


পুরীর তিন রথ আসলে তিনটি পৃথক কাঠামো নয়, বরং মানবজীবনের তিনটি মৌলিক মাত্রার প্রতীক। ‘নন্দীঘোষ’ মানুষের আনন্দ, পূর্ণতা ও ঈশ্বরসন্ধানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে; ‘তালধ্বজ’ মানুষ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, কৃষিসভ্যতার ভিত্তি এবং স্থিতিশীল জীবনের আদর্শকে তুলে ধরে; আর ‘দর্পদলন’ মানুষের অন্তর্জগৎকে শুদ্ধ করে আত্মজ্ঞান ও বিনয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
পুরীর শ্রীজগন্নাথ রথযাত্রা কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভারতীয় সভ্যতা, শিল্প, স্থাপত্য, ধর্মতত্ত্ব এবং লোকঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়। প্রতিবছর আষাঢ় মাসে অনুষ্ঠিত এই মহোৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তিনটি মহারথ– জগন্নাথের ‘নন্দীঘোষ’, বলভদ্রের ‘তালধ্বজ’ এবং সুভদ্রার ‘দর্পদলন’ বা ‘দেবদলন’। এই তিনটি রথ কেবল দেবমূর্তির বাহন নয়; বরং হিন্দু-দর্শনের গভীরতম তত্ত্ব, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতীকী বিন্যাস এবং মানুষের আত্মিক অভিযাত্রার চলমান রূপক।

রথযাত্রার সময় দেবতা মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগমন করেন। এই আচার দেবতা ও ভক্তের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে ঈশ্বরের সর্বজনীনতা এবং মানবসমাজের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম মমত্ববোধকে প্রকাশ করে। প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ার পবিত্র তিথিতে তিনটি রথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বহু শতাব্দী ধরে বংশানুক্রমে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন ‘মহারানা সেবক’ নামে পরিচিত দক্ষ কারিগররা। নির্দিষ্ট প্রজাতির নতুন কাঠ ব্যবহার করে প্রতি বছর সম্পূর্ণ নতুন রথ নির্মিত হয়। পুরনো রথ পুনর্ব্যবহার করা হয় না। এই অনন্য প্রথা ভারতীয় দর্শনের অনিত্যতা, পুনর্নবীকরণ এবং সৃষ্টির চিরন্তন চক্রের এক শক্তিশালী প্রতীক।
‘স্কন্দপুরাণ’, ‘পদ্মপুরাণ’, ‘ব্রহ্মপুরাণ’ এবং ‘কপিল সংহিতা’য় রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। দ্বাদশ শতকে পূর্ব গঙ্গা বংশের শাসনামলে জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠার পর এই রথনির্মাণ ও রথযাত্রার আচার সুসংগঠিত রূপ লাভ করে এবং ধীরে ধীরে তা সমগ্র ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

জগন্নাথের রথের নাম ‘নন্দীঘোষ’, যার অর্থ আনন্দময় বা শুভধ্বনিময় রথ। এটি ১৬টি চাকার ওপর নির্মিত, যা পূর্ণতা, বিশ্বসামঞ্জস্য এবং ঐশ্বরিক পরিপূর্ণতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এই রথের লাল ও হলুদ বস্ত্রাবরণ শ্রীকৃষ্ণের পীতাম্বর ও তাঁর দিব্যজ্যোতির স্মারক। রথের রক্ষক গরুড় এবং সারথি দারুক। চারটি অশ্ব বিশ্বজগৎকে পরিচালনকারী ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক। নন্দীঘোষের প্রতিটি কাঠামোগত উপাদান মানুষের কাছে এই বোধ জাগিয়ে তোলে যে, পরমেশ্বর কেবল মন্দিরের অন্তরালে সীমাবদ্ধ নন; তিনি সকল মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বলভদ্রের রথ ‘তালধ্বজ’ ১৪টি চাকার ওপর নির্মিত হয়। এই ১৪ চাকা হিন্দু বিশ্বতত্ত্বে বর্ণিত চতুর্দশলোকের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। রথের তালগাছচিহ্ন কৃষি, স্থিতিশীলতা, শক্তি এবং জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। নীলাভ-সবুজ ও লাল বস্ত্রের সমন্বয় বল, সহিষ্ণুতা এবং করুণার সুষম প্রকাশ ঘটায়। এই রথের সারথি মাতলি। বলভদ্রের রথ মানবসমাজকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি, কৃষি এবং নৈতিক শৃঙ্খলা মানবসভ্যতার মৌলিক ভিত্তি।

সুভদ্রার রথ ‘দর্পদলন’ বা ‘দেবদলন’ নামে পরিচিত। এটি ১২টি চাকার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা বছরের বারোমাস এবং সময়ের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের প্রতীক। লাল ও কালো রঙের বস্ত্রশোভা শক্তির গতিময়তা এবং মহাশক্তির রহস্যময় রূপকে প্রকাশ করে। ‘দর্পদলন’ নামটি অহংকার বিনাশের আদর্শকে সামনে আনে। আধ্যাত্মিক জীবনে মুক্তি অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে অহংকার পরিত্যাগের যে শিক্ষা ভারতীয় দর্শন প্রদান করে, এই রথ তারই দৃশ্যমান প্রতীক। এই রথের সারথি অর্জুন, যিনি জ্ঞান, কর্তব্যবোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আদর্শকে ধারণ করেন।
রথগুলির স্থাপত্য কেবল প্রকৌশলগত দক্ষতার পরিচয় নয়; এটি এক সুসংগঠিত ধর্মীয় স্থাপত্যরীতি। প্রতিটি রথে অসংখ্য কাঠের অংশ নির্দিষ্ট অনুপাত ও নিয়মে সংযোজিত হয়। চক্র বা চাকা সময়ের অনন্ত প্রবাহ এবং ধর্মচক্রের প্রতীক। ‘অখা’ বা ‘অক্ষ’ সমগ্র রথের ভার বহন করলেও নিজে স্থির থাকে; তাই এটি পরিবর্তনশীল জগতের অন্তর্নিহিত অপরিবর্তনীয় ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতীক। ‘আরা’ বা চাকার কাঁটাগুলি চারদিকে বিকিরিত ঐশ্বরিক শক্তির প্রতিরূপ। দণ্ড বা প্রধান কাষ্ঠদণ্ড পৃথিবী ও আকাশের সংযোগরেখার মতো সমগ্র কাঠামোকে ধারণ করে। সিংহাসন সেই পবিত্র স্থান, যেখানে দেবতা অধিষ্ঠিত হন; এটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র এবং পরম চৈতন্যের আসন হিসেবে বিবেচিত।

রথের ভূমি বা ভিত্তি পৃথিবীর প্রতীক, আর পরপর ঊর্ধ্বমুখী পীঠাগুলি মানুষের আধ্যাত্মিক উত্তরণের ধাপকে নির্দেশ করে। ‘ষোলো নাহাকা’ এবং ‘আট নাহাকা’ নামে পরিচিত প্রধান স্তম্ভগুলি কেবল কাঠামোগত ভার বহন করে না; এগুলি যথাক্রমে ‘ষোড়শ কলা’ এবং অষ্টদিকের দেবশক্তির প্রতীক বলেও ব্যাখ্যা করা হয়। কানকমুণ্ডি, খাপুরি, কলস ও ধ্বজ ধাপে ধাপে রথকে এক চলমান মন্দিরের রূপ দেয়। সর্বোচ্চে স্থাপিত কলস সমৃদ্ধি, অমরত্ব এবং ঈশ্বরীয় আশীর্বাদের প্রতীক, আর ধ্বজ ঘোষণা করে ধর্মের বিজয় এবং দেবতার জীবন্ত উপস্থিতি।
রথের অলংকরণও গভীর তাৎপর্য বহন করে। ‘হংসপাটা’ জ্ঞান ও বিবেকের প্রতীক, কারণ ভারতীয় দর্শনে হংস সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষমতার প্রতিরূপ। ‘মকরদণ্ড’ রক্ষাকবচ ও উর্বরতার প্রতীক। ‘রুষিপাটা’ প্রাচীন ঋষিদের জ্ঞানধারাকে স্মরণ করায়, আর ‘রাহুপাটি’ মনে করিয়ে দেয় যে, সমস্ত মহাজাগতিক শক্তিই পরমেশ্বরের নিয়ন্ত্রণাধীন। ‘ওলটা সুয়া’ বা ওল্টানো টিয়া পাখির অলংকরণ ভক্তি, পবিত্র বাক্য এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বাহক হিসেবে বিবেচিত। এভাবে প্রতিটি ক্ষুদ্র কাঠখণ্ড-ও এক গভীর সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক অর্থ বহন করে।

রথের কাপড়ের ছাউনি বা ‘চাঁদোয়া’ আকাশমণ্ডলের প্রতীক, আর বিশাল রথরশি মানুষের সম্মিলিত ভক্তির রূপ। হাজার হাজার মানুষ যখন একই রশি ধরে রথ টানেন, তখন সেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা সামাজিক অবস্থানের বিভেদ বিলীন হয়ে যায়। এই দৃশ্য ভারতীয় সমাজে সাম্য, অংশগ্রহণ এবং সম্মিলিত আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য উদাহরণ। এখানে ঈশ্বর যেন মানুষের টানে মানুষের মধ্যেই আগমন করেন। রথকে টেনে নিয়ে চলা কেবল শারীরিক শ্রম নয়; এটি ভক্তির এক সমষ্টিগত সাধনা, যা মানুষকে একে অপরের সঙ্গে এবং পরম সত্যের সঙ্গে যুক্ত করে।
জগন্নাথ দর্শনে রথকে একটি চলমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা ‘রথবিমান’ হিসেবে কল্পনা করা হয়। রথের চাকা জন্ম-মৃত্যুর অন্তহীন আবর্তনকে নির্দেশ করে, অক্ষ চিরন্তন ব্রহ্মের প্রতীক, রথের দেহ মানবদেহের রূপক, ছাউনি আকাশের প্রতীক এবং সিংহাসনে অধিষ্ঠিত দেবতা মানুষের অন্তর্নিহিত পরমাত্মার প্রতিরূপ। এই ব্যাখ্যা উপনিষদীয় দর্শন, ভক্তি আন্দোলন এবং পুরাণীয় ধর্মচিন্তার এক সুন্দর সমন্বয় উপস্থাপন করে। রথযাত্রা তাই কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগৎ থেকে মহাজগতের দিকে যাত্রার এক প্রতীকী উপাখ্যান।

সবশেষে বলা যায়, পুরীর তিন রথ আসলে তিনটি পৃথক কাঠামো নয়, বরং মানবজীবনের তিনটি মৌলিক মাত্রার প্রতীক। ‘নন্দীঘোষ’ মানুষের আনন্দ, পূর্ণতা ও ঈশ্বরসন্ধানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে; ‘তালধ্বজ’ মানুষ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, কৃষিসভ্যতার ভিত্তি এবং স্থিতিশীল জীবনের আদর্শকে তুলে ধরে; আর ‘দর্পদলন’ মানুষের অন্তর্জগৎকে শুদ্ধ করে আত্মজ্ঞান ও বিনয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে, রথের প্রতিটি অংশ– চাকা, অক্ষ, দণ্ড, স্তম্ভ, ধ্বজ, কলস কিংবা রশি– মানব অস্তিত্বের কোনও না কোনও দিকের প্রতীক। চাকা সময়ের মতো ঘুরে চলে, অক্ষের মতো মানুষের অন্তরাত্মা স্থির থাকে, রশির মতো সমাজ মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং চাঁদোয়ার মতো প্রকৃতি সকলকে তার আশ্রয়ে ধারণ করে। ফলে রথ কেবল দেবতার বাহন নয়; এটি মানবদেহ, মানবসমাজ এবং বিশ্বপ্রকৃতির এক সমন্বিত রূপক।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, তিনটি রথই কৃষিনির্ভর ভারতীয় জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। কাঠ আসে বন থেকে, রং ও প্রতীক আসে প্রকৃতির জগৎ থেকে, বলভদ্রের লাঙল কৃষির স্মারক, তালধ্বজ ভূমির সঙ্গে মানুষের বন্ধনের প্রতীক। অর্থাৎ, রথযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সভ্যতা প্রকৃতির দান এবং সেই প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ ছাড়া কোনও স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।

প্রতিবছর নতুন রথ নির্মাণের প্রথা জীবনের অনিত্যতা এবং পুনর্জন্মের চিরন্তন দর্শনকে প্রকাশ করে। পুরনো কাঠামো বিলীন হয়, নতুন কাঠামো গড়ে ওঠে; কিন্তু ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং চেতনা অব্যাহত থাকে। ঠিক মানুষের জীবনও তেমনই– শরীর পরিবর্তিত হয়, প্রজন্ম বদলে যায়, কিন্তু মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান যুগে যুগে প্রবাহিত হতে থাকে।
তাই জগন্নাথের রথযাত্রাকে যদি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখা হয়, তবে তার প্রকৃত ব্যাপ্তি উপলব্ধি করা যাবে না। এটি আসলে মানুষ ও ঈশ্বরের, মানুষ ও মানুষের, মানুষ ও প্রকৃতির, এবং ক্ষুদ্র জীবন ও মহাবিশ্বের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের এক জীবন্ত উদ্যাপন। পুরীর তিন রথ আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রকৃত অর্থ নিহিত রয়েছে সমন্বয়ে– ভক্তি ও কর্মে, প্রকৃতি ও সভ্যতায়, ব্যক্তি ও সমাজে এবং আত্মা ও বিশ্বচৈতন্যের মিলনে। সেই কারণেই রথযাত্রা আজও কেবল একটি উৎসব নয়; এটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক মনের এক চলমান দর্শন, যেখানে মানবজীবনের সমগ্র যাত্রাপথ প্রতীক, আচার ও অনুভূতির মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন আলোক নূর ইভানা-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved