


গার্সিয়া মার্কেজের ক্ষেত্রে নির্মাতা শুধু চারপাশ বা আখ্যানকার নন। তাঁর নিজের কথায়, কবিরাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়েছেন। যেমন হোমার তেমন পাবলো নেরুদা। কবিতাই তাঁর চালিকাশক্তি। তাঁর নোবেল পুরস্কারের ব্যাঙ্কোয়েট ভাষণের নাম তাই ‘কবিতার জন্য উল্লাস’। এই আগ্রাসী সস্তার উপন্যাসে ঠেসে থাকা বাজারে তিনি মনে করাতে চান কবিতার গুরুত্ব। বলেন, কবিতাই মানুষের অস্তিত্বের একমাত্র সঠিক প্রমাণ। কবিতার শিখর ও প্রভাব। কীভাবে কবিতা তাঁর শিরায়, কীভাবে তিনি তাঁর কুলপতির হেমন্তে বিভিন্ন কবিতা সরাসরি ব্যবহার করেছেন গদ্যের ছদ্মবেশ ধরিয়ে। কবিতায় অরুচি পাঠককে তিনি কী কৌশলে কবিতা পড়িয়েছেন তা শিক্ষণীয়।
যে প্রশ্নে শুরু করেছিলাম, লেখা কি ছড়িয়ে থাকে না লেখক তাকে তৈরি করে– গার্সিয়া মার্কেজ প্রসঙ্গে তাতে ফিরে আসা আবার। সেই মৃৎপাত্র ও মাটির প্রসঙ্গ। ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। ইতিহাস ও ভূগোল। মনে হয় মানবেতিহাসের নবীন ভূখণ্ড নতুন ধরনের লেখার সহায়ক। মনে হয়, যে অঞ্চলের লিখিত ইতিহাস কম বা নেই সেখানে সম্ভাবনা আদিম পৃথিবীরই মতো। ঔপনিবেশিক ইতিহাস আমাদের সামনে এরকম সম্ভাবনা এনে দিয়েছে অনেক। যদিও সেসব দেশের লিখিত ইতিহাস না থাকলেও প্রভুর চাপানো ভাষার তা ছিল। যা ছিল না, তা হল সংস্কারমুক্ত মন। মার্কিন দেশে যা করলেন ওয়াল্ট হুইটম্যান। পরে হেরমান মেলভিল। ইস্পানো আমেরিকা সেই সংস্কার ঝেড়ে ঘুরে দাঁড়াল পাবলো নেরুদার হাতে, আখ্যানে আলেখো কার্পেন্তিয়ের পথ দেখালেও তাঁর স্তম্ভপ্রতিম পাণ্ডিত্য পুরোপুরি রাস্তায় নেমে আসতে কোথাও যেন বাধা দিচ্ছিল। আর সেই বাধাটাই অতিক্রম করলেন গার্সিয়া মার্কেজ। তিনি নিজে বলেছেন, নানাভাবে, কী কষ্টকর সেই মুক্তি। আর তাই তো তিনি প্রথম! তিনিই ইস্পানো আমেরিকার হোমার বা বাল্মীকি। পাবলো নেরুদা যে কাজ শুরু করেছিলেন কবিতায়, সে কাজ এল আখ্যানে। কারণ তাঁর আগে বিচ্ছিন্ন চেষ্টা হলেও, তিনিই প্রথম সাহেবদের হাতে ভাষা হারানো মহাদেশের মহাকাব্য লিখলেন, সে অঞ্চলের নিজস্বতায়। বেরবেন সেই ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে, সেই আখ্যান পরিধি, যাকে মিলান কুন্দেরা চিহ্নিত করবেন ‘দ্য আর্ট অফ দ্য নভেল’ বলে। এই আর্টের আগের আর্টিকেলটি ইউরোপীয় ধরনকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত, যে আর্টের ঈশ্বর এক স্পেনীয়, মিগেল দে সের্বান্তেস, যাঁর হাতে উপন্যাস নামক শিল্পের জন্ম। কী আশ্চর্য! সেই একই ভাষা ঔপনিবেশিক সূত্রে হাত ফেরতা পেলেন গার্সিয়া মার্কেজ, প্রথম গল্প ছাপা বিশ শতকের চারের দশকে। ১৬০৫ থেকে ১৯৪৭, স্পেনীয় ভাষা ততদিনে আমেরিকা থেকে পাবলো নেরুদা, সেসার বাইয়েখোকে পেলেও ভাবতে পারেনি, এভাবে আমেরিকার নিজস্বতায় মহাকাব্যিক গদ্য লেখা হবে।

গার্সিয়া মার্কেজ নিজে বলেছেন বারবার কীভাবে চেষ্টা করেছেন, কিভাবে সেই ১৭ বছর বয়সে লেখা ‘বাড়িটা’ নামক উপন্যাসের ব্যর্থ চেষ্টা থেকে ‘নীল কুকুরের চোখ’, ‘বড়মার শেষকৃত্য’, এমনকী ‘পাতাঝরা’ নামক এক ছোট উপন্যাস লিখে শেষে হাল ছেড়েছিলেন, যেন কোনওদিন লেখা যাবে না ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’।
বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন কীভাবে গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর ঠাকুর্দার কর্নেল নিকোলাস রিকার্দো মার্কেজ মেখিইয়ার পেনশন না আসা, কীভাবে এক ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি শোষিত গ্রামে কাটানো শৈশবের প্রভাব তাঁর লেখায়। কিন্তু তিনি নিজে কী বলেছেন? বলেছেন এক অস্থিরতার কথা। অস্থিরতা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল ছোটবেলার দিকে। বলেছেন নিঃসঙ্গতার একশ বছর আসলে তাঁর নিজের ছোটবেলার ঘটনাবলি যা তাঁর জীবনে গভীর ছাপ রেখেছে– তার কাব্যিক উন্মোচন। যদিও তাঁর সমালোচকেরা আবিষ্কার করে নিয়েছিলেন অন্য জগতের ছাপ।

আর ছিল প্রস্তুতি– উইলিয়াম ফকনার, সেই মার্কিন ঔপন্যাসিক, যিনি ইয়াকনাপটাফা কাউন্টি নামক এক অলীক রাজ্য নির্মাণ করে মার্কিন দেশের নবীন ভাষ্য দেন। দু’জন লেখক, মূলত উইলিয়াম ফকনার ও ফ্রানজ কাফকা, সঙ্গে ভার্জিনিয়া উলফ ও আরনেস্ট হেমিংওয়ে তাঁকে চালিত করেন। বন্ধুরা জানাচ্ছেন গার্সিয়া মার্কেজ কৈশোর থেকেই দান্তের ভক্ত। গোগ্রাসে পড়েছেন দিভিনা কোমেদিয়া। সব কিছু ছাড়িয়ে ইয়াকনাপটাফা নামক এক কল্পদেশ, যা কি না গার্সিয়া মার্কেজকে তাঁর মাকন্দ নির্মাণে প্রেরণা দেবে, তিনি সাহস পাবেন নিজস্ব মহাকাব্যিকতার।
সমস্ত ঘটনা পরম্পরা যেন তাঁকে এগিয়ে দিচ্ছিল এ নবীনতা সন্ধানে, এক চূড়ান্ত আকস্মিকতায় লেখা হয়েছিল নিঃঙ্গতার একশ বছর। এক ছুটিতে স্ত্রী-পুত্রদ্বয়কে নিয়ে মেখিকোর আকাপুল্কো যাবার পথে হঠাৎই আবিষ্কার করে নেন সেই আঙ্গিক। গাড়ি ঘুরিয়ে মেখিকো শহরে ফেরত আসা, পরে গাড়ি বেচে স্ত্রী মেরসেদেস-এর হাতে তুলে দেওয়া ছ’মাস চলার মতো টাকা। কিন্তু ১৮ মাস লেগেছিল শেষ করতে। নিঃসঙ্গতার একশো বছর। সংসার কী করে চলেছে, জানেন অন্নপূর্ণা মেরসেদেস। কিন্তু শেষ হয়েছে মহাকাব্য। তখন জানা ছিল না কী হবে তার গতি। গতি হয়নি। বিখ্যাত প্রকাশকরা ফিরিয়ে দিয়েছেন। এক অধ্যাপক দাগিয়ে জানিয়েছেন তাঁর স্পেনীয় ভাষা ভালো করে শেখা দরকার। এইসব কারণে গারসিয়া মার্কেজ সারাজীবন অধ্যাপকদের পাত্তা দেননি কোনওদিন। বেশ শ্লেষভরে কথা বলেছেন বহুবার তাঁদের বিরুদ্ধে। সেই না ছাপা পাণ্ডুলিপি পড়েছিলেন বন্ধুরা। তরুণ কার্লোস ফুয়েন্তেস, তরুণ কবি আলবারো মুতিস– এঁরা। ফুয়েন্তেসই সাহস করে পাঠিয়েছিলেন অগ্রজ খুলিও কোর্তাসারের কাছে। কোর্তাসারের নোট পেয়ে ছাপা হয় সেই মহাগ্রন্থ। (এ ঘটনার বিস্তৃত বর্ণনা আছে স্পেনীয় ভাষা আকাদেমি, রেয়াল আকাদেমিয়া এস্পানিওলার ছাপা বিশেষ স্মারক সংকলনের ভূমিকায়।) ১৯৬৭ সালে বেরিয়েছিল প্রথমবার সে বই।

ধাপে ধাপে পৌঁছনো এক মহৎ লেখার কাছে, তাকে লিখে ফেলা, প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে স্বীকৃতি অর্জন। যে লেখাপ্রবাহের ফলে এই স্বীকৃতি, তার বাইরের লেখালেখিতে কেমন তিনি? সাধারণত দেখা যায় সফল লেখক নিজের বানানো খোলস ছেড়ে বেরতে পারেন না, এমনকী স্বল্প-স্বীকৃত লেখকও তাঁর চেনা গণ্ডির বাইরে সহজে পা ফেলেন না। গার্সিয়া মার্কেজ এখানেও এক ব্যতিক্রম। বিশিষ্ট গারসিয়া মার্কেজ বিশেষজ্ঞ ও জীবনীকার দাসসো সালদিবার জানিয়েছেন গার্সিয়া মার্কেজের লেখনকে ১০টি গ্রন্থে চিহ্নিত করা যায়। নৌকাডুবির গল্প (১৯৫৫-১৯৭০, খবরের কাগজের রিপোর্ট হিসেবে লেখা, প্রকাশক জোটেনি ১৯৭০ অবধি), কর্নেলকে চিঠি লেখার কেউ নেই (১৯৫৮-’৬১, লেখার পরে প্রকাশক জোটেনি, কবি বন্ধু গাইতান দুরান প্রথম ছাপেন তাঁর ‘মিতো’ নামক ছোট কাগজে, ১৯৬১ সালে এক অনামী প্রকাশক ছাপেন), বড়মার শেষকৃত্য (১৯৬২), নিঃসঙ্গতার একশ বছর (১৯৬৭), সরল এরেন্দিরা ও তার নিদয়া ঠাকুমার করুণ কাহিনি (১৯৭২), কুলপতির হেমন্ত ( ১৯৭৫), ঘোষিত মৃত্যুর ধারাবিবরণী (১৯৮১), কলেরার দিনগুলিতে প্রেম (১৯৮৫), গোলকধাঁধায় সেনাধ্যক্ষ (১৯৮৯), প্রেম ও অন্যান্য রাক্ষস (১৯৯৪)। এই গ্রন্থগুলি তাঁর লেখার বাঁক ও বদল চিহ্নিত করে। লেখার পরিধি ও বিস্তার অনেক সময় পরস্পরকে স্পর্শ করলেও (বিশেষত মাকন্দ নামক কল্পলোকের) ভাষা আলাদা, নিজেকে কখনওই এক ভাষায় বাঁধেননি তিনি। হয়ত তাঁর শৈলী তাঁকে চিনিয়ে দেয় সহজে, কিন্তু নিঃসঙ্গতার একশ বছরের দীর্ঘ বাক্যবিন্যাস যখন সম্পূর্ণ কাব্যিক কুলপতির হেমন্তে পড়ল, তার ভাষাবদল নজরে পড়ার মতো। তাঁর মাগনুম ওপুস যদি নিঃসঙ্গতার একশ বছর হয়, তাহলে তিনি হেলায় ছেড়ে এসেছেন সেই ভাষা। যা যে কোনও আঙ্গিকের লেখকের কাছে শিক্ষণীয়।

গার্সিয়া মার্কেজের রাজনীতি নিয়ে না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ। কারণ তিনি সারাজীবন রাজনৈতিক। কৈশোরে বামপন্থায় পরিশীলিত গার্সিয়া মার্কেজ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপ দেখে সোচ্চার হয়েছিলেন, সেসব দেশের সমাজব্যবস্থা দেখে। তাঁর মনে হয়েছিল কোথাও ভুল আছে। অথচ এক জ্যান্ত স্ববিরোধ থেকে যায় ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব নিয়ে। যখন গোটা কিউবা (Cuba) ফিদেলের অত্যাচারে ধ্বস্ত, দারিদ্র সীমা ছাড়িয়েছে, দেশের মানুষ যে কোনও মূল্যে দেশ ছাড়ছেন, আত্মহত্যা করছেন লেখক রেইনালদো আরেনাস, কিউবার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও লেখক হোসে লেসামা লিমা (যিনি গার্সিয়া মার্কেজের নিজের প্রিয় লেখকদের একজন) প্রতিবিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য নিষিদ্ধ হচ্ছেন, গার্সিয়া মার্কেজ নিজে লেখক নরবেরতো ফুয়েন্তেসকে কিউবা থেকে বের করে আনার জন্য ফিদেলের সঙ্গে দরবার করছেন, তবুও তিনি সারাজীবন ফিদেলের বিরুদ্ধে একটা শব্দও কোথাও লেখেননি। আধুনিক আমেরিকা মহাদেশের ইতিহাসে ফিদেল কাস্ত্রো ঘৃণ্য পাঁচজন স্বৈরাচারী শাসকের একজন হিসেবে সবাই মেনে নিলেও নয়। কিউবার জনসংখ্যার শুধুমাত্র থেকে যেতে বাধ্য হয়েছে এমন বাদে আর কেউ দেশে নেই, পালিয়েছে যেভাবে হোক। তবুও গার্সিয়া মার্কেজ একটাও কথা বলেননি। জেরাল্ড মার্টিনের ইংরেজিতে লেখা গার্সিয়া মার্কেজের জীবনীতে লেখা আছে এই বন্ধুত্বের এক মনোবিশ্লেষণ। গার্সিয়া মার্কেজের ক্ষমতাবান পুরুষের প্রতি আকর্ষণের দিক।

কুলপতিদের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণদের মধ্যে অন্য চেহারা দিলেও, কোনও পাঠক তাঁর অবদান অস্বীকার করতে পারবে না। তিনিই এস্পানিওল ভাষার সাহিত্যের ইস্পানো আমেরিকার প্রথম আবিষ্কারক আখ্যানকার।
শুরু করেছিলাম গ্রন্থ নির্মাণ দিয়ে, কীভাবে গ্রন্থের কাছে পৌঁছনো যায়, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ঘটনাপ্রবাহ দেখতে গিয়ে মনে হয় গ্রন্থ নির্মাণের ধাপগুলি ছড়ানো থাকে, নিহিত বীজ লেখক নিজের নির্মাণেই বৃক্ষ গড়ে তোলেন। গার্সিয়া মার্কেজের ক্ষেত্রে সেই নির্মাতা শুধু চারপাশ বা আখ্যানকার নন। তাঁর নিজের কথায়, কবিরাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়েছেন। যেমন হোমার তেমন পাবলো নেরুদা। কবিতাই তাঁর চালিকাশক্তি। তাঁর নোবেল পুরস্কারের ব্যাঙ্কোয়েট ভাষণের নাম তাই ‘কবিতার জন্য উল্লাস’। এই আগ্রাসী সস্তার উপন্যাসে ঠেসে থাকা বাজারে তিনি মনে করাতে চান কবিতার গুরুত্ব। বলেন, কবিতাই মানুষের অস্তিত্বের একমাত্র সঠিক প্রমাণ। কবিতার শিখর ও প্রভাব। কীভাবে কবিতা তাঁর শিরায়, কীভাবে তিনি তাঁর কুলপতির হেমন্তে বিভিন্ন কবিতা সরাসরি ব্যবহার করেছেন গদ্যের ছদ্মবেশ ধরিয়ে। কবিতায় অরুচি পাঠককে তিনি কী কৌশলে কবিতা পড়িয়েছেন তা শিক্ষণীয়। সেখানেই আসে তাঁর নির্মাণ কৌশল। তাঁর শৈলী।

আর সে নির্মাণ জাতিসত্তার সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছে, তাই তিনি জাতীয় লেখক হয়ে ওঠেন। সেখানে জাতিসত্তা শুধু একটা দেশে আবদ্ধ নয়, জাতি মানে মানব, জাতিসত্তা মানে মানবসত্তা। সেখানে উপাদান দেশজ, উপাদান নিজের ভাষার, সেই উপাদান বিশ্বমানবের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। সেখানেই তিনি সবার। অনুবাদেও সমান গ্রাহ্য। যেমনটা ঘটেছিল পাবলো নেরুদা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্তাভিও পাজ বা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ক্ষেত্রে। এবং সেখানে তিনি নিঃসঙ্গই, নিজের ভাষায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved