Yayoi Kusama: Dots, Infinity and the Forms of Her Art | Robbar
Robbar
  • ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিন্দুময় হে ভুবন

ইয়ায়োই কুসামার শিল্পকে শুধু ‘পলকা ডট’ বলে মনে রাখলে তাঁর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক কথাটিই বাদ পড়ে যায়। তাঁর বিন্দু আসলে অলংকরণ নয়– নিজেকে মুছে ফেলার এক যন্ত্র। তাঁর আয়না কোনও ঘরকে বড় করে না, বরং ‘আমি’ নামের ছোট্ট ঘরটিকেই অসীমের মধ্যে ভেঙে দেয়।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ১৭:৩৯   
Facebook WhatsApp Messenger

কিছু কিছু শিল্পীকে শুধুই তাঁর সৃষ্টিতে ধরা যায় না। কোনও একটি নির্দিষ্ট শৈলীতে তো নয়ই। তাঁরা আসলে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী আবহাওয়া, যার মধ্যে একবার ঢুকে পড়লে পৃথিবীর চেহারা পাল্টে যেতে বাধ্য; তাঁদের কাজ অনবরত ভেঙে দেয় দৈনন্দিন দেখার চেনা ছক। ইয়ায়োই কুসামা তেমনই এক শিল্পী।

তাঁর এক প্রমাণ আকারের ইনস্টলেশনের কথাই ধরা যাক একটি সাদা ঘরের দেওয়াল জুড়ে আয়না। আয়নার সামনে একটি আলো। সেই আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন মাঝখানে। হঠাৎ বুঝতে পারলেন, আপনার শরীরটিও শিল্পের অংশ হয়ে গিয়েছে। এক, দুই, দশ, হাজার প্রতিবিম্বতারপর আর গোনা যাচ্ছে না। আপনি আর একক দর্শক নন, আপনি অসংখ্য। সম্ভবত ইয়ায়োই কুসামার শিল্পের সবচেয়ে গভীর অভিঘাত এখানেই!

zoom
কুসামার লার্জ-স্কেল ইনস্টলেশন

টোকিওর একটি হাসপাতালে গত ১৪ আগস্ট, ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছবি এঁকে গিয়েছেন। কুসামার মতো শিল্পীর মৃত্যুকে ‘শেষ’ বলে মেনে নেওয়া মুশকিল।

যে শিল্পী আজীবন একই কথা বলে গিয়েছেন সৃষ্টির মধ্যে দিয়েএকটি বিন্দু থেকে অসংখ্য বিন্দু, একটি রেখা থেকে অনন্ত জাল, একটি আলো থেকে অগণিত আলো, একটি মানুষ থেকে অসংখ্য প্রতিফলন তাঁর ক্ষেত্রে মৃত্যু যেন নিছক শেষের চেয়েও পুনরাবৃত্তিরই আরেকটি মুহূর্ত। কারণ যে শিল্পী সারাজীবন ব্যক্তিসত্তাকে অসংখ্য বিন্দু, রেখা, আলো ও প্রতিবিম্বের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছেন, তাঁর নিজের মৃত্যুও কি তবে আর-একটি আত্মবিলুপ্তি ?

কুসামার শিল্পের মাধ্যম ছিল বিস্ময়কর ভাবে বহুমাত্রিক জলরং ও অ্যাক্রিলিক থেকে ক্যানভাস, ভাস্কর্য, ইনস্টলেশন, পারফরম্যান্স, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন থেকে কবিতা পর্যন্ত বিস্তৃত। মাধ্যম বদলালেও তাঁর শিল্পের মূল ভাষা একই থেকেছেবিন্দুর পুনরাবৃত্তি, জালের বিস্তার এবং ব্যক্তিসত্তাকে অসীমের মধ্যে বিলীন করে দেওয়ার চেষ্টা।

zoom
বৃহত্তর বিস্তারের দুনিয়ায় শিল্পী

ইয়ায়োই কুসামার শিল্পকে আজ প্রায় সবাই চেনে তাঁর পলকা ডট দিয়ে। বলা চলে তাঁর ‘সিগনেচার স্টাইল’। লাল জমির উপর কালো বিন্দু, হলুদ কুমড়োর গায়ে কালো বিন্দুসাদা ঘরের মধ্যে রঙিন বিন্দু, এমনকী, নিজের পোশাকেও বিন্দু। কিন্তু কুসামার বিন্দু কি সত্যিই নিছক সহজ অলংকরণ?

১৯২৯ সালে জাপানের মাতসুমোতো শহরে জন্ম কুসামার। শৈশব থেকেই তিনি হ্যালুসিনেশনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ছোটবেলা থেকেই তাঁর চোখে ধরা দিতে শুরু করে অদ্ভুত সব দৃশ্য জাল, বিন্দু, আবার কখনও ফুলের মতো আলোর বিস্তার যেন সাধারণ দৃশ্যের উপর পরত ফেলছে। যে অভিজ্ঞতা অন্য কারও কাছে আতঙ্ক হয়ে উঠতে পারত, কুসামা তাকে ধীরে ধীরে ছবির ভাষায় রূপ দিলেন। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তাঁর ভিজুয়াল ভোকাবুলারি হয়ে ওঠে ক্রমশশৈশবের সেই ভয়ই পরে তাঁর শিল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হয়ে উঠল।

পরবর্তী জীবনে তিনি পৃথিবীর উপর কোনও পূর্ব-নির্ধারিত প্যাটার্ন চাপিয়ে দেননি, বরং এমন একটি পৃথিবী আঁকছিলেন, যেটি আগাগোড়াই ছকভাঙা। বলা যায়, তিনি তাঁর উপলব্ধির জগতের অস্থিরতাকে বাস্তবের আয়নায় অনবরত উপস্থাপিত করতে  থাকেন।

zoom
আগাগোড়াই ছকভাঙা পৃথিবীকে বিন্দুর বিন্যাসে ভেবেছিলেন কুসামা

প্রথম জীবনে পরিবারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তিনি কয়োতে-তে নিহোংগা পেন্টিং শেখেন। কিন্তু জাপানি শিল্পের প্রথাগত কাঠামো তাঁকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। তাঁর চোখ তখন পশ্চিমের আধুনিক শিল্পের দিকে। ১৯৫৭-তে আমেরিকা, তারপর নিউ ইয়র্ক এবং সেখানেই এক তরুণী জাপানি শিল্পী হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করলেন পুরুষ-শাসিত পরিসরে।

নিউ ইয়র্কে তাঁর ইনফিনিটি নেট পেন্টিংসযেন প্রথম নিঃশব্দ বিপ্লব। বিশাল ক্যানভাস জুড়ে একই ব্রাশ স্ট্রোকের অবিরাম পুনরাবৃত্তি কোনও কেন্দ্র নেই, কোনও শেষ নেই। যেখানে অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম শিল্পীর ব্যক্তিগত জেশচার-কে সামনে আনছিল, কুসামা সেখানে প্রায় নিজের হাতকেই অদৃশ্য করে দিলেন। একটি স্ট্রোক, তার অসংখ্য পুনরাবৃত্তি শেষ পর্যন্ত পেন্টিং নিজেই হয়ে উঠল এক অসীম বিচরণভূমি।

তারপর এল পুঞ্জীভূত ভাস্কর্য– সোফা, চেয়ার, জুতো, নৌকা কিংবা দৈনন্দিন বস্তু ঢেকে গেল অসংখ্য নরম লিঙ্গাকৃতির ফর্মে। যৌনতা, ভয়, শরীর এবং অবচেতন সবকিছু মিশে গেল এক অস্বস্তিকর অথচ অপ্রতিরোধ্য শিল্প ভাষায়।

zoom
পুঞ্জীভূত ভাস্কর্য

১৯৬০-এর নিউ ইয়র্কে আভা গার্দে তিনি পারফরম্যান্স, বডি পেইন্টিং, যুদ্ধবিরোধী শিল্পপ্রদর্শনী, ফ্যাশন এবং ফিল্মেও কাজ করেছেন। অ্যান্ডি ওয়ারহল, ক্ল্যায়েস ওডেনবার্গ, অ্যালান কাপ্রো-দের সময়ের সেই শিল্প-পরিবেশে কুসামা ছিলেন একইসঙ্গে আউটসাইডার এবং পাইওনিয়ার। তাঁর শিল্পকে শুধু পপ আর্ট, মিনিমালিজম, ফেমিনিজম বা সারিয়ালিজম-এর কোনও এক ঘরে রাখা যায় না।

১৯৬৫-তে ইনফিনিটি মিরর রুম ফাল্লিস ফিল্ড-এর মাধ্যমে আয়না তাঁর শিল্পে নতুন মাত্রা আনল। একটি ঘর, অসংখ্য প্রতিফলন, আলো, রিসেপশন– দর্শক যেখানে আর আর্টওয়ার্কের বাইরে থাকে না; দর্শক নিজেই ইন্সটলেশন আর্টওয়ার্কের ভিতরে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে এই ইনফিনিটি মিরর রুমস-ই কুসামাকে নিউ থেকে পপুলার কালচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পাম্পকিন, পলকা ডটস, ফ্লুরোসেন্ট কালারস এবং মিররড স্পেসেস হয়ে ওঠে তাঁর অননুকরণীয় সিগনেচার। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার নীচে ছিল এক গভীর দর্শন– সেলফ অবলিটারেশন। অর্থাৎ নিজেকে মুছে দিয়ে বৃহত্তর অসীমের অংশ হয়ে যাওয়া।

১৯৭৩-এ জাপানে ফিরে আসার পর কুসামা কবিতা লিখেছেন, স্কাল্পচার ও আউটডোর ইন্সটলেশন করেছেন, এবং পরবর্তী দশকগুলিতে তাঁর কাজ ক্রমশ আন্তর্জাতিক মিউজিয়ামের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ২০০৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত তাঁর ‘মাই ইটারনাল সোল’ সিরিজের প্রায় ৯০০টি পেইন্টিং তৈরি হয়। ২০১৬-তে তিনি জাপানের অর্ডার অফ কালচারে সম্মানিত হন।

zoom
‘মাই ইটারনাল সোল’ সিরিজের ছবি
zoom

আপাতভাবে তাঁর সব কাজই অত্যন্ত রঙিন হলেও স্বপ্নের মতো নয় তাঁর পৃথিবী। বরং স্বপ্ন এবং জাগরণের মাঝের যে অস্পষ্ট জায়গা– যেখানে পরিচিত জিনিস হঠাৎ নিজের পরিচয় হারায়– কুসামা সেই জায়গাটিকে ধরতে চান নিজের সৃষ্টিতে ।

একটি বিন্দু– যেমন ক্ষুদ্র, তেমনই সম্পূর্ণ। পৃথিবীকে দূর থেকে দেখলে, মানুষ, বাড়ি, রাষ্ট্র, শহর– সবই বিন্দু। মহাকাশের মধ্যে পৃথিবী একটি বিন্দু। পৃথিবীর মধ্যে মানুষ আর-একটি বিন্দু। মানুষের শরীরের মধ্যেও অগণিত কোষ। সেই কোষের মধ্যেও আরও ক্ষুদ্র জগৎ। কুসামার ভাষায় বিন্দু কেবল প্যাটার্ন নয়– বরং তা আত্মবিলোপের একটি উপায়। সেলফ অবলিটারেশন’– নিজেকে মুছে ফেলা। কিন্তু সেই মুছে-যাওয়া মানে কিন্তু মৃত্যু নয়। বরং বৃহত্তর বিস্তারের মধ্যে নিজের সীমানাকে দ্রবীভূত করে দেওয়া। ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’… তারপর ‘আমরা’ থেকেও আর-একটি বৃহত্তর জ্যামিতি।

zoom
একটি বৃহত্তর জ্যামিতি ও শিল্পী

আজকের কুসামাকে দেখে বোঝা কঠিন যে, বরাবর তিনি এই বিপুল খ্যাতির কেন্দ্র ছিলেন না। প্রসঙ্গক্রমে যে কথা আগেই এসেছে পাঁচের দশকের শেষদিকে জাপান থেকে নিউ ইয়র্কে আসা এক তরুণী শিল্পী, পুরুষশাসিত শিল্পজগতের মধ্যে নিজের জায়গা খুঁজছেন। অর্থ নেই, নিরাপত্তা নেই, প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক নেই। কিন্তু এক অদ্ভুত দৃশ্যমান ভাষাই তাঁর হাতিয়ার। পরবর্তীকালে কুসামার কাজ নিয়ে একটি জটিল বিতর্কও তৈরি হয়– তিনি বহু ধারণার অগ্রদূত হলেও, পুরুষ শিল্পীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। কুসামার জীবন তাই শুধু শিল্পের বিজয়গাথার গল্প নয়।

একজন নারী, এশীয়, অভিবাসী এবং মানসিকভাবে বিপন্ন শিল্পীএই পরিচয়গুলির কোনওটিই ছয়ের দশকের পশ্চিমি শিল্প-প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক ছিল না। আজ তাঁর নাম বিশ্বজোড়া। সমকালীন পৃথিবীতে, যেখানে প্রত্যেকটি মানুষ নিজের ছবি, নিজের পরিচয়, নিজের উপস্থিতি, নিজের পরিচয় নিয়ে এত ব্যস্ত কুসামার শিল্প প্রায় উল্টো কথা বলে।

একক অস্তিত্ব আর বহুত্বের মাঝখানেই সম্ভবত তাঁর শিল্পের মুক্তি… কুসামা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো তাঁর সেই লাল চুলের মধ্যে, অগণিত আলোয়, আয়নার ভিতরে আয়নায়– একটি ছোট্ট বিন্দু হয়ে। তারপরেই ছড়িয়ে যাচ্ছেন অসীমের দিকে…

abstract artist hallucination installation art Mirror Effect obituary polka dots pumpkin Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Yayoi Kusama

Share this article on