


সভ্যতা যত চোঁ চোঁ করে এগয়, দেখা যায় জগতের প্রায় সমস্ত জীবজন্তুর সঙ্গেই মানুষের একটা মারদাঙ্গা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বন কেটে বসতি দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই আদিম যুগের শেষ যাত্রা, এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে খাবারে, রেলপথের বিস্তারে। কিন্তু বনে আর কারা ছিল, কীভাবে ছিল? সেই সহাবস্থানের স্মৃতি আমরা কবেই ছেঁটে ফেলে দিয়েছিলাম। পথ দেখাল অসম। চাষিরা আলাদা করে চাষ করছেন হাতির জন্য। হাতিও চাষির ভাগের ফসল নষ্ট করছে না। এরকম উদাহরণ আরও ছড়িয়ে পড়ুক। এইটুকু তো সভ্য হওয়াই যায়, তাই না?
সে কতকাল আগে আব্দুল লতিফ লিখেছিলেন, ‘পরের জায়গা পরের জমিন/ ঘর বানাইয়া আমি রই/ আমি তো সেই ঘরের মালিক নই’– জমিজমা, সম্পত্তি নিয়ে পৃথিবীজুড়ে ছোট থেকে বড় কত ধরনের বিবাদ! কোথাও একই পরিবারের ভিন্ন সন্তানের মধ্যে বিবাদ, কোথাও দুই পরিবারের মধ্যে বিবাদ, কোথাও দুই রাজ্যের মধ্যে বিবাদ, কোথাও দুই দেশের মধ্যে বিবাদ। ভূমি ও তার মালিকানা নিয়ে পৃথিবীজুড়ে বিবাদের শেষ নেই।
অথচ এই ধরিত্রীর এক বিন্দু জায়গাও মানুষ নিজ হাতে সৃষ্টি করেনি। সৃষ্টির ক্ষমতা কেবলমাত্র প্রকৃতির– প্রকৃতির সেই ক্ষমতা কোনও জীবকেই দেয়নি। অথচ মানুষ তার সর্বগ্রাসী লোভ নিয়ে সকলের আগে এই প্রকৃতির ওপর আধিপত্য কায়েম করতে চায়। এই আধিপত্য কায়েম করার খেলায় চিরকাল সবল দুর্বলের ওপর অধিকার কায়েম করে এবং ছিনিয়ে নেয় সম্পদের ভাগ। কালের নিয়মে এই ছিনিয়ে নেওয়ার ইতিহাস এতটাই সরলীকরণ হয়েছে যে, উন্নয়নের নামে বিঘার পর বিঘা প্রাকৃতিক জমি নষ্ট করলে, গাছ কেটে ফেললে আমাদের খুব একটা খারাপ লাগে না। সত্যি বলতে কিছুটা ভালোই লাগে, অন্যের ভাগ কেড়ে নিয়ে সেখানে গগনচুম্বি অট্টালিকা বানাতে মন্দ লাগে না বোধহয়।
সেখানে কোন জঙ্গলের কোন হাতি তার বাসস্থান হারাল, কোন ময়ূর তার সন্তানকে হারাল, কোন পাখি তার বাসা হারাল, কোন পাখি তার পশু তার খাদ্যের জায়গা হারাল– সেসব নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা নেই।

ভারতের বহু অঞ্চলেই বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের সংঘাত বাড়ছে বহু জায়গায়। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের পরিমাণ কমছে, বন্যপ্রাণ তার স্বাভাবিক বাসস্থান হারাচ্ছে। তার খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ভারতের বহু অঞ্চলে খাদ্যের অপ্রতুলতার জন্য হাতি মানুষের পরিসরে ঢুকে ফসলের খেত নষ্ট করেছে– এই চিত্র খুব একটা দুর্লভ নয়।
সেই চিত্রের অন্যথা হত না অসমের কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানের নিকটস্থ হাতিখুলি-রংহাং গ্রামের অঞ্চলগুলোয়। হাতির প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণেই জায়গার এমন নামকরণ। জঙ্গলের পরিমাণ কমে যাওয়া, মাইনিংয়ের প্রভাব ইত্যাদি নানা কারণে হাতির বাসস্থান এবং খাদ্যের পরিমাণ ক্রমাগত কমতে থাকায় হাতির দল গ্রামে ঢুকে কৃষিকাজ বিপন্ন করা এবং ফসল নষ্ট করা– প্রায়ই ঘটত। অন্যান্য বহু জায়গার মতোই হাতিকে আটকানোর নানা চেষ্টা সেখানেও ব্যর্থ হয়।

কিন্তু একটি পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত হাতিখুলি-রংহাংকে বাকিদের থেকে একেবারে আলাদা করে তোলে। শুধু ‘আলাদা’ বললে ভুল হবে, পরিবেশগত আলোচনা প্রেক্ষিতে সেখানকার মানুষদের কর্মকাণ্ডকে অনন্যসাধারণ করে তোলে।
ফসল ফলানোর নির্দিষ্ট সময়ে এই অঞ্চলে প্রতি বছর হাতির উপদ্রব দেখা যেত। ‘উপদ্রব’ বললে ভুল বলা হয়, কারণ এই অঞ্চলটি হাতির নিজস্ব বিচরণভূমি বলা যায়। মানুষের তৈরি নানা কারণে তাদের সেই বিচরণভূমি বিঘ্নিত হচ্ছিল। মূলত খাদ্যের অপ্রতুলতার জন্য তারা বারবার মানুষের ফসলের ওপর হানা দিচ্ছিল।

সমাধান বের করেন পরিবেশবিদ প্রদীপকুমার ভুয়ান। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণবিদ বিনোদ দুলু বোরা। ২০১৮ সালে যৌথভাবে তারা ‘হাতি বন্ধু’ নামে একটি উদ্যোগের সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কয়েকশো বিঘা জমি হাতির নিজের খাবার আহরণের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে। শুধু ছেড়ে দেওয়া নয়, সেই স্থানে স্থানীয় চাষিরাই হাতির জন্য ফসলের চাষ করবে এবং সেই ফসলে চাষিরা কোনওরকম ভাগ বসাবে না। সেই ফসলের ভাগ কেবল হাতিদের জন্যই।

শুরুতে অবশ্য চাষিদের খুব একটা সায় ছিল না। অনেকেই নিমরাজি ছিলেন। অনেকের মনেই দ্বন্দ্ব ছিল যে, তাঁদের নিজেদের জমি এইভাবে কেন হেলায় নষ্ট করবেন। কিন্তু আবার এ-কথাও সত্য যে, হাতির আনাগোনা ধরুন তাঁরা নির্বিঘ্নে সেই অঞ্চলে চাষাবাদও করতে পারছিলেন না। প্রসঙ্গত, এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন গ্রামের মহিলারা।
এই অঞ্চলে গ্রামের মহিলাদের যথেষ্ট পরিমাণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর আছে। গ্রামের মহিলারা এগিয়ে এসে তাঁরা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেন এবং বাকিদের রাজি করান যে, প্রাথমিকভাবে হাতির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি ছেড়ে দেওয়া হোক এবং সেই জমিতে চাষিরা হাতিদের জন্য চাষ করুক।
কথামতো প্রায় কয়েকশো বিঘা জমিতে হাতির অত্যন্ত প্রিয় নেপিয়ার ঘাস (যার প্রচলিত নাম ‘এলিফ্যান্ট গ্রাস’) , কিছু বিশেষ ধান, নানা ফল ইত্যাদি চাষ করা হয়। ধীরে ধীরে দেখা যায়, হয় হাতির দল সেই সমস্ত অঞ্চল-জুড়ে তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য জুটিয়ে নিয়ে আবার বনে ফিরে যাচ্ছে।

অর্থাৎ, স্থানীয় চাষিদের নিজেদের জন্য চাষ করা ফসলের খেত আর কোনওভাবেই বিঘ্নিত হচ্ছে না। ধীরে ধীরে চাষিরা বুঝতে পারেন যে, এই কর্মকাণ্ড সাফল্য পাচ্ছে। হাতিদের যাতায়াতের জন্য তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ পথ তৈরি করে এখন সেই পরিমাণ ফসল তাঁরা মজুত রাখছেন। অভূতপূর্ব ভাবে বিগত কয়েক বছরে অসমের এই অঞ্চলে হাতি এবং মানুষের সংঘাত প্রায় নেই বললেই চলে। মানুষও নির্বিঘ্নে তাঁদের প্রয়োজনীয় চাষাবাদ করতে পারছেন।
অসমের এই গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় কৃষকদের কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের অনেকখানি শেখার আছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমতে যাওয়া পর্যন্ত– এমনকী, ঘুমের মাঝেও যে পরিশুদ্ধ বাতাস আমরা কামনা করি, তা প্রকৃতি থেকেই পাওয়া যায়। প্রতিদিন নিজের ক্ষুধা নিবারণের জন্য যে খাদ্য গ্রহণ করি, তা প্রকৃতির দান। আমাদের যাবতীয় চাহিদার সবটুকু রসদ কেবলমাত্র প্রকৃতির কাছে আছে।

একথা বোঝার সময় এসেছে যে প্রকৃতি এই বিপুল রসদ কেবলমাত্র মানুষের জন্য বানায়নি। তার এই রসদের সম্ভার প্রতিটি জীবের জন্য। আমরা কেবলমাত্র শুধু নিয়েছি, দিয়েছি কতটুকু? প্রকৃতির বাকি জীবের সঙ্গে সেই খাদ্য ভাণ্ডার ভাগ করে নিয়ে সহাবস্থান করলে দ্বন্দ্বের কোনও প্রশ্ন ওঠে না। যে সহাবস্থান আমাদের পূর্বপ্রজন্ম বজায় রেখেছিল। যে সহাবস্থানের দরুন মানব-সমাজ ও সভ্যতা এতটা পথ এগিয়ে আসতে পেরেছে।

অসমের এই প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষেরা মিলে যে সমবায় ভাবনার বিকাশ ঘটিয়েছেন আজকের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচার জন্য সেই একই সমবেত লড়াই প্রয়োজন। তা শিখিয়েছেন, তারা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন যে কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে লড়ে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে সুন্দর দুনিয়া গড়ে ফেলা যায়।
………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন শুভজিৎ নস্কর-এর অন্যান্য লেখা
………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved