


কিছুক্ষণ পরে চন্দ্রালোক-বিধৌত এক উন্মুক্ত নদীচরে এসে দাঁড়ালাম আমি। তখন শরৎকাল, নীল পদ্মের মতো উন্মুক্ত রাতের আকাশ। চিন্তার অনির্বার স্রোতই চিত্ত। সে নদীর অন্য নাম আশা। মনোরথ তার জল। তৃষ্ণা তার তরঙ্গ। ধৈর্য সেই নদীপাড়ে পতনোন্মুখ অশ্বত্থ। মোহের আবর্তে সেই চিত্তনদীর জল সতত চঞ্চল।
১৫.
কীভাবে যে ঘটনাক্রম স্থির হয়, বলতে পারি না। পূর্ববর্ণিত অভিজ্ঞতার পর মাস-দুয়েক চলে গেল। হঠাৎ শুনলাম, আমতলি গাঁয়ের কয়েকজন একত্রে কৈলাশহর যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কী জানি কী মনে হল আমার, ওঁদের সঙ্গে কৈলাশহর ঘুরে আসার একটা সুগভীর তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম। আমি ওঁদের সঙ্গে যেতে চাই শুনে সকলেই খুব খুশি। যথাদিনে যথাসময়ে আমরা সবাই মিলে কৈলাশহরের পথে বেরিয়ে পড়লাম।
কৈলাশহরের খুব কাছেই ঊনকোটি তীর্থ। শৈব-তীর্থ হিসেবেই এর প্রসিদ্ধি। আমার বন্ধু প্রিয়ংকু চক্রবর্তী অবশ্য গবেষণা করে দেখিয়েছেন, একসময় ঊনকোটিতে বজ্রযান বৌদ্ধমতের সাধন ও চর্চা প্রভূত পরিমাণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কেউ আবার বলেন, শৈব ও বৌদ্ধ ধারার সঙ্গে ঊনকোটিতে এসে মিশেছিল লৌকিক ধর্মেরও ঐশ্বর্য। সে যাই হোক, আমার সঙ্গীরা প্রধানত হিন্দু তীর্থযাত্রী, আর আমি ঠিক তীর্থবাসনায় যে কৈলাশহর যাচ্ছিলাম, তা নয়। ঠিক কেন যে আমি কৈলাশহর যাচ্ছিলাম, কোন মনোভাব নিয়ে, সে-সম্পর্কে আমার কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল কি তখন? বোধহয় না। আমি জীবনে কখনই খুব আঁটোসাঁটো পরিকল্পনা করে কিছু করিনি। একটা মোটামুটি ধারণা নিয়ে এগিয়ে যাই, তারপর ঘটনাক্রম ধীরে ধীরে গড়ে উঠে একটা আকার নেয়। আমার জীবনের গল্প সর্বাংশে এমনই। আপনাদের ক্ষেত্রে কি কিছু অন্যরকম হয়? হতেও পারে।

কৈলাশহর আমরা গিয়েছিলাম কুমারঘাটের মধ্য দিয়ে। ট্রেনে গিয়েছিলাম, তাই বিস্তারিত কিছুই জানার সুযোগ ঘটেনি। কৈলাশহরে পৌঁছে এক আশ্রমে গিয়ে উঠেছি। সারাদিনের পথশ্রমে অন্যরা সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে গভীর নিদ্রায়। অথচ কী আশ্চর্য, আমার আর দু’চোখে ঘুম আসে না! বিছানায় অন্ধকারে চোখ চেয়ে পড়ে আছি।
ঘরের ভিতর একটা জোনাকি কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছিল। আলোর ছুঁচে অন্ধকার আঁচলের প্রান্ত হেমসেলাই করছিল জোনাকিটি। এক জায়গায় স্থির সে নয়। আগে, পিছে, ঊর্ধ্বে, নিম্নে। আমি বিছানায় শুয়ে তার বিচিত্র গতিবিধি লক্ষ করছিলাম। জোনাকিটি কী বলতে চাইছে? সে কি বলতে চাইছে, ‘কেন তুমি এখানে এখনও শুয়ে আছ? পরম মুহূর্ত সমাগত। তুমি কেন নৈশ স্থবিরতাকে আলিঙ্গন করে শুয়ে আছ বলো তো? এখনও কি তুমি সময়ের ইঙ্গিত বুঝতে পারছ না? এখনও যদি না বোঝো, আর কবে বুঝবে? এই যে আমি এখানে! এই ভেসে এলাম নিচে! দেখো, উঠছি ঘরের কড়িকাঠের কাছে! এই আবার নেমে এলাম তোমার বুকের ওপর! তুমি ওঠো, বাইরে যাও, এখানে আর নয়, আর এখানে নয়। ওগো, আর এখানে নয়কো!’
রাত তখন কত কে জানে! হবে একটা কি দেড়টা। কিছুতেই ঘুম আসছে না দেখে ‘ধ্যাত্তেরিকা’-বলে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম! অপরাপর ব্যক্তিদের সেই নাসিকাগর্জনমন্দ্রিত ঘরটা ছেড়ে বাইরে এলাম। উঠানে একটা সবুজ রঙের টিপকল। রাতের অন্ধকারে তা কালো দেখাচ্ছিল। বারান্দা থেকে নেমে হ্যাঁচোর-প্যাঁচোর করে টিপকল থেকে জল খেলাম। জল মুখে দিলাম, মাথায় দিলাম। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, আজ রাতে আমার ঘুম আসার আর কোনও সম্ভাবনা নেই।
অপরূপ জ্যোৎস্নারাত্রি। এমন মায়াময় চাঁদের রাত কখনও এসেছে কি আমার জীবনে? পায়ে পায়ে আশ্রমের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে এলাম। সামনে দিয়ে একটা ধুলামাখা পথ যেন কোন অনন্তের দিকে চলে গিয়েছে। পথের দু’পাশে ঝোপঝাড় অন্ধকারে মৌর্যযুগের গুপ্তচরদের মতো হাঁটু মুড়ে বসে আমাকে লক্ষ করে চলেছে। অন্ধকারে সেই ধুলাপথ ধরে হাঁটছি। কী যেন এক নিষিদ্ধ উত্তেজনা আমার সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলীতে, আমার শরীরের সমস্ত রোমকূপে শিহরন সঞ্চার করছিল। অথচ এতাদৃশ শিহরনের কোনও প্রত্যক্ষ কারণ ছিল না। তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল, কেন জানি মনে হচ্ছিল… এই পথ দিয়ে জন্মজন্মান্তর ধরে আমি হেঁটে চলেছি। সেই কত সহস্রাব্দ আগে, যেদিন সত্যকাম নামক এক বালক ভোররাতে মাঘশীতের কুয়াশামাখা পথঘাট পেরিয়ে গুরু গৌতমের আশ্রমে চলে গিয়েছিলেন আত্মস্বরূপের অন্বেষণে, সেদিনও এই পথে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। সেই যে সেদিন, যেদিন সিদ্ধার্থ নামক এক রাজ্যপরিত্যাগী শাক্যপুত্রের সন্ধানে পাঁচজন কৃচ্ছ্রসাধনপ্রিয় তপস্বী উরুবেলায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন, সেদিনও এই ধুলামলিন পথে হাঁটতে হাঁটতে আমার সঙ্গে তাঁদের অকস্মাৎ দেখা হয়েছিল। যেদিন ঘটনাচক্রে বিচ্ছিন্ন বৈপিত্রেয় দুই ভ্রাতা তপস্বী অসঙ্গ ও পণ্ডিত বসুবন্ধু তক্ষশিলার উপান্তে এক নির্জন শৈলশিখরলগ্ন ভূমিদেশে আচম্বিতে পরস্পরের দেখা পেয়েছিলেন, তাঁদের প্রিয়সম্ভাষণের কলধ্বনি শুনে চমকিত আমি এই ধুলাপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই চকিতে চোখ তুলে তাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিংবা জনাদেশে গুরু সোক্রাতেসের বিষপানোত্তর মৃত্যুসংবাদ শুনে যে-রাত্রে প্লেটো গণতন্ত্রে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এক ফুঁয়ে প্রদীপ নিভিয়ে পাঠকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে আহত সিংহের মতো আর্তনাদ করে উঠেছিলেন, সেই রাত্রে তীব্র সে-যন্ত্রণাজর্জর কণ্ঠস্বর শুনে সেই পাঠকক্ষের নিচেকার সংকীর্ণ গলিপথ এই ধুলা-আবিল পারোডোস ধরেই হাঁটতে হাঁটতে আমি শোকসমুদ্রে ডুবে গিয়েছিলাম। গোলগথার সমাধিগুহার পাথর সরিয়ে যে-প্রভাতে পুনরুত্থিত ইয়েশুয়া ক্রন্দনরতা মেরি ম্যাগডলিনকে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন, সেই গুহারই সমীপস্থ প্রস্তরপ্রকীর্ণ পথ… সে যে এই ধুলারই পথ… এই পথেই তো আমি এগিয়ে চলেছিলাম নতুন সূর্যের সমুদয় দেখব বলে। যে-অপরাহ্ণে ওষধিপ্রভাবে সংজ্ঞাহীন যুবরাজ প্রতাপসিংহ ও তাঁর সংজ্ঞাহীনা পত্নী আজব্দেবাইকে গোশকটে তুলে নিয়ে ভিষগ্শ্রেষ্ঠ চক্রপাণি মিশ্র চিত্তোর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন কুম্ভলগড়ের পথে, সেই অপরাহ্ণেও সেই লুপ্তপরিচয় পন্থার সঙ্গে আমার এই ধূলিমলিন পথের দেখা হয়েছিল। এবং টাইবার নদীর ধারের এক ঝরনায় স্নানরতা মার্গেরিটার নগ্ন সৌন্দর্য অবলোকন করে যে-দ্বিপ্রহরে ভুবনবন্দিত শিল্পী রাফায়েল প্রেমোন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, সেই দ্বিপ্রহরেও এই পথ ধরেই উদাসীন আমি হেঁটে চলেছিলাম কোন অলক্ষ্যের দিকে!

আজও কৈলাশহরের এই ধুলাস্তীর্ণ পথ ধরে হেঁটে চলেছি আমি নৈশ এই মুহূর্তের সঙ্গে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্তহীন মুহূর্তসংক্ষোভ-সমূহকে চেতনার চীনাংশুকে জুড়ে জুড়ে। এ পথ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে আজ রাত্রে কোন অনিবর্চনীয় ভুবনে?
কিছুক্ষণ পরে চন্দ্রালোক-বিধৌত এক উন্মুক্ত নদীচরে এসে দাঁড়ালাম আমি। তখন শরৎকাল, নীল পদ্মের মতো উন্মুক্ত রাতের আকাশ। রাজহংসের পক্ষচ্যুত পালকে নির্মিত তুলিকার কোমল দুয়েকটি আঁচড়ে আঁকা নীলাব্জপ্রভ গগনলগ্ন শ্বেত নীরদরেখা, নদীতট ধূসর, যামিনীর প্রিয়তম শরৎশশীর গলিত প্রণয়কিরণ শুভ্রকান্তি কাশবনের শীর্ষদেশে পড়ে, নদী-বাতাসের আন্দোলনে, সে কী যে অপূর্ব রূপ ধারণ করেছিল, আমি বহু প্রয়াসেও তার ভাষারূপ দিতে পারি না আজও। আর দুইপাশের সেই চিত্তবিমোহন কাশবনের মধ্য দিয়ে কে একটি যুবতী নদী তার তন্বী রূপবল্লরী নিয়ে নিভৃতে, অতি সন্তর্পণে যেন নিশীথিনী অভিসারিকার মতো সুগোপন পদক্ষেপে কোন অজানিত নিকুঞ্জের দিকে চলেছে…
ইনিই সুদুর্লভা মহাভাগা মনুনদী। অনন্ত কোটি জন্মের সুকৃতি না থাকলে এই রূপে এঁর দেখা পাওয়া যায় না।
আমি সেই জ্যোৎস্নার প্রান্তদেশে দাঁড়িয়ে সেই অন্ধকার জলস্রোতকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কে?’
জ্যোৎস্নাজলে মর্মরধ্বনি উঠল, ‘আমার কোনও নাম নেই। তাই তোমার প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই।’
আমি ভাবতে লাগলাম। অন্ধকারে কে বলে উঠল কথাগুলো? আমি নিজেই কি নিজের সঙ্গে তন্দ্রাচালিত হয়ে কথা বলছি? কিন্তু কই, তা তো মনে হচ্ছে না আমার। বরং মনে হচ্ছে, এ নদীটিরই কণ্ঠস্বর!
আমি বললাম, ‘তবে যে সকলে বলে, তোমার নাম মনু!’
অমনই উত্তর এল, ‘সে মানুষের চিন্তার ত্রুটি। অতি দীর্ঘলালিত কুসংস্কার। যেকোনও বস্তুকে নাম না-দিয়ে মানুষ শান্তি পায় না। ভাবে, নাম দিলেই জানা হল বুঝি।’
‘তুমি কি নদী, না কি নারী?’
আমার দিকে পাশ ফিরে শুয়ে রহস্যভরা চোখ দু’টি তুলে সে প্রতিপ্রশ্ন করল, ‘তোমার কী মনে হয়?’
আমি চুপ করে রইলাম। আমাকে নিরুত্তর দেখে সে আবার প্রশ্ন করল, ‘প্রতিটি নারীই কি নদী নয়? প্রতিটি মানুষই কি নয় এক একটি প্রবাহের ফেনায়িত ফুল?’
আমি বললাম, ‘মানুষ কী করে নদী হবে?’
‘মাতৃকুক্ষি থেকে জাত তোমার সেই নবনীতকোমল শরীর আজ কোথায়? সে-নবনী ধুয়ে মুছে গলে চলে গিয়েছে ধরিত্রীর স্রোতে। পরিবর্তে এসেছে এই সুগঠিত আকার, এই বিস্তারিত স্কন্ধদেশ, সুচ্ছন্দিত বাহু, এই যুবাসুলভ অবয়ব। এ-ও ন্যুব্জ হবে একদিন, ভঙ্গুর হবে, বিচূর্ণ হবে জরার লগুড়াঘাতে, তারপর ভস্ম হয়ে ভেসে যাবে কালস্রোতে একদিন…’

‘ও তো তুমি শরীরের কথা বলছ। আমি কি সামান্য শরীর শুধু? আমার কি মন নেই, মনুনদী?’
“তোমার সে-চিত্তনদীও এ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। চিন্তার অনির্বার স্রোতই চিত্ত। সে নদীর অন্য নাম আশা। মনোরথ তার জল। তৃষ্ণা তার তরঙ্গ। অনুরাগ, বীতরাগ সেই তরঙ্গে সতত ধাবমান মকর। সংশয় তার পারাপারগামী বিহগকুল। ধৈর্য সেই নদীপাড়ে পতনোন্মুখ অশ্বত্থ। মোহের আবর্তে সেই চিত্তনদীর জল সতত চঞ্চল। দু’পাশে তার দুশ্চিন্তার প্রোতুঙ্গ তটভূমি। সেই নদী অতিক্রম করতে পারেন কেবল কতিপয় অলোকসামান্য মানুষ।”
‘আমার মানুষজন্ম ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে, মনুনদী। আমি আর মানুষ হতে চাই না।’
এবার সে আমার আরও কাছে সরে এসে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস নিবিড় করে অপরিস্ফুট শব্দে প্রশ্ন করল, ‘তবে পরজন্মে তুমি কী হতে চাও বলো দেখি?’
কাশফুল হতে চাই, মনু। পরজন্মে যেন তোমার তীরে কাশফুল হয়ে জন্মাই। যেন তোমার বুকের পাশে জ্যোৎস্নাজলে ভিজে এমনিভাবে ঘুমোতে পারি:
‘আবার নতুন করে শুরু করি যদি
আমি হব কাশফুল, তুমি– মনুনদী।’
……………………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব
……………………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved