংড়ি মাছ হয়। কোনো বি-এ অথবা এম-এ অথবা কি একটা পাশ করা লোক কৃষিকার্য্য সম্বন্ধে একখানা বাঙ্গালা স্কুলপাঠ্য পুস্তক লিখিয়াছিলেন। পুদিনা গাছ সম্বন্ধে তাহাতে তিনি এরূপ লিখিয়াছিলেন, এক খণ্ড দড়িতে গুড় মাখাইয়া বাহিরে বাঁধিয়া দিবে। গুড়ের লোভে তাহাতে মাছি বসিয়া মল ত্যাগ করিবে। মাছির মল মূত্রে দড়িটী যখন পূর্ণ হইবে, তখন সেই দড়ি রোপণ করিবে। তাহা হইতে পুদিনা গাছ উৎপন্ন হইবে। মক্ষিকার বিষ্ঠায় যদি পুদিনা গাছ হইতে পারে, তাহা হইলে মশার শুঁড় হইতে জোঁক হইবে না কেন?’

ত্রৈলোক্যনাথের গল্প বৈঠকখানাজাত, কিন্তু ‘বৈঠকি গল্প’ বলতে যা বোঝায়, তার সঙ্গে এর মিল নেই। বৈঠকি গল্প নেহাতই আধুনিক ব্যাপার। বরং বৈঠকখানায় বসেও ত্রৈলোক্যনাথের গল্পের ধাঁচ পাড়াগাঁর চণ্ডীমণ্ডপের। তার জগৎ সামন্ততান্ত্রিক যুগের। সদ্য উপনিবেশিক সত্তা তার ধর্মে প্রবেশ করেছে, কিন্তু মর্মে প্রবেশ করেনি। ফলত সেই গ্রামসমাজ স্বাধীন এবং স্বনির্ভর অর্থনীতির জীবন কাটাচ্ছে। ঔপনিবেশিক যুগের ভেতরেই প্রাক-ঔপনিবেশিক চরিত্র তার। ফলত গুলিখোর বা গাঁজাখোরের গল্পের অবিশ্বাস্য অলৌকিকতা তার চাই। সেখানে ‘অবিশ্বাস’ শব্দটির কোনও স্থান নেই। তাই একজন লোকের জীবিকা ভূমিকম্প বিক্রয় করা জেনে আমাদের আহ্লাদই হয়। আসলে পাড়াগাঁর নিস্তরঙ্গ জীবন থেকে আধুনিক যুগাকাঙ্ক্ষায় প্রবেশের এক কাল্পনিক প্রবেশদ্বার এই গাঁজাখুরি গল্পগুলি। তার যাবতীয় নিস্তরঙ্গ জীবন প্রতিমুহূর্তে অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে কখনও কখনও ভয় পেয়েছে। কিন্তু কল্পনার স্বাধীন ডানাটিতে তাকে বসাতে তাঁর দ্বিধা নেই। তার সঙ্গে ইতিহাসের যোগ নেই, বরং যোগ আছে অবিশ্বাস্য আজগুবি কাহিনির বিশ্বাসযোগ্য পরম্পরার। গল্পের ধরন রূপকথার, তার ভেতরে ঢুকে থাকে লোককথা কিন্তু তার নিষ্ঠুরতার কাহিনিটি আধুনিক যুগের। তাদের শঠতা বা মনস্তত্ত্ব আধুনিক যুগের ভগ্ন বাক্যের জটিলতায় আক্রান্ত। সমাজকে ধাক্কা মারার জন্য আজগুবি গল্প আসলে তাঁর ছদ্মবেশ। ঘটনার ঘনঘটায় ত্রৈলোক্যনাথ শেষ পর্যন্ত কোথাও দাঁড়ান না। তাঁর রচনার পরপর দু’টি বাক্যের মধ্যে কখনও এক বছর কখনও এক যুগের ব্যবধান। রুদ্ধশ্বাস গতিতে কাহিনি এগিয়ে চলেছে। তবুও কখনও কখনও কঙ্কাবতী বা ফোকলা দিগম্বরের কুসীর সৌন্দর্য বিচারে তিনি যে অভাবনীয় বঙ্কিমি সৌন্দর্যের অবতারণা করেছেন, তা আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তবু আমাদের মননের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বিস্মৃত রইলেন। তাঁর বসতবাড়ি সরকারি উদ্যোগ এড়িয়ে পোড়ো বাড়িতে পরিণত হল। আজ সেই ভগ্নস্তূপে ডমরুধর বসার জায়গা পায় না। অথচ তার জন্য কোনও দুঃখবোধ এখন আর অবশিষ্ট নেই বাঙালি জীবনে।