


প্রথম কন্যা বেলাকে মনে রেখে কবি রচনা করেছিলেন ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনি চরিত্রটি। জগদীশচন্দ্র নিজেকে মনে করতেন কাবুলিওয়ালা। মিনি আর কাবুলিওয়ালার সখ্যের একটি সুন্দর ছবি ধরা পড়ে ছোট্ট বেলা আর মধ্যবয়সী বিজ্ঞানীর মধ্যে। অন্যদিকে জগদীশচন্দ্রকে দেখেই ছেলেবেলায় বিজ্ঞানী হতে চাইতেন রথীন্দ্রনাথ।
গীতাঞ্জলির কবিতাগুলোর ইংরেজি অনুবাদ ইংল্যান্ডে পৌঁছনোর অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘কাবুলিওয়ালা’ ও ‘পোষ্টমাস্টার’ বিজ্ঞানী-বন্ধু জগদীশচন্দ্রের হাত ধরে ইংল্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিল। জগদীশচন্দ্র তাঁর মাতৃসমা রমণী মার্গারেট নোবেলের (ভগিনী নিবেদিতা) হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেই গল্প এবং ইংল্যান্ডে নিবেদিতা সেই গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। বিদ্বজন মহলে সেই গল্প এবং তার অনুবাদ যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল। জগদীশচন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে গভীর সখ্যের এ এক অভিজ্ঞান। দু’জনের ক্ষেত্র আলাদা হলেও দু’জন সৃষ্টিশীল মানুষের মনের নৈকট্য বন্ধুত্বের পরিসর তৈরি করে দেয়। পতিসরে থাকাকালীন যে বন্ধুবলয় রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন, তার একদিকে যেমন ছিলেন ব্যারিস্টার লোকেন পালিত অন্যদিকে ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু আর পণ্ডিতপ্রবর প্রিয়নাথ সেন। সেই সময়ে জমিদারির বিচিত্র কর্মভারে জড়িয়ে পড়া এবং পদ্মার পাড়ের বিচিত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে তাঁদের যে দিনগুলি কাটত– রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের বিষয়বস্তু সেখান থেকেই উঠে এসেছিল। গ্রামবাংলার মানুষের সুখদুঃখ আশা-নিরাশা আলোআঁধারের চিত্ররূপময়তায় পূর্ণ গল্পগুচ্ছের প্রথম দিকের গল্পগুলো। শিলাইদহে প্রতিদিন বিকেলে যখন সবাই চা নিয়ে বসত, বিজ্ঞানী-বন্ধু রবীন্দ্রনাথের কাছে নতুন গল্প শুনতে চাইতেন। রবীন্দ্রনাথ দুপুরে গল্পগুলো লিখতেন আর বিকেলে বন্ধুকে পড়ে শোনাতেন। এইভাবে গল্পগুচ্ছের গল্প, রবীন্দ্রনাথ আর জগদীশচন্দ্র বসু একসূত্রে গাথা হয়ে রয়েছে রবীন্দ্র সাহিত্য বলয়ে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থ জগদীশচন্দ্রকে উৎসর্গ করেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে শান্তিনিকেতনে যে সংবর্ধনা সভার আয়োজন হয়েছিল– জগদীশচন্দ্র বসু তার সভাপতিত্ব করেন এবং যে লজ্জাবতী লতা দ্বারা তিনি গাছের প্রাণ আছে আবিষ্কার করেছিলেন সেই লজ্জাবতী লতার একটি গাছ রবীন্দ্রনাথকে সেদিন উপহার দেন। এইরকমই ছিল তাঁদের বন্ধুত্বের মিষ্টি স্রোত। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলছেন, তিনি ঠাকুরবাড়ির অন্দরে আঁধারে থেকে যেতেন– যদি না জগদীশচন্দ্রের মতো এরকম উজ্জ্বল মানুষ তাঁকে বন্ধুত্ব দিতেন। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের বন্ধু হওয়া তো সোজা ব্যাপার নয়। রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছেন যে, ঠাকুরবাড়ির বাইরে জগদীশচন্দ্র বসুই তাঁর প্রথম বন্ধু। স্বীকার করেছেন, তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের কোণ থেকে জগদীশচন্দ্র তাঁকে টেনে বের করেছিলেন, যেমন করে শরতের শিশিরস্নিগ্ধ সূর্যোদয়ের মহিমা চিরদিন তাঁকে ঘর থেকে ছুটিয়ে বাইরে এনেছে।
পদ্মার চরে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন জগদীশচন্দ্র। ইউরোপের এত সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখা সত্ত্বেও তাঁর মনে হত পদ্মার চরের মতো মনোরম স্বাস্থ্যকর জায়গা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। বলা বাহুল্য রবীন্দ্রনাথেরও ছিল একই মত।

দু’জনেই পদ্মার চরে ঘুরে বেড়াতেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য পান করতেন। বিজ্ঞানীর প্রিয় খাবার ছিল কচ্ছপের ডিম। বন্ধু-পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র দু’জনে মিলে বালির চর থেকে বালিতে ঢাকা কচ্ছপের ডিম খুঁজে নিয়ে আসতেন। হই-হই করে সেসব রান্না হত। এমন করেই তিনি পারিবারিক বন্ধুও হয়ে গিয়েছিলেন। এমনই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল যে, রথীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে জগদীশচন্দ্রের মতো বিজ্ঞানী হবেন।
রবীন্দ্রনাথ মনেপ্রাণে চাইতেন জগদীশচন্দ্র বসু ইংল্যান্ডেই থেকে যান। সেই সময়ে ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীরাও চেয়েছিল, জগদীশচন্দ্র ইংল্যান্ডে থেকে গেলে তাঁর গবেষণার কাজে সুবিধা হবে। রবীন্দ্রনাথও সেটাই চাইতেন। কিন্তু তারপরেও তিনি আশা করতেন, বিজ্ঞানী এই পরাধীন ভারতে এসে বিজ্ঞানমনস্কতা জাগিয়ে তুলবেন যুবসমাজের মধ্যে। একটি চিঠিতে তিনি বন্ধুকে লিখছেন– ভারতবর্ষের উন্নতির অশ্বমেধের ঘোড়া তোমার হাতেই আছে, তুমি ফিরে এলেই আমাদের যজ্ঞ সমাধা হবে। জগদীশচন্দ্রের গভীর জ্ঞানের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রচণ্ড আস্থা ছিল। শুধু উদ্ভিদবিদ্যা রসায়নবিদ্যা বা পদার্থবিদ্যা নয় মনোবিদ্যার চর্চা করতেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধুকে অনুরোধ করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মনোবিদ্যার চর্চায় জগদীশচন্দ্র নতুন দিশা দেখাতে পারবেন।

শিলাইদহে তাঁদের সুন্দর দিনগুলো কাটত। দিনের বেলা কবি ও বিজ্ঞানীর গল্পগুজব ও নানা বিষয়ে আলোচনায় কেটে যেত। রাতের দিকে জগদীশচন্দ্র বন্ধুকে অনুরোধ করতেন গান শোনাতে। কয়েকটি গান ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। ‘এসো এসো ফিরে এসো বঁধূ হে ফিরে এসো’– এই গানটি বন্ধুর মনোরঞ্জনের জন্য রবীন্দ্রনাথ যে কতবার গেয়েছেন!
আসলে জগদীশচন্দ্রের কোনও অনুরোধই রবীন্দ্রনাথ ফেলতে পারতেন না। একবার নিবেদিতার একটি গ্রন্থ ‘The Web of Indian Life’-এর মুখবন্ধ লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেন। প্রথমে অরাজি হলেও শেষে বন্ধুর অনুরোধ তিনি রক্ষা করেন। বস্তুত নিবেদিতা আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল জগদীশচন্দ্রের মাধ্যমেই।
ইংল্যান্ডে বিজ্ঞানীমহলে জগদীশচন্দ্রের বিপুল সাফল্যের ভুবনজয়ী খ্যাতিতে কবি আনন্দে আত্মহারা। বিজ্ঞানীকে কবি লিখলেন– বন্ধু ধন্যোহং, কৃতকৃত্যোহং– বন্ধু আমার পূজা গ্রহণ করো, তোমার জয় হোক, তোমাতে আমাদের দেশ জয়ী হোক, নব্য ভারতের প্রথম ঋষি রূপে জ্ঞানের আলোকশিখায় নতুন হোমাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করো। বন্ধুর সাফল্যে বন্ধুর এ উচ্ছ্বাস আমাদেরও অনুকরণীয়।

কবি ও বিজ্ঞানীর এই বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত ১৮৯৭ সালের এক বসন্তে। জগদীশচন্দ্র ইউরোপ সফর শেষে কলকাতায় ফিরেছেন । রবীন্দ্রনাথ দেখা করতে গেলেন তার বাড়িতে। বিজ্ঞানী বাড়িতে ছিলেন না। টেবিলে ম্যাগনোলিয়া ফুল রেখে আসেন কবি। পরে তাঁদের আবার সাক্ষাৎ হয়। সেই ফুল দু’জনের বন্ধুত্বের সুবাস ছড়িয়েছে আজীবন। জগদীশচন্দ্র তাঁর নিজের ভাগনা অরবিন্দমোহন বসুকে পাঠান বন্ধুর শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমে। কবি-কন্যাদের সঙ্গেও জগদীশচন্দ্রের ছিল মধুর সখ্য। প্রথম কন্যা বেলাকে মনে রেখে কবি রচনা করেছিলেন ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনি চরিত্রটি। জগদীশচন্দ্র নিজেকে মনে করতেন কাবুলিওয়ালা। মিনি আর কাবুলিওয়ালার সখ্যের একটি সুন্দর ছবি ধরা পড়ে ছোট্ট বেলা আর মধ্যবয়সী বিজ্ঞানীর মধ্যে। শুধু বিজ্ঞানী নন, বিজ্ঞানী-পত্নী অবলা বসুর সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের মধুর সম্পর্ক ছিল। কবি বিজ্ঞানী-জায়াকে ডাকতেন ‘আর্যা’ বলে। কবি-পত্নী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গেও বিজ্ঞানী-দম্পতির ছিল হাস্যমধুর সম্পর্ক। অজস্র চিঠিতে তাঁদের মতবিনিময়, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত উদ্বেগ ধরা পড়েছে।
তবে শুধু সুখের দিনেই নয়, এ বন্ধুত্ব গভীর ছিল তাদের দুঃখের দিনেও। জগদীশচন্দ্র বসু এবং অবলা বসু ছিলেন নিঃসন্তান। অবলা বসুর প্রথম সন্তানটি জন্মের কিছুকাল পরেই মারা যায় এবং সেই দুঃসহ দিনগুলোয় বিজ্ঞানী ও তাঁর স্ত্রীর পাশে ছিলেন বন্ধু রবীন্দ্রনাথ। আবার রবীন্দ্রনাথের জীবনে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনার নিদারুণ সময়গুলোয় পাশে থেকেছেন জগদীশচন্দ্র বসু এবং অবলা বসু। শমীর মৃত্যু, বেলার মৃত্যু, রেনুকার মৃত্যু বা কবির স্ত্রীর মৃত্যু– বিদীর্ণ করে দেওয়া এই সময়গুলোতে বন্ধু ও বন্ধুজায়া রবীন্দ্রনাথের পাশে থেকেছেন, বন্ধুত্বের চামর দুলিয়ে স্নিগ্ধতা ছড়িয়েছেন কবির তপ্ত হৃদয়ে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved