Robbar

ভালোবাসা সবচেয়ে বড় ম্যাজিক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 2, 2026 11:45 am
  • Updated:August 2, 2026 11:47 am  

গল্পের ডেমেন্টররা আসলে রাউলিং-এর মানসিক অবসাদের প্রতিফলন, যার ধ্বংসাত্মক শক্তিকে পরাজিত করবার জন্য দরকার হয়েছিল ইতিবাচক শক্তির, যা এসেছিল ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের প্রতি বিশ্বাস থেকে। তাই ডেমেন্টরদের প্রতিহত করার জন্য যে মন্ত্র ‘Expecto Patronum’ অর্থাৎ প্যাট্রোনাস চার্ম, তা শুধুমাত্র উচ্চারণ করলেই কিন্তু ডেমেন্টরদের হাত থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয় জীবনের কোনও সুন্দর মুহূর্ত মনে করতে করতে।

রবীনা মিত্র

–লিউমোস! 

এই তো চারপাশে খুদে এবং দুঁদে জাদুকর-জাদুকরীদের জাদুদণ্ড জ্বলে উঠেছে জাদু মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে। সেই কোমল, মায়াবী, শঙ্খসাদা আলোর স্রোতের মধ্যে একটি বিশাল মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন এক সোনালি চুলের সুন্দরী নারী। ওই তো তাঁর হাতেও দেখা যাচ্ছে একটি জাদুদণ্ড যা বাকিদের জাদুকাঠির তুলনায় অনেকটাই ছোট যদিও। এই জাদুদণ্ড শিশু থেকে বৃদ্ধ– অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে অদৃশ্য আলো জ্বালিয়েছে নিঃসন্দেহে। সেই উজ্জ্বল অগ্নিশিখা বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, বীরত্বের, ঐক্যবদ্ধতার। 

হঠাৎ দেখা যায় ওই মহিলা তাঁর জাদুদণ্ড দিয়ে খসখস করে একটি সাদা পৃষ্ঠার উপর কিছু লিখছেন। গোটা মাঠ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আলো হাতে। খানিকক্ষণ পর সাদা পৃষ্ঠাটি উঁচু করে ধরলেন তিনি। তাতে লেখা–

‘Always!’ 

সোনালি চুলের সুন্দরী

সমবেত হর্ষধ্বনিতে কেঁপে উঠছে মাঠ। হ্যাঁ, ভালোবাসা চিরকালীন। শুভশক্তির উপর মানুষের বিশ্বাস চিরকালীন। সকলের ওয়ান্ডের (জাদুদণ্ড) আলো আরও জোড়ালো হয়ে উঠেছে। মাথা ঝুঁকিয়ে সবাই অভিবাদন জানাচ্ছে মহিলাকে! চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছি– হ্যারি, হারমাইনি, রন, নেভিল, লুনা সকলেই তাদের ওয়ান্ড উঁচু করে ধরে আছে, অপলক তাকিয়ে রয়েছে সামনের ওই নারীর দিকে। দেখতে পাচ্ছি প্রফেসর ডাম্বলডোর, প্রফেসর স্নেপ, প্রফেসর ম্যাকগোনাগাল, মিসেস উইজলি, ফ্রেড ও জর্জ দুই উইজলি যমজ, পার্সি উইজলি, জিনি উইজলি, হ্যাগ্রিড, লিলি, সিরিয়াস ব্ল্যাক, প্রফেসর লিউপিন, প্রফেসর স্প্রাউট, ম্যাড আই মুডি, গিলডেরয় লকহার্ট, চো চ্যাং, সেডরিক ডিগোরি, ড্রেকো ম্যালফয়, ভোল্ডেমর্ট, বেলাট্রিক্স, এমনকী মিসেস নরিসকে (বেড়াল) কোলে নিয়ে এককোণে দাঁড়িয়ে থাকা হগওয়ার্টস স্কুল অফ উইচক্র্যাফট আ্যন্ড উইজার্ড্রির কেয়ারটেকার আর্গাস ফিলচকেও। সকলেই মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন সেই নারীকে যিনি এই মাঠে জড়ো হওয়া সকলকে দিয়েছেন তাদের নিজস্ব একটি গল্প! এখানে যারা উপস্থিত রয়েছে তাদের সকলেরই স্রষ্টা এই নারী। আজ তাঁর জন্মদিনে তাই সবাই জড়ো হয়েছে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে, অভিনন্দিত করতে, কারণ তারা জানে এই নারীর পূর্বজীবনের অসহায়তা, বিষণ্ণতা, অপমান। তারা জানে গভীর বিষাদসমুদ্রে পাড়ি দিতে দিতে, অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যেতে যেতেও হৃদয়ের গভীর গোপন কুঠুরিতে তিনি একটি ছোট্ট আলো জ্বালাতে ভুলে যাননি। 

ফিসফিস করে বলেছিলেন ‘লিউমোস’!

হ্যারি ও তার বন্ধুরা

একটি ক্ষুদ্র জোনাক-আলো জ্বলে উঠেছিল কোথাও, মস্তিষ্কের জটিল ল্যাবাইরিন্থের কোনও গোপন কোনায়। সেই আলোর দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। আলো খুঁজতে খুঁজতে এক এক করে খুঁজে পেয়েছেন তাদের, যারা সেই আলো বয়ে নিয়ে চলবে। চারপাশ থেকে দারিদ্র, অসহায়তা, একাকিত্ব যখন প্রাণপণে শুষে নিতে চাইছে সমস্ত জীবনীশক্তি তখনই ওই মহিলা তাকালেন মানসচক্ষে ভেসে ওঠা এক বালকের মুখে। সেই নিষ্পাপ মুখের হাসি হয়ে উঠল তীব্র এক আলোর ঢাল, সেই আলো কখনও হরিণের মতো, কখনও খরগোশের রূপ নিয়ে, কখনও ঘোড়া, কখনও বেড়াল, কখনও রাজহাঁস, কখনও ফিনিক্স হয়ে ছুটে ছুটে, উড়ে উড়ে, দৌড়ে দৌড়ে তাড়া করল সমস্ত অন্ধকারকে। আলো হয়ে উঠল চারপাশ! ডেমেন্টরদের ধাওয়া করল প্যাট্রোনাস চার্ম! আশার বীজ অঙ্কুরিত হল। সেই ক্ষুদ্র আলো আরও আরও আলো জড়ো করতে লাগল। মস্তিষ্কে ছুটল কাহিনিস্রোত। কীসের গল্প? ভালোবাসার। রূপকথা? হ্যাঁ, রূপকথা! কিন্তু না, রূপকথা নয়! প্রবল অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে গডরিকস হলো-র একটি বাড়িতে মা, লিলি পটারের মৃতদেহর সামনে রাখা বেবিকটে অক্ষত, জীবন্ত বসে রইল এক মাসের শিশু– দ্য বয় হু লিভড। হ্যারি পটার। সদ্যোজাত এই শিশু কী যুদ্ধ জানে যে অমন শক্তিশালী বিপক্ষকে পরাজিত, নিশ্চিহ্ন করে দেবে? সে কিছুই জানে না। সে নিষ্পাপ। কিন্তু তার মা লিলি পটারের অপরাজেয় সন্তানস্নেহের অলৌকিক শক্তির কাছে ধূলিসাৎ হয়ে গেল ‘ডার্ক লর্ড’ ভোল্ডেমর্টের সমস্ত অশুভ শক্তির প্রয়োগ। ডেথ কার্স রিবাউন্ড করল। ঘাতক হল ঘায়েল। মা নিজের জীবন দিয়ে বাঁচালেন সন্তানকে। হ্যারি– জেমস ও লিলি পটারের আদরের আত্মজ হয়ে উঠল শুভশক্তির মশালধারী সেই শিশু যে বড় হয়ে উঠতে উঠতে বারবার দেখাবে জীবনে ভালোবাসার থেকে বড় জাদু আর কিছু হতে পারে না। যুদ্ধ যদি করতেই হয় তবে শুধুমাত্র তা ভালোবাসার জন্য করা যেতে পারে।

ভালোবাসার জন্য যুদ্ধ

এইখানে বারবার মনে পড়ে যায় করম্যাক ম্যাকার্থির ‘দ্য রোড’ উপন্যাসের কথা। সেই ছোট্ট শিশুর কথা যে সবসময় মনে রাখে, মনে করিয়ে দেয় পাঠকদের যে, আমরা শুভচিন্তার উজ্জ্বল দীপশিখা বহন করে চলেছি। চারপাশে যতই অরাজকতা চলুক, আমরা ভালোর পথ, আলোর পথ থেকে সরব না, কারণ ‘We are the good guys’। পাঠক জে. আর. আর. টোলকিয়েনের ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ সিরিজেও দেখেছেন, অশুভ, অনিষ্টকারী শক্তি বিনাশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ফ্রোডো ব্যাগিন্স নামে এক হবিটকে, যে জানে না কোনওরকম জাদুবিদ্যা, যার নিজস্ব কোনও অলৌকিক শক্তিও নেই। যে গ্যান্ডাল্ফের মতো কোনও অসীম শক্তিধারী, প্রাজ্ঞ জাদুকর নয়। সে একজন মামুলি হাফলিং, সাধারণ মানুষ, শুধু এই হাফলিংদের আকার অনেকটা বামনদের মতন এবং কয়েকশো বছর এদের আয়ু। কিন্তু এই হবিটরা সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করে। এইরকম এক হাফলিং যুবককে টোলকিয়েন বেছে নিলেন অমঙ্গলকারী শক্তি বিনাশ করবার কঠিন অভিযানের অগ্রদূত হিসেবে। কেন? তার কারণ আমরা জানতে পারি টোলকিয়েন-সৃষ্ট সবচেয়ে দীপ্যমান চরিত্র, শুভশক্তির অদম্য রক্ষক গ্যান্ডাল্ফের এক সংলাপের সূত্রে। উত্তরটি এসেছে কিন্তু অন্য প্রসঙ্গে। এসেছে ফ্রোডোর পিতামহ বিলবো ব্যাগিন্সকে যখন গ্যান্ডাল্ফ অন্য একটি দুঃসাহসিক অভিযানে পাঠিয়েছিলেন– সেই প্রসঙ্গে, যখন গ্যালাড্রিয়েল, একজন এল্ফ-সম্রাজ্ঞী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘Why the halfling?’ 

এই প্রশ্নের উত্তরে গ্যান্ডাল্ফ বলেন– 

“I don’t know. Saruman believes it is only great power that can hold evil in check. But that is not what I found. I have found that it is the small everyday deed of ordinary folks that keep the darkness at bay. Simple acts of kindness and love. Why Bilbo Baggins? Perhaps because I am afraid, and he gives me courage.”

এই সংলাপ পাওয়া যায় ‘দ্য হবিট: অ্যান আনেক্সপেক্টেড জার্নি’ চলচ্চিত্রে গ্যালাদ্রিয়েল এবং গ্যান্ডাল্ফের কথোপকথনের সময়। 

তাই হ্যারি পটার হয়ে উঠল ‘The Boy who Lived’, ‘The Chosen One’ এবং এই শিশুকে উদ্ধার করতে এলেন কে? সিভেরাস স্নেপ। যিনি কোনওদিনও তাঁর ভালোবাসার মানুষকে (হ্যারির মা লিলি পটার) পাবেন না জেনেও, সারাজীবন নিঃশব্দে তাঁকে ভালোবেসে যাবেন। হ্যারির বাবা জেমসের প্রতি চরম বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র লিলির সন্তান বলে, অশুভ শক্তির উপাসক ডার্ক লর্ডের সমর্থক হিসাবে কলঙ্কিত এবং সম্পূর্ণ মিথ্যে এক পরিচয় বহন করেও, হ্যারিকে সারাজীবন রক্ষা করে যাবেন স্নেপ! কারণ? হ্যারির চোখে লিলির চোখ একেবারে বসানো। কারণ হ্যারি তাঁর ভালোবাসার মানুষের সন্তান, তাঁর অস্তিত্বের অংশ। একটি দুর্বল মুহূর্তে অতি সংযমী, আপাত আবেগহীন স্নেপ হ্যারিকে বলেন–

“You have your mother’s eyes!” 

নিজের জীবনকে প্রতি মুহূর্তে বাজি রেখে ভালোবাসার জন্য যুদ্ধ করে যেতে দেখি আমরা সেই মানুষটিকে, যাঁকে তাঁর জীবনের গোটা সময়টাই সকলে ভুল বুঝবে, তাঁর সঙ্গে করা হবে আপত্তিজনক কদর্য ব্যবহার। তা সত্ত্বেও স্নেপ কিন্তু থাকবেন নিজের উদ্দেশ্যে অবিচল। প্রেম, প্রেমের অমোঘ কল্যাণকর শক্তি তাঁকে সবসময় চালিত করবে সঠিক পথে। 

সেভেরাস স্নেপ

এই সুদীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার পর আর বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে, জাদুদণ্ড হাতে সাদা পৃষ্ঠার উপর খসখস করে রূপকথা লিখে চলা এই নারী আর কেউ নন, স্বনামধন্য ফ্যান্টাসি কথাসাহিত্যিক জে. কে. রাউলিং। 

ব্রিটিশ সাহিত্যিক জোয়ান কে রাউলিং-এর জন্ম ১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই, ব্রিটেনের ইয়েট শহরে। তিনি এক্সেটর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া করেছেন এবং স্নাতক হওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। রাউলিং গবেষণার কাজের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিভাষী সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। একসময় রাউলিং তাঁর জীবনের এক গভীর সংকটময় পর্যায়ের মুখোমুখি হন। তাঁর মা অ্যান দীর্ঘদিন ধরে স্ক্লেরোসিস রোগে ভোগার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মায়ের মৃত্যুর পর শোকাচ্ছন্ন রাউলিং মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন। জীবনে মায়ের অনুপস্থিতি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। এরপর তিনি পর্তুগালে ইংরেজি ভাষাশিক্ষকের কাজে যোগ দেন। সেখানে তিনি বিবাহসম্পর্কে আবদ্ধ হলেও কিছুদিনের মধ্যে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তাঁর শিশুকন্যাকে নিয়ে তিনি ফিরে আসেন স্কটল্যান্ডের এডিনবরায়। সেই সময় প্রবল আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। সরকারি সহায়তার উপর নির্ভর করে কোনওমতে দিনাতিপাত করতেন তিনি। সিঙ্গল মাদার হওয়ায় তাঁর উপর ছিল সন্তানপালনেরও গুরুদায়িত্ব। ধীরে ধীরে অশুভ কালো ছায়ার মতন মানসিক অবসাদ গ্রাস করতে থাকে রাউলিংকে। এই চূড়ান্ত হতাশা, নৈরাশ্য এবং অন্তর্দাহের মধ্যে ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনগামী একটি ট্রেনে যাত্রাকালে তার মাথায় বিদ্যুতের মতো আসে এক চশমাপরা বালকের ছবি, তার মাথা ভর্তি কালো এলোমেলো চুল আর সে জানেই না সে একজন জাদুকর! ‘হ্যারি’ নামটি ছিল রাউলিং-এর খুব পছন্দের নাম। আর ‘পটার’ পদবি তিনি পান তাঁর ছোটবেলার এক প্রতিবেশী পরিবারের পদবি থেকে, যাদের তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন৷ হ্যারিকে কল্পনায় দেখতে পাওয়ার পর তাকে ঘিরে রাউলিং-এর মাথায় আসতে থাকে একের পর এক ঘটনা, তৈরি হতে থাকে চরিত্রের পর চরিত্র। ট্রেনে রাউলিং-এর কাছে কোনও কলম না থাকায় গোটা গল্পটি তিনি মাথায় বহন করতে থাকেন। বাড়ি ফিরে তিনি হ্যারি এবং তার বন্ধুদের চরিত্র, জাদুশিক্ষার স্কুল ‘হগওয়ার্টস’-এর প্রেক্ষাপট, সেখানকার শিক্ষকদের চরিত্র সমস্তকিছুর খসড়া তৈরি করে ফেলেন। হ্যারি পটার সিরিজ রাউলিং লিখেছেন একসঙ্গে একাধিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে। বাস্তব জগতে যতভাবে যতরকম সংকট রাউলিংকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে থাকে, তিনি তার কল্পনার জগৎকে ততই আঁটোসাঁটো বুনটে বাঁধতে শুরু করেন। এই কাহিনিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে রাউলিংও আসলে যুদ্ধ করতে থাকেন এক ক্ষমাহীন, নির্দয় বাস্তবের সঙ্গে। তিনি বুঝতে পারেন পৃথিবীতে প্রকৃত স্বার্থহীন ভালোবাসার বড় অভাব। স্বার্থপরতা, রূঢ়তা, নিষ্ঠুরতার কালো ছায়া আচ্ছন্ন করে রেখেছে মানুষকে। বাস্তব জগতের বিষাদ, আশাহীনতা, নিষ্ঠুরতা যেমন মানুষের সমস্ত আলো, আনন্দ, উজ্জ্বলতা শুষে নেয়– ঠিক সেই চিন্তা থেকে রাউলিং তৈরি করলেন ডেমেন্টরদের। ডেমেন্টররা হল এমন সব জীব, যারা কাছাকাছি এলে আশেপাশে জ্বলতে থাকা সমস্ত আলো নিভে যায়, মানুষের মন থেকে মুছে যেতে থাকে সমস্ত সুখস্মৃতি, প্রফুল্লতা, বেঁচে থাকার স্পৃহা। গল্পের ডেমেন্টররা আসলে রাউলিং-এর মানসিক অবসাদের প্রতিফলন, যার ধ্বংসাত্মক শক্তিকে পরাজিত করবার জন্য দরকার হয়েছিল ইতিবাচক শক্তির, যা এসেছিল ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের প্রতি বিশ্বাস থেকে। তাই ডেমেন্টরদের প্রতিহত করার জন্য যে মন্ত্র ‘Expecto Patronum’ অর্থাৎ প্যাট্রোনাস চার্ম, তা শুধুমাত্র উচ্চারণ করলেই কিন্তু ডেমেন্টরদের হাত থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয় জীবনের কোনও সুন্দর মুহূর্ত মনে করতে করতে। সেই আনন্দ-স্মৃতির ইতিবাচক শক্তি অমঙ্গলকারী শক্তিদের বিরুদ্ধে তৈরি করে এমন এক অপ্রতিরোধ্য ঢাল যা বিষাদকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। লেখা ছিল রাউলিং-এর সেই ঢাল, বিষণ্ণতাকে পরাজিত করার অব্যর্থ অস্ত্র! সহৃদয়তা, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা হল হ্যারির এবং তার ডার্ক লর্ড ভোল্ডেমর্টকে চিরতরে পরাস্ত করার সেই অভ্রান্ত হাতিয়ার। 

প্যাট্রোনাস চার্ম

রাউলিং তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই ডেমেন্টর এবং প্যাট্রোনাস চার্মের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে গিয়ে বলেছেন– 

‘The Dementors are among the foulest creatures that walk this earth … They drain peace, hope and happiness out of the air around them…

A Patronus is used against Dementors. It is a kind of positive force, a projection of the very things that the Dementor feeds upon– hope, happiness, the desire to survive.’

রাউলিং-এর কল্পনাশক্তির উদ্ভাস প্রবলভাবে ধরা পড়ে যখন তিনি দেখান ডার্ক লর্ড কীভাবে নিজের অমরত্ব নিশ্চিত করতে নিজের আত্মাকে সাতটি টুকরোতে ভেঙে বিভিন্ন বস্তু ও প্রাণীর মধ্যে বন্দি করে রাখে। তৈরি হয় সাতটি হরক্রাক্স। সুতরাং শুধুমাত্র ভোল্ডেমর্টকে হত্যা করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করতে হবে প্রতিটি হরক্রাক্স, কারণ একটিও যদি টিকে থাকে তবে সেই বস্তু বা জীবের মধ্যে রক্ষিত শয়তানের প্রাণ উপযুক্ত পরিবেশ এবং সাহচর্য পেলেই আবার জেগে উঠে গ্রাস করতে পারে গোটা পৃথিবীকে। তাই হ্যারি ও তার দুই প্রিয়তম বন্ধু রন এবং হারমাইনি বেরিয়ে পড়ে সেই হরক্রাক্স ধ্বংস করার কঠিন অভিযানে। কিন্তু রাউলিং-এর গল্প বলার মুনশিয়ানা বোঝা যায় যখন পাঠক জানতে পারে যে, হ্যারি– যাকে আমরা জেনে এসেছি ভোল্ডেমর্টকে পরাস্তকারী শুভশক্তির বাহক হিসেবে, যার উপর পাঠক তার সমস্ত আশাভরসা সমর্পণ করে বসে আছে, সেই হ্যারি নিজেই একটি হরক্রাক্স। তাহলে অর্থ কী দাঁড়াল? ভল্ডেমর্টকে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন করতে হলে হ্যারিকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। সেই মৃত্যুর দিকে যুবক হ্যারি মনের সমস্ত ভয়, দ্বিধা, অসমাপ্ত ইচ্ছে নিয়ে এগিয়ে গেল মাথা উঁচু করে, কারণ সে আত্মসমর্পণ না করলে ভল্ডেমর্ট ও তার অনুগামী ডেথ-ইটাররা নিরপরাধ ছাত্রছাত্রীদের প্রাণ নিচ্ছে নির্দ্বিধায়। হ্যারি, যার গডফাদার অকুতোভয় সিরিয়াস ব্ল্যাক, যাকে জন্মের পর থেকে রক্ষা করে এসেছেন, প্রতিটি মুহূর্তে সবরকম বিপদ থেকে আড়াল করেছেন হগওয়ার্টসের হেডমাস্টার অ্যালবাস ডাম্বেলডোর, হাউজ-হেড প্রফেসর মিনার্ভা ম্যাকগনাগাল, যাকে সন্তানের মতো ভালোবেসেছেন হ্যারির বন্ধু রনের মা, মলি উইজলি, তাদের সকলের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে হ্যারি মুখোমুখি হল মৃত্যুর। ‘আভাডা কেডাভরা!’ ভল্ডেমর্টের ওয়ান্ড থেকে ছিটকে এল তীব্র সবুজ রশ্মি, ডেথ কার্স। হ্যারি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কিন্তু এই যে সবার প্রাণ যাতে বিপন্ন না হয়ে পড়ে তাই হ্যারির এই আত্মসমর্পণ, সকলের জন্য হ্যারির যে ভালোবাসা তা আরও একবার রক্ষা করল হ্যারিকে। ডেথ কার্স আবার রিবাউন্ড করল। মৃত্যু হল হ্যারির ভিতরে থাকা ভল্ডেমর্টের আত্মার অংশের। হ্যারিকে স্পর্শ করল না মৃত্যু। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হ্যারি অচেতন অবস্থায় দেখল: কিংস ক্রস স্টেশনে তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে তার প্রিয় প্রফেসর ডাম্বেলডোরের। একটি বেঞ্চের নিচে একটি ক্ষুদ্র রক্তাক্ত প্রাণীকে কাতরাতে দেখে হ্যারি তাকে সাহায্য করতে চায়, আর ঠিক সেই সময় ডাম্বেলডোরের স্নেহময় কণ্ঠ কানে আসে হ্যারির। 

“Don’t pity the dead Harry, pity the living.”

হ্যারি পটার ও ডাম্বলডোর

ডাম্বেলডোর মৃত, তাহলে হ্যারির সঙ্গে হাঁটছেন কী করে হ্যারির প্রিয় প্রফেসর? কারণ হ্যারি এসে দাঁড়িয়েছে জীবন এবং মৃত্যুর সেই সীমারেখায়, যেখান থেকে ডাম্বলডোর তার যাত্রাপথ ঘুরিয়ে দেবেন জীবনের দিকে। হ্যারির ভিতরের বাসা বেধে থাকা ভল্ডেমর্টের আত্মার অংশ মৃত। হ্যারি এবার স্বাধীন। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই কি থাকে না অন্ধকারের বসবাস? হিংসা, দ্বেষ, স্বার্থপরতা, ঘৃণা, ঈর্ষার অন্ধকার ছায়া কি আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে না! সেই অন্ধকারকে জয় করা তখনই সম্ভব, যখন আমরা আমাদের ভিতরের নেতিবাচক দিকগুলিকে মেনে নিই। রোগ হয়েছে তা স্বীকার না করলে কী সেই রোগের চিকিৎসা সম্ভব? হ্যারি মৃত্যুর কাছে স্বেচ্ছায় গিয়েছে তাই ফিরে পেয়েছে প্রাণ। রাউলিং নিজের মানসিক অবসাদকে বুঝেছিলেন, কাটিয়ে উঠতে চেয়েছিলেন বিষণ্ণতা, জীবনের দিকে মুখ ঘোরাতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন আলোর দিকে হাঁটতে। চেয়েছিলেন পৃথিবী জুড়ে ভালোবাসার জয়জয়কার! তাই চরম অসহায়তা ও বিষণ্ণতার মধ্যেও ছোট্ট একটি টিমটিমে আলো জ্বালানোর কথা তাঁর মনে হয়েছে। তাই তিনি ডাম্বেলডোরের কণ্ঠে তার পাঠকদের বলছেন–

‘Happiness can be found even in the darkest of times, if one only remembers to turn on the light.’

তাই বলি, পাঠক, যখনই চারপাশ থেকে হতাশা, অবসাদ, নৈরাশ্যের কালো প্রেতেরা ঘিরে ধরবে ফিসফিস করে একবার মন্ত্রোচ্চারণ করবেন– 

‘লিউমোস!’ 

‘লিউমোস!’

দেখবেন কোথাও একটা আলোর আভাস ফুটে উঠেছে দূরে। এবার আপনার কাজ হল সেই আলোর উদ্দেশ্যে এক পা এক পা করে হেঁটে এগিয়ে যাওয়া। রাস্তায় ঠিক জাদু হবে। হবেই!