ফুল ফোটানোই তো আত্মার প্রকাশ। যেকোনও কাজেই হতে পারে সেটা। মেসি তাঁর ফুটবলে শরীরের প্রাবল্য দেখাননি। তিনি ফুটবলের মতো শরীরী খেলাতেও ফুল ফুটিয়েছেন। তাঁর অবসরের চিঠিটিও একটি ফুলের মতো। নরম। এবং পাপড়িতে বৃষ্টির ফোঁটা। বেদনা। কান্না। বিদায়ের বিষাদ।
১০৮.
লিওনেল মেসি অবসর নিলেন। সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা। তিন পাতার একটি লড়াই ও বোঝাপড়া। লড়াই প্রবল আবেগের সঙ্গে। বোঝাপড়া নিজের সঙ্গে এবং বিশ্বের সঙ্গেও। প্রথমে লিখলেন স্প্যানিশে। তারপর ইংরেজিতে। এবং এই আপাত সহজ, সাহসী ও সৎ অবসরপত্রে হয়তো ‘অবসর’ শব্দটি নতুনভাবে ও ব্যঞ্জনায় সংজ্ঞায়িত হল!

মেসি সাহিত্যিক নন। কবি নন। দার্শনিক নন। তবু আজীবন তাঁর ফুটবলে যা ফুটে উঠেছে, তাঁর অবসরপত্রেও তাই ফুটে উঠল: তাঁর আত্মার প্রকাশ। মেসির ফুটবল, একমাত্র মেসির ফুটবলই আমাকে, ঘুমের ওষুধের (Anxit) সঙ্গে হুইস্কি খাওয়ার পরেও জাগিয়ে রেখেছে, রাতের পর রাত, কেননা আমার মন আত্মার প্রকাশ দেখতে ভালোবাসে, সেই প্রকাশ পাবলো নেরুদার প্রেমের কবিতায় হোক, কিংবা অমৃতা শেরগিলের নগ্ন আত্মপ্রতিকৃতিতে হোক, কিংবা সেই প্রকাশ হোক বল পায়ে নিয়ে লক্ষ্যের পানে মেসির ছান্দিক লাবণ্যময় দৌড়ে।
মেসির মতো আত্মিক ফুটবল আমি কাউকে খেলতে দেখিনি। তাঁর ফুটবলে নিশ্চয় আছে শরীরের সাবলীল দ্রুতি, আছে অনন্য তৎপরতা, আছে ব্যাখ্যার অতীত শৌভিক স্কিল, আর আছে অপূর্ব সুরম্য নিয়ন্ত্রণ, কাউকে আঘাত না-করে বাতাসের মতো বয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। ফুল ফোটার মধ্যে কোনও লেবার পেন, প্রসব যন্ত্রণা নেই। মেসির প্রতিটি গোল ঠিক তাই। কুঁড়ি থেকে ফুটে ওঠা ফুল। এক যন্ত্রণাহীন জন্ম। নেই লেবার পেন। নেই বার্থমার্ক।

এই প্রসঙ্গে আমার অস্কার ওয়াইল্ডের ‘ডে প্রোফান্ডিস’-এর শেষটা মনে পড়ছে: ঝড় তুমি উড়িয়ে দিও আমার পায়ের চিহ্ন। আমি কোনদিকে যাচ্ছি, কীভাবে যাচ্ছি, তার কোনও রেখাপাতের হদিশ তুমি রেখো না। ঝড় তুমি আমার গতিপথের সকল চিহ্ন মুছে দিয়ে এইটুকু নিশ্চিত করো, যেন আমার পথের দিশা কেউ না পায়।
মেসির গোলের প্রতিটি খুব মন দিয়ে নিরীক্ষণ করেছি। এমনকী স্লো মোশনে প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা আলাদাভাবেও দেখেছি। কিন্তু তবু অন্তরলোক থেকে গিয়েছে অন্তরালে। এটাই মেসি ম্যাজিক! মেসি হওয়া যায় না। মেসি হয়ে জন্মানো যায়। এবং প্রতিটি গোলকে ফুলের মতো ফুটিয়ে তোলা যায়। এই সিম্পল কথাটা বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এবং লিখেছিলেন এই আসল কথা:
‘তোরা কেউ পারবি নে গো পারবি নে ফুল ফোটাতে।…
যে পারে সে আপনি পারে, পারে সে ফুল ফোটাতে!’

ফুল ফোটানোই তো আত্মার প্রকাশ। যেকোনও কাজেই হতে পারে সেটা। মেসি তাঁর ফুটবলে শরীরের প্রাবল্য দেখাননি। তিনি ফুটবলের মতো শরীরী খেলাতেও ফুল ফুটিয়েছেন। তাঁর অবসরের চিঠিটিও একটি ফুলের মতো। নরম। এবং পাপড়িতে বৃষ্টির ফোঁটা। বেদনা। কান্না। বিদায়ের বিষাদ।
এবার চিঠিটার মধ্যে ঢোকা যাক।
মেসির বয়স ৩৯। ২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল ১১ জুন শুরু হয়ে শেষ হল ১৯ জুলাই। ফাইনালের দু’দিন পরে মেসি লিখলেন তাঁর ঐতিহাসিক ও অনবদ্য অবসরলিপি, যুগপৎ নিহিত যাতনার, অকপট কৃতজ্ঞতার:
‘I wrote this letter two days after the final. After what happened with my dad, I am even more convinced of this decision than before. After all this time since the final.’

মেসির বাবা জর্জে মেসি মাত্র ৬৮ বছর বয়সে মারা গেলেন। তিনি অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু কী অসুখ, খুব স্পষ্ট নয়, অন্তত আমার কাছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, তিনি আশা করেছিলেন তাঁর পুত্রের অলৌকিক ফুটবল এবারের বিশ্বকাপ নিয়েই ফিরবে। এবং এবারের বিশ্বকাপে মেসির দেওয়া আট গোল এবং চারটে গোল তাঁরই অব্যর্থ, নিখুঁত, অবিস্মরণীয় পাস থেকে, মেসির বাবার এই স্বপ্নকে আরও বিশ্বাস্য করেছিল নিশ্চয়, মেসি দ্বিতীয়বার জিততে চলেছেন বিশ্বকাপ। সেটা হল না! এবং ফাইনালে মেসি জ্বলে উঠতেও পারলেন না। তাঁর এই অবিশ্বাস্য পরাভব তাঁর বাবার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেনি তো? এই ভাবনা কি আসেনি মেসির মনে? মনে রাখতে হবে, বাবা ছিলেন মেসির বন্ধু, উপদেষ্টা, অর্থ ও সম্পত্তির নিয়ন্ত্রক। মনে রাখতে হবে, মেসি লিখেছিলেন এই অবসরপত্র বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার দু’দিন পরেই। তারপর শুরু হয়েছে তাঁর অন্তরদ্বন্দ্ব। দোলাচল। ‘টু বি অর নট টু বি’র সংশয় পর্ব।

বাবা মারা যাওয়ার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন অবসর নেওয়ার। পরের বিশ্বকাপ ২০৩০-এ। সেই টেবিলে চুপ করে বসে আছেন মেসি, যে টেবিলে বসে ডাইরি লেখেন তিনি। ডাইরিতে খুললেন ৭ আগস্টের পাতা। বাবার চলে যাওয়ার দিন। একটিও শব্দ লেখেননি মেসি সেদিনের দিনলিপির পাতায়। মাঝখানে এঁকেছেন কাঁপাকাঁপা হাতে একটা কালো শূন্য। সেদিকে তাকিয়ে থাকেন মেসি। হঠাৎ মনে হয় মেসির পাতার মাঝখানে ওই শূন্যটা একটা ব্ল্যাকহোলের মুখ। তাঁকে অন্ধকারের মধ্যে টেনে নিচ্ছে। বন্ধ করেন ডাইরি। আর তখুনি শুনতে পান টেবিলটার কথা। যেমন শোনেন আজকাল প্রায়ই। বলেন না কাউকে। কে বিশ্বাস করবে এই আজগুবি? মেসি বিশ্বাস করেন অ্যাবসার্ডে। তাঁর ফুটবল, তাঁর বেশিরভাগ গোল এবং তাঁর পৃথিবীজুড়ে এই সাফল্য আর তাঁর অপরিমেয় অর্থ, সম্পত্তি– এর থেকে অ্যাবসার্ড কী হতে পারে? এই অ্যাবসার্ডিটির কাছে টেবিলটার কয়েকটা কথা কী এমন উদ্ভট? টেবিলের কথায় কান দেন মেসি।

“লিও, মন দিয়ে শোনো। ২০৩০-এর বিশ্বকাপে যাবে কি যাবে না, আর ভেবে কাজ নেই। তোমার বাবা মারা গিয়েছেন ৭ আগস্ট। আর সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে গেল। বাবা থাকলে আমি এ-কথা বলতাম না। তিনি তোমাকে জোর করে পাঠাতেন। তোমার তখন ৪৩ বছর বয়স হবে। তোমার বাবা তোমাকে বলতেন, ‘লিও, তুই তো ফুটবলের ভগবান। তুই ঠিক পারবি!’ মেসি, আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই। তুমি যে কাউকে আঘাত না করে হওয়ার মতো ভেসে যাও আর তোমার ওরা আঘাত করে, বাধা দেয়, তোমার ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়, আর তুমি সহ্য করো। ৪৩ বছর বয়সে তুমি আর সেটা পারবে না। তোমার স্কিল থাকবে সারাজীবন। তোমার রিফ্লেক্স ছেড়ে যাবে। অনেক দিয়েছ দেশকে। তোমার দেশ, পৃথিবী তোমাকে ভুলবে না। তুমি এখনও অপরাজিত। এবং অপরাজেয়। এই একেবারে সঠিক সময়। বিদায়ের লগ্ন এসে গিয়েছে। অন্য অনেক কাজ আছে লিও তোমার জীবনে। নতুন দরজা, নতুন পথ তোমাকে খুলতেই হবে।”

মেসি ফিরে আসেন তাঁর ডাইরিতে। তাঁর অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত লিখতে শুরু করেন:
‘After all this time since the final and after thinking about it a lot, I want to let everyone know that I am retiring from the national team. It was a decision that hurt and that still hurts deep down in my soul but I understand that this is the right moment. I swere that I always give everything – not just during the last few years when we won everything, but before that as well… There is not much time left and I have nothing more left to give.’

বন্ধুরা, বিদায়। আমি সব দিয়ে দিয়েছি। আর কিছু নেই আমার দেওয়ার মতো। দেশের জন্য আমার শেষবিন্দু পর্যন্তই দিয়েছি, ঈশ্বরের দিব্যি। এবার চললাম। এই সিদ্ধান্ত সহজে নিতে পারিনি। কিন্তু নিতেই হল, যদিও অনেক গভীরে আমার আত্মা ব্যথা পাচ্ছে। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে আমি আর দেশের জন্য খেলব না। একে একে জীবনের অধ্যায়গুলো বন্ধ হচ্ছে। হাতে সময়ও বেশি নেই।
এই বেদনা এই আর্তি এবং চিঠির শেষটা কেমন যেন রহস্যময়… এটা কি শুধু অবসর নেওয়ার পত্র? না কি আরও নিবিড় কিছু? এর শিকড় চলে গিয়েছে অনেক গভীরে!
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved