

যে পরিবারের হাতে অর্থ, সামাজিক প্রভাব বা বিকল্প পথের প্রাচুর্য নেই, তাদের সন্তানের কাছে মেধা ও পরীক্ষা অনেক সময় এগিয়ে যাওয়ার প্রধান সিঁড়ি। সেই সিঁড়িটিই যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি বা অনিয়মে ভেঙে পড়ে, তবে আঘাতটা সবচেয়ে বেশি লাগে সেইসব পরিবারের উপর, যারা নিজেদের সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত সন্তানকে পড়ানোর চেষ্টা করে। এই কারণেই আদিত্যের প্রতিবাদকে শুধু একটি ছয় বছরের শিশুর অকালপক্বতা বলে দেখলে ভুল হবে।
আদিত্য কুমার। ছোট্ট ছেলেটার কাঁধে একরাশ স্বপ্ন। চোখে আগুন, বুকে উত্তাপ। ছেলেটার বলিষ্ঠ গলার আওয়াজ প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছে রাষ্ট্রকে। গলা ছেড়ে ছোট্ট আদিত্য বলেছে, ‘গুলি চালালে আমি গুলি খাব। লাঠি চালালে সেই লাঠির আঘাতও আমি সহ্য করে নেব। জেল যেতে হলে তাও যাব কিন্তু এই অনাচারের সরকারকে ছুড়ে ফেলে দেব।‘ আদিত্যের বয়স মাত্র ছয়। বিহারের এক অজ পাড়াগাঁয়ে তার বাস। বট–অশ্বত্থ–কৃষ্ণচূড়ার ছায়ার অতলে যে ছেলেটার উদাসী দুপুর উদ্ভাসিত হওয়ার কথা ছিল, সেই ছেলেটা বাসের উপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে শাসককে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। পুলিশের গাড়ির পাদানিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে। যে ছেলেটার স্কুলব্যাগে নুড়ি–পাথর আর ক্যাম্বিস বল থাকার কথা ছিল, সেই ছেলেটা ব্যাগে সংবিধান নিয়ে ঘোরে। কালো ছাপা প্যান্ট আর খয়েরি রঙের গেঞ্জি পরা ছেলেটাকে পুলিশি ঘেরাটোপে আন্দোলন কেন্দ্র থেকে বাইরে নিয়ে আসার সময়ও তার নাছোড়বান্দা মনোভাব ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বারবার। ভিতর থেকে আওয়াজ এসেছে, যে আওয়াজ তাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। যে বয়সে কোনও আধখানা গানের কলি তার গলায় ভেসে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই বয়সে আদিত্য এসে দাঁড়িয়ে একরাশ ভিড়ের মধ্যিখানে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতায় দেখতে পাওয়া সেই শিশুর মতো, যে প্রশ্ন করেছিল। জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’

পাটনায় বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশন-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে চাকরিপ্রার্থী ও ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল, পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনিয়ম বন্ধ করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। সেই আন্দোলনের ভিড়েই দেখা যায় মাত্র ছয় বছরের প্রথম শ্রেণির ছাত্র আদিত্য কুমারকে। বয়সে যদিও সে আন্দোলনে উপস্থিত অধিকাংশ ছাত্রের চেয়ে কয়েক দশক ছোট। এখনও তার নিজের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসার সময়ই আসেনি। তবুও স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সে বড়দের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তার স্কুলব্যাগে থাকা ভারতের সংবিধান। জানা গিয়েছে সে ইতিমধ্যে সংবিধানের প্রায় ৮০ পাতা পড়েও ফেলেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে আদিত্য যে কারণটি জানায়, সেটিই এই ঘটনাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তার কথায়, আজ প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না-নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সে নিজেও যখন পরীক্ষায় বসবে, তখন একই সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। অর্থাৎ, যে পরীক্ষা আজ তার চেয়ে বয়সে বড়দের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে, আদিত্য তার মধ্যেই নিজের আগামী দিনের ছবিটিও দেখতে শুরু করেছে। ফলে পাটনার সেই আন্দোলনে তার উপস্থিতি নিছক কৌতূহলী শিশুর উপস্থিতি নয়; বরং তার কথার মধ্যে ধরা পড়ে এমন এক সময়ের ছবি, যেখানে পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বড়দের গণ্ডি পেরিয়ে শিশুদের পৃথিবীতেও ঢুকে পড়ছে।

আদিত্যর কথার গুরুত্ব এখানেই যে, সে পরীক্ষাকে নিজের ভবিষ্যতে পৌঁছনোর একটি পথ হিসেবে দেখছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজ আর শুধু বড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি শিশু যখন শুনতে শুনতে বড় হয়– ভালো নম্বর না-পেলে ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া যাবে না, ভালো স্কুলে না পড়লে ভালো কলেজে যাওয়া কঠিন, ভালো কলেজের পরে একটি নিশ্চিত চাকরি না-পেলে জীবন নিরাপদ নয়, তখন পরীক্ষার খাতা ধীরে ধীরে তার কাছে জ্ঞানের মাপকাঠির চেয়ে ভবিষ্যতের দরজার চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। সেই দরজার সামনে যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস, নকল, কারচুপি কিংবা নিয়োগে অনিয়মের মতো ঘটনা ঘটে, তবে ক্ষতিটা শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভেঙে যায় পরিশ্রমের উপর আস্থা। বিহারের মতো রাজ্যে সরকারি চাকরির মতো একটি পরীক্ষাকে ঘিরে বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়া তরুণের কাছে একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তাই নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়। সেটি বয়সের কয়েকটি মূল্যবান বছর, পরিবারের খরচ করা অর্থ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত। আর সেই বাস্তবতার ছায়াই হয়তো আজ আদিত্যের মতো শিশুর মনেও এসে পড়ছে। যে শিশু এখনও নিজের জীবনের প্রথমদিকের পরীক্ষাগুলিই দিচ্ছে, সে যদি বড়দের পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তবে সেটিকে শুধু তার ‘অকালপক্বতা’ বলে প্রশংসা করলেই চলবে না; আমাদের ভাবতে হবে, কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে এই উদ্বেগ এত তাড়াতাড়ি একটি শিশুর পৃথিবীতে প্রবেশ করছে।

আদিত্য হয়তো ব্যতিক্রম, কিন্তু তার উদ্বেগটি একেবারেই বিচ্ছিন্ন নয়। আজকের বহু শিশুর শৈশবের ভিতরেই খুব ধীরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে ঢুকে পড়ছে পরীক্ষার ভবিষ্যৎ। যে শিশু এখনও খেলার মাঠে দৌড়তে শেখেনি ভালো করে, তার কানে পৌঁছে যাচ্ছে ভালো স্কুলের কথা; যে শিশু সদ্য অক্ষর চিনেছে, তার সামনে রাখা হচ্ছে ভালো নম্বর পাওয়ার লক্ষ্য; আর যে শিশু একটু বড় হচ্ছে, তার পৃথিবীতে ঢুকে পড়ছে র্যাঙ্ক, প্রতিযোগিতা, ভর্তির পরীক্ষা, কোচিং এবং ভবিষ্যতে কী হবে সেই অনিবার্য প্রশ্ন! পাড়ার দুই শিশুর মধ্যে একজন পরীক্ষায় কত পেল, কে কোন স্কুলে সুযোগ পেল, কার ছেলে কোন কোচিংয়ে ভর্তি হল– এই তুলনাগুলিও ক্রমশ শিশুর আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে পরীক্ষা আর কেবল কয়েক ঘণ্টার একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকছে না; তার ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে শিশুর প্রতিদিনের জীবন জুড়ে। পরীক্ষায় ভালো করলে সে ভালো ছেলে, কম নম্বর পেলে কোথাও যেন তার যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়। অথচ একটি শিশুর বুদ্ধি, কৌতূহল, কল্পনা, সহমর্মিতা কিংবা পৃথিবীকে নতুন করে দেখার ক্ষমতা কোনও প্রশ্নপত্রের কয়েকটি পাতায় মাপা সম্ভব নয়। তবু আমরা এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর জীবনের পরবর্তী দরজাটি খুলবে কি না, তার চাবি যেন পরীক্ষার নম্বরের হাতেই তুলে দেওয়া হয়। আদিত্যের আশঙ্কা তাই শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে নয়; তার ভিতরে আরও বড় একটি ভয় লুকিয়ে আছে– যদি আমি যথেষ্ট চেষ্টা করেও আমার ভবিষ্যৎ নিজের হাতে রাখতে না পারি?

আদিত্যের কথাগুলিকে বুঝতে গেলে তার পরিবারের দিকে একবার তাকানোও জরুরি। যে পরিবারে তার বাবা দিনমজুরের কাজ করেন, মা অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে সংসার চালান, যে পরিবারকে পাটনায় ভাড়াবাড়িতে থেকে প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ সামলাতে হয়, সেই পরিবারের ছয় বছরের শিশুর কাছে ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটির অর্থ হয়তো আমাদের মধ্যবিত্ত স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। দারিদ্রের পরিবারে জন্মানো একটি শিশুর জন্য ‘শিক্ষা’ শুধু জ্ঞান অর্জনের পথ নয়, অনেক সময় নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বদলে দেওয়ার একমাত্র আশ্রয়। বাবা সারাদিন শ্রম দিয়ে যে সংসার চালান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে যে অর্থ ঘরে আনেন, সেই বাস্তবতার মধ্যেই আদিত্যর স্কুলের বই, খাতা, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি হচ্ছে। তাই সে যখন বলে, আজ পরীক্ষার অনিয়ম বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে সে নিজেও সমস্যার মুখে পড়তে পারে, তখন সেই কথার মধ্যে একটি দরিদ্র পরিবারের শিশুর গভীর নিরাপত্তাহীনতাও যেন ধরা পড়ে। তার কাছে একটি পরীক্ষা নষ্ট হওয়া হয়তো শুধু একটি পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া নয়; বহু কষ্টে অর্জন করতে চাওয়া একটি সুযোগ হারিয়ে যাওয়া। যে পরিবারের হাতে অর্থ, সামাজিক প্রভাব বা বিকল্প পথের প্রাচুর্য নেই, তাদের সন্তানের কাছে মেধা ও পরীক্ষা অনেক সময় এগিয়ে যাওয়ার প্রধান সিঁড়ি। সেই সিঁড়িটিই যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি বা অনিয়মে ভেঙে পড়ে, তবে আঘাতটা সবচেয়ে বেশি লাগে সেইসব পরিবারের উপর, যারা নিজেদের সামর্থের শেষ সীমা পর্যন্ত সন্তানকে পড়ানোর চেষ্টা করে। এই কারণেই আদিত্যের প্রতিবাদকে শুধু একটি ছয় বছরের শিশুর অকালপক্বতা বলে দেখলে ভুল হবে; তার কণ্ঠের ভিতরে হয়তো কথা বলছে এমন একটি পরিবারের স্বপ্ন, যে পরিবার নিজের বর্তমানের অভাব পেরিয়ে সন্তানের জন্য একটি অন্য ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চায়।

যে শিশুর বাবা দিনমজুরি করে সংসার চালান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, সেই শিশুর কাছে শিক্ষা হয়তো দারিদ্র থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যদি অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি কিংবা অবিশ্বাসে ভেঙে পড়ে, তবে ক্ষতিটা শুধু একটি পরীক্ষার্থীর নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের বিশ্বাস। তাই আদিত্যকে দেখে শুধু তার সাহসের প্রশংসা করলে চলবে না। বরং নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হবে, আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারছি, যেখানে একটি ছয় বছরের শিশুকে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এত তাড়াতাড়ি চিন্তা করতে হবে না? যেখানে পরীক্ষা হবে শেখার আনন্দের একটি অংশ, জীবন জয়ের একমাত্র দরজা নয়; যেখানে মেধার সঙ্গে ন্যায়েরও মূল্য থাকবে; যেখানে দরিদ্র ঘরের সন্তানও বিশ্বাস করবে, তার পরিশ্রম বৃথা যাবে না। নীরেন্দ্রনাথের কবিতার সেই শিশুটি যেমন রাজার নগ্নতা দেখিয়ে দিয়েছিল, তেমনই আদিত্যও হয়তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক অদৃশ্য নগ্নতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। পার্থক্য শুধু একটাই– সেই শিশুর প্রশ্ন ছিল রাজার পোশাক নিয়ে, আর আদিত্যের প্রশ্ন তার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এখন উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা কি পারব এই সমাজকে শিশুর বাসযোগ্য করে যেতে?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved