Robbar

অনেকে বলেছিল, এইরকম নাম রাখলে সিনেমা চলবে না!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 23, 2026 3:54 pm
  • Updated:July 23, 2026 4:46 pm  

নামকরণটা পুরোপুরি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের সূত্র ধরেই নিয়েছি। যদিও, এখানকার অনেকে আমাকে বলেছিল এরকম নাম রাখলে সিনেমা চলবে না। কিন্তু, আমি অটল ছিলাম এই নামটাই রাখব! দর্শক যাতে প্রথমেই বুঝতে পারে যে, এটা প্রচলিত ধাঁচের সিনেমা নয়! একটা জায়গায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আরেকটা গান ব্যবহার করেছি, ‘সোনা বন্ধুরে, আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি…’। আমার তরুণ বয়সে ওঁর সঙ্গে কাটানো কয়েকদিনের স্মৃতি থেকে ওঁর প্রতি শ্রদ্ধা বা ট্রিবিউট দিয়েছি।

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

ছোটবেলাটা কেমন কেটেছিল, কাইয়ুম সাব?

বাবা সরকারি চাকরি করতেন; মাঝেমাঝেই তাঁর পোস্টিং বদলি হত। ফলে, আমাকেও কিছুদিন পরপর নানা শহরে কাটাতে হয়েছে। তাই বাংলাদেশের অনেক জায়গা দেখার সুযোগ পেয়েছি; চারটে স্কুলে পড়েছি। বেশ ভালো ছাত্র ছিলাম। অনেকে বলত, আমি খুব ওপরে উঠব; সেই ‘ওপর’ মানে স্বর্গ কি না, জানি না (হাসি)। 

হাইস্কুলে পড়ার সময় আরম্ভ হল মুক্তিযুদ্ধ, ’৭১ সালে। তখন আমরা পালিয়ে গ্রামে চলে যাই। তারপর অনেক ঘুরে ঘুরে ঢাকায় আসি। কলকাতা থেকে চালু হওয়া গোপন রেডিও-তে খবর শুনতাম। স্বাধীনতা পাওয়ার পর সাংঘাতিক অরাজকতা শুরু হয়েছিল। বাড়ির দরজায় দেখতাম, অভুক্ত মানুষরা ভাত চাইছে। এদিকে, আমরাও তখন কোনওরকমে একবেলা খেতে পাই। ওরা বলত, ‘একটু ফ্যান দ্যান!’ আমরা হয়তো সেই ফ্যানটুকু বাঁচিয়ে রেখেছি আরেকবেলায় খাব বলে। কৈশোরে দেখা সেই ছবি আমার মনোজগতে স্থায়ী দাগ ফেলেছে; সমাজ নিয়ে, ধর্ম নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষের পর বিপর্যস্ত বাংলাদেশ জনজীবন

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হই। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে বামপন্থার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্রের আশ্রয় নিয়েছি। তখন নাটকের গ্রুপ তৈরি করে নাটক লিখেছি, পরিচালনা করেছি। ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনেক ক্লাসিক সিনেমা দেখেছি, দেখিয়েছি। সেই সময় বিদেশি সিনেমা এখনকার মতো সহজলভ্য ছিল না। সেগুলো জোগাড় করতে সোভিয়েত দূতাবাস, ব্রিটিশ কাউন্সিল, জার্মান কালচারাল সেন্টার– এসব জায়গায় গিয়েছি। 

কোন কোন বই বা সিনেমা আপনার ওপর প্রভাব ফেলেছে?

ছোটবেলায় বইপত্র পড়তাম বটে, যদিও তখন তেমন সচেতনভাবে কোনও প্রভাব তৈরি হয়নি। তরুণ বয়সে সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল। সেই প্রথম অনুভব করেছিলাম, ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজের কী শক্তি! তবে, তখন কেবল দর্শক হিসেবে চর্চা করা বা বোঝার চেষ্টা করার ভিতরেই ছিলাম। নিজে সিনেমা বানানোর ব্যাপারে সেই সময়ে ভাবিনি।

সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’-এর দৃশ্য

সিনেমা বানানোর টেকনিক্যাল দিকগুলো কখন থেকে শেখা শুরু করলেন?

তখন টেকনিক্যাল দিকগুলো শেখার সুযোগ আমাদের কাছে ছিল না। বাংলাদেশ সরকারের ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন ছিল, তবে ছয়-সাতের দশকে মোটামুটি সবই ছিল কলকাতার প্রভাবে বানানো কমার্শিয়াল, সামাজিক সিনেমা। তারপরের সিনেমায় এল বম্বের প্রভাব। আমার ধারণা, আটের দশকের আগে এ-দেশে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ সিনেমা সেই অর্থে ছিল না। 

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের কাছে গিয়ে বললাম, আপনার কাছ থেকে কাজ শিখতে চাই। প্রায় বছর দেড়েক ওঁর সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছিলাম। তখন এখানে ঠিকঠাক মেশিনপত্র ছিল না; ল্যাবের অবস্থা ছিল মারাত্মক খারাপ। ল্যাব থেকে এমন ছবি বেরত, যেগুলো দেখতে আবছা, রং উল্টোপাল্টা। তবু, সেসবের মধ্যেই ফিল্মমেকিংয়ের পদ্ধতিটা মোটামুটি শিখেছিলাম।

বাংলাদেশের চিত্রপরিচালক মুহাম্মদ কাইয়ুম

এসবের পর, নয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হল; এখানের বামপন্থী সংগঠনগুলোতে বিষাদের ছায়া নেমে এল; সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগুলো প্রায় ভেঙে গেল। ততদিনে আমি পেশাগত কাজেও জড়িয়ে পড়েছি। কিন্তু, কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে নানা জায়গায় ঘুরতে চলে যেতাম। সেইভাবেই একবার হাওর অঞ্চলে পৌঁছেছিলাম। প্রায় পাঁচটা জেলার বিস্তীর্ণ হাওরে বারবার গিয়েছি। তবে, প্রথমদিকে সিনেমা বানানোর কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে যাইনি। যদিও অবচেতনে বরাবর একটা চিন্তা ছিল যে, আমার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের লোকজীবন বা লোকসংস্কৃতির কথাই তুলে ধরব।

‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’-র পোস্টারে ক্যাচলাইন ছিল– ‘ভাটির দেশের মাটির ছবি’। ‘হাওর’ আর ‘ভাটি’– দুটো কি একই, না কোনও তফাত আছে?

হাওর অঞ্চলকেই ভাটি-ও বলে। মেঘালয় আর অসমের পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি নেমে এসে গর্তের মতো যে জায়গাটায় থেমে যায়, সেটাকেই ভাটি বলে। ওই জায়গাটা বাটির মতো, পানি একবার ঢুকলে আর বেরতে পারে না। রোদের তাপে বাষ্প না হওয়া পর্যন্ত আর মাটি শুষে না নেওয়া পর্যন্ত জায়গাটা শুকোয় না। টানা কয়েক মাস মাইলের পর মাইল পানি থইথই করে।

‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’র দৃশ্য

‘হাওর’ শব্দটা কি ‘সাগর’-এর অপভ্রংশ?

হ্যাঁ, অনেকেই ‘স’-কে ‘হ’ বলে। সেই উচ্চারণের কারণে ‘সাগর’ থেকে ‘সায়র’, তারপর হয়েছে ‘হাওর’। ওই এলাকার মানুষরা কিন্তু ‘হাওর’-ও বলে না; ওরা বলে ‘আওর’। 

সিনেমাটা তৈরির প্রস্তুতিপর্ব কেমন ছিল?

কাহিনিটা মোটামুটি ভাবার পরেও অনেক বছর গুটিয়ে ছিলাম। চিন্তা ছিল, এই জিনিস বানানোর পয়সা কে দেবে! এর মাঝে যেটা হল, সিনেমা তৈরির উপায়টা সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল হয়ে যাওয়ার কারণে খরচ অনেকটা কমে গেল। ক্যামেরা বেশ সস্তা হল। এডিট করার পদ্ধতিটা সহজ হল। তবুও, কিছু তো টাকা লাগবে! একসময়ে হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। এসবের জন্য কে আমাকে টাকা দেবে! 

একদিন, ২০১৭ সালে ঢাকায় বসে টিভিতে দেখলাম, ভয়ংকর বন্যায় সম্পূর্ণ হাওর অঞ্চলের পাকা ধান রাতারাতি ভেসে গিয়েছে! খবরটা দেখার ক’দিনের মধ্যেই ওখানে গেলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানের মানুষের হাহাকার শুনে আমার ভিতরটা একেবারে তোলপাড় হয়ে গেল। স্থির করলাম, সিনেমাটা নিজেই বানাব! নিজের যা-কিছু সঞ্চয় ছিল, সেসব ভাঙালাম। আত্মীয়-বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু ধার করলাম।

বাজেট কম রাখার জন্য অপরিচিত বা কম-পরিচিত মুখ কাস্ট করলাম। টিমের সকলকে বললাম, বেশি পয়সা দিতে পারব না এবং সবাইকে কষ্ট করে কাজ করতে হবে। অবশ্য পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজটা কলকাতা থেকে করানোর কারণে বাজেট আরেকটু বাড়াতে হয়েছিল।

সিনেমার পর্দায় বাস্তবকে যেভাবে ধরেছেন পরিচালক কাইয়ুম

বাংলাদেশে কি পোস্ট-প্রোডাকশনের কোয়ালিটি ভালো নয়?

না, ভালো নয়, তা বলব না। এখন তো আরও ভালো হয়েছে। ব্যাপারটা কী, সেগুলো এখনকার প্রজন্মের কিছু নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক বা হাবের মধ্যে আছে। আর, আমি যেহেতু তাদের থেকে বয়স্ক, তাই আমার সঙ্গে কমিউনিকেশনের সমস্যা হয় একটু (হাসি)। 

যদিও আমি নিজে সিলেটি ভাষা জানি না, তবে সিলেটি জানা এক বন্ধু বলছিল যে, এই সিনেমার মুখ্য অভিনেতারা সিলেটের নয়, তাদের উচ্চারণে ত্রুটি আছে।

হ্যাঁ, ঠিকই। অভিনেতাদের কেউ বরিশালের, কেউ খুলনার, কেউ ঢাকার। আরেকটা বিষয় হল, লোকেশন হিসেবে যে অঞ্চলটা বেছেছিলাম, সেটা ময়মনসিংহের বর্ডার। আগে ওই জায়গাটা ছিল ঘন জঙ্গল; হিংস্র জন্তুদের বিচরণভূমি। জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে মানুষ ওখানে গিয়ে বন-জঙ্গল কেটে থাকতে শুরু করেছিল। ফলে, ওখানকার ভাষায় ময়মনসিংহের ছোঁয়া মিশে গিয়েছে।  

প্রথমদিকে অভিনেতাদের উচ্চারণ ঠিক করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু জানতাম ওটা একেবারে পারফেক্ট হবে না। তবে আমার বিশ্বাস, যে কনটেন্টটা বলতে চেয়েছি, সেটা বিশ্বজনীন; সেটা ভাষার জন্য হারিয়ে যাবে না।

যে লোকেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’

এত কম বাজেটে এত চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি কীভাবে করেছেন, একটু বলুন।

সিনেমাটা বানাব বলে নিজেই একটা সাধারণ ক্যামেরা কিনে নিয়েছিলাম। দুটো উদ্দেশ্য ছিল। এক, আমি জানতাম দীর্ঘ সময় ধরে শুটিং করতে হবে। যেমন, ঝড়ের একটা দৃশ্যের জন্য প্রায় দু’বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সুতরাং, ক্যামেরা ভাড়া করলে প্রচুর পয়সা লাগবে; সেটা কুলোতে পারব না। আর দুই, ভাড়ার ক্যামেরার ওপর নির্ভর করলে সবসময় একই ক্যামেরা পাব, তা নয়। ফলে, এডিটিংয়ের সময়ে ছবির কোয়ালিটি মিলবে না। 

আমাদের কাছে ক্যামেরার অ্যাক্সেসরিজ-ও তেমন কিছু ছিল না। আড়াই বছর ধরে পুরোটাই দিনের আলোয় আউটডোরে তোলা। হয়তো আরও ভালো ছবি হতে পারত। তবে, যা এসেছে, তাতে আমি সন্তুষ্ট। 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি সামলে, মাত্র একটা ক্যামেরা নিয়ে একেকটা দৃশ্য নানা দিক থেকে কীভাবে তুলেছেন?

বাজেট কম থাকার কারণে একটা ক্যামেরার বেশি নেওয়ার সাধ্য আমাদের ছিল না। তাছাড়া, ছবি তোলার আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ওই দুর্গম এলাকায় বয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। নৌকায় চড়া ছাড়াও অনেক জায়গায় হেঁটে গিয়ে শুটিং করতে হয়েছে। তাই, ট্র্যাক বা রেইল করা আর প্রধানত হ্যান্ডহেল্ড উপায়েই কাজ করতে হয়েছে। একেকটা দৃশ্যে ক্যামেরা হাতবদল করে করে শুটিং করতে হয়েছে; কিছু জায়গায় ইম্প্রোভাইজ করতে হয়েছে। যারা প্রশিক্ষিত অভিনেতা নয়, তাদের সেইভাবে বুঝিয়ে কাজ করতে হয়েছে।

কাহিনিতে দু’জন শিশু আছে। একজনের বয়স দুই-তিন বছর। আরেকজনের বয়স দশ-এগারো এবং সে মেয়ে। ফলে, আড়াই বছর ধরে শুটিং করলে তাদের দু’জনেরই নানা শারীরিক পরিবর্তন আসবে, যেটা পর্দায় দৃশ্যমান হবে। এই জিনিসটা কীভাবে সামলেছেন?

অনেকেই জানে, সিনেমার শুটিং সাধারণত ঘটনার কালানুক্রমিক হয় না; কিন্তু, আমরা কাহিনির ক্রমানুসারে শুট করেছি। তাই, ছোট বাচ্চাটার কাজ প্রথম বছরেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, আড়াই বছরে বড় মেয়েটার একটু বাহ্যিক পরিবর্তন হয়েছিল বটে; সেটা কোনওভাবে ম্যানেজ করেছি। 

ছোট বাচ্চাটার কাস্টিং কীভাবে করলেন? তার কোনও সংলাপ নেই; সকলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে-বসে থাকে; আর, একটা দৃশ্যে নাগাড়ে চিৎকার করে কাঁদে। কীভাবে কী নির্দেশ দিয়েছিলেন?

লোকেশন স্থির করার পর, ওই জায়গাটায় আমি বারবার যেতাম। কারণ, জানতাম স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। ওখানকার বাচ্চাদের জন্য কিছু বইপত্র, লজেন্স-চকলেট এসব নিয়ে যেতাম। আমার মাথায় প্রথম থেকেই ছিল যে, ওইটুকু কোলের বাচ্চা বাইরে থেকে নিয়ে গিয়ে শুটিং করতে পারব না। ওই চরিত্রের জন্য ওখানের কোনও স্থানীয় বাচ্চাই দরকার। 

সিনেমাতে যে বাচ্চাটাকে দেখলেন, সে ওই গ্রামেরই; আমাকে ‘নানা’ ডাকত; গেলেই কাছে ছুটে আসত। এমন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল যে, আমি যা বলি, সে তা-ই করে। বাকি অভিনেতাদের সঙ্গেও ওর বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। কোনও সিকোয়েন্সে ওকে নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি, শুধু কান্নার দৃশ্যে ভাবতে হয়েছিল, এবার কী করব! তো, ক্যামেরা রেডি করে বসার পর একটা বুদ্ধি খাটালাম। ওর মা-বাবাকে বললাম যে, আমি ওকে মিছামিছি ধমক দেব, মারের ভয় দেখাব। তারপর, বাচ্চাটাকে হঠাৎ ধমক দিতেই ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল। ওই দৃশ্যের কাজ হয়ে যাওয়ার পর বোধহয় আধা ঘণ্টা ধরে ওকে কোলে নিয়ে, ঘুরিয়ে শান্ত করেছিলাম।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘হবিগঞ্জের জালালি কইতর সুনামগঞ্জের কুড়া/ সুরমা নদীর গাংচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া…’ গানটার প্রসঙ্গ এবং আপনার সিনেমায় সংগীতের ব্যবহার সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন…

আসলে, স্ক্রিপ্ট লেখার সময় থেকেই খুব চিন্তিত ছিলাম সিনেমার নামটা কী হবে! তখন সন্ধান করছিলাম, যে জনপদ নিয়ে কাজটা করছি, সেখানকার কোনও ইউনিক প্রতীক কী আছে! মানে, যে চিহ্ন বা ছবি বা শব্দ শুনলেই মানুষ বুঝতে পারবে, কোথাকার কথা বলছি। তখন মনে পড়ল, হাসান রাজার গানে কুড়া পাখির কথা আছে। উনি নিজের বাড়িতে ওই পাখি পুষতেন। স্থির করলাম, তাহলে এটাই হাওর অঞ্চলের প্রতীক হতে পারে। প্রথমে নাম রেখেছিলাম, ‘কুড়া পাখির উড়াল’।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমরা একবার হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর তাঁর সঙ্গীদের আমন্ত্রণ করে এখানে এনেছিলাম ’৮১ সালে। উনি ওই বয়সেও টানা চার ঘণ্টা ধরে প্রোগ্রাম করেছিলেন। তখন ওই গানটা একেবারে সামনে বসে শুনেছিলাম। ওই গানটার মধ্যে ব্যক্তিগত শেকড় ছেঁড়ার শোক-দুঃখ ভীষণ তীব্রভাবে রয়েছে। তো, একদিন হঠাৎ মাথায় এল, এই ‘শূন্যে উড়া’-র জায়গাটা সিনেমার নামের সঙ্গে রাখলে আরও মানানসই হতে পারে।

বলতে পারেন, নামকরণটা পুরোপুরি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের সূত্র ধরেই নিয়েছি। যদিও, এখানকার অনেকে আমাকে বলেছিল এরকম নাম রাখলে সিনেমা চলবে না। আসলে, এখানে তো সিনেমার নাম হয় ‘বরবাদ’, ‘জিঘাংসা’, ‘পালাবি কোথায়’ (হাসি)… কিন্তু, আমি অটল ছিলাম এই নামটাই রাখব! দর্শক যাতে প্রথমেই বুঝতে পারে যে, এটা প্রচলিত ধাঁচের সিনেমা নয়!

একটা জায়গায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আরেকটা গান ব্যবহার করেছি, ‘সোনা বন্ধুরে, আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি…’। আমার তরুণ বয়সে ওঁর সঙ্গে কাটানো কয়েকদিনের স্মৃতি থেকে ওঁর প্রতি শ্রদ্ধা বা ট্রিবিউট দিয়েছি।

সংগীতের ক্ষেত্রে এটুকু বলতে পারি, অনেকেই জানে, সুনামগঞ্জ এলাকার মিউজিক চিরকালই অত্যন্ত গর্বের। সেই ঐতিহ্য বলে শেষ করা যাবে না। রাধারমণ দত্ত থেকে শুরু করে হাসান রাজা বা শাহ আবদুল করিম– একেকজন দিগ্‌গজ। প্রতিটা গ্রামে প্রায় দু’-চারজন পাবেন, যারা স্বভাবকবি বা বাউল। নিজেরাই গান রচনা করে সুর দিয়ে গাইছে। আমরা হয়তো মাত্র কয়েকজনের নাম জানি। 

ওখানকার মানুষ গানের সঙ্গে আমাদের মতো শহুরে বাদ্যযন্ত্র বাজায় না; তারা স্বাভাবিকভাবেই একটা দোতারা বাজায়। সঙ্গে, বড়জোর একটা ঢোল বা মন্দিরা থাকে; কখনও কখনও একটা হারমোনিয়াম। আমি সাত্যকিকে (ব্যানার্জি) বেছে নিয়েছিলাম, কারণ ওর লোকগীতি সম্বন্ধে বোঝাপড়া বা চর্চাটা আছে। ওকে বলে দিয়েছিলাম, ওই স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যেই থাকতে হবে; ওগুলো দিয়েই সংগীতের কাজ করতে হবে।

মৈনাক বিশ্বাসের সঙ্গে কি আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল?

না, না। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান ব্যবহার করার অনুমতি নেওয়ার জন্য মৈনাক আর ওঁর বোন, রঙ্গিলির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ওঁরা সানন্দে অনুমতি দিয়েছিলেন; কোনও টাকা-পয়সাও নেননি। 

যেখানে শুটিং করেছেন, সেই অঞ্চলের মানুষরা এই সিনেমাটা দেখেছে? তাদের অনুভূতি কেমন ছিল?

হ্যাঁ, প্রোজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম, পর্দা সব নিয়ে গিয়ে ওখানে সিনেমাটা দেখিয়েছিলাম। মোটামুটি বোধহয় আট-দশটা গ্রামের মানুষ এসে জমা হয়েছিল সেদিন। যদিও, ওরা চট করে আমাদের মতো অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। তবে সিনেমা শুরু হওয়ার পর পাঁচ মিনিটের মধ্যে সকলে নিস্তব্ধ হয়ে পুরোটা দেখেছিল। তাতেই বুঝেছিলাম যে, ওরা ওই কাহিনির ভেতরে, দৃশ্যের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে।

শুনলাম, এরপর এই সিনেমার একটা সিকুয়েল বানাবেন ভাবছেন…

হ্যাঁ, সিকুয়েল ঠিক না, সারবস্তু বা থিমের দিক থেকে সিকুয়েল বলা যায়। কাহিনির দিক থেকে নতুনটা আলাদা হবে। সরকারি ফান্ড পাওয়ার চেষ্টা করছি। দেখি, কী হয়।

বাংলাদেশের নতুন ফিল্মমেকারদের কাজ কেমন লাগছে?

নতুনদের মধ্যে ডিজিটাল এডুকেশনটা আমাদের থেকে অনেক উন্নত। ইন্টারনেটের অ্যাক্সেস সহজ হওয়ার ফলে সারা বিশ্বের সিনেমা এখনকার মানুষ দেখতে পারছে। আর, নতুন কিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার ফলে নতুন ধরনের কাহিনি নিয়ে কাজ করার সুযোগ বেড়েছে। আমি এ-ব্যাপারে আশাবাদী। নয়ের দশক বা ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত যেরকম অবস্থা ছিল, এখন সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন উদয়ন ঘোষচৌধুরি-র অন্যান্য লেখা

………………………