Robbar

প্রতিভা নয়, অসুখ!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 29, 2026 12:22 pm
  • Updated:July 29, 2026 12:46 pm  

সিয়েন অসাধারণ মডেল। যেভাবে ভিনসেন্ট চায়, সেভাবে পোজ দিতে পারে। আবরণ সরিয়ে যতদূর চাও, যতক্ষণ চাও, নিরাবরণ থাকতে আপত্তি নেই সিয়েনের। সিয়েনকে মডেল করে ভিনসেন্ট উত্তীর্ণ হল একদিন তার স্বপ্নপূরণের ছবি ‘Woman Sitting on a Basket with Head in Hands’-এ। এক হেরে-যাওয়া নিঃসঙ্গ নারীর ছবি। তার সমস্ত অঙ্গ ঢাকা কালো পোশাকে। শুধু গাল আর ঘাড়ের একটি অংশ দৃশ্যমান

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

১০৪.

কেউ বলছে ‘লেটেন্ট এপিলেপসি’। কেউ বলছে, ‘লার্ভাল এপিলেপসি’, যে ব্যাধি লুকিয়ে থাকে কয়েক মাস, তারপর আকস্মিক আক্রমণ করে! কেউ একটু আধুনিক ভাষায় বলছে, ‘মাস্কড এপিলেপসি’, মুখোশপরা মৃগীরোগ। ওই মানুষটা উন্মাদের মতো যে-সব বিকৃত-অশ্লীল ছবি আঁকছে, বেশ্যাদের মডেল করে, উলঙ্গ মেয়েদের ছবি আঁকছে বা কিম্ভূত ফুলের ছবি, বা বাঁকাচোরা গাছের ছবি, তাদের মধ্যে ওই মানুষটার প্রতিভা নয়, ওর অসুখেরই প্রকাশ। মানুষটা অভিশপ্ত। ওর সঠিক জায়গা পাগলা-গারদ!

প্রিজনার’স রাউন্ড, ১৮৮৯

এই আপাত উন্মাদ বা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষটি মারা যান ১৮৯০ সালের ২৯ জুলাই। জন্মেছিলেন ১৮৫৩-র ৩০ মার্চ। অবসান মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। এই বছর তাঁর রহস্য মৃত্যুর ১৩৬-তম বার্ষিকী। তিনি রবীন্দ্রনাথের থেকে আট বছরের বড়, প্রায় সমসময়ের মানুষ।

প্রথমেই তাঁর রহস্যমৃত্যুর কাহিনি: ১৮৯০-এর ২৭ জুলাই, রবিবার। মানুষটা সারা সকাল ফ্রান্সের এক গ্রামে খোলা আকাশ আর উন্মুক্ত ভূমির পরিবেশে প্রাণ ভরে ছবি এঁকেছে। তারপর দুপুর বেলার খাবার খেতে ফিরেছে সেই সরাইখানায়, যেখানে সে থাকে। তারপর আবার সে বেরয় ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে, সোজা চলে যায় একটা ফাঁকা গম-খেতে। এরপর ওই মানুষটা, ২৭ জুলাই ওই ‘Ravoux’ সরাইখানায় ফিরে আসছে পেটে একটা গর্ত নিয়ে। রিভলবারের বুলেটের গর্ত। কে তাঁকে গুলি করল? পুলিশকে ওই পাগলাটে মানুষটা বলল, ‘আমি নিজেই নিজেকে গুলি করেছি।’ পুলিশ প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি জানো না আত্মহত্যা আইনের চোখে অপরাধ?’ ওই মানুষটার উত্তর, ‘আমিই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। অন্য কেউ নয়।’ আশ্চর্যের ব্যাপার, কোনওদিন খুঁজে পাওয়া গেল না সেই রিভলভার! এবং মানুষটির আঁকার সরঞ্জামও সব উধাও।

এতক্ষণ যে মানুষটার রহস্যজনক ব্যাধি এবং মৃত্যুর কথা লিখলাম, তিনি জগৎবিখ্যাত ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গখ!

ভ্যান গখ,আত্মপ্রতিকৃতি , ১৮৮৮

তাঁর জীবনকালে তিনি বিখ্যাত হতে পারেননি। এবং সারা জীবন তাঁর দুঃখে ও দারিদ্রে কেটেছে। কেটেছে অবহেলায়, অপমানে, অবজ্ঞায়, অপ্রেমে। এখন অবশ্য তাঁর ছবি কিনে ঘরে টাঙিয়ে রাখার মতো ধনী পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। তাছাড়া, তাঁর অধিকাংশ ছবি এখন পৃথিবী-জুড়ে আর্ট মিউজিয়ামের সম্পত্তি। কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

‘ভ্যান গখ: দ্য লাইফ’ নামে এই অনন্য শিল্পীর জীবনী লিখেছেন দুই স্কলার যৌথভাবে: Steven Naifeh এবং Gregory White Smith। তাঁরা এই শিল্পীর মৃত্যু-প্রসঙ্গে যা বলেছেন:

Surprisingly little is known about the incident that led to Vincent Van Gogh’ s death at the age of thirty-seven. All that can be said with certainty is that he died of a gunshot wound that he sustained in or near the town of Auvers, about twenty miles north of Paris, on July 27, 1890. The injury occurred sometime after he had lunch at the inn where he was staying and then left on a painting excursion loaded down with equipment. He returned to the Revoux Inn just after suppertime with a bullet hole in his upper abdomen. He called for medical assistance but the injury was fatally severe. He died approximately thirty hours later.
No physical evidence of the shooting was ever produced. No gun was ever found. None of the painting equipment that Vincent took with him from the Revoux Inn– easel, canvas, paints brushes, sketchbooks– was ever recovered. The location of the shooting was never conclusively identified.’

ভিনসেন্ট আর থিও, দাদা এবং ভাই। থিও দাদার মতো খামখেয়ালি নয়। কিন্তু দাদার বেপরোয়া ভাবটা তার ভালো লাগে। ভালো লাগে দাদার ইন্টেলেক্ট এবং ছবি আঁকার প্রতিভা। এক কথায় সে দাদার প্রতিভায় মুগ্ধ। তবে দাদার খ্যাপামিকে থিও ভয় পায়। দাদা যখন-তখন যা খুশি করে ফেলতে পারে।

করিডোর ইন দ্য অ্যাসাইলাম, ১৮৮৯

ক্ষণে ক্ষণে দাদার মুড পরিবর্তন হয়। এই আনন্দে ভেসে যাচ্ছে ভিনসেন্ট। পরক্ষণেই সে গভীর বিষাদে ডুবে যাচ্ছে। এমনকী আত্মহত্যার কথা ভাবছে। থিওর একটা গভীর কষ্টের জায়গা মা অ্যানার সঙ্গে দাদার ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠা সম্পর্ক। থিওর যা কিছু ভালো লাগে দাদা ভিনসেন্টের মধ্যে, যেমন দাদার বিচিত্র বিষয়ে উৎসাহ এবং জানার ইচ্ছে, প্রকৃতির মধ্যে দাদার চোখ এমন সৌন্দর্য দেখতে পায়, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। রাতের মহাকাশের দিকে তাকিয়ে দাদার উন্মাদনা, আর ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে দাদার বেপরোয়া পাগলামি, এই সব কিছু থিওর ভালো লাগে। আর মা দাদাকে ঘেন্না করে এই সবকিছুর জন্যই। মায়ের সব থেকে অপছন্দ দাদার আঁকা ছবি। দাদা যে মানসিকভাবে সুস্থ নয়, সেটা না কি মা বুঝতে পেরেছে দাদার আঁকা গাছ, ফুল, আকাশ, নদী আর নারী দেখে। পাগলের আঁকা ছবি, এই কথাটা তো প্রথম রটিয়েছে মা। এবং মায়ের ব্যবহারে তো ভিনসেন্ট ক্রমশ বিষাদগ্রস্ত, এপিলেপটিক হয়ে পড়ছে, বুঝতে পারছে থিও। শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় এল, ভিনসেন্টকে বারবার যেতে হচ্ছে উন্মাদ অ্যাসাইলামে। বেশিরভাগ উন্মাদ-আশ্রম চালায় যাজকরা। ডাক্তারদের প্রতিপত্তি সেখানে কম। থিওকে ভিনসেন্ট জানিয়েছে, কিছু কিছু উন্মাদ-আশ্রম তার ভালো লেগেছে দুটো কারণে। এক, সেখানে পাওনাদারদের অত্যাচার আর সুদের তাগাদা নেই। দুই, শান্তিতে ছবি আঁকা যায়। তবে একটা বড় অসুবিধে। রাত্রে বেরতে দেওয়া হয় না। সুতরাং, রাতের আকাশ দেখার উপায় নেই। তবে আরও একটা অসুবিধের কথা থিওকে জানায়নি ভিনসেন্ট। উন্মাদ-আশ্রমে বেশ্যা মেয়েদের নিয়ে আসা যায় না মডেল করে ন্যুড ছবি আঁকার জন্য। আরও অনেক কিছুই থিওকে জানাতে পারেনি ভিনসেন্ট, যেমন তার সিফিলিসের কথা। তবে একেবারে জানাতে পারেনি, তাও নয়। থিওকে বলেছে, দ্যাখ, প্যারিসে আমাদের জীবন এখন এইরকম, Well, we have set the pace in drinking, absinthe in the afternoon, wine with dinner, free beer at the cabaret and my personal favourite, cognac, anytime. And to treat our winter depression we need women who will stimulate blood circulation. এই অবস্থায় সিফিলিস হতেই পারে। তবে একটা ভালো কথা হল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, once you have caught it, you will never catch it again.

ভ্যান গখের আঁকা ‘সরো’ (১৮৮২)

কিন্তু সিফিলিসের ব্যাপারটা কি অত হালকামির মেজাজে নেওয়া যায়, যদি দুই ভাই একই মেয়ের প্রেমে পড়ে? ভিনসেন্ট ৩৪ বছর বয়েসে একটা অদ্ভুত সেক্স-গেম খেলতে শুরু করল। পরপর অনেকগুলো সেলফ পোর্ট্রেট এঁকে ফেলল। এইরকম তাদের বর্ণনা: Stripped of silks and satins, the figure in the mirror appears in the limp, tattered smock of an artist, his hair cropped short, his cheeks sunken, his gaze colourless, unfocussed, affectless. For all the sun flooding into his studio, Vincent stands against the dark, murky background of a prison cell.

ভিনসেন্ট নিজে লিখছে এই সেলফ পোর্ট্রেট নিয়ে: আমি খুব চেষ্টা করছি তাড়াতাড়ি একটা ছোটখাটো দেখতে খারাপ বুড়ো মানুষে রূপান্তরিত হতে। ভিনসেন্ট যেন শুনতে পেয়েছে, তার আঁকার ইজেল তাকে বলছে, progress fast towards growing into an ugly old man with wrinkles, a tough beard, number of false teeth and so on. থিওকে তো ভিনসেন্ট একদিন জানিয়েই দিল, আমি এই বয়সেই খুব বুড়ো হয়ে গেছি জানিস, আর শরীরটাও ভেঙে গেছে।

ভ্যান গখের আঁকা ভাই থিও-র প্রতিকৃতি

ভিনসেন্ট এক শরীর-ভাঙা বুড়োয় রূপান্তরিত হয়ে হাত বাড়াল ভাই থিওর রক্ষিতার দিকে, সূক্ষ্মভাবে। বলল, আমার স্টুডিওতেই আমরা তিনজনে একসঙ্গে আঁকব। তাতে উৎসাহ বাড়বে। হঠাৎ থিও একদিন বলল, ভাবছি বিয়ে করে ফেলি। সঙ্গে সঙ্গে ভিনসেন্ট বলল, আমাদের দু’জনেরই একটা বউ পাওয়া উচিত। ভিনসেন্ট ততদিনে সম্ভবত থিওর রক্ষিতার মন কিছুটা ভিজিয়েছে। সাহস করে বলে দিল, দু’জনে একটা মেয়েকে বিয়ে করলে কেমন হয়। এটা না করলে দুই ভাইয়ের সম্পর্কে তো চিড় ধরবে। আর তখুনি থিওর মনে ঘনিয়ে এল সিফিলিসের সংকট।

এরপর আর এক মডেল এল দুই ভাইয়ের জীবনে। সুন্দরী জো বঙের। থিও বলে বসল, আমার মন থেকে তো মেয়েটাকে সরাতেই পারছি না। আমারও সেই অবস্থা, বলল ভিনসেন্ট। ৩৪ বছর বয়সে শরীর গেছে। কিন্তু খিদে বেড়েছে। বিয়ে করলে একসঙ্গে করব, ওকেই। জানি এটা অসামাজিক ব্যাপার। কিন্তু আমার মধ্যেকার শিল্পী ওটাই চাইছে, I shall continue to have the most impossible and highly unsuitable love affairs, ইজেলের গায়ে এক টুকরো কাগজের গায়ে এই মারাত্মক বাক্যটি বোনকে লিখল ভিনসেন্ট। এবং এই চিঠি লেখার ক’দিনের মধ্যে তার জীবনে এল উল্কার মতো অ্যাসনিআরেস, বয়সে ভিনসেন্টের থেকে বেশ বড়। তাঁকে ‘কাউন্টেস’ বলে ডাকতে শুরু করল অসামাজিক, পাপবিদ্ধ প্রেমের প্রার্থী ভিনসেন্ট। একটার পর একটা ছবি কাউন্টেসকে উপহার দিল ভিনসেন্ট। তারপর লিখল, বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার সঙ্গে সত্যি কোনও সম্পর্ক হয়েছে বলে। ভয় করছে, ইলিউশন নয় তো?

না, ইলিউশন নয়। যাদের এতদিন খুঁজছিলাম, যাকে চাইছিলাম, সব পেয়েছি। ভিনসেন্ট তার ইজেলটার ওপরে কাগজ রেখে ভাইকে লিখল, থিও, এরা খুব গরিব, আমি এদের দেখাশোনার ভার নেব, মেয়েটা খুব গরিব, যাকে আমার মডেল হিসেবে পছন্দ, splendidly willing, a prostitute, ওকেই বিয়ে করব হয়তো। নাম সিয়েন হুরনিক।

সিয়েন অসাধারণ মডেল। যেভাবে ভিনসেন্ট চায়, সেভাবে পোজ দিতে পারে। আবরণ সরিয়ে যতদূর চাও, যতক্ষণ চাও, নিরাবরণ থাকতে আপত্তি নেই সিয়েনের। সিয়েনকে মডেল করে ভিনসেন্ট উত্তীর্ণ হল একদিন তার স্বপ্নপূরণের ছবি ‘Woman Sitting on a Basket with Head in Hands’-এ। এক হেরে-যাওয়া নিঃসঙ্গ নারীর ছবি। তার সমস্ত অঙ্গ ঢাকা কালো পোশাকে। শুধু গাল আর ঘাড়ের একটি অংশ দৃশ্যমান। ওই দৃশ্যমানতা ধারণ করে আছে যুগ-যুগান্তরের পরাজয়ের সৌন্দর্য, অসহায় কান্নার শক্তি!

মোর্নিং উওম্যান সিটেড অন আ বাস্কেট (১৮৮৩)

সিয়েন! আলতো স্বরে ডাকে ভিনসেন্ট। সিয়েন ঘাড় তুলে তাকায় ভিনসেন্টের দিকে। তার গাল বেয়ে নামছে চোখের জল। গত বছর এপ্রিল মাসে পেনসিল আর কালি দিয়ে তোমার যে ছবিটা এঁকেছিলাম, নাম দিয়েছিলাম ‘দুঃখ’, এই দেখ সেই ছবি। এই সদ্য আঁকা ছবিটার পাশে রাখলাম। এরা পরস্পরকে সম্পূর্ণ করল সিয়েন। এই ছবিতে তুমি সম্পূর্ণ নগ্ন। এখানেও মাথা নিচু করে নারীর হেরে যাওয়ার ছবি। এই দুটো ছবি হয়তো একদিন একসঙ্গে বিক্রি হবে। আমার কোনও ছবিই বিক্রি হয় না সিয়েন। কী হবে আর ছবি এঁকে?

তুমি ছবি আঁকা বন্ধ করলে আমরা যে না খেয়ে মরব। আমার বাচ্চাটার কী হবে? আমাকে আবার আমার পুরনো ব্যবসায় ফিরে যেতে হবে। আমার শরীর তোমার কাছ থেকে যা পেয়েছে, তার পরে আর….

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য লেখা

………………….