in Classrooms How Hate Against Muslims Is Taking Root। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নব্য হিন্দুত্বের উদযাপন এখন ইশকুলের উচ্চশিক্ষিত স্টাফরুমে

নব্য হিন্দুত্বের উদযাপন দেখছি তো উচ্চশিক্ষিত স্টাফরুমগুলিতে, শিক্ষকদের নানা রকম নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়ার বুকে। কাজেই ক্লাসরুমে নিঃসাড়ে তার প্রভাব পড়বে না সে কী হয়! মুখ্যত, মিডিয়ামগ্ন যে-হিন্দু শিক্ষক বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, ওদের জন্যই ‘আমাদের’ দেশের এই অবস্থা, তিনি কি এতটা অপরায়ন ভিতরে বহন করে ক্লাসে তাঁর মুসলিম পড়ুয়াটিকে শ্রদ্ধা করেন মন থেকে? আমাদের মনে রাখতে হবে, বাচ্চারাও ক্লাসরুমের বাইরের জীবনে হাতের ফোনটি থেকে যে-সমান্তরাল পাঠ পায়, তার অনেকটা জুড়ে থাকে মন্দির-মসজিদ, জুড়ে থাকে রাষ্ট্রের অনেক কুশলী রাজনীতি।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২, ২০২৬, ১৮:২৭   
Facebook WhatsApp Messenger

‘সৃষ্টির মনের কথা, মনে হয়, দ্বেষ।’ লিখছেন জীবনানন্দ দাশ, ’৪৬-এর দাঙ্গার পর এক দীর্ঘকবিতায়। কলকাতার দাঙ্গায় হতপ্রাণ বাঙালি মানুষদের নাম কীরকম? হানিফ, মহম্মদ, মকবুল, গগন শশী– কেউ পাথুরেঘাটার, কেউ মানিকতলার। রাজনীতিতে যাঁরা বিদ্বেষবিষের আমদানি করেন তাঁদের চোখে দাঙ্গায় মরে যাওয়া মানুষগুলি কোন শ্রেণির? অসীম গ্লানি বুকে নিয়ে ‘১৯৪৬-৪৭’-এর কবি লেখেন, ‘জীবনের ইতর শ্রেণীর মানুষ তো এরা সব…বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করে…’

zoom
১৯৪৬-৪৭ কবিতার অংশ। জীবনানন্দ দাশ

সম্প্রতি আমার দেশের এক হিন্দু মাস্টারমশাই ক্লাসে সরাসরি এক মুসলিম ছাত্রকে জাতধর্ম তুলে ‘জঙ্গি’ সম্বোধন করেন। স্বস্তির কথা এই যে, এই ঘটনায় তীব্রভাবে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে তার সহপাঠীরা। গোপন হিংসা বেরিয়ে আসছে আচরণে, বেরিয়ে আসছে মানুষ গড়ার কারিগরের ভিতর থেকে, এ দুঃসময়ের বীজ আমাদের সমাজমনের কত গভীরে– ভাবলে স্থির থাকে না আর মন।

zoom
ছবিটি প্রতীকি

আজ থেকে ৩১ বছর আগে, ক্লাস ফাইভে ইংরেজি পড়াতে গিয়ে জেনেছিলাম আমার ইশকুলের কত বাচ্চা জীবনে আপেল কেমন খেতে, তা জানে না। গরিব ঘরের পড়ুয়াদের কাছে ‘A for Apple’, ‘অ-এ অজগর’-এর মতোই করুণ, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার বয়ানমাত্র। কিন্তু তখনও কী দেখেছি? ইদের পরে মেহেন্দি-আঁকা শীর্ণ হাতে অ্যালুমিনিয়ামের টিফিনবাটিতে ছাত্রী মাস্টারমশাইদের জন্য নিয়ে এসেছে মায়ের হাতের রান্না করা সিমুই। সেই টিফিন কৌটোকে সবাই কি সম্মান দিয়েছি আমরা? না, দিইনি। প্রায় বছর সাতেক হয়ে গেল মেহেন্দিপরা হাত বইখাতা বের করে ক্লাসে পড়া শোনে, কিন্তু সেই হাতে আর উঠে আসে না অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন বাক্সের আত্মীয়তা।

আমার মনে পড়ে, আজ থেকে ২০ বছর আগে এমএ পাশ হেডমাস্টার ইশকুলের হিন্দু, বিধবা টিফিনমাসিকে বলছেন, ‘মাসি, রুমা বেগম ম্যাডামের বাসায় বিয়ার নেমন্তন্ন খাইতে যাবা? খাইলে কিন্তু তোমার জাত যাবে!’ মাসি কিন্তু গিয়েছিলেন। খেয়েওছিলেন আমাদের সঙ্গে বসে, পাত পেড়ে। কিন্তু পোলাও দেখে আমাদের এক যুবক শিক্ষক নাক সিটকে বলেছিলেন, ‘ইঃ! আমি হলুদ ভাত খাই না!’ সেটা কি তাঁর ইসলামোফোবিয়া? আমি বলব, না। কিন্তু এক ধরনের প্রত্যাখ্যান। ‘মুসলমানদের মতো সব শাকে রসুন ফোড়ন দিস কেন?’ উচ্চবর্ণের হিন্দু দিদিমণিকে বলতে শুনেছি তাঁর হিন্দু সহকর্মীকে।তিনি জানেন না, গরিব, নিম্নবর্ণের খেটে-খাওয়া মানুষের শাক রান্নার প্রধান উপাচার রসুন আর কাঁচালঙ্কা। রসুনের তীব্র ঘ্রাণে আর কাঁচালঙ্কার ঝালে একপদ দিয়ে একথালা মোটা চালের ভাত খেয়ে নেওয়া যায় যে! আমাদের শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় হবু মাস্টারের মনের গড়ন বুঝে নেওয়ার কোনও পন্থা নেই। তাই, অমুকে মুসলমানমার্কা টুপি পড়েছে বা অমুকে বোধহয় হোমো– এইসব আলটপকা উচ্চারণ চিরকাল তো থেকেছে ইশকুল শিক্ষার আঙিনায়।

zoom
তাজমহল। সূত্র: ইন্টারনেট

আর এখন? নব্য হিন্দুত্বের উদযাপন দেখছি তো উচ্চশিক্ষিত স্টাফরুমগুলিতে, শিক্ষকদের নানা রকম নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়ার বুকে। কাজেই ক্লাসরুমে নিঃসাড়ে তার প্রভাব পড়বে না সে কী হয়! মুখ্যত, মিডিয়ামগ্ন যে-হিন্দু শিক্ষক বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, ওদের জন্যই ‘আমাদের’ দেশের এই অবস্থা, তিনি কি এতটা অপরায়ন ভিতরে বহন করে ক্লাসে তাঁর মুসলিম পড়ুয়াটিকে শ্রদ্ধা করেন মন থেকে? আমাদের মনে রাখতে হবে, বাচ্চারাও ক্লাসরুমের বাইরের জীবনে হাতের ফোনটি থেকে যে-সমান্তরাল পাঠ পায়, তার অনেকটা জুড়ে থাকে মন্দির-মসজিদ, জুড়ে থাকে রাষ্ট্রের অনেক কুশলী রাজনীতি। আমার মনে পড়ে আট বছর আগে আমায় ক্লাস ইলেভেনের এক ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যর, তাজমহলের নীচে নাকি শিবলিঙ্গ আছে?’ সেদিন ক্লাসে ‘শিব’ শব্দের অর্থটি বলেছিলাম। আর শুনিয়েছিলাম উস্তাদ বিসমিল্লা খানের সেই গল্প– যেদিন উনি বাবা বিশ্বনাথকে সানাই শোনাতে পারবেন না বলে আমেরিকায় ক্লাস নিতে যেতে চাননি।

zoom
ওস্তাদ বিসমিল্লা খান। ছবি: রঘু রাই

আজকাল ইশকুলে ইশকুলে সরস্বতী পুজোয় পড়ুয়াদের দিয়ে পৌরোহিত্য করানো হচ্ছে। মিডিয়াও প্রচার করছে প্রগতিশীল শিক্ষকদের বয়ান– এতে নাকি ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে সমাজকে। কিন্তু জটিল সংস্কৃত মন্ত্র, আচার, ভূতশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি, হোম-আহুতি ইত্যাদি পড়ুয়াদের দিয়ে অনুষ্ঠিত করে আরও বড় একটা আধিপত্যের খাঁচায় কি পুরে দিচ্ছি না আমরা বাচ্চাদের? রবীন্দ্রনাথ যাকে বলতেন ‘হিন্দুয়ানি’– সেই হিন্দুয়ানির প্রবলতর উদযাপন কি আমরা করছি না দেশের এই ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান চুরমার-করা সময়কালে? সেদিন সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ে ইশকুল শিক্ষার অঙ্গনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় একজন শিক্ষক খুব গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘আমাদের ইশকুলে কিন্তু মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই পুজোয় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে থাকে।’ এই গৌরব কার? সংখ্যালঘুর গৌরব, না সংখ্যাগুরুর? উল্টোদিক থেকে ভাবলে কীরকম হবে বিষয়টা? আমরা মনে করি, সংখ্যাগুরুর উৎসবে সংখ্যালঘুকে শামিল করতে পারার মধ্যে কোনও বাহাদুরি নেই। যেমন নেই ইশকুলের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে বারবার সংস্কৃত মন্ত্র গেয়ে অনুষ্ঠানে ধ্রুপদী গ্ল্যামার দেওয়ায়। সারস্বত সাধন সেইদিন সার্থক হবে, যেদিন বড়দিনের কেক খাবার মতো উৎসাহে আমরা ইশকুলেও খুশির ইদের আগে-পরে মিড ডে মিলে একদিন সেমুই রান্না করে ইদের খুশিতে শামিল হব।

ChangeStartsHere ClassroomReality EducationMatters EndIslamophobia HumanRights InclusiveEducation IndianEducation ReligiousTolerance Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar SayNoToHate SchoolCulture Secularism SocialAwareness StopHate UnityInDiversity

Share this article on