Robbar

রিয়ার-ভিউ মিররে, একা…

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 30, 2026 9:02 pm
  • Updated:July 30, 2026 9:02 pm  

‘Taxi Driver’ তাই কেবল একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের গল্প, যে সমাজ একজন মানুষের ভেতরের ভাঙনকে দেখতে পায় না, যতক্ষণ না সেই ভাঙন কোনও দৃশ্যমান বিস্ফোরণে পরিণত হয়। যে সমাজ কখনও একজন মানুষকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে, আবার কখনও তার কোনও একটি কাজের জন্য হঠাৎ তাকে নায়ক বানিয়ে দেয়।

 

যোগমায়া নস্কর

“Loneliness has followed me my whole life. Everywhere. In bars, in cars, sidewalks, stores, everywhere. There’s no escape. I’m God’s lonely man.”

একজন মানুষ যখন বলে, ‘একাকিত্ব সারাজীবন আমার পিছু নিয়েছে’, তখন আমরা কি সত্যিই তার কথা শুনি? না কি ভিড়ের মধ্যে তাকে দেখে, তার অস্বস্তিকে ‘অদ্ভুত’ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাই?

মার্টিন স্করসেসি-র ‘Taxi Driver’ (১৯৭৬) এমনই এক মানুষের গল্প– ট্রাভিস বিকল। নিউ ইয়র্কের রাতের রাস্তায় ট্যাক্সি চালানো এক প্রাক্তন মেরিন। তার গাড়ির জানলার ওপারে ছুটে চলে এক বিশাল শহর; আর জানলার এপারে বসে থাকে এমন এক মানুষ, যে ধীরে ধীরে নিজের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। শহরটি তার চারপাশে ক্রমাগত কথা বলে, অথচ তার সঙ্গে সত্যিকারের কথা বলার মতো কেউ নেই।

ট্রাভিসের ঘুম আসে না। তাই রাতের পর রাত সে ট্যাক্সি চালায়। বৃষ্টি-ভেজা নিউ ইয়র্কের রাস্তায় সে দেখে অপরাধ, মাদক, যৌন ব্যবসা, হিংসা আর অসংখ্য অপরিচিত মুখ। শহরটাকে তার কাছে ক্রমশ পচে যাওয়া এক জগতের মতো মনে হয়। তার মনে হয়, একদিন প্রবল বৃষ্টি এসে এই সমস্ত নোংরামি ধুয়ে নিয়ে যাবে।

কিন্তু ট্রাভিসের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত অন্যত্র– সে কি সত্যিই শহরকে ঘৃণা করে, না কি নিজের একাকিত্ব, হতাশা এবং বিচ্ছিন্নতাকে শহরের ওপর প্রতিফলিত করে?

ট্রাভিস মানুষের কাছে যেতে চায়। কিন্তু মানুষের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়– সে জানে না। বেটসির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে বেটসির মধ্যে এমন এক স্বাভাবিক, পরিচ্ছন্ন জীবনের ছবি দেখতে পায়, যে জীবন থেকে সে নিজেই অনেক দূরে সরে গিয়েছে। সে সম্পর্ক চায়, কিন্তু তার আচরণে সেই স্বাভাবিকতার অভাব। তার অস্বস্তি, সামাজিক অক্ষমতা এবং বিচ্ছিন্ন মানসিকতা শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটিকে ভেঙে দেয়। ট্রাভিস আবার ফিরে যায় তার একাকিত্বের কাছে।

ট্রাভিস বিকল চরিত্রে রবার্ট ডি নিরো

এখানেই ‘Taxi Driver’ আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে– একাকিত্ব শুধুই একা থাকা নয়; কখনও কখনও মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একজন মানুষ সম্পূর্ণ একা হয়ে যেতে পারে।

বেটসির সঙ্গে সম্পর্কে ব্যর্থতার পর ট্রাভিসের ভিতরের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়। তার জীবনে আসে আইরিস– এক অল্পবয়সি মেয়ে, যে যৌন ব্যবসার অন্ধকার জগতে আটকে পড়েছে। ট্রাভিস তাকে উদ্ধার করতে চায়। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়– সে কি সত্যিই আইরিসকে বাঁচাতে চায়, না কি অন্য একজনকে উদ্ধার করার মধ্যে দিয়ে নিজের অর্থহীন জীবনকে কোনও অর্থ দিতে চায়?

হয়তো দুটোই।

ট্রাভিসের জীবন তখন স্বাভাবিকতার সীমা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। সে শরীরচর্চা করে, অস্ত্র সংগ্রহ করে, নিজের চেহারা বদলে ফেলে। ধীরে ধীরে তার মনে জন্ম নেয় এক বিপজ্জনক ধারণা– এই নোংরা পৃথিবীকে পরিষ্কার করার দায়িত্ব যেন তারই।

এখানেই ‘Taxi Driver’ একটি ব্যক্তিগত গল্প থেকে সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়।

একজন মানুষ যখন নিজেকে সমাজের বিচারক ভাবতে শুরু করে, তখন তার একাকিত্ব আর শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক। ট্রাভিস একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে তার সমস্ত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সেই অন্ধকার জগতের ওপর, যেখানে আইরিস আটকে আছে।

তারপর আসে হিংসা। রক্তপাত। মৃত্যু।

ট্রাভিস আইরিসকে উদ্ধার করে। আর তারপর ঘটে সিনেমাটির সবচেয়ে অদ্ভুত এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও ছিল এক বিপজ্জনক, হিংস্র ব্যক্তি– সংবাদপত্রের চোখে সে হয়ে ওঠে নায়ক। সমাজ তাকে স্বীকৃতি দেয়। তার কাজকে সাহসিকতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ দর্শক জানে, সেই নায়ক হয়ে ওঠার পথটি রক্তে ভেজা।

তাহলে ট্রাভিস কি সত্যিই নায়ক?

না কি সমাজ কখনও কখনও একজন মানুষের কাজকে তার মানসিক অন্ধকার থেকে আলাদা করে দেখে? আমরা কি কখনও কোনও মানুষের ভিতরের ভাঙন না বুঝেই তার শেষ কাজের ভিত্তিতে তাকে বিচার করি?

সিনেমার শেষদিকে ট্রাভিস আবার ট্যাক্সির স্টিয়ারিং-এ বসে। শহর আগের মতোই ছুটছে। মানুষ আসছে, যাচ্ছে। আলো জ্বলছে, নিভছে। আর ট্রাভিস রিয়ার-ভিউ মিররে তাকায়।

সেই মুহূর্তে মনে হয়– কিছু কি সত্যিই বদলেছে?

বেশভূষা পালটানোর পর ট্রাভিস

হয়তো ট্রাভিস বদলায়নি। শুধু সমাজের চোখে তার পরিচয় বদলে গেছে।

এই কারণেই ‘Taxi Driver’ আজও এত প্রাসঙ্গিক। কারণ ট্রাভিস শুধু ১৯৭৬-এর নিউ ইয়র্কের মানুষ নয়। সে আমাদের চারপাশের সেই মানুষ, যে প্রতিদিন মানুষের ভিড়ে থেকেও একা। যে নিজের কথা কাউকে বলতে পারে না। যে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে একটি আলাদা পৃথিবী তৈরি করে নেয়।

আজকের পৃথিবীতে আমরা আগের চেয়ে বেশি ‘connected’। আমাদের হাতে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শত শত পরিচিতি, প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা। কিন্তু এই সমস্ত যোগাযোগের মধ্যেও কি আমরা সত্যিই একে অপরের কাছে পৌঁছতে পারছি?

একজন মানুষের অনলাইন উপস্থিতি কি তার একাকিত্বের প্রমাণ মুছে দিতে পারে? শত শত ‘friend’ কি একজন সত্যিকারের শ্রোতার বিকল্প হতে পারে?

সম্ভবত পারে না।

আজকের সমাজে মানসিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। যে মানুষটি প্রতিদিন হাসছে, সে হয়তো রাতের অন্ধকারে নিজের সঙ্গে কথা বলছে। যে মানুষটি সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশছে, সে হয়তো ভিতরে ভিতরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আর যে মানুষটি নিজেকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, তার ভিতরে কী চলছে– সেটা জানার চেষ্টা আমরা কতটা করি?

নায়িকা জোডি ফর্স্টার, রবার্ট ডি নিরো ও পরিচালক মার্টিন স্করসেসি

আমরা খুব সহজেই কাউকে ‘অদ্ভুত’, ‘অসামাজিক’ বা ‘নিজেকে গুটিয়ে রাখা মানুষ’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু খুব কম মানুষই থেমে জিজ্ঞেস করে– ‘তুমি কেমন আছ?’

হয়তো এই একটি প্রশ্নই কখনও কখনও একজন মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

‘Taxi Driver’ তাই কেবল একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের গল্প, যে সমাজ একজন মানুষের ভেতরের ভাঙনকে দেখতে পায় না, যতক্ষণ না সেই ভাঙন কোনও দৃশ্যমান বিস্ফোরণে পরিণত হয়। যে সমাজ কখনও একজন মানুষকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে, আবার কখনও তার কোনও একটি কাজের জন্য হঠাৎ তাকে নায়ক বানিয়ে দেয়।

ট্রাভিসের ট্যাক্সি তাই শুধু একটি গাড়ি নয়। সেটি যেন আমাদের সময়ের একটি চলন্ত আয়না। তার কাচের ওপারে যে শহর, সেখানে আমরা নিজেদেরই দেখতে পাই– ভিড়ের মধ্যে একা, শব্দের মধ্যে নীরব, সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছিন্ন।

হয়তো ‘Taxi Driver’-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই– মানুষকে ভেঙে পড়ার পর নয়, ভেঙে পড়ার আগেই দেখতে শেখা দরকার।

একজন মানুষ অপরাধী হওয়ার আগেই যদি আমরা তার একাকিত্ব দেখতে পেতাম? একজন মানুষ নিজের ভিতরে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়ার আগেই যদি কেউ তার পাশে দাঁড়াত? একজন মানুষকে ‘অদ্ভুত’ বলে দূরে সরিয়ে দেওয়ার বদলে যদি একবার তার নীরবতার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতাম?

জোডি ফর্স্টার ও রবার্ট ডি নিরো

হয়তো অনেক গল্পের শেষই অন্যরকম হতে পারত।

আর হয়তো কোনও এক গভীর রাতে, শহরের আলো পেরিয়ে কোনও ট্যাক্সির রিয়ার-ভিউ মিররে তাকালে সেখানে শুধু ট্রাভিস বিকলকে দেখা যাবে না– আমরাও নিজেদের দেখতে পাব।