


‘গোদান’-এর পরে, তাঁর ‘ময়লা আঁচল’ (১৯৫৪) হয়ে উঠবে একটা ল্যান্ডমার্ক, যেখানে কাহিনির পটভূমি উত্তর-পূর্ব বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মেরীগঞ্জ– আলো-অন্ধকারে মেশানো যেন একটা চরিত্র। লেখার জন্য যে ‘রিপোর্টাজ’ স্টাইল রেণুর সহজাত ছিলই, সেটাই উপন্যাসের ছাঁচে ঢেলে, তিনি খুলে-মেলে দেখিয়ে দিতে চাইলেন আঞ্চলিক মানুষ কীভাবে বাঁচে প্রতিদিন, দারিদ্র-শোষণ-সংস্কারের মধ্যেই, করুণা আর বিদ্বেষ মিলিয়ে নিয়ে।
আঞ্চলিক সাহিত্যের নতুন একটা জানলাই খুলে গেল, যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ময়লা আঁচল’ লিখলেন ৩৩ বছরের তরুণ লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণু (১৯২১-১৯৭৭)। প্রেমচন্দ-উত্তর হিন্দি বলয়ে, রেণুই হয়ে উঠেছিলেন আঞ্চলিক সাহিত্যের স্বর; বিহারের ‘ভূমিপুত্র’, তিনি অঞ্চলকে দেখছিলেন তার পুরনো ইতিহাস, লোক-সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে নিয়ে, আবার সদ্য-স্বাধীন ভারতের মুখও তাঁরই মধ্যে।
‘গোদান’-এর পরে, তাঁর ‘ময়লা আঁচল’ (১৯৫৪) হয়ে উঠবে একটা ল্যান্ডমার্ক, যেখানে কাহিনির পটভূমি উত্তর-পূর্ব বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মেরীগঞ্জ– আলো-অন্ধকারে মেশানো যেন একটা চরিত্র। লেখার জন্য যে ‘রিপোর্টাজ’ স্টাইল রেণুর সহজাত ছিলই, সেটাই উপন্যাসের ছাঁচে ঢেলে, তিনি খুলে-মেলে দেখিয়ে দিতে চাইলেন আঞ্চলিক মানুষ কীভাবে বাঁচে প্রতিদিন, দারিদ্র-শোষণ-সংস্কারের মধ্যেই, করুণা আর বিদ্বেষ মিলিয়ে নিয়ে। যেন মেরীগঞ্জে বসেই এই তাঁর ধারাবিবরণী, যেখানে উঠে আসছে ধনীর ক্ষমতার ভাষা, ধর্মাচারণের আড়ালে ভণ্ডামি, উগ্র জাতপাত বিভাজন, দলিত জীবনের অন্ধকার, আর চরিত্রের মিছিল। সময়কাল ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের পর্ব থেকে শুরু করে উত্তর-স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছর।

শুরু থেকেই ফণীশ্বরনাথ রেণু বিশ্বাস করেছেন– আঞ্চলিক সমাজ-রাজনীতির প্রতিদিনের বাস্তব আর নিম্নবর্গের জীবন, সংস্কৃতির ওপর তার প্রভাব পাঠককে চিনিয়ে দেওয়া চাই। প্রতিবেদনের ধরনে তাঁর লেখা ‘ভিদাপত নাচ’, ‘বাপ রে’, ‘হাড্ডিয়োঁ কা পল’ অথবা ‘পুরানি কহানি: নয়া পথ’ দলিত সংস্কৃতির অনালোকিত দিক ঘিরেই। ‘ময়লা আঁচল’ উপন্যাসে তিনি মিলিয়ে দিলেন তথ্য আর ফিকশন একটা বড় স্কেলে, যেখানে আদর্শবাদী ‘ডাগদারবাবু’ থেকে অর্থলোভী তশীলদার, অনাচারী মোহান্ত, মহাজন থেকে নিরন্ন শ্রমিক, প্রেম থেকে জাত-বিদ্বেষ– সবটা রইল। উপন্যাস হয়ে উঠল যেন ‘লিটেরারি রিপোর্টাজ’।
রেণুর বয়ান প্রত্যক্ষ, কারণ উত্তর-পূর্ব বিহারের সিমরাহা গ্রামে তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলি থেকে তিনি হাতের তালুর মতো যে আঞ্চলিক লোকসমাজ চিনেছেন, তাকেই তুলে আনছেন নির্ভুল, আক্ষরিক অর্থে তৃণমূল থেকে। মেরীগঞ্জে একটা ডিসপেনসারি (‘ইস্পিতাল’) হবে, আর শহরে-শিক্ষিত তরুণ আদর্শবাদী ডাক্তার প্রশান্ত ব্যানার্জি সেখানে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরের চিকিৎসার আগ্রহ নিয়ে স্বেচ্ছায় এসে পড়ছেন, এই কাহিনি-সূত্র থেকে শুরু করে রেণু ঢুকে পড়লেন সমকালের পল্লিসমাজের অন্দরে। স্থানীয় চলিত ভাষা-শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন, উপকথা, লোকগানের অনর্গল প্রয়োগ উপন্যাস-জুড়ে, তাঁর বাস্তব-নিষ্ঠা থেকেই; প্রসূন মিত্রের বাংলা অনুবাদেও (ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ১৯৭২) মূলের অনেকটা স্বাদ পাওয়া যায়।

রেণু আঞ্চলিক জীবন দেখছেন খুঁটিয়ে, আর যেন সরাসরি রিলে করে দিচ্ছেন– মেরীগঞ্জ থেকে বলছি; নির্মোহ কিন্তু প্রখর তাঁর স্বর, আবার মানবিকও একই সঙ্গে। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পরতী পরিকথা’, পরে লিখেছেন ‘জুলুস’, ‘কিতনে চউরাহে’, ‘পল্টু বাবু রোড’, ‘দীর্ঘতপা’, তবে ‘ময়লা আঁচল’ তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ, যেখানে একটা প্রকাণ্ড বড় পরিসরে নিম্নবর্গের মানুষকেই করে তুলেছেন একটা অঞ্চলের হৃৎস্পন্দন, তাদেরই প্রতিদিনের বেঁচে-থাকার লড়াই বিশদে, বিস্তারে।
শুরু থেকেই রেণুর জনমুখী দৃষ্টি চিনে নিয়েছে পাঠক। আজ যে আমরা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ‘দেশজ’ উপাদান খুঁজি, সঙ্গে ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর স্লোগান, তাঁর উপন্যাসে যেন তারই সূচনা। তাঁর প্রভাবও সাহিত্যে দূরপ্রসারী– নির্মল ভর্মার মতো হিন্দি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত লেখক বলেছিলেন, রেণুর সাহিত্যকর্ম যেন একটা ‘সেন্সর’ হিসেবে কাজ করে গিয়েছে উত্তরসূরি লেখকদের সামনে। প্রেমচন্দের মতোই, ‘সাবঅলটার্ন’ সাহিত্যে রেণুর খ্যাতি, তবে সংবাদ পরিবেশনের ধরনের সঙ্গে গল্প মিলিয়ে-নেওয়া তাঁর ওই বিশেষ স্টাইল, তাঁর গদ্যে এনে দিয়েছে অসম্ভব গতি আর প্রত্যক্ষতা। পরে পি. সাইনাথ, হুসেন জাইদির মতো ভারতীয় লেখকরা ‘লিটেরারি রিপোর্টাজ’-এর চর্চা করবেন, জার্নালিজমের সঙ্গে মানবিক চেতনা, চিন্তা জুড়ে নিয়ে একই পরিসরে।

একাধিক সাবপ্লট ঘিরে গড়ে উঠছে ‘ময়লা আঁচল’ উপন্যাসের কাহিনি, আর লেখক দেখে নিচ্ছেন মেরীগঞ্জের জনজীবনের আনাচ-কানাচ, এক টোলা থেকে অন্য টোলা, মোহান্তের কোঠি থেকে স্থানীয় তশীলদারের ঘর-দোর, খেত-খামার, পঞ্চায়েতের সভা, রাজনৈতিক ‘মিটিন’, আর প্রবাহমান অসংখ্য মুখের মিছিল, গ্রামের বহুস্বর চিনিয়ে দিয়ে। অঞ্চলের কায়স্থ, রাজপুত, যাদবের বিরোধ সম্প্রদায়গত, এছাড়া ‘আমীর-গরিব’ বিভাজন তো আছেই, আবার খদ্দরধারী, ‘জইহীন্ন’ স্লোগান-দেওয়া গান্ধীবাদী বালদেও যখন স্বাধীন ভারতের নতুন বাস্তবের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে, তখন সোশালিস্ট-কমিউনিস্ট কালীচরণ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। তবে জাতপাতই সব চেয়ে বড় প্রতিবন্ধক, ডাক্তার প্রশান্তের জন্মবৃত্তান্তের ওপরেও তার ছায়া– অজ্ঞাত-পরিচয় মায়ের সন্তান তিনি, কুলশীল নিজেরই অজানা, কেবল ডাক্তার ব্যানার্জির স্ত্রী তাঁকে লালন করেন, যদিও সেই বন্ধনও টেঁকেনি পরে। তশীলদারের অসুস্থ মেয়ে কমলির সঙ্গে তার প্রেমের মধ্যেও বাধা জাতপাতের সমীকরণ।
লেখক দেখছেন– মানুষের দারিদ্র শুধু নয়, অজ্ঞতা, নিরক্ষরতা, ভুল বিশ্বাসও অন্তরায়; গ্রামের জোতখি (জ্যোতিষী), মোহান্ত অথবা পঞ্চায়েতের মোড়লরাই আধুনিক চিকিৎসার পথ আটকে দাঁড়িয়ে। কায়স্থ আর রাজপুতের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, যাদব সম্প্রদায় প্রান্তিক, অন্যদিকে কায়স্থ তশীলদাররা নিজস্ব ‘প্রশাসন’ চালিয়ে, খেত-মজুরের শোষণ করে, বাড়িয়ে তুলছে সামাজিক-আর্থিক অনন্বয়, মুখিয়ারা মধ্যস্বত্বভোগী।

উপন্যাসের ভূমিকায় লেখক বলছেন, ‘এতে ফুলের কথাও আছে, কাঁটার কথাও। যতটা ধুলো আছে, ততটা পরাগও আছে। কাদায় চন্দনে মাখামাখি হয়ে আছে… কোনো কিছুর থেকেই গা বাঁচিয়ে চলা সম্ভব হয় নি আমার।’ (বাংলা অনুবাদ থেকে) প্রশান্ত-কমলির ভালোবাসার পাশাপাশি চোখে পড়ে ‘সদ্গুরু’-র স্বপ্ন-দেখা দ্বিচারী মোহান্তর সঙ্গে কোঠারিন লছমির গূঢ় সম্পর্ক। প্রান্তিক মানুষের জমির দখল চলে যাচ্ছে সম্পন্ন কৃষক তশীলদারদের হাতে, বর্ষা আর ফসল-তোলার পর্বে তাই আতঙ্ক; বিরসা মাঝি জানে, ‘ভাদৈ ধান’ পেকেছে, তবে তশীলদারের সেপাই কেটে নেবে! জমিদারি প্রথা লোপ পেলেও অর্থনৈতিক শোষণ অথবা জমির পাট্টা নিয়ে দলাদলি চলছেই, তবু ‘ডিস্টিবোট’-এর কর্তারা নির্বাক, নেতারা উদাসীন। নিষ্ক্রিয় আমলাতন্ত্র অথবা ধর্মের নামে অনাচার নিয়ে রেণুর প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপও চোখে পড়ে, আর তা এখনও অপ্রাসঙ্গিক নয়।
অন্যদিকে, রোগ-ব্যাধি ছড়াচ্ছে গ্রাম-জুড়ে, টোলিতে টোলিতে মৃত্যু, অথচ ডাক্তার ঢেঁড়া পিটিয়ে খবর দিলেও কেউ ‘সুই’ নিতে আসবে না! গাছের তলায় টেবিল পেতে ডাক্তার, চরখা সেন্টারের ‘মাস্টারনি’, কালীচরণ ধরে বেঁধে নিয়ে আসে লোক। বাংলার সমাজ-সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ, সতীনাথ ভাদুড়ীর ব্যক্তিগত বন্ধু ফণীশ্বরনাথ রেণু মিলিয়েছেন আলো অন্ধকার।

দেশে তখন নতুন গণতন্ত্র, সামাজিক-রাজনৈতিক জাগরণেরও সময়, অন্যদিকে আধুনিক ভারত-নির্মাণ আদর্শের প্রায়-বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনগ্রসর মেরীগঞ্জ, গ্রাম-ভারতের ‘মাইক্রোজোম’ যেন। তবে আঞ্চলিক সমাজ-রাজনীতির অন্ধকারের মধ্যেও লেখক দেখছেন দিনবদলের লক্ষণ, নতুন ভারতের উদ্বুদ্ধ ভাবনার সঙ্গে তাল দিতেই। ক্ষমতার কাঠামোয় একটা ‘শিফট’ সম্ভব হচ্ছে মোহান্তের মৃত্যুর পরে মঠের কর্তৃত্ব যখন কর্মচারী রামদাসের হাতে। আবার কালীচরণ শ্রমিক, মজুরদের বোঝায়, ‘শত শত জমির মালিক কিসানের হাতে পয়সা আছে, সেই পয়সায় গরীবকে দিয়ে গরীবের গলায় ছুরি চালায় ওরা! খুব সাবধান!’ ‘উসকানির অপরাধে’ তার জেল হয়, সঙ্গে বাসুদেও, জগদেবার মতো বিপ্লবের কর্মীর; ‘স্বদেশীঅলা’ বালদেও তখন অনশনের তোড়জোড় করছে।
দলিত মানুষের, খুব আবছাভাবে হলেও একটা সংগঠিত শক্তির সূচনা, পছিয়ারিটোলা, যাদবটোলা অথবা ততমাটোলী জাগছে, আর তখনই গান্ধী-হত্যার ঘটনায় দেশ উত্তাল– অঞ্চল আর দেশের আবেগ মিলিয়ে দিলেন রেণু। অন্যদিকে, উদ্যত বন্দুক হাতে তশীলদার– ডাক্তারকে তার ‘দামাদ’ বলে মানার আগেই তাকে শেষ করবে, যদিও শেষে স্নেহের কাছে হার মানে ‘ক্ষমতা’-র দম্ভ। খেতমজুরদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণায় যেন তার প্রায়শ্চিত্তও।
আশ্চর্য নয় যে ডাক্তার প্রশান্ত থেকে যাবেন মেরীগঞ্জেই– ‘আমি আবার কাজ শুরু করব … আমার সাধনা শুরু হবে পল্লী মায়ের ময়লা আঁচলের ছায়ায় … অন্তত একটা গ্রামের একমুঠো মানুষের বুকে আশার আর বিশ্বাসের অঙ্কুর জাগিয়ে তুলব…’। গ্রামে এসেই তিনি জেনেছেন ‘মৃত্তিকামাতা’-র রূপ–
‘ভারতমাতা গ্রামবাসিনী
ক্ষেতে ক্ষেতে শ্যামসম্ভার
ধূলিমাখা ময়লা আঁচল।’ (বাংলা অনুবাদ থেকে)

এটা ঠিকই যে, দলিতের বঞ্চনা, রাজনৈতিক দুর্নীতি, দুর্বিনীত দারোগা সাহেবের দাপট, সঙ্গে অশিক্ষা আর অজ্ঞতা, সব মিলিয়ে নিয়ে এই মেরীগঞ্জ এক অর্থে দেশের স্বাধীনতার মূল-সত্তার একটা সাবভারশন। তবে ফণীশ্বরনাথ রেণু বলেছেন, তিনি ‘কাদায় চন্দনে’ মিলিয়ে নিচ্ছেন। ডাক্তার প্রশান্ত অথবা মমতার আদর্শবাদিতা, তরুণী কমলির প্রেম অথবা অগণিত নিরীহ, সাধারণ মানুষজন আঞ্চলিক জীবনের আলোকিত মুখ দেখায়। টোলা, মহল্লা, মঠ, মন্দির, পাতকুয়ো, ভোরের ‘প্রাতকী’ আর সন্ধ্যার ভজন, খঞ্জনীর গমক, পালা-পার্বণ আর ভাণ্ডারার ভিড় নিয়ে এই মেরীগঞ্জের একটা মেঠো সুরও আছে, লেখকের পুনর্নির্মাণে তা আমাদের ছুঁয়েও থাকে সারাক্ষণ।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন উমা চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved