Robbar

নাসিরুদ্দিন ও প্রত্যাখ্যানের পৃথিবী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 6, 2026 5:56 pm
  • Updated:August 6, 2026 6:54 pm  

কোন গন্তব্যে পৌঁছল একজন অভিনেতার সুদীর্ঘ অভিনয়-জীবন? যেন নির্ধারণ করে দেয় একটা জীবনকৃতি পুরস্কার। কারণ, বলিউড আমাদের শিখিয়েছে, নক্ষত্রের মতোই ক্ষয়ে যায় একজন অভিনেতা। তারপর পড়ে থাকে শুধু ধুলো। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল নাসিরুদ্দিনের প্রথম ছবি, ‘নিশান্ত’। তারপর ২০২৬। ‘ম্যায় ওয়াপাস আয়ুঙ্গা’। এতদিনে তিনি কিংবদন্তি! কিন্তু নাসিরুদ্দিন শাহ আমাদের চমকে দিলেন। বললেন, ভাগ্যিস আমি স্টার নই! কেন বললেন এ-কথা?

রোদ্দুর মিত্র

জীবনে প্রথমবারের মতো কার্টেনের এপারে দাঁড়িয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ। ১৯৬১ সাল। ক্লাস এইট। বয়স, মর্জিমাফিক। ১২ অথবা ১৩। হ্যাঁ, কার্টেনের এপারেই দাঁড়িয়ে– দু’বার লিখলেন নাসিরুদ্দিন। আসলে এমফ্যাসিস করলেন নিজের অস্তিত্ব। টের পাচ্ছেন, কার্টেনের ওপারে কৌতূহলী কত দর্শক। সেই প্রথম মঞ্চে পা! সেই প্রথম জান উজাড় করতে উন্মুখ।

কৈশোরে নাসিরুদ্দিন শাহ

রোববার ডিজিটালের সম্পাদক আমায় বললেন: ‘লেখাটা জান দিয়ে লিখিস’। আশমান থেকে নেমে এসে কেউ, যদি পড়ে দেখে এ-লেখা, সে যেন শরীর পায়। জ্যান্ত হয়। কথা বলে মায়ের ভাষায়। তারপর মায়ালোক আর ইহলোকের যেটুকু বিভেদরেখা, আস্তে আস্তে মুছে দেয়… তবেই না ম্যাজিক! মনে। মঞ্চে। ভুবনে।

নাসিরুদ্দিন লিখছেন, ‘কার্টেনের নিচের প্রান্তে একবার লাথি মারলাম। ওলটপালট করে দিলাম। যতক্ষণ পর্দা পড়ে আছে, ততক্ষণ একটা মঞ্চ মায়ের গর্ভের মতো উষ্ণ এবং নিরাপদ। তোমার কোনও ওজন নেই, চিন্তা নেই…’। পর্দা সরে যায়। নাসিরুদ্দিনের সামনে হাজার হাজার দর্শক। ভীষণরকম ভয় আর সদ্যজাতর মতো জড়তা কাটিয়ে বলে ফেলতে হবে একটা সংলাপ। নাসিরুদ্দিন সংলাপ বললেন। দর্শক হেসে উঠল অর্থাৎ সাড়া দিল অর্থাৎ একজন অভিনেতার জন্ম হল। নাসিরুদ্দিন আবিষ্কার করলেন: সেই মোক্ষম মুহূর্তে একজন দর্শক তোমাকে যেভাবে ভালোবাসতে অভিলাষী, উদ্যত আর মরিয়া, এ-ব্রহ্মাণ্ডে আর কেউ কখনও তোমায় সেভাবে ভালোবাসতে পারবে না।

নেশা লেগে গেল। সহপাঠীরা যখন ফিজিক্স আর অঙ্কের প্যাঁচ পয়জারে নাজেহাল, নাসিরুদ্দিন মুগ্ধ হয়ে দেখছেন একজন অভিনেতার চোখ। জিওফ্রে কেন্ডেল। কখনও ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’-এর শাইলক, কখনও ব্রুটাস থেকে এক পলকে ওথেলো… নাসিরুদ্দিনের সাধ হয়, ‘শেক্সপিয়ারানা’– জিওফ্রে কেন্ডেলের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে। এটুকু অভিনেতার প্রস্তুতি! অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন।

সম্প্রতি, নাসিরুদ্দিন শাহ জীবনকৃতি সম্মান পুরস্কার গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছেন। প্রশ্ন আসে, কেন?

উত্তর সহজ, একজন অভিনেতার সফর কখনও ফুরয় না। ২০১৯ সালে, সাঈদ নাকভি একটি সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভালো অভিনেতা কে? নাসিরুদ্দিন বলেছিলেন, ‘ভালো অভিনেতা আসলে একজন দূত। মেসেঞ্জার। কোনও বার্তা বিকৃত না করে, দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া তার কাজ।’ আর সেই কাজ আমৃত্যু করে যেতে হয়। এমনই নিয়তি। তাই বারবার নাসিরুদ্দিন বলছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমার কেরিয়ার এখনও শেষ হয়নি।’

মনে পড়ছে, নোবেলজয়ী সাহিত্যিক লাজলো ক্রাসনোহোরকাই-এর কথা। ‘আমি লেখক নই। একজন মডারেটার। দু’জন মানুষ, দুটো পৃথিবী, দুই নিয়তির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করি মাত্র।’ দূতের কাজও তেমনই নয় কি?

সে কোন গন্তব্যে পৌঁছল, এই সুদীর্ঘ ৫০ বছরের অভিনয়-জীবনে? যেন নির্ধারণ করে দেয় একটা জীবনকৃতি পুরস্কার। কারণ, বলিউড আমাদের শিখিয়েছে, নক্ষত্রের মতোই ক্ষয়ে যায় একজন অভিনেতা। তারপর পড়ে থাকে শুধু ধুলো। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল প্রথম ছবি, ‘নিশান্ত’। তারপর ২০২৬। ‘ম্যায় ওয়াপাস আয়ুঙ্গা’। ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’। গৌতম ঘোষের ছবি, ‘পার’। এতদিনে তিনি কিংবদন্তি! অভিনয়ের আঁতুড়ঘর। স্টার। কিন্তু নাসিরুদ্দিন শাহ আমাদের চমকে দিলেন। বললেন, ভাগ্যিস আমি স্টার নই! কেন বললেন এ-কথা? একজন অভিনেতা যখন ‘স্টার’ হয়ে যায়, সে তখন অভিনয়-সত্তা, যা মৌলিক এবং অ্যাবসোলিউট, তা থেকে বিচ্যুত হয়। তাই সময়ে-অসময়ে, স্টার আসবে এবং চলেও যাবে। সে তো কেবল রাতের আকাশেই জ্বলজ্বল করছিল। কিন্তু মানবসভ্যতার স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে, একজন অভিনেতা। গাছ হয়ে। যে দিনে ও রাতে– দৃশ্যমান।

নবজীবন অন্ধবিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল, আনিরুধ পারমার। একজন অন্ধ। সামনে বসে আছেন কবিতা প্রসাদ। বলছেন, অন্ধ শিশুদের গান শেখাবেন। এ-কথা শুনে আনিরুধ পারমারের মুখ লাজুক। হাসছেন অনাবিল! পরক্ষণেই মুখভঙ্গি বদলে যায়। নির্মম হয়। যেহেতু কবিতা প্রসাদ বলেছেন, অন্ধ শিশুরা ‘বেচারা’। ১৯৮০ সালের ছবি– ‘স্পর্শ’! আনিরুধের চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ, শারীরিক অক্ষমতা জুড়েছেন নিজের ক্রাফটে আর কী আশ্চর্য দৃঢ়তায় সংলাপ বলেছিলেন, ‘কিসি কা কিসি পার এহসান নেহি, কোয়ি বেচারা নেহি…’ অথবা, ‘এ ওয়েডনেসডে’। যেখানে একজন ‘স্টুপিড কমন ম্যান’, যার সঙ্গে ভিড় বাসে আমাদের প্রায়শই দেখা হয়, পাইস হোটেলে ভাত, ডাল, কখনও এক টুকরো মাছ জুটে যায়, সে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে আর ভয় দেখায়। এই বহুমাত্রিকতাকে, একটা একটা জীবনকৃতি সম্মান খাটো করে দেয়।

এ-ও বুঝতে হয়, অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পেয়েছি মাত্রই যেন রাতারাতি কেউকেটা হয়ে গিয়েছি! কলার তুলেছি। সোশাল মিডিয়ায় ফলোয়ার বেড়েছে। মনে হয়েছে, আমি সাধারণের থেকে উপরে! নাসিরুদ্দিন শাহ এ-জীবনে যত পুরস্কার পেয়েছেন, বলছেন, ‘পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ ছাড়া প্রায় প্রত্যেকটাই অর্থহীন। কারণ, মেধার নিরিখে পুরস্কৃত করার ধক, আমাদের নেই। তাই, মুম্বইয়ের ফার্মহাউসের বাথরুমের দরজায় আমি পুরস্কারগুলো লাগিয়ে রেখেছি।’

এই দর্শন, আসলে বলিউডি বিষের প্রতিষেধক। শেষ এক দশকে, বলিউডের মূলধারা ছবিগুলো যে টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি, অহেতুক ভায়োলেন্স, স্পাই-কেন্দ্রিকতা, সুঠাম পুরুষালি দেহ, প্রকটভাবে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি প্রমোট করেছে, সেখানে একজন অভিনেতার স্পেস কতটুকু? তাই ফিরে আসতে হয় নাসিরুদ্দিনের কাছেই। আত্মজীবনীতে নাসিরুদ্দিন লিখছেন:

“যে-মুহূর্ত থেকে নিজেকে একজন অভিনেতা বলে ভাবার দুঃসাহস পেয়েছি, তখন থেকেই একটা স্বপ্ন আমাকে তাড়া করে। দেখতে পাই, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ আমার অভিনয় দেখে বলছেন, নিঃসন্দেহে তুমি একজন ভালো অভিনেতা, কিন্তু… এই কিন্তুর পরে কী আছে? আমি জানতে পারিনি। আসলে একটা কিন্তু থেকে অনেকগুলো রাস্তা খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু শেষ গন্তব্য কোথায়, জানা যায় না। সেই ভয়ের সঙ্গে বসবাস করতে দিব্যি লাগে এখন। সেই ভয়ই আমায় শিখিয়েছে, ‘নিশ্চিত’ বলে কিছু নেই এ-পৃথিবীতে। প্রতিটা অভিনয়ের পরেই দারুণ আগ্রহে অপেক্ষা করি, বৃদ্ধ যদি কিছু বলেন!” আমাদের মনে পড়বে, মির্জা গালিবের কবিতা। ‘হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি কে হার খোয়াইশ পে দাম নিকলে/ বহত নিকলে মেরে আরমান, লেকিন ফির ভি কাম নিকলে…’।

অভিনেতা না হতে পারলে চাষ করতাম। হতাম একজন শহুরে কৃষক। প্রবলভাবে চেয়েছিলেন ইরফান খান। অভিনয় অথবা কৃষিকাজ। মন অথবা মাটি। আবাদ করতে করতে একটা জীবন উতরে যাবে! জীবন কীভাবে উতরে যায়? ৭৫ বছর পেরিয়েছে। ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ ভারী ভারী কিছু শব্দ শিখিয়েছিল, ট্যালেন্ট, ইনভলমেন্ট, ইমোশনাল ইন্সপিরেশান, স্তানিস্লাভস্কি… আসলে কিচ্ছু শেখায়নি!

বহু বছর পরে যখন ফিরে এসেছিলেন এনএসডি-তে, চেয়েছিলেন স্কুলের ছাত্রদের অভিনয়-ক্লাসের মাধ্যমে সাহায্য করবেন সামান্য। একইসঙ্গে নিজেও কিছু শিখতে পারবেন, যা ৫০ বছরের অভিনয়-জীবনে কখনও শিখে উঠতে পারেননি। এ-ও এক অভিনয়-দর্শন। যে-কারণে, অনায়াসে জীবনকৃতি পুরস্কার অগ্রাহ্য করা যায়। আরও এক দর্শনের কথা বলেন। বলেন, মঞ্চে অভিনয়ের মুহূর্তে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে দেওয়ার কথা। ভারিক্কি যে আবহ তৈরি হয় প্রেক্ষাগৃহে, সেটা ভেঙে ফেলার দায়িত্ব একজন অভিনেতার। তবেই দর্শক গ্রহণক্ষম হয়ে ওঠে। কারণ, থিয়েটারের ক্ষেত্রে, দর্শক এবং অভিনেতা– একটাই সত্তা। একমাত্র সেইভাবেই, একজন অভিনেতা, এক মুহূর্তে, ১০০০ মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারেন। ওই কমিউনিকেশনের চেয়ে পবিত্র আর কিছু নেই। একজন অভিনেতার জীবনে।

এক দর্শন থেকে আরেক দর্শন। কথা চলতে থাকে। পুরস্কার আসে। নাসিরুদ্দিন সজ্ঞানেই ফিরিয়ে দেন।

শ্যাম বেনেগালের ‘জুনুন’ ছবির শুটিং যখন চলছে, ১৯৭৮, জিওফ্রে কেন্ডেলের সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল নাসিরুদ্দিনের। নাসিরুদ্দিন জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার অনুশোচনা হয় না? ইংল্যান্ডে থাকলে নাইট অথবা লর্ড হতে পারতেন!’ কেন্ডেল দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এটাই তো করতে চেয়েছি আজীবন। আমি আসলে অভিনেতা নই। একজন মিশনারি। ধর্মপ্রচারক। আমার ধর্ম, শেক্সপিয়রকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া’।

অভিনেতার প্রস্তুতি। অভিনেতার শিক্ষা। অভিনেতার দর্শন। আদৌ কোথাও স্তব্ধ হয়ে যায় কি? সে তো প্রতি সংলাপেই জান উজাড় করতে উন্মুখ। আর রোববার ডিজিটালের সম্পাদক আমায় বলছেন, লেখাটা জান দিয়ে লিখিস…।

………………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা

………………………….