a prose a memoir a realization about ellipses | Robbar
Robbar
  • ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ২১ আগস্ট ২০২৬

এক, দুই, তিন…

উড়তে দেখেছিলাম বটে, প্রসেনজিৎ আর অর্পিতাকে। না, না, টালিগঞ্জের নয়, ক্লাস সেভেনে, এক সাইকেলে, সেকেন্ড ব্রিজের ছায়ায়। সেকেন্ড ব্রিজ যেমন উঁচিয়ে থাকে, সেরকমই দুটো মাথা, সাইকেলে। দেখামাত্র, যারা ইশকুলফেরত, অকালপক্ব, বুঝতে পারল নিজেদের কাছে কী একটা নেই। নেই, নেই, নেই, নেই, নেই। ‘নেই’-ও দু’অক্ষরের। আর আমরা! তারপর ছাই ভালোই লাগে না কিছু। আমসি-কোকাকোলা-ফুচকা-আলুকাবলি– সবই তো একপেশে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ। যেমন চলছিল। কিন্তু আরও আরও অর্পিতারা? অবশ্য তাদের মাতারা-পিতারা… নজর বাঁচিয়ে কেউ কেউ সফল হল…

Published by: Robbar Digital

Posted:August 20, 2026 7:47 pm | Updated:August 20, 2026 7:47 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

তারপর যা হয়, শিকারির জাল ছিঁড়ে বেরতে থাকে একের-পর-এক পাখি।
তারপর?
আরও পাখি।
তারপর?
আরও আরও। পৃথিবীর সমস্ত পাখিই তো ধরা পড়ে গিয়েছিল ওই জালে। এখন তারা এক এক করে বেরচ্ছে। জালের ছেঁড়া অংশটা তো ছোট। তা দিয়ে একসঙ্গে দুটো পাখি বেরবে কী করে?
কিন্তু তারপর কী হবে?
আগে বেরক, এই একটা, একটা করে বেরচ্ছে। ভাব, চোখ বন্ধ করে ভাব। দ্যাখ্‌ কেমন সাদা পাখি, কালো পাখি, হলুদ-সবুজ-লাল– কত কত রঙের পাখি এক এক করে বেরচ্ছে ওই জাল দিয়ে।

এই ছিল আমার, প্রায় রোজকার ঘুমপাড়ানি গল্প। পাখিগুলোর ডানা ঝাপটানো, তাদের মিটমিটে চোখ, রং– দ্রুত ছড়িয়ে যেত আমার চোখে-মুখে-কপালে। সবে যখন ডানা গজাতে শুরু করেছে আমার, আমিও যখন জাল ছিঁড়ে মাথা গলাব বাইরে, তখনই বাকি পাখিগুলো ঝাপসা হতে হতে, ধূসর হতে হতে, একসময় কোথায় যে চলে যেত, কে জানে! আমার তো বাড়িঘর নেই কোনও গাছে। আমি তো চিনি না কোনও পাখিদের আস্তানা। আয়ত্তে কোনও পক্ষীভাষা নেই। আজও তো পাখিরা কোথায় চলে যায়, একলা, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ টের পায় না। দূর কাকে বলে সে কিছুটা জানে, দূরান্ত জানে পাখিরা। কথা বলতে বলতে ‘যাই’ বলে চলে যায় পরিযায়ী পাখিরা। জীবনে প্রথম নিজেকে অসমাপ্ত মনে হয়েছিল সেই ছেলেবেলাতেই, কারণ আমার তো ডানা নেই কোনও… ডানা তো ছাই কোনও মানুষেরই নেই, তবুও কী তীব্র একটা ডানাবোধ, কী একটা উড্ডীপনা আকাশের প্রতি– শ্বেত পাথরের আকাশ, গ্রানাইটের আকাশ।

এমনকী, আমার ডানা হল না কোনওকালেই। অবশ্য, কোনও পক্ষী-চিকিৎসকের কাছে গিয়ে, আমি তো কোনওকালে বলিনি: ‘ডানা হয়নি আমার, কী করবেন, করুন। এমন ভারী অসুখ…’ তবুও উঠতি বয়সে দু’-চারজন পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয় তো টেরাব্যাঁকা বললই– আজকাল দেখছি খুব ডানা গজিয়েছে! সারা শরীর খুঁজেও, বিশ্বাস করুন, একটা পালকও পাইনি তখন। তবে, সে বয়স থেকেই পালক উড়ে এসেছে আমার কাছে প্রায়শই। কোন পাখি, তা জানি না। পায়রা হবে কিংবা কাক বা চড়াই। না, না, কোকিল হবে না। তবে কোকিলের ডাক, শিখে যাব আমি আরও কিছুকাল পর, আপন বসন্তকালে। পাখির ছিন্ন পালক দিয়েই তো তৈরি হত পালকের কলম– কুইল। সেই ছেলেবেলায়, তবে সেই বিচ্ছিন্ন পালক, যা ডানার অসমাপ্তি, আমাকে লিখতে বলেছিল প্রথম? সে-ই প্রথম সম্পাদক আমার?

২.
উড়তে দেখেছিলাম বটে, প্রসেনজিৎ আর অর্পিতাকে। না, না, টালিগঞ্জের নয়, ক্লাস সেভেনে, এক সাইকেলে, সেকেন্ড ব্রিজের ছায়ায়। সেকেন্ড ব্রিজ যেমন উঁচিয়ে থাকে, সেরকমই দুটো মাথা, সাইকেলে। দেখামাত্র, যারা ইশকুলফেরত, অকালপক্ব, বুঝতে পারল নিজেদের কাছে কী একটা নেই। নেই, নেই, নেই, নেই, নেই। ‘নেই’-ও দু’অক্ষরের। আর আমরা! তারপর ছাই ভালোই লাগে না কিছু। আমসি-কোকাকোলা-ফুচকা-আলুকাবলি– সবই তো একপেশে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ। যেমন চলছিল। কিন্তু আরও আরও অর্পিতারা? অবশ্য তাদের মাতারা-পিতারা, তাদের নজর বাঁচিয়ে কেউ কেউ সফল হল…

কলেজ পাশ করে, এক বন্ধু প্রেমে ঘা খেয়ে প্রথমে ক্যারাটে শিখল, তারপর জিমে গেল, তারপর পিঠে করাল ট্যাটু। দুটো দশাসই ডানা। বোজা নয়, খোলা। কাঁধ ঝাঁকালে সামান্য নড়ে-চড়ে। ছেলেটি ওড়ে না। পালকও খসে পড়ে না। কিংবা, হয়তো তার পালক খসে পড়েছে আগেই। পরেও হয়তো খসবে। কিছুই শেষতম সংস্করণ নয়। সবই অশেষ। চিরকাল আত্মীয়স্বজন বলল বটে ডানা গজানোর কথা, কিন্তু সত্যিকারের ওড়া আর হল কই! বড় জোর ঘুড়িতে নাম-পদবি লিখে আকাশে বিন্দু করে রাখা। আর ঘুড়ি কেটে গেলে– এক, দুই, তিন– ত্রিবিন্দু…

৩.
কলমের খাপ চিরকালই পলায়নমুখর। আর হারিয়ে যায় বলেই, কলমের জুটে যায় বাড়তি দেখভাল। অনেক কলমের ঝাঁকের মধ্যে আলাদা ঐশ্বর্যময়, আশ্চর্যময় লাগে তাকে। মনে হয়, কোনও এক দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সদ্য উঠে এসেছে সে। অনেকদিন বসেনি লেখা নিয়ে। লিখতে বসলেই সে লিখে ফেলবে, অজস্র সত্যি দিনকাল, আস্ত একটা উপন্যাস কিংবা দীর্ঘকবিতা। মনে হয়, এ লেখা শুরুও হয়েছিল, মাঝপথে রেখে, আশপাশেই গিয়েছিল লেখক– হয়তো বাজারে, হয়তো দুপুরের খাদ্যবিরতিতে, হয়তো মৈথুনে-হস্তমৈথুনে– এই তো ফিরে এসেছে। খাপখোলা তাঁর তলোয়ার। হয়তো, সেই পেন দৈব, লেখকের শ্রম ছাড়াই, মাঝে মাঝে নিজেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে লেখা। সে জানে, অসমাপ্ত রাখতে নেই। সে তো শরীর দিয়ে বুঝেছে একথা।

খাপ সবসময়ই হারায় যে, তা নয়। কলমও হারায়। খাপ পড়ে থাকে। অনেক সময়, লাল পেনের গায়ে সবুজ খাপ, সবুজ পেনের গায়ে নীল, নীল পেনের গায়ে কালো– এরকম বহু এতোলবেতোল। ওগুলোই– ছাঁচ ভেঙে ফেলো। না-গল্প। হাংরি। থার্ড থিয়েটার। ওগুলোই সমপ্রেম, পরকীয়া, সোনাগাছি, সাম্যবাদ। ওগুলোই নকশাল আমল, অ্যান্টিকবিতা, দিল্লির জেন জি আন্দোলন।

‘নিয়ে নিলি ঠাকুর? নিয়ে নিলি তো। নে, এ-ও দান করলাম।’

হাসপাতালে সারারাত অচেনা এক ভদ্রলোক বলে চলেছেন, তাঁর অসমাপ্ত পা নিয়ে। সুগারে একটা পা, কুচকুচে কালো হয়ে পড়েছিল। ডায়াবেটিক ফুট। গ্যাংগ্রিন হয়তো বা। বাদ দিতে হয়েছে। হাঁটুর নিচ থেকে।

‘লক্ষ্মী বলত, তুমি এত দান করো না গো। দান করো না। এত কুকুরকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছ। মুরোদ আছে এত? কেন যে করো! আমি লক্ষ্মীর কথা শুনিনি ঠাকুর। দান করেছি।’

লক্ষ্মী ওঁর স্ত্রী। সকালে ভিজিট করে গিয়েছেন। ভীত ছিলেন। স্বামীর পা কাটা যাবে বলে কথা!

‘‘সারাজীবন, লক্ষ্মী, সারাজীবন এই দান নিয়ে ঘুরব। দান কি কম করেছি? বনগাঁয় বাপের জমি, দু’-বিঘে কি বিলিয়ে দিইনি বলো আশ্রমের জন্য? তবু তুমি সন্তুষ্ট হলে না ঠাকুর?’

এসেছিলেন ওঁর মেয়েও। হাতকাটা কালো গেঞ্জি। হাতে ট্যাটু ও মাদুলি। কানে হেডফোন। থমথমে কাচঘষা মুখ।

‘ও লক্ষ্মী-ই-ই, তুমি কখন আসবে? ও ঠাকুর, লক্ষ্মী আসবে তো-ও? এখন তো আর হাঁটতে পারব না। ওই যে কাটা পা, তা দিয়ে যতটুকু হাঁটতাম, সব পথটুকু, পথের ধুলোবালিকাদা সব দান করলাম গো ঠাকুর।’

যে পথ চলেননি তিনি, সে পথও দান করলেন। হাঁটুর নিচে তিনি দেখছেন কিছু নেই। আমি দেখছি আছে। ঝুলছে, তিনটে বিন্দু…

প্রস্থেটিক পা লাগানো হবে, কিছুদিন পরে। লাল পেনের গায়ে নীল রঙের খাপ। তবু তো হাঁটা যায়। তবু তো লেখা হয়। আস্ত একটা উপন্যাসের মতো কখনও টেনেহিঁচড়ে হাঁটা, কখনও থমকে থমকে, কখনও হু হু। দান করে যেতে হয় কালি। পথের ধুলোকাদাবালি। কাফকার ‘ক্যাসল’ মনে পড়ে যায়। ঠিক ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল সেই উপন্যাস। কাফকার মৃত্যুর পর, সে-ও অসমাপ্ত। একটি দুর্গ, ক্রমে, দুর্গম হয়ে ওঠে। ‘কে’ চরিত্রটি পৌঁছতে চায় সেখানে, কিন্তু ক্রমে সরে সরে যায় ওই গন্তব্য। ত্রিবিন্দু এসে পড়তে থাকে পথের ওপর… লেখার ওপর… জীবনের ওপর…

ফিরে আসি ঘুমপাড়ানি গল্পে। এখন তো আর ঘুমতে এসব লাগে না। আরও পরে, হয়তো লাগবে ঘুমের ওষুধ। আজ সেই পাখিগুলোর কী অবস্থা? আমার ছেলেবেলায়, যারা একে একে বেরিয়ে পড়ছিল? সেদিকে তাকিয়ে আজ দেখি, পাখিগুলো উড়তে উড়তে এতদিনেও শেষতম পাখিটিতে আসতে পারেনি। কারণ পাখিদের অনবরত মুক্তি আর ডানা ঝাপটানো শিকারি দেখে ফেলেছিল ঠিক। পৃথিবীর দীর্ঘতম জালে, সে, আবারও আটকে রেখেছে সমস্ত পাখিকে।

এখন এই লেখা যাঁরা পড়লেন, আপনারা, যদি সেই জাল, আরেকবার ছিঁড়ে ফেলতে পারেন, দেখবেন, এক এক করে, পাখি বেরচ্ছে। এই এক, এই দুই, এই তিন…

আর এইবেলা একটু একটু করে, আমি ঘুমিয়ে পড়ব আবার। আর কে না জানে, শেষ ঘুমের আগে সমস্ত ঘুমই অসমাপ্ত…

ellipses Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar ত্রিবিন্দু

Share this article on