Nagaland: Tribal Culture, Dance and Living Traditions। Robbar
Robbar
  • ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধভূমিতে প্রেমের নাচ

প্রেমের নাচ ‘সুংসাং’-এর মতো মিজো ও নাগাল‍্যান্ডের কুকিদের মধ্যে জনপ্রিয় ‘চিররাও’ নাচ। ‘ব‍্যাম্বু ডান্স’ নামে পরিচিত এই নাচ অনেকেরই দেখা। এই নাচে একদিকে লম্বালম্বি আর অন্যদিকে আড়াআড়ি বাঁশ রাখা থাকে। বাজনার তালে তালে একদিকের বাঁশের সারি বন্ধ হয় আর অন্যদিকের খোলে। চমৎকার একটা ধ্বনি তৈরি হয়। বাঁশের ফাঁকে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা নাচে। মনে হয়, এই বুঝি পা আটকে গেল, কিন্তু উদ্দাম নাচ চলতে থাকে।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১৬:০০   
Facebook WhatsApp Messenger

৯.

সবুজ পর্বতমালা আর রুপোলি জলধারা দেখতে হলে যেতে হবে নাগাল্যান্ডে। তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাস্তা ধরে গেলে এক রকম দৃশ্য– দেওয়ালচিত্রের মতো। বিমানে চড়ে গেলে অন্যরকম। আকাশ থেকে অনেকখানি জায়গা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দুটো দু’-রকমের ছবি, কিন্তু দুটোতেই চোখের আনন্দ আর প্রাণের আরাম মেলে। মনে হয় প্রকৃতি যেন ময়ূরের পেখমের মতো তার রূপ মেলে ধরেছে। আর যত কাছে যাওয়া যায়, তত‌ই পাহাড়ি লতাপাতা ও ফুলের গন্ধ নাকে ভেসে আসে। কানে শোনা যায় পাহাড়ি নদীর চলনধ্বনি। সে সঙ্গে মাথার উপরের আকাশটাকে মনে হয় নীল চাঁদোয়া! রাত নামলে তারার দল সংসার পেতে বসে। পরিবেশ দূষণ নেই বলে গ্রহ ও তারা জ্বলজ্বল করে। চাঁদও অনেক বড় চেহারায় দেখা দেয়। চারপাশ আলোয় ভরে ওঠে। আমাদের মহানাগরিক জীবনে অন্ধকার কম আর চাঁদের পুরো আকার ও উজ্জ্বলতাও আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। নাগাল‍্যান্ডের ধ‍্যানমগ্ন পাহাড়মালায় চাঁদকে সত‍্যিই নিশিপতি বলে মনে হয়।

zoom
চোখের আনন্দ, প্রাণের আরাম

প্রকৃতি যেভাবে নিজেকে উজাড় করে দেয়, মানুষ সেভাবে দেয় না। বিশেষ করে সে মানুষ যদি আবার রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠে। সে তখন যতখানি দেবে, তার চেয়ে বেশি হাতে রাখার চেষ্টা করবে। আসলে এ-ও এক নিয়ন্ত্রণের রীতি। নাগাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ইংরেজদের আমল থেকে এটা ঘটে আসছিল। এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ফ্রান্স থেকে যুদ্ধফেরত হাজার-দুয়েক সেনা ও সামরিক-কর্মী নানা পাহাড়ে থাকা ১৬টি গোষ্ঠীর মধ্যে একটা সংযোগ গড়ে তোলে এবং নাগা ক্লাব তৈরি করে। এরই একটি সংহত সাংগঠনিক রূপ হল ১৯৩৯-এ প্রতিষ্ঠিত ‘নাগা হিলস ডিস্ট্রিক্ট ট্রাইবাল কাউন্সিল’। আগের ৫০০ বছরে যে জাতি বর্মি, অসমিয়া, মেইতেই ও ইংরেজের সঙ্গে সংঘাত ও সন্ধির অনিশ্চিত বৃত্তে বেঁচেছে, সে এবার আপন ভাগ্য নির্ধারণের কিছুটা অধিকার পেল। আধা-সার্বভৌম হয়ে উঠল। ভারতের স্বাধীনতার সময় নতুন চুক্তিতে কিছু ক্ষমতা সংকোচন করা হল আর ১৯৫০-এ চুক্তির বয়ান আরও বদলে গেল। ফলে নাগাদের একটি অংশ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। প্রতিবাদ শোনা গেল। ১৯৬৩ সালে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা নাগাদের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় সৃষ্টি করল।

এর সাড়ে তিন দশক পরে, গত শতকের শেষ দিকে নাগাল্যান্ডে যাই। তখন পরিস্থিতি বেশ জটিল। প্রায় নিত্যদিন সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটছে। শুধু নাগাল‍্যান্ডে নয়, এই রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিমে অসমে, দক্ষিণে মণিপুরে ও পূর্বে অরুণাচল প্রদেশেও প্রবল অস্থিরতা। পূর্বদিকে মায়ানমার দেশটিতেও অশান্তি চলছে। সিকিম বাদ দিয়ে উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যেও প্রায় একই অবস্থা।

zoom
গত তিন দশক ধরে অস্থিরতা সঙ্গী নাগাল্যান্ডবাসীর

নাগাল্যান্ডের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দু’-তরফের। একদিকে নাগাল্যান্ডের নানা ভাষার কাজকর্ম ‘সাহিত্য অকাদেমি’র কলকাতা অফিসের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, অন্যদিকে নর্থ-ইস্ট জোনাল কালচারাল সেন্টারের পরিচালন সমিতির সদস্য সাহিত্য অকাদেমি। সম্পর্ক তৈরি হলে ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই মিটে যায়। ফলে যেতেই চাইতাম, কিন্তু কখন কীভাবে যাব, সেটা ঠিক নিজের হাতে ছিল না। নর্থ-ইস্ট জোনাল কালচারাল সেন্টারের দফতর ছিল নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে। মিটিংয়ের আগের দিন ফোন এল আমি যেন ডিমাপুরে পৌঁছে বিমানবন্দরের গেটের বাইরে না-বেরিয়ে আসি। কালচারাল সেন্টার থেকে একজন গিয়ে নিয়ে আসবে।

সকালের বিমান ধরে দমদম থেকে ডিমাপুরে গিয়ে নেমেছি। বিমানের জানলা দিয়ে পাহাড়, গাছপালা, ঝরনা ইত্যাদি দেখে মনটা খুশখুশি। মালপত্রের বেল্ট থেকে ব‍্যাগ নিয়ে বেরোনোর গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। কাচের দরজার ভিতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি ভারী ভারী মিলিটারি গাড়ি দাঁড়িয়ে। এমন নিরাপত্তার ব্যবস্থা দেখলে নিরাপত্তাহীনতার বোধ বেশি করে জাগে। এতক্ষণে বিমানবন্দরের ভিতরে থাকার পরামর্শের কারণ বুঝলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে কালচারাল সেন্টারের নাম লেখা বোর্ড চোখে পড়ল। গাড়িতে উঠলাম। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল চারদিকে অস্ত্র উঁচিয়ে রাখা সশস্ত্র বাহিনীর গাড়ির যাতায়াত। প্রতিপক্ষের অস্ত্রগুলো স্বাভাবিক কারণেই চোখে পড়ছিল না। গাড়িতে যেতে যেতে ভাবছিলাম দু’-পক্ষের অস্ত্রের মাঝের যে জনজীবন, তা কতটাই না অসহায় ও বিপন্ন!

zoom
পাহাড়ের বুকে প্রতিবাদের মিছিল

থাকার হোটেলটি ভালোই। চারতলা বাড়ি। হোটেলের সামনে ও দু’-পাশে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। ফুলগাছ ও অর্কিডের বাগান রয়েছে। ঘর বড়, জানলা দিয়ে বাইরের গাছপালা দেখা যায় আর নানারকমের খাবার মেলে। নাগাল‍্যান্ডের নিজস্ব খাবারও চোখে পড়ল। চান সেরে কালচারাল সেন্টারে গেলাম। বাড়িটি পাহাড়ের ওপরে, আর দেখতে খুবই সুন্দর। উত্তর-পূর্ব ভারতের নানা রাজ্যের সংস্কৃতির রূপ দেওয়ালে আঁকা হয়েছে। বেশ কিছু ছোট ছোট মূর্তিও চোখে পড়ল। ছবি আর মূর্তি মিলে অধিকাংশ দৃশ্য নাচের। তার মধ্যে একটি নাগাল্যান্ডের আউ উপজাতির নুকনারা গোষ্ঠীর প্রেমের নাচ ‘সুংসাং’। এই নাচের বৈশিষ্ট্য হল অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীরা হাত ধরাধরি করে নাচে ও পরস্পরকে প্রেম নিবেদন করে। এর মাধ্যমে জীবনসঙ্গী ঠিক হয়ে যায়।

zoom
নাগাল্যান্ডের আউ উপজাতির নুকনারা গোষ্ঠীর প্রেমের নাচ ‘সুংসাং’

‘চিররাও’ নাচের ছবিও চোখে পড়ল, যা মিজো ও নাগাল‍্যান্ডের কুকিদের মধ্যে জনপ্রিয়। ‘ব‍্যাম্বু ডান্স’ নামে পরিচিত এই নাচ অনেকেরই দেখা। এই নাচে একদিকে লম্বালম্বি আর অন্যদিকে আড়াআড়ি বাঁশ রাখা থাকে। বাজনার তালে তালে একদিকের বাঁশের সারি বন্ধ হয় আর অন্যদিকের খোলে। চমৎকার একটা ধ্বনি তৈরি হয়। বাঁশের ফাঁকে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা নাচে। মনে হয়, এই বুঝি পা আটকে গেল, কিন্তু উদ্দাম নাচ চলতে থাকে। আসলে এই নাচের মধ্যে একটা দৈববিশ্বাস কাজ করে। যে-সব মায়েরা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছে, এই নাচের ফলে তাদের আত্মা সুষ্ঠু জায়গায় পৌঁছে যাবে।

zoom
‘চিররাও’ নাচ, মিজো ও নাগাল‍্যান্ডের কুকিদের মধ্যে জনপ্রিয়

মিটিং যেমন হওয়ার কথা, তেমনই হল। আগের মিটিংয়ের কাজকর্মের খবর জানানো আর নতুন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা। এর মধ্যে কিছু তর্কবিতর্কও হল। সেটি হল বাংলাদেশ থেকে ছিন্নমূল যেসব মানুষ গত বিশ-তিরিশ বছর ধরে এসেছে, তাদের দায়িত্ব কে নেবে? এটা এক রাজ‍্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের টানাপোড়েন। সরকারি দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের উপস্থিতির কারণে সংস্কৃতির মধ্যে অস্তিত্বের প্রশ্নটি জড়িয়ে যায়। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভূকম্পন ঘটে বাংলাদেশে আর তার প্রভাব পড়ে উত্তর-পূর্বের নানা রাজ‍্যে। তবে কালচারাল সেন্টারের উপ-অধিকর্তা জামির একটা সময়ে মূল আলোচ্য বিষয়ে সবাইকে ফিরিয়ে আনেন। দেখছিলাম গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের ভূগোল তাঁর মুখস্থ। সেই সঙ্গে যাতায়াতের খরচপাতির হিসেবও নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারেন। এমন দক্ষ মানুষ থাকলে প্রতিষ্ঠানের খুবই সুবিধে। খাওয়ার সময় দেখি– উনোন থেকে খাবার নামিয়ে সরাসরি পরিবেশনের টেবিলে আনা হচ্ছে। বুঝতে পারলাম জামির অতিথি-বৎসলও।

খাওয়া শেষে কালচারাল সেন্টারের এক যুবক আমাদের শহর দেখাতে নিয়ে গেল। রাস্তার দু’-পাশে চোখে পড়ল বাঁশের বন, পাহাড়ি নানা গাছ আর বিভিন্ন প্রজাতির লতাগুল্ম। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি নাগাদের বাড়িগুলো দেখতে বেশ সুন্দর। বাড়ির উঠোনে দু’-চারটে পাথর রাখা আছে বসার জন্য। মানুষ না বসলে তার দখল নিয়েছে লাল পালকের মুরগি। ঘাড় তুলে চারপাশ দেখছে। উঠোনের দড়িতে রঙিন কাপড় ঝোলে। ধোঁয়া ওড়ে রান্নাঘর থেকে। দুপুরের সময় বলে খাবার তৈরি হচ্ছে। বাজার এলাকায় ঢোকার পর আধুনিক বাড়িঘর ও দোকানপাট চোখে পড়ে। কয়েকটি বাড়ির সামনে দেখি– নাগাদের প্রতীক আড়াআড়ি বর্শা আটকানো আছে।

নতুন শহর দেখার ঘোর কেটে যায় ঘন ঘন মিলিটারি গাড়ির শব্দে আর বেয়নেটের উঁচিয়ে থাকা মুখ দেখে। ঘণ্টাখানেকের ডিমাপুর পরিক্রমায় কতবারই না এসবের মুখোমুখি হতে হল! শহর থেকে সামান্য দূরে ডিমাপুর দুর্গের তোরণের কাছে গেলাম। ১৪ শতকে কছারি রাজ‍্যের রাজধানী ছিল ডিমাপুর। সঙ্গের যুবক বন্ধুটি বলল, অঙ্গামি (তেনেদেই) নাগাদের সঙ্গে কছারিদের মাঝেমধ্যেই সংঘর্ষ ঘটত। ফলে কছারিরা দুর্গ বানায়। পরে অবশ্য দু’পক্ষের ভাব হয়ে যায়। লোহার বাণিজ‍্যে অঙ্গামিরা কছারিদের খুবই সাহায্য করে।

zoom
অঙ্গামি নাগাদের কুটির, যা ধরে রেখেছে লোকজ সংস্কৃতি

ডিমাপুরের ‘ডিমা’ শব্দটি কছারি ভাষা থেকে এসেছে। ‘ডি’ মানে জল, ‘মা’ হল বড় বা বিশাল, আর তৎসম ‘পুর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে– ইট দিয়ে তৈরি বাড়ি বা নগর। এভাবেই ৩৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ ধানসিঁড়ি নদীতীরের এই জনপদটি ‘ডিমাপুর’ নাম পায়।

সন্ধে নামল। বাইরে তাকিয়ে দেখি রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি জ্বলছে, তবে বড়ই টিমটিমে। দূরে কয়েকটা বাড়িতেও আলো জ্বলছে, তবে তেমন তেজ নেই। রাস্তার গায়ের গাছগুলোকে ভূতুড়ে লাগে। বাড়িতে ফোন করার দরকার। কালচারাল সেন্টারের মিটিংয়ে যোগ দিতে কলকাতা থেকে এসেছিলেন ‘ললিতকলা অকাদেমি’র কলকাতা দফতরের সচিব সিদ্ধার্থ ঘোষ। দু’জনে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে এস.টি.ডি. বুথ খুঁজতে চললাম। মিনিট পাঁচ-সাতেকের মধ্যে মিলল। দোকানের দরজার একটা পাল্লা ভেজানো। সন্ধে সাতটাতেই দোকান বন্ধ করার তোড়জোড় চলছে। পাশাপাশি দোকানগুলো আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একটা খাবারের দোকানে তিনজন লোককে রাতের খাবার খেতে দেখলাম। জনা তিন-চার যুবক মোটর বাইকের গায়ে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলছে। হোটেলে ফেরার পর রাতের খাবার খেয়ে নেওয়ার তাগাদা এল। রাত আটটায় রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে খাবার ও পানীয় একসঙ্গেই খাওয়া।

zoom
নাগাল্যান্ডের শ্বাসপ্রশ্বাসে নাচের ছন্দ

খিদে না পেলেও অবস্থার ফেরে খেতে হয়, কিন্তু ঘুম সেভাবে আসে না। তাই খাওয়ার পর হোটেলের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। জায়গাটা বেশ চওড়া আর ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো। এ জায়গাতে মাথার ওপর ছাদ নেই বলে চাঁদের হালকা আলো গাছপালায় পড়েছে। দূর থেকে নানা শব্দ কানে ভেসে আসতে লাগল। মনে হল বোম-ফাটা ও গুলিগালার শব্দ। চোখে পড়ল বছর ২৫-২৬-এর এক যুবক হোটেলের নিচে থেকে ওপরে উঠছে। দেখে বুঝলাম হোটেলের কর্মী আর কাজের তেমন তাড়া নেই। ডেকে নাম জিজ্ঞেস করলাম। নাম শুনে কোথাকার মানুষ জিজ্ঞেস করলাম। বলল, কলকাতা। কলকাতার কোথায়, জিজ্ঞেস করাতে বলল যে, উত্তরে। উত্তরের কোথায়, জিজ্ঞেস করাতে– বনগাঁ বলল। তারপর আর কিছু প্রশ্নের পর শুনলাম, ত্রিপুরা থেকে এখানে এসেছে। ভাষার উচ্চারণ দেখে মনে হল– বাংলাদেশ থেকে বনগাঁ হয়ে ত্রিপুরা আর সেখান থেকে কাজের খোঁজে ডিমাপুরে আসা। জিজ্ঞেস করলাম, ডিমাপুরে থাকতে ভয় করে না? বলল, হোটেলের বাইরে গেলে গা ছমছম করে, কিন্তু হোটেলে কোনও ভয় নেই। হোটেলে কেন ভয় করে না, জিজ্ঞেস করলাম। বলল, কালচারাল সেন্টারের উপ-পরিচালক জামির স‍্যর বছর ছ’-সাত আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে নাগা আন্দোলন চালিয়েছেন। এই হোটেলটি তাঁরই। সবাই তাঁকে ভয় ও ভক্তি করে। ফলে হোটেলটি নিরাপদ। এতক্ষণে কালচারাল সেন্টারে জামিরের প্রশাসনিক দক্ষতার কারণ খুঁজে পেলাম।

একজন যোদ্ধা একটি মাত্র ভুল লক্ষ্যে নিজের প্রাণ হারাতে পারে। তাই তিরন্দাজ অর্জুনের মতো একজন যোদ্ধা কাজের ক্ষেত্রে পাখির চোখটুকুই দেখেন। এর থেকেই বোধহয় ‘প্রাণপণ’ শব্দটি এসেছে। হোটেলের যুবকটির কথা শুনে মনে হল, ডিমাপুর তো বটেই, আমার জন‍্যে সারা নাগাল্যান্ডই নিরাপদ। কেউ কিডন্যাপ করে তুলে নিয়ে গেলেও আবার পুরনো জায়গায় নামিয়ে দিয়ে যাবে।

এর প্রায় দেড় দশক পরে ভারতীয় কবিতার একটি সংকলন বাংলা অনুবাদে প্রকাশ করার চেষ্টা করছি। তা নিয়ে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক স্বপ্না গুহ-বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম কিছু মরাঠি কবিতা অনুবাদ করে দিতে। তিনি অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। সে-সঙ্গে তিনি আমাকে নাগা কবি কে. উংচানের পাঁচটি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে পরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

উংচানের জন্ম গত শতকের চারের দশকে। আমার সংকলনটি প্রকাশের সময় তিনি পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী। তাঁর বলা তিনটি কবিতা লোকমুখ থেকে নাগা গবেষক লেইশিপেম খামরাং সংগ্রহ করেন আর দু’টি উখরুল গ্রামের গির্জার খাতা থেকে উদ্ধার করেন। তারপর সেগুলি স্বপ্না গুহ-বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেন এবং নাগা থেকে বাংলা অনুবাদে সাহায্যও করেন। তার মধ্যে একটি কবিতার বিষয় ছিল– বনের মধ্যে লুকিয়ে থেকে দীর্ঘদিন আন্দোলন পরিচালনার পর নাগা যোদ্ধারা বাড়ি ফিরছে। শান্তি চুক্তি সই হয়েছে। ফেরার সময় বনের পশুপাখি ও জলাশয়কে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। কবিতার কয়েকটি পংক্তি হল–

‘এ আমার প্রিয় নাগালিমের জীবজন্তুরা, কি বিশাল আনন্দ
তোমাদের সাথে থাকতে পারায়,
কিন্তু এখন সময় বিদায় নেবার, তোমরা চলে যাবে, আমরাও
যাব ফিরে।

হে নাগালিমের বন্ধুরা, তোমাদের
বিনম্র মাধুর্য, মিষ্টভাষ
গাছের পাতাকেও করে নমিত, নিরহংকার,
সুমধুর এই ফিরে যাওয়া, তোমাদেরই জলে
তৃষ্ণা নিবারণের পর, আমি, হে বন্ধু, ফিরে যাচ্ছি
ঘরে।’

প্রকৃতির সঙ্গে ঠিক এতখানিই নিবিড়তা নাগাদের। পারস্পরিক এতটাই নির্ভরতা। দেশজুড়ে বন বিনাশের কালে নাগারা ভিন্ন ভাব ও ভাবনা নিয়ে বাঁচে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে ভালোবাসে আর রক্ষাও করে। বিমানের তেল পুড়িয়ে পরিবেশ সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে যাওয়া নয়, নিত‍্যদিন প্রকৃতি ও পরিবেশের সৎসঙ্গে বাঁচা ও বাঁচিয়ে রাখা।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য লেখা

……………………….

Naga Hills District Tribal Council Nagaland Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Tribal Culture Tribal Dance Tribal Festival Tribal Heritage

Share this article on