The Unseen Shibram: Desire, Sex and Violence। Robbar
Robbar
  • ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ২৮ আগস্ট ২০২৬

ভয়-ধরানো শিবরাম!

শিবরাম মানেই পানিং? শব্দের মজারু কারিকুরি? হাসির ফুলঝুরি? মজার গল্পের ঘনঘটা? নাহ। এ শিবরামের বাইরেও রয়েছে আরেক শিবরাম। যাঁকে ‘ডার্ক’ বললেও কম বলা হয়।  

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ১১:৫৭   
Facebook WhatsApp Messenger

মাথায় শ্যাম্পুর পর তিনি মুখে সাবান মাখলেন, তারপরে বললেন আমায়– পিঠের দিকটায় মাখিয়ে দাও তো আমার।

সাবানটা নিয়ে আমি তাঁর পিঠে মাখাতে লাগলাম।

ভালো করে মাখাও।

আমি জোরে জোরে ঘষতে লাগলাম।

এবার এদিকটায়।

আমি ইতস্তত করছি দেখে তিনি বুকের দিকে তোয়ালেটা সরিয়ে দিলেন এবার।

তবু আমি হাত বাড়াই না দেখে তিনি একটু হেসে বললেন– তোমার মনে পাপ ঢুকেছে দেখছি।

পাপের কথায় রাগ হয়ে গেল আমার। আমি চোখ কান বুজে জোরে জোরে সাবান ঘষতে লাগলাম।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন তারপর। পায়ে মাখাও এবার।

মাখাতে লাগলাম। কী সুন্দর সুগঠিত পা! অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার মতোই। বাবা বলতেন, দেবীর স্তরে পা থেকে বন্দনা শুরু করতে হয়। সরস্বতীর বেলায় কে যেন তা করেনি, তাই তাঁর কোপে সে নাকি গাধা বনে গেছল। আমি তার মর্মটা তখন বুঝতে পারি।

এ কী! থামছ কেন? ওপর পর্যন্ত মাখাও। থেমে যাচ্ছ যে?

আমি তখন ওঁর কোমর অবধি সাবান মাখাতে লাগি। হাঁটুর ওপরে আরো কী সুষমার রহস্য রয়েছে দেখার কৌতূহল যে না জেগেছিল তা নয়। তবুও কেমন একটা বাধ বাধ, ঠেকছিল বইকি।

আরো ওপরে। আরো।

আরো উপরে মাখাতে গিয়ে তাঁর পরনের তোয়ালে খসে পড়ে। তিনি মোটেই সামলাতে চান না।

আমি ঘাড় হেঁট করে থাকি।

থামলে কেন? মাখাবে তো।

ঘাড় গুঁজে ঘষতে থাকি সাবান।

সব জায়গায় লাগছে না যে। বাদ দিয়ে যাচ্ছ তুমি।

তারপর আমি আর কোন বাদবিসংবাদ রাখি না। ঘাড় হেঁট করে চালিয়ে যাই।

মাথা নীচু করে কেন? কোথায় মাখাচ্ছ দেখছ না? তাকাও ওপরে।

নিজেই তিনি দু হাত দিয়ে মাথাটা আমার তুলে ধরেন। প্রাণপণে আমি সাবান মাখাই। সামনে পিছনে সব জায়গাতেই।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন তারপর পা থেকে গলা অবধি বেশ করে রগড়ে দাও তো দেখি। ময়লা কেটে যাক।

রগড়াই বেশ করে। তলার থেকে গলা পর্যন্ত। দেবীর বন্দনায় কোনো অংশই বাদ যায় না।

ক্রমশই ভালো লাগতে থাকে।

এবার কুয়োর থেকে বালতি বালতি জল তুলে ঢালতে পারবে? কুয়োর ভেতরে পড়ে যাবে না তো তুলতে গিয়ে।

পড়ব কেন? এসব কাজ আমি খুব পারি। হাতে হাতে প্রমাণ দিয়ে দিই।

কয়েক বালতি ঢালার পর তিনি শুকনো তোয়ালে দিয়ে গা মুছতে মুছতে বলেন– এসো এবার সাবান মাখিয়ে তোমার গা ধুইয়ে দিই বেশ ভাল করে। কেমন? জামা কাপড় খুলে রাখো ওইখানটায়।

না।

না কেন? গা ধোও না বিকেলে?

না।

বিকেলেই তো নাইবার আরাম গো। নাও, জামা-টামা খোলো। খুলে রাখো ওইখেনে। একী, লজ্জা করছে নাকি খালি গা হতে?

না।

আমি এত বড়ো মেয়ে খালি গা হয়ে নাইতে পারলাম আর তুমি এইটুকু ছেলে, তোমার লজ্জা! এসো, লজ্জা কীসের? বেশ ভালো লাগবে তোমার।

এই আশ্চর্য রিরংসার কাহিনি যাঁর লেখায় উঠে এসেছে কৈশোরক শরীরসন্ধিৎসার আঁকাড়া ছবি হয়ে, অণু-পরমাণু আকাঙ্ক্ষার ফেনা যাঁর লেখার গা বেয়ে অকালবসন্তের বাতাসে মিলিয়ে যেতে যেতে পাঠকের শিরদাঁড়া বেয়ে নামিয়ে দিয়ে গেছে উষ্ণশীতল যৌনতার আভাস, যদি বলি তাঁর নাম শিবরাম চক্রবর্তী, একটুও চমকে উঠবেন না, তা কি হয়?

মুক্তারামের তক্তারামে শুক্তারাম খেয়ে শুয়ে থাকা ব্রামবাবুর বাড়ির খোঁজ করতে করতে আলগোছে কোথাও হারিয়ে গিয়েছে এমন কিছু বৈদ্যুতিক ছুতার, যার সম্মোহনের ধার কিছু কম ছিল না! Pun-আসক্ত, গোহর্ষবর্ধনের স্রষ্টা কিংবা স্যাটায়ারের ছড়াছড়ির মধ্যে থেকে একটু এদিক-ওদিক পাতা ওল্টালেই যে শিবরাম বেরিয়ে আসেন নারীপুরুষের আদিম যৌনতার প্রতি তীক্ষ্ণদৃষ্টি আসঙ্গ-অভিলাষ নিয়ে, তাঁকে সামলে চলা বেশ কঠিন। 

কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর কাহিনিতে যৌনতা আসে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। রম্যরচনায় তাঁর অবগাহন যতটাই নির্মল, প্রেম অথবা যৌনতার বিন্যাসে তাঁর ভাষা ততটাই সাংঘাতিক ধারালো এবং ভয়াবহ সব রূপকে মোড়া। তার অর্থ ক্রমশ পাঠককে নিয়ে যাবে অনর্থের দিকে, কিন্তু খুব সোজাসাপটা ছলে নয়। এমন আলগোছে সেসব শরীরী লিপ্সার কথা তিনি লিখবেন, যাতে দু’টি আলাদা আলাদা ছবি উঠবে ফুটে। তার বহিরঙ্গে আপাত নিটোল একটি গল্প। কিন্তু খোলসটি ধরে টান মারলেই অন্তরঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠবে সর্পিল নকশার ডোরাকাটা দাগ– পাঠক কোনটি লুকোবেন আর কোনটি রাখবেন সাজিয়ে, কোন অর্থটি নেবেন আর কোনটি পুষে রাখবেন গোপন নিষিদ্ধতায়, তা তাঁদের স্বাধীনতা।

‘গৃহিণী গৃহ মুছ্যতে’ গল্পটিই যেমন। শুরু হয় ঘাটশিলায় নতুন চাকরি নিয়ে সদ্যপ্রবাসী দম্পতির দাম্পত্য কলহ নিয়ে, যে অশান্তির জেরে স্বামীটি এক রাতের জন্য রাগ করে বনবাসী হন। গল্পের শেষে তিনি ফিরেও আসেন, কিন্তু মাঝপথে গাছের ডালে রাত্রিবাসের পর্বে একটা অদ্ভুত বর্ণনা রেখে যান শিবরাম, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এই দ্বৈত অর্থের খেলা–

খানিক বাদে এক বিরাট অজগর সেই পথে যেতে দেখতে পেল শেখরকে। ‘ইস্‌ লোকটা কী বেকায়দায় শুয়েছে দ্যাখো দেখি! ঘুমের ঘোরে উলটে পড়ে হাড়গোড় ভাঙবে বোধহয় বেচারা। না, ওকে রক্ষা করা আমার দরকার।’ আপনমনে আওড়াল সাপটা।

এই না ভেবে সেই পরচিকীর্ষু সাপটা গাছে উঠে সাত পাকে তাকে জাপটে ধরল।… সকালে গাছের ফোকর দিয়ে সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল শেখরের। ঘুম ভাঙতেই শেখর দেখল বিরাট এক অজগর তাকে জড়িয়ে রয়েছে। এক সাতপাকের হাত থেকে বাঁচতে আরেক সাতপাকের ফাঁসে এসে পড়েছে সে। সাপটা তখনো গভীর নিদ্রায় অচেতন। শেখরের ডান হাতটা মুক্ত ছিল, আর দেরি না করে পকেট থেকে তার ছোরাটা বার করে সে সাপের পিঠে বসিয়ে দিলে সবলে।

সাপটা তখন আরও জোরে জাপটাবার চেষ্টা করল তাকে– আর ছুরিটাও সেই চেষ্টায় আরও বেশি করে গেঁথে বসল তার গায়ে। একটু পরেই অজগর নিজের বাঁধন আলগা করে গাছ থেকে খসে পড়ে ভূমিশয্যায় দেহরক্ষা করল তার।

এখন ঘাটশিলার জঙ্গলে অরণ্যসুন্দরী এই সর্পিণী আলিঙ্গনের মধ্যে বন্য মানুষীর গন্ধ আছে কি নেই, নিশুত রাতে মুহূর্তের স্খলনের পর শহুরে পুরুষের নাগরিক নীতিবোধ শিকারের রূপকে জাগরূক হয়ে উঠল কি না, সে দায় ঝেড়ে ফেলা আছে পাঠকের হাতে। শুধু পড়ে আছে, একটা আনখশির সিরিয়াস গল্পের ভেতরে অযথাই পশুকথার আদলে সাপিনীর ওপরে ভাবনার আরোপ, কিংবা ‘এক সাতপাকের বদলে আরেক সাতপাকের বিধ্বংসী ইঙ্গিত’, কিংবা গল্পের শেষে গুম হয়ে যাওয়া পুরুষালি অপরাধবোধ– ‘ডেকচেয়ারটায় গা এলিয়ে মনে হল শেখরের, গভীরতর বনে না সেঁধিয়ে ভালোই করেছে সে। কেননা পরের বন যতই গভীর হোক না কেন…’ 

আত্মঘাতী এক আত্মজীবনীর ছলে ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’-তেও মিথ্যের ছলনায় ঢাকাঢুকি দিয়ে যেসব কাহিনি তিনি লিখে গিয়েছেন, অদ্ভুত এক কায়দা আছে তাতে। সেসব গল্প সত্যি বলে ধরে নিতেও পারেন, আবার শিবরামীয় গাঁজাখুরি ভেবে সোডার বোতলের আগার ভসভসানির মতো অজান্তেই সেসব উড়িয়ে দিতেও পারেন হাওয়ায়। প্রশ্ন করার কেউ নেই। বিয়ে করার নামে কোন এক মেয়ের যথাসর্বস্ব গয়নাগাটি-টাকাকড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়া লেখক শিবরামের বৃত্তান্ত সেখানে লেখা থাকে গুজবের মতো, ঠিক যেভাবে স্বগতোক্তির মতো বলা থাকে মাকে খুন করে পালিয়ে ফেরার হওয়া বহুনারীগামী বাবার কথাও। সত্যি আর মিথ্যের বিবাদভঞ্জনের দায় থেকে চিরকেলে হাত-পা ঝাড়া লেখককে সমন ধরানোর কোনও দায় সেখানে কারওর নেই! আর নারী যতবার এসেছে জীবনের অন্তরালবর্তিনী কাহিনির ঢেকে রাখা পাতা থেকে চমক জাগিয়ে, যেভাবে তাদের নিয়ে সমস্ত শরীর আর আবেদনের আবরণহীন খেলা খেলেছেন এই মিথ্যে ধোঁয়াশার শিবরাম, পড়ে অবাক হতে হয়। তরুণ কথকের জীবনে দেহসৌরভের মদিরা ছড়িয়ে দিয়ে যাওয়া রিনি যেমন–

না, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর দেখা দেবে না আজ। কেমন ধোঁয়াটে কুয়াশার মতন দেখছি যেন উত্তর দিকটা।

না দেখা দিক। তুই তো দেখা দিয়েছিস! তোকেই না হয় দেখব আজ। ভালো করে দেখব আরো।

দেখছই তো। আবার কী দেখবে আমায়!

এ দেখা নয়, ভালো করে দেখব তোকে। আমার সামনে খালি গা হবি?

দূর! তা আবার কেউ হয় নাকি?

সুন্দর মেয়েরা হয়। আর্টিস্টের সামনে হয়ে থাকে। দেখে দেখে তাদের ছবি আঁকে যে তারা। এমন সব খালি গায়ে মেয়েদের ছবি তোকে আমি দেখাতে পারি। বিলিতি অ্যালবামে আছে।

ও! সেই বিলেতেই হয়, এদেশে নয়। সে বলে।

এদেশেও হয়েছে। এদেশের আর্টিস্টরা ছবি এঁকে চিরদিনের মত ধরে রেখেছে তাদের। দেখতে চাস্?

না। দেখে কী হবে? দেখবার কী আছে ওতে?

দেখতে সুন্দর! দেখতে চমৎকার! দেখলে আনন্দ হয়। এই! আবার কী! আমি বলি-তোকেও সেই রকমটি আমি দেখতে চাই।

দেখে কী করবে? তুমি তো আর আঁকতে পারবে না।

মনের মধ্যে এঁকে নেব– চিরকালের মতই।

দেখছ তো! অনেকখানিই দেখছ! মুখ দেখতে পাচ্ছ– কতটা পা দেখতে পাচ্ছ দ্যাখো। এই তো! এতখানি ফ্রকটা তুললাম… দ্যাখো না!

না আমি সবটা দেখতে চাই।

সবটাই তো দেখছ। আবার কী আছে দেখবার?

আরও সব। আমি বললাম– তুই দেখতে সুন্দর না? দেখতে ইচ্ছে করে না আমার?

আর কোনো মেয়েকে তুমি দেখেছ এমন খালি গায়ে?

আবার কে আছে দেখবার? আমি বলি, আবার কে সুন্দর আছে এখানে?

কেন, আমার দিদি! সে তো আমার চেয়ে অনেক সুন্দর।

মোটেই না। আমার কাছে নয়, আমার কাছে তুই-ই কেবল সুন্দর, তোকেই দেখতে চাই।

আমি যদি খালি গা হই তুমি দিদিকে বলে দেবে না তো?

পাগল! তা কি কেউ কাউকে বলে নাকি?

সে চুপ করে থাকে, কী যেন ভাবে।

ছাদে কেউ এসে পড়বে না তো হঠাৎ?

কে আসবে?

মাসিমা, কি তোমার ভাই?

মা তো জলখাবারের লুচি ভাজছেন এখন। আর সত্য? সে এখন নানুর সঙ্গে মার্বেল খেলছে উঠোনে। 

তুমি আমার গায়ে হাত দেবে না তো? ছোঁবে না তো আমায়?

কক্ষনো না। তুই সাত হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকিস। খালি এক মিনিটের জন্যে কেবল। খুলবি আর পরবি।

সে ফ্রকটা খোলে। খুলে একটুখানি হাসে— হল তো এবার?

বা রে! কোথায় হল?

তখন সে ইজেরটাও খুলল আস্তে আস্তে।

কয়েক মুহূর্ত না হতেই লাজুক চোখে তাকিয়ে বলল– পরি এবার?

পর। সত্যি, তুই ভারী সুন্দর। তোর মতন সুন্দর মেয়ে আর হয় না। আমি তো কখনও দেখিনি।

কটা মেয়ে তুমি দেখেছ! সে হেসে বলে– জীবনে কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে দেখতে পাবে। আমার চেয়েও ঢের ঢের।… তখন তো ভুলে যাবে আমাকে।

কক্ষনো না। আর কোনো সুন্দর মেয়েকে আমি দেখব না। দেখতেই চাইনে আমি। তুই-ই আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর। তুই একমাত্র।

ফ্রক-টক পরে সে এক দৌড়ে চলে গেল। একটু পরেই ফিরে এল আবার।

কোথায় গেছিলিস?

দোতলায়। বাথরুমে।

তারপর সে আপনার থেকেই ফ্রক খুলল, ইজেরটা খুলে ফেলল আবার, না সাধতেই।…

দৌড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে কোলের ওপর বসে পড়ল সে। আমার মুখের মধ্যে তার মুখ গুঁজে রাখল।

তোর এত ফুর্তি যে হঠাৎ! আমি শুধাই– কেন রে?…

এমনিই।…

একদিন তোর পা থেকে মাথা অবধি আমি চুমু খাব– বুঝলি?

খেও।

হাজার হাজার।

আচ্ছা।… খাবে পায়ে? সে তার ডান পা-খানা তুলল একটুখানি। পাখির ডানার মত।

আমি আলতো হাতে ধরে তার পায়ের পাতার ওপরে আমার চুমু রাখলাম।

এমন অপূর্ব গা শিউরে-ওঠা সাবালক সঙ্গমদৃশ্য এইরকম নির্দ্বিধায় কেউ লিখে ফেললে, সেদিকে নিষ্পলক দৃশ্যকাম নিয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া ঠুঁটো পাঠকের আর কিছু করার আছে কি?

তবে, আত্মজীবনীর অবকাশ বাদ দিলে, গল্পের ভেতরে বহুবার এমনভাবেই প্রেমদৃশ্য কিংবা গোপন শরীরী দৃশ্যের অবতারণা করেছেন শিবরাম, যেখানে কাহিনির নায়কদের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় দ্রষ্টা অথবা শ্রোতার। এইসব সম্ভাবনাময় কাহিনিতেও কিছুতেই পুরুষ নায়কদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেননি তিনি, আলগোছে পুতুলনাচানো সুতো ধরে রেখে নামিয়ে দিয়েছেন উত্তেজক মুহূর্তে, যেখানে পাঠকের মতোই তারাও ঠুঁটো। ‘সুন্দর মুখের joy’ গল্পে হোটেলের ঘরে মিলিত হতে চাওয়া দম্পতির ঘরে আড়িপাতা যুবকের নিষ্ফল যৌন-ইঙ্গিত, কিংবা ‘উলটো উৎপত্তি’ গল্পে বিজ্ঞানী বন্ধুর তৈরি অটোমেটিক বাথটব দেখতে গিয়ে তার নগ্ন স্নানরতা স্ত্রীকে দেখে ফেলা বিধ্বস্ত কথক, ‘বড়োদিনের বাড়ন্ত দিন’-এ নিজের স্ত্রীর সঙ্গে প্রাক্তন প্রেমিককে দিনের পর দিন দেখেও কিচ্ছু করে উঠতে না পারা রুগন স্বামী, কিংবা ‘একটি শ্লীলতাহানির কাহিনী’ গল্পে সুস্তনী স্ত্রীর চারপাশের সপ্রশংস পুরুষদৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীর নতুন কেনা ব্রা ছিঁড়েখুঁড়ে ‘ধর্ষণ’-এর আনন্দ পাওয়া মধ্যবয়সি পুরুষ– প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই কিন্তু অপারগতার মধ্যেই রয়েছে প্রেমহীনতার আক্রোশ। 

আবার নিটোল প্রেমের গল্প লিখতে বসেও ভয়ানক যে অন্ধকার স্থানবিশেষে যেন নেহাত হেলাফেলায় নামিয়ে এনেছেন তিনি, তা এতটাই অস্বস্তিকর যে, তাকে ‘ডার্ক কমেডি’ বলতে পর্যন্ত দ্বিধা হয়। যদিও ছাঁচটা হাস্যরসেরই, কিন্তু তার মধ্যে যেসব নির্বিকার ভয়াবহ ক্লেদ লুকিয়ে আছে, তার স্বরূপ বেরিয়ে পড়ার পর তাকে হজম করতে হলে হাসি শুকিয়ে যেতে বাধ্য। ‘প্রাণকেষ্টর দুই কাণ্ড’ গল্পে প্রাণকেষ্টর প্রেমিকা অনুর সালতামামি যেমন। প্রাথমিকভাবে তাকে মনে হয়, বেশ কচি নরম তপতপে মনের একটি মায়াবী মেয়ে। বিশেষত নিজের পোষা খরগোশের বিহনে সে যেরকম মুহ্যমান হয়ে পড়ে, তাতে অন্তত এ বিষয়ে সন্দেহ থাকে না যে, অমন একটি দরদিয়া মনের ভালোবাসা উপযুক্ত আধার পেলে যথাসাধ্য কমনীয় আরও একটি প্রেমের কাহিনি পল্লবিত হতে পারত। কিন্তু টুইস্টটি চলে আসে সম্পূর্ণ বে-আন্দাজি নিশানা ধরে। প্রেমিকের অফিসে স্বয়মাগতা অনুর অপূর্ব গলাবন্ধ একটি কোটের সুলুকসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, তার সেই খরগোশ প্রেমের আতিশয্যই সেখানে এক খুনে চেহারা নিয়ে সেজে বসেছে। যে খরগোশ ছাড়া তার জীবন চলবে না, তাদেরই মেরে কেটে সে রাঁধিয়েছে মা-কে দিয়ে। নিজে সে মাংস মুখে তোলেনি, ডেকে খাইয়েছে নিজের বন্ধুনীকে। এবং তাদের স্মৃতি অক্ষয় করে রাখতে সেই চামড়া দিয়ে বানিয়ে নিয়েছে ওই গলাবন্ধ! শ্বাসরোধী এই প্রেমদৃশ্যের সঙ্গে গলাবন্ধর এই সদৃশতা যে দমচাপা মুহূর্ত তৈরি করে ফেলে এক লহমাতেই, তাতে মনে হয়, শিবরামের এই অমিত শক্তির হাত থেকে কারওর কি নিস্তার নেই?

একইরকম নিস্পৃহতায় আর-একটি গল্পেও খুনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে তুমুল প্রেমের আসঙ্গলিপ্সাকে হাজির করেছেন শিবরাম। গল্পের নাম ‘মরণবাঁচন প্রশ্ন’। আচমকা নিখোঁজ বন্ধুর সন্ধানে তার বাড়িতে হানা দিয়ে নায়ক বুঝতে পারে, বাড়ির প্রচুর আসবাবপত্র হাপিশ! ক্রমশ প্রশ্ন করতে করতে বন্ধুর স্ত্রীর কাছ থেকে উন্মোচিত হয় বন্ধুর এক আশ্চর্য চরিত্র। পুরনো কোনও কিছুই সইতে পারে না সে। দিনযাপনের প্রাচীনতায় আক্রান্ত আসবাবগুলি একে একে ডাস্টবিনে ফেলে আসে সব। ক্রমশ এ অভ্যাস কখন যে জারিত হয় তার স্ত্রীর মধ্যেও, জানতে পারে না কেউ। প্রশ্নোত্তরের খেলায় শেষাবধি জানা যায়, রাতে শুতে যাওয়ার সময় আসন্ন বিবাহবার্ষিকী পালনের পরিকল্পনা উঠে আসে আচমকাই। আর হঠাৎই দু’জনে যেন সেই প্রথম আবিষ্কার করে ফেলে, তারাও পুরনো হল প্রচুর। ২৫ বছর কেটে গিয়েছে মাঝে। প্রাচীনতার ক্লেদ কি সেখানে আর লাগতে দেওয়া যায়? বিকৃত ভালোবাসার তীব্রতায় যে কীভাবে পরস্পরের অস্বাভাবিকতাও আত্মস্থ করে নেয় একটি দম্পতি, এ গল্পের উপসংহারে লেগে আছে সেই আবিষ্কারের ভয়াবহতা। স্ত্রী আর পুরনো হতে দিতে চায়নি স্বামীকে। প্রচুর প্রচুর ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মেরে ফেলেছে তার পুরনো দেহটাকে।   

সত্যি বলতে কী, অত্যন্ত ‘সেনসুয়াস’ প্রেমদৃশ্যের মধ্যেও এই ‘ডার্কনেস’ নামিয়ে আনার যে নিষ্ঠুরতা শিবরাম একের পর এক গল্পে করে যান, তাতে একসময় তাঁকে ভয় করে। চেনা যায় না সেই অতিপরিচিত হাস্যমেদুর মানুষটির ভেতরে ক্ষণে ক্ষণে জেগে ওঠা এই আঁশটে বুদবুদ। ‘গুম্ফবতী’ নামে একটা বেশ দুষ্টু যৌনতার আবেশে ভরা গল্প পড়তে বসে প্রথমটায় পাঠক যেমন বেশ উত্তেজিত বোধ করেন, কারণ, গল্পের গোড়াতেই আন্দামানের নিরালা দ্বীপে একদল স্বেচ্ছানির্বাসিত শহুরে যুবক চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দেখে ফেলে এক ভূমিজ নগ্নিকাকে। তার নগ্নদেহ সৌন্দর্যের রেশ নিয়মিত কাঁপিয়ে দিয়ে যায় নির্বাসনের দিনগুলি রাতগুলি। কিন্তু কুমিরভরা জলের লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে তার দিকে সাঁতরে যাওয়া ভারী মুশকিল। তবু হাল ছাড়ে না রবীন, মেয়ে-শরীরের খাঁজভাঁজগুলির রহস্য স্পর্শের উন্মুখতা দিয়ে ভেদ করে ফেলতে চেয়েছিল যে জেদি পুরুষটি। একদিন একটি কুমিরকে মেরে তার ছাল সে জড়িয়ে নেয় সর্বাঙ্গে। মনে আশা, এইবার সে নির্বিঘ্নে সাঁতরে যেতে পারবে পরপারের রহস্যময়ীর কাছে, কারণ কুমির তো আর কুমিরকে আক্রমণ করে না! সেই মতো  জলে লাফ দিয়ে এগিয়েও যায় বহু দূর। কিন্তু–

বেশ খানিক বাদে ফিরে এল। না, সে নয়। সেই মেয়েটি।

ঘাসের ঘাগরা পরনে। সূর্যালোক আবরণে।

সেই বাবু কুথাকে গো? শুধাল সেই মেয়েটি।

বাবু তো তুমার খোঁজেই গিয়েছে গো! তারপরই আমার বিস্ময় লাগে, কৌতূহল জাগে– তুমি সাঁতরে এলে কী করে? কুমিররা কিছু বলল না তোমায়?

কুমির কুথাকে? সে জানায়: এই খালের সব কুমির মেরে মেরে খতম করে দিয়েছি। বিলকুল খতম।

খতম? কী করে করলে?

তির মেরে মেরে। ইখানে বাবুর কাছে আসবার লেগে হামি রোজ কুমির মারতেছি। রোজ চার পাঁচটা। আজ শেষ কুমিরটাকে খানিক আগে মারলাম। সেখানকার জলটা রক্তে লাল হয়ে আছে এখনও। বাবু কুথায়?

শেষ কুমিরের সাথে সেই বাবুটিও নিরুদ্দেশ। কিন্তু সে কথা কি তাকে বলা যায়?

আবার তাঁর তৈরি করা এই স্তব্ধতাই খানখান হয়ে পড়ে তাঁরই ইচ্ছাকৃত রসত্রুটিতে। যে শিবরাম এতক্ষণ শরীর নিয়ে, যৌনতা নিয়ে, প্রেম নিয়ে যে রহস্যের জটিল কুয়াশা বুনে চলেছিলেন, নারীপুরুষের দেহসন্ধির অন্ধিসন্ধির খেলা নিয়ে যে অপরূপ সূক্ষ্মদৃশ্য তৈরি করছিলেন একের পর এক, তিনিই ক্ষেত্রবিশেষে ধর্ষকামী পুরুষদৃষ্টির হাতুড়ি চালিয়ে মুহূর্তে চুরমার করে দেন সব কিছু। কোনও কিছুতেই যেন তাঁর মোহ কিংবা আসক্তি নেই, নেই প্রেমের অপরূপ অভিজ্ঞান নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা। একের পর এক গল্পে যে রহস্যাতুর নারীশরীরকে নিয়ে তাঁর কল্পজালের শেষ নেই, ‘পরকীয়া’ গল্পের শুরুতেই বিনা ভূমিকায় তাকে কদর্য নিষ্পেষণে ভোগ্য করে তুলতেও তাঁর চরিত্ররা কী সাংঘাতিক নির্মোহ– ‘মেয়েদের একটু স্বাদ পায়, নিখিলের অনেক দিনের সাধ। মেয়েদের নিয়ে একটু ফুর্তি করে।’ গল্প যত এগোয়, এই স্বাদ নেওয়ার ভেতরে আসলে লুকিয়ে থাকা চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় করে তোলার শরীরী আগ্রাসনের ছায়া ক্রমশ মূর্তি পায়। এক উপোসী রাতে নিখিল আর দিব্যেন্দু রাস্তা থেকে আলাপ জমিয়ে ট্যাক্সিতে তুলে আনে দুই নারীকে। তাদের যোগসাজশে ঠিক এক আলো-আঁধারি গাছের ছায়ায় এসে গাড়ি বিগড়োয় আর ড্রাইভার নেমে যায় নকল মেরামতির কাজে। ‘ওদিকে দিব্যেন্দু লাগল–। এবং নিখিলকেও লাগাবার জন্য এক টিপ্পুনি লাগাল।’

এখানে নেই কোনও প্রেম, ভালোবাসা, আদর কিংবা রহস্যাবৃত শরীর আবিষ্কারের মায়াবী মোহ। যা আছে, তা খিদে। আর উদ্গত অসহনীয় পৌরুষের উত্তেজক দৃঢ়তা নিয়ে উপগত হওয়ার অশ্লীল নিষ্পেষণ। কী ভয়ানক নির্লিপ্তি নিয়ে যে শিবরাম এইসব মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্তের নির্মম সাক্ষাৎকার লিখে গিয়েছেন অলজ্জ কলমে, ভাবা যায় না! বলছিলাম না, শিবরামকে কখনও কখনও চেনা যায় না, ভয় হয়? 

BengaliLiterature DarkHumour Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sex and desire in literature Sexuality SexualityInLiterature Shibram Chakraborty Shibram Chakraborty lesser known stories

Share this article on