বেঞ্জামিনের আধুনিক মূল্যায়ন তাঁর দর্শনের আরও একদিক সামনে এনেছে: আধুনিক চেতনা এবং কালবোধের মধ্যে যে স্ববিরোধগুলি বাসা বেঁধেছে, সেগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। সেই স্বীকৃতিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। উল্টে তাঁর মার্কসবাদী লেখার জন্য অপপ্রচার হয়েছে। বেঞ্জামিন ছিলেন শহুরে জীবনের বাণিজ্যকরণের বিরোধী। কিন্তু তাঁর মতামত চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি।
১০৭.
এমন একজন মানুষ, যাঁর তেমন কিছু হল না! অন্তত তাঁর জীবনকালে হল না। এমন মানুষের জন্যই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন তাঁর এই গান: ‘না হয় তোমার যা হয়েছে তাই হল।/ আরো কিছু নাই হল, নাই হল, নাই হল।/… পথেই নাহয় ঠাঁই হল’।
যে মানুষটিকে নিয়ে এবারের কাঠখোদাই, রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি, সেই মানুষটি প্রসঙ্গে আক্ষরিক সত্য। হয়তো আমাদের অনেকের প্রসঙ্গেই। বুঝতেই পারছেন, এবারের কাঠখোদাই কোনও ভুবনজোড়া প্রখ্যাত মানুষকে নিয়ে নয়। তাঁর জীবনকালে এক পরাভূত, ছিন্নভিন্ন, সংসারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে একজন বিফল প্রতিভাকে নিয়ে। বলতে পারেন, এবারের কাঠখোদাই ব্যর্থতার সেলিব্রেশন। তার একটাই কারণ। সম্প্রতি পড়েছি তাঁর ‘ওয়ান ওয়ে স্ট্রিট অ্যান্ড আদার রাইটিংস’ এবং ‘ইলুমিনেশনস: এসেজ অ্যান্ড রিফ্লেকশনস’। আর একটা বইয়ের সুবাস পেয়েছি মাত্র: ‘আর্কেডস প্রজেক্ট’, প্যারিসের নগরজীবন এবং আলো ঝলমল বিপণি সংস্কৃতির ওপর লেখা একটি দার্শনিক বই!

এই অসামান্য দার্শনিক এবং চিন্তক বিন্দুমাত্র স্বীকৃতি পাননি তাঁর নিজের বাড়িতে, সমাজে, এমনকী লেখক পরিচয়েও। আর তাঁর দর্শন বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহীত হয়নি, তিনি পাননি শিক্ষকের পদ, কেননা তিনি বেশ্যালয়ে যেতেন প্রকাশ্যে, পতিতাদের সঙ্গ করতেন অন্যায়বোধ ছাড়া। আমি যতটুকু তাঁকে জানতে পেরেছি তাঁর বই পড়ে, আমার মনে হয়েছে, তিনি শনির দশায় জন্মেছেন! এবং সত্যিই জীবনের শেষ ১০ বছর তাঁর মাথা গোঁজার কোনও নিশ্চিত ঠাঁই ছিল না!

কাঠখোদাই শুরু হচ্ছে ১৯৪০-এর ২৬ সেপ্টেম্বর। ৪৮ বছরের মানুষটি শেষপর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, স্পেনের বর্ডারে এই হোটেল ঘরেই তিনি আত্মহত্যা করবেন! তাঁর পকেটে আমেরিকার ভিসা। কিন্তু তাঁর পালানোর সময় নেই। একজন বন্ধু তাঁর সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য জার্মান বাহিনীকে জানিয়েছে, তাঁর মার্কসবাদী লেখা তুলে দিয়েছে তাদের হাতে। বন্ধুর মতোই কাজ করেছে! দার্শনিক একবার জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর এসে বসলেন হোটেলরুমের টেবিলে। এখানে বসেই তিনি লিখলেন তাঁর শেষ কথা, যা আগেও বলেছেন তিনি, আমরা বেঁচে থাকি সাফল্যের আলো আর প্রচারের ব্যাপ্তির জন্য নয়। জীবন আমার কাছে কিছু নিভৃত, একান্ত নিজস্ব চিহ্নমাত্র। জীবন ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে আরও একবার বলে গেলেন তিনি। আর লিখে গেলেন এই জরুরি উপলব্ধি: ‘I came into the world under the sign of Saturn, the planet of detours and delays!’ তারপর ৪৮ বছরের জার্মান-ইহুদি মার্কসবাদী দার্শনিক খেলেন এমন মারাত্মক পরিমাণে মরফিন, তাঁর জীবনে ফিরে আসার কোনও উপায় রইল না!

এই অসফল মানুষটির নাম ওয়াল্টার বেঞ্জামিন (১৫ জুলাই, ১৮৯২-২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪০)। জন্ম বার্লিনে, এক উচ্চবিত্ত জার্মান-ইহুদি পরিবারে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অতি মেধাবী ছাত্র। ১৯২৮ সালে ৩৬ বছর বয়েসে জমা দিলেন তাঁর গবেষণাপত্র ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য: ‘দ্য অরিজিন অফ জার্মান ট্র্যাজিক ড্রামা’। তাঁকে গবেষণাপত্র ফিরিয়ে নিতে বলা হল। তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণাপত্র ইংরেজিতে।

ইংরেজি ভাষায় ক্রমশ সারা পৃথিবী পরিচিত হচ্ছে তাঁর দার্শনিক লেখাগুলির সঙ্গে। সেই সঙ্গে তাঁর কিছু আপাত হালকা অথচ গভীর সাংবাদিক লেখাও তিনি লিখেছিলেন পেটের তাগিদে। সেই সব লেখা এই যুগেও আধুনিক! এমনই একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘A life lived exclusively in the bright glare of the public realm will fade, will lose depth and ability.’ এই সময়ের রাজনীতিকদের কথা ভাবলে বোঝা যায় কতদূর সত্য বেঞ্জামিনের এই বাণী!
‘এসেস অ্যান্ড রিফ্লেকশন’ বইয়ে একটি প্রবন্ধে এখনকার সাংবাদিকতার চরিত্রটি কী নিখুঁতভাবে সেই কোনকালে বুঝেছিলেন বেঞ্জামিন, জানিয়ে গিয়েছেন কী সহজে: ‘Every morning brings us news of the globe. Yet we are poor in noteworthy stories. This is because no event comes to us without being already shot through with explanation. And almost everything benefits information.’

ততদিনে বেঞ্জামিনকে ছেড়ে গিয়েছে প্রেমিকাও! বেঞ্জামিন নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ। কিন্তু দার্শনিক। টেবিলে বসলেই অনর্গল ঝরে পড়ে ভাবনা। কখনও প্যারিসের বিপণি সংস্কৃতি। কখনও মার্কস। কখনও কান্ট। কখনও গ্যয়েটের রোম্যান্টিক জীবন। একালের দার্শনিক লেখক উলফ্রাম এইলেনবার্গার তাঁর ‘টাইম অফ দ্য ম্যাজিশিয়ানস’ গ্রন্থে লিখছেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিন প্রসঙ্গে:
‘In those years, being Benjamin was a costly business. Along with his insatiable appetite for restaurants, nightclubs, casinos and houses of pleasure he developed a passion for collecting curiosities. Without family home, the life of a journalist was for Benjamin characterized by permanent financial insecurity.’

যত দিন গেল ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তত দ্বিখণ্ডিত হতে লাগলেন চোখের সামনে; একদিকে ডোরা অন্যদিকে আসহা। একদিকে বার্লিন, অন্য দিকে মস্কো। একদিকে সাংবাদিক। অন্যদিকে দার্শনিক। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যদিকে বেশ্যালয়। স্বামীকে হয়তো সঠিক চিনেছিলেন স্ত্রী ডোরা। লিখেছেন একটি চিঠিতে, আমার স্বামী দ্বিখণ্ডিত: একদিকে উর্বর মস্তিষ্ক। অন্যদিকে জাগ্রত লিঙ্গ। ‘He now exists only as a head and genitals!’

এইবার আসা যাক, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের উত্তরমৃত্যু মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতিতে।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগের প্রেক্ষিতে কান্ট-এর দর্শনকে নতুনভাবে নিরীক্ষণ ও ব্যাখ্যা করেছিলেন বেঞ্জামিন। কিন্তু সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে বুঝতে চাননি জার্মান দার্শনিকরা, বেঞ্জামিনের বেপরোয়া জীবনযাপনের জন্য। বেঞ্জামিনের আধুনিক মূল্যায়ন তাঁর দর্শনের আরও একদিক সামনে এনেছে: আধুনিক চেতনা এবং কালবোধের মধ্যে যে স্ববিরোধগুলি বাসা বেঁধেছে, সেগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। সেই স্বীকৃতিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। উল্টে তাঁর মার্কসবাদী লেখার জন্য অপপ্রচার হয়েছে। বেঞ্জামিন ছিলেন শহুরে জীবনের বাণিজ্যকরণের বিরোধী। কিন্তু তাঁর মতামত চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে: ‘Walter Benjamin searched for salvation in times of total social collapse.’
কেন বেনজামিনের কথায় কেউ কান দিলেন না? কারণ একটাই: ‘The answer is simply that in 1929, from the point of view of any academic philosophy, Walter Benjamin was a nonentity.’

কী কারণে তিনি সেই সময়ের অ্যাকাডেমিক দার্শনিক মহলে উপেক্ষিত? তাঁকে কেউ পাত্তা দেয় না! কেননা তিনি কোনও বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদাধিকারী নন। ‘He had tried to find employment at many different universities ( Bern, Heidelberg, Frankfurt, Cologne, Hamburg, Jerusalem) over the years and had failed each and every time, sometimes because of adverse circumstances, sometimes because of anti-Semitic prejudices, but mostly because of his own chronic indecisiveness.’

অথচ ছাত্র হিসেবে তিনি ব্রিলিয়ান্ট! বার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট। তাঁর লেখা বিশেষ গবেষণাপত্র– ‘Concept of Art Criticism in German Romanticism’ শিক্ষকদের তাক লাগিয়ে দিল, তখন মনে হয়েছিল তাঁর জন্য খোলা সকল দরজা: ‘All doors seemed open to him. His doctoral supervisor, Richard Herbertz, professor of German, told him a paid teaching post was within his grasp.’ কিন্তু বেঞ্জামিন থতমত, ইতস্তত করলেন। বাবার সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করলেন। কঠিন ডিসিপ্লিনের জার্মান অ্যাকাডেমিক পরিসরে যেতে চাইলেন না। বেছে নিলেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকের অনিশ্চয়তা। কিন্তু পাশাপাশি লিখতে লাগলেন মেধাবী দার্শনিক লেখা। এবং শুরু হল তাঁর রাহুগ্রস্ত যাপন! এবং একই সঙ্গে মহার্ঘ রজনীজীবন। নাইটক্লাব, দামি রেস্তোরাঁ, ক্যাসিনো বা জুয়ানিলয়, বেশ্যাবাড়ির দেহসুখ আর মাতোয়ারা– এই সব তাঁকে পেয়ে বসল।

বউ ডোরা আর ১১ বছরের ছেলে স্টেফান আর অসুস্থ মাকে ভুলে তিনি থাকতে শুরু করলেন প্রেমিকা আসহা ল্যাসিস (Asja Lascis) এর সঙ্গে। কিন্তু প্রেমিকাও বেশিদিন বোধহয় সহ্য করতে পারেনি বেঞ্জামিনের লম্পট জুয়াড়ি রাতযাপন। তাছাড়া অচিরে দেখা দিল বেঞ্জামিনের অর্থসংকট। প্রেমিকের হাতটান কোন প্রেমিকা মেনে নেবে? একদিন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল বেঞ্জামিনকে। বেঞ্জামিন দ্রুত বাড়ি চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন মা মৃত্যুশয্যায়। সেদিকে খেয়াল না-করে বউ ডোরাকে বললেন, ‘আমি ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, তোমাকে ডিভোর্স করে আমার ল্যাটভিয়ান-লাভার ল্যাসিসকে বিয়ে করব।’
১৯২৪-এ ডোরার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হল বেঞ্জামিনের। তার আগেই মারা গিয়েছেন বেঞ্জামিনের মা!
………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব
………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved