

ধ্রুব জুরেল। সেঞ্চুরি করেছেন। সেলিব্রেশন করেছেন হাতের মাসল-ট্যাটু দেখিয়ে। সেখানে লেখা: জয় জওয়ান, জয় কিসান। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কৃষক কেমন আছেন ঋণের বোঝাসমেত? কেমন আছেন সেনাবাহিনী এই দেশপ্রেমের বাড়বাড়ন্ত উপত্যকায়? একটি ট্যাটু– অনেক প্রশ্ন। দেশমৃত্তিকার জন্যই তো তাঁরা, অক্লান্ত, অফুরান। একদল মাটি থেকে ফসল ফলান, আরেকদল এই মাটি আগলে রেখেছেন। তাঁদের বন্দনা একপ্রকার দেশমৃত্তিকার বন্দনা নয়?
… ১৯১৭
… ১৯৬৫
… ২০২৬
হতে পারে আপাতবিচ্ছিন্ন তিন টাইমলাইন। কিন্তু তাদেরকেই অস্বস্তিকর একমালায় গেঁথে বসলেন শ্রীলঙ্কা সফররত ভারতীয় টেস্ট দলের তরুণ ব্যাটার ধ্রুব জুরেল! মিডিয়াতাড়িত ভারত এতক্ষণে জেনে গিয়েছে– কলম্বোর মাটিতে শতরান করে হাতের নতুন ট্যাটু ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’ দেখিয়েছেন জুরেল। কিন্তু এতে পাত্তা দেওয়ার কী আছে! ‘জুরেলের জুড়ি মেলা ভার’– এমন হেডলাইন ভাবে না দেশজ মিডিয়া। সোজা কথাটা হল, ধ্রুব কিন্তু বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মা নন, এমনকী, বৈভব সূর্যবংশীর মতো আইসিসির উঠতি ‘ধ্রুবতারা’ও না। বিজ্ঞাপনী দুনিয়া পোঁছে না তাঁকে। খেলেছে তো মোটে ১২টা টেস্ট, সাকুল্যে দুটো সেঞ্চুরি। যাঁরা নিয়মিত ক্রিকেটের খোঁজ রাখেন, তাঁদের বাইরে ওঁর অস্তিত্বই নেই। তার উপর প্রেমিকা কিংবা হবু বউকে নিয়ে হাতে-বুকে ট্যাটু আঁকলেও কথা ছিল। তারও না হয় একটা বাজারমূল্য আছে। প্রেম প্রদর্শন ক্রিকেট মাঠে মোটেই আর নিষিদ্ধ নয়। এই সমস্ত কিছু না করে সেই ১৯৬৬ সালে মরে ভূত ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে বিস্মৃতির অতল থেকে টেনে তোলা কেন?

উত্তর পেতে চলুন চম্পারন। ১৯১৭। চেনা বিষয়, জানা জুলুম। ব্রিটিশ নীলকর সাহেবরা ‘তিনকাঠিয়া প্রথা’র মাধ্যমে দেশের অন্নদাতা কৃষকদের মোট জমির একটি নির্দিষ্ট অংশে জোর করে নীলচাষ করাচ্ছেন, অতিরিক্ত কর চাপিয়ে শোষণ করছেন। এই অত্যাচার অবসানের লক্ষ্যে স্থানীয় কৃষক রাজকুমার শুক্লার আহ্বানে সদ্য দক্ষিণ আফ্রিকা ফেরত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী চম্পারনে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে নামলেন। ইতিহাস জানে, সফল হয়েছিল সেই আন্দোলন। কুখ্যাত ‘তিনকাঠিয়া প্রথা’ বাতিল হয়। নীলকরদের বেআইনিভাবে আদায় করা অর্থের ২৫ শতাংশ ফেরত দেওয়া হয় গরিব কৃষকদের। কার্যত এই আন্দোলনেরই সন্তান গোটা বিশ্বে অহিংস প্রতিবাদের আইকন মহাত্মা গান্ধী। তবে কি না বিশ্ব যাই বলুক, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে কৃষকদের জন্য, গরিব ভারতবাসীর জন্য আজীবন লড়া এই লোকটার প্রচুর ভুল বের করছে আত্মনির্ভর ভারত। ভাবুন একবার, এই লোকটারই ভাবশিষ্য ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, বেমালুম তাঁর কথা মনে করিয়ে দিলেন ভারতীয় দলের জেন জি ক্রিকেটার ধ্রুব জুরেল!

নেহরুর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শাস্ত্রী। তারপরই পাকিস্তানের বেয়াদপি! অর্তকিতে কাশ্মীরে আক্রমণ চালায় পাক সেনা। অন্যদিকে সদ্য স্বাধীন দেশে খাদ্যশস্যের তীব্র সংকট। এই জোড়াফলার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’য় ১৯৬৫ সালে প্রয়াগরাজের এক জনসভায় আধুনিক ভারতের সবচেয়ে পবিত্র স্লোগানটি দেন শাস্ত্রী– ‘জয় জওয়ান, জয় কিসান’। এরপর ছয় দশক কেটে গিয়েছে। ২০২৬ সালও সাক্ষী, প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর স্বার্থান্বেষী মানুষের ষড়যন্ত্রে কৃষক কিংবা জওয়ান কারও দুঃখমোচন হয়নি। বরং বেদনার বেহালা আরও বেশি করুণ সুরে বেজেছে। একদিকে চিন, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে ও ছায়াযুদ্ধে বলি হচ্ছেন লক্ষ লক্ষ জওয়ান। এমনকী, সেই যুদ্ধ কতটা প্রয়োজনের, কতখানি কূটনৈতিক ব্যর্থতার কিংবা দ্বেষের রাজনীতির ফলাফল। তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তো দাবি, সেনাও এখন শাসকদলের ঘুঁটি।

অন্যদিকে খরা, অজন্মা সামলে ফসলের ন্যূনতম দাম পেতে পথে নামতে হচ্ছে কৃষকসমাজকে। ঋণের দায়ে আত্মহত্যা তো ছিলই। এবার অন্নদাতার অনশন আন্দোলনেরও সাক্ষী হচ্ছে অভাগা দেশ। ‘মেরি দেশ কি ধরতি সোনা উগলে/ উগলে হিরা-মোতি’… এ কেবল ‘কথার কথা’ হয়েই থেকে যাচ্ছে। কারণ মধ্যস্বত্বভোগীরা অন্নদাতাকে লোটার পাশাপাশি অন্নভোগীদেরও বোকা বানাচ্ছে। অথচ তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই রাষ্ট্রের! প্রশ্ন হল, এই যে ভারত জুড়ে সবজি বাজার অগ্নিমূল্য! সংসার টানতে প্রাণ যাচ্ছে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের, তারপরও সোনার ফসল ফলায় যে, তাঁর দুইবেলা আহার জুটবে না কেন? সমস্যা ঠিক কোথায়? কে আমাদের বোকা বানাচ্ছে?
একটিমাত্র ট্যাটুতে এইসব বেজায় কঠিন, তীব্র অস্বস্তিকর, এমনকী, বিপজ্জনক প্রশ্নমালার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় দলের তরুণ ব্যাটার ধ্রুব জুরেল। তিনি কি এবার বিপদে পড়বেন? তাঁর বাহুতে কেন ভেসে উঠবে চম্পারন, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী আর দেশপ্রেমের বলি জওয়ানদের কথা! উত্তর দিয়েছেন ধ্রুব নিজেই। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার ঠাকুরদা কৃষক ছিলেন। আর আমার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। আমি নিজের শিকড় ভুলতে চাই না।’ কিন্তু আত্মনির্ভর ভারত তো অনায়াসে ভুলে যাচ্ছে! গুলিয়ে ফেলছে দেশ ও শাসক, ধর্ম ও দর্শনের গভীর, গভীরতম তফাত!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved