


আশ্রমের চারিদিকে অনুচ্চ পাঁচিল, আর সেখানে ঢোকার একমাত্র গেটের মাথায় অর্ধবৃত্তাকার সাদা সাইনবোর্ডে সবুজ রঙে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা: ‘অমল আশ্রম’। এত ক্লান্তিকর বিপদপরিপূর্ণ পথ পেরিয়ে এসে বাংলা ভাষার প্রথম দুটি স্বরবর্ণ ‘অ আ’ দেখতে পেয়ে আমি তো দিব্বি সুস্থ তরতাজাই হয়ে উঠেছিলাম, এবার সে-কথা পড়ে আপনারাও নিশ্চিন্ত নিরুদ্বেগ হয়ে যান।
২২.
কীভাবে সেই বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ‘হরিবাবা’-র আশ্রমে গিয়ে পৌঁছেছিলাম, তার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করে আর পুঁথির ভারবৃদ্ধি করব না। বিশেষত, গত পর্বের সংকট-সমাহার পড়ে আমার প্রতি অত্যধিক স্নেহশীল পাঠক-পাঠিকাদের চিত্তাকাশ যখন আমার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে সবিশেষ উদ্বেগমেঘে আচ্ছন্ন হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ রীতিমতো সন্দিহান হয়ে পড়েছেন এই কথা ভেবে যে, আমি আদৌ এখনও অবধি বেঁচে আছি কি না। এরকম একটা পরিস্থিতিতে সে-পথরেখার বিস্তৃত বিবরণ রচনা করার দুর্মর প্রলোভন জয় করে এটুকু লেখাই এখানে পর্যাপ্ত হবে, শেষ পর্যন্ত সেই আগুনের পাহাড়, বিপদের ঢেউ ও নিষ্করুণ মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে আমি দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের রাজপুত্তুর পাহাড় থেকে সমতলে নেমে ফ্রের আঁরি-র আশ্রমে নিরাপদে উপস্থিত হয়েছিলাম। এবং ধরে নিন, সেই আশ্রমের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে আপনাদেরই প্রিয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ওই গানটাই আমার মনের কানে বারবার অনুরণিত হচ্ছিল: ‘যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ আসিতে তোমার দ্বারে, মনে হল।’ সবই আসলে ‘মনে হওয়া’-র ব্যাপার, যাক্-গে!
আশ্রমের চারিদিকে অনুচ্চ পাঁচিল, আর সেখানে ঢোকার একমাত্র গেটের মাথায় অর্ধবৃত্তাকার সাদা সাইনবোর্ডে সবুজ রঙে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা: ‘অমল আশ্রম’। এত ক্লান্তিকর বিপদপরিপূর্ণ পথ পেরিয়ে এসে বাংলা ভাষার প্রথম দুটি স্বরবর্ণ ‘অ আ’ দেখতে পেয়ে আমি তো দিব্বি সুস্থ তরতাজাই হয়ে উঠেছিলাম, এবার সে-কথা পড়ে আপনারাও নিশ্চিন্ত নিরুদ্বেগ হয়ে যান।
ফাজলামি করা একটা স্বভাব, একটা নেশা। এ নেশা পেয়ে বসলে তা দূর করা দুঃসাধ্য। কিন্তু আজ যতই ইয়ার্কি ফাজলামি করি, সেদিন কিন্তু ওই গেট দিয়ে ঢুকে রসিকতার অবকাশই ছিল না। গেটে দারোয়ান নেই দেখে খানিক ইতোটু-তোতোটু করে, এদিকে সেদিকে ফুলুক-ফালুক চেয়ে যেই না আশ্রমের ভিতরে সেঁধিয়েছি, ওমনই কোথা থেকে বাছুরের সাইজের ইয়া এক জার্মান শেফার্ড কুকুর ঘাউঘাউ হাউহাউ করতে করতে হিংস্র দাঁতটাঁত বের করে আমার দিকে ছুটে এল! আমাকে কোনও রকম সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দিয়েই সে গায়ের ওপর উঠে পড়ে, তার সামনের দুই পা আমার কাঁধের ওপর স্থাপন করে বিশাল লালায়িত জিভ বের করে আমার মুখের উপর ‘হ্যা হ্যা’-করে গরম নিশ্বাস ফেলতে লাগল। আমার তো ভাই রে ভাই, নাজেহাল অবস্থা! একহাতে শম্ভুর হ্যান্ডেল অন্যহাতে এই আপদের পিঠের ওপর হাত রেখে যতই বোঝাতে যাই, ‘ওরে মুখ্যু! আমি চোর, ছ্যাঁচ্ছড়, গাঁটকাটা নই রে! শুধু বিড়িসিগারেট খেয়ে খেয়ে চেহারাটা চোট্টার মতো করে ফেলেছি রে!’ ততই সে ব্যাটা কুকুর আমার মুখের ওপর আরও আরও বিপজ্জনকভাবে উষ্ণ সন্দেহমাখা নিশ্বাস ফেলতে থাকে। কী আর করি, অচল স্থাণুর মতো হয়ে কুকুরের আফজলখাঁ-সুলভ আলিঙ্গন সহ্য করেই চলেছি, এমন সময় দূর থেকে কে যেন তীক্ষ্ণ শিস্ সহকারে গর্জন করে উঠল, ‘অ্যারো! অ্যারো! লিভ হিম! লিভ হিম অ্যাট ওয়ান্স!’

ও মা! কী বলব মশাই, অমনি সেই বীর সারমেয় এতক্ষণের বিক্রম ভুলে গিয়ে মন্ত্রৌষধিরুদ্ধবীর্য সর্পের মতো আমার বুক থেকে, ঘাড় থেকে তড়াক করে নেমে পড়ে মাটির ওপর তার সামনের দুই পা প্রসারিত করে যেন ‘বাধাই হো, বাধাই হো, হুজুর!’ বলতে বলতে নিতান্ত নিরীহ নেড়িপ্রতিম লেজ নেড়ে নেড়ে আমাকে অবিকল তোষামোদ করতে আরম্ভ করলে!
আমি খানিক স্বস্তি পাইলাম। কী বলিব, মহাশয়, মস্তিষ্ক কিঞ্চিৎ সক্রিয় হইল। বুঝিলাম, এই সারমেয়-শাবকের ভালো নাম ‘অ্যারো’।
সার্থকনামা বলতেই হবে, তিরের মতো ছুটে এসে আমার বুকে আরেকটু হলেই ঢুকিয়ে দিচ্ছিল স্বদন্তের থুড়ি শ্বদন্তের চাক্কু!
কিন্তু কুকুরটি তো পাওয়া গেল, এখন এর মালিকটি কোথায়? কুকুরটি দেশি নয়, তাহলে মালিকও কি আর দেশি? অন্তত দূর থেকে যে-কেতার ইংরেজি শব্দগুলো অ্যারো-র উদ্দেশে ভেসে এসেছিল, তার উচ্চারণ ঠিক ওইভাবে করতে গেলে এদেশীয় লোকের জিভ টাকরায় আটকে যেত।
ঠাহর করে দেখলাম, গেটের থেকে সামান্য দূরে একটা সবুজ রঙের কটেজ। সেই কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। বুঝলাম, হুংকারটা তাঁরই। অগত্যা অ্যারো-র পিছন পিছন আমার শম্ভুসাইকেল-সহ কটেজের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। বারান্দায় দাঁড়ানো ব্যক্তিটির সম্মুখে উপস্থিত হয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হল। হ্যাঁ, ইনি তিনিই বটেন! সেই যে গড়ের পুকুরের ধার দিয়ে সাইকেলে চড়ে এঁকেই তো আমি চলে যেতে দেখেছিলাম! চাঁপার বরণ গায়ে আজ গেরুয়া রঙের ফ্লোয়িং রোব, পায়ে নীল ট্রাউজার, আর হ্যাঁ, দেবব্রতর কথা পুরোপুরি সত্যি নয়, আজ কিন্তু গলায় দিব্বি রুপোলি ক্রশ ঝুলছে, মাথায় একটা থ্যাবড়ানো মেরুন রঙের টুপি।
আমি কিছু বলার আগেই তিনি বলে উঠলেন, ‘কইত্থিক্কা আইলেন অ্যাত্তো বিহানবেলায়?’
এ কী রে! এ যে ইংরেজি নয়, ফরাসি নয়, সরেস বাংলা ভাষা, কিংবা তারও চেয়ে বেশি– খাঁটি বাঙাল ভাষা!
বুঝে নিলাম, বহু বছর ‘আঁরিবাবা’ অথবা ‘হরিবাবা’ এ তল্লাটে আছেন। কাজেই মিশনারিসুলভ উৎসাহে বাংলাভাষার আঞ্চলিক রূপটি কণ্ঠে তুলে নিতে কসুর করেননি।
তাঁর প্রশ্নের উত্তরে যা বলা উচিত, তাই-ই বললাম। সব শুনে তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘কন কী? আমতলি হইতে আইলেন ক্যামনে আপনি কুহুডাঙায়? পথে কোনও বিপদ-আপদ অয় নাই তো?’
আমি নির্বিকার বদনে বললাম, ‘না-না, তেমন কিছু না। ওই একটু মশামাছি পোকামাকড়ের উপদ্রব!’
তাঁর মুখ দেখে মনে হল, তিনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। সে যাই হোক, সেই প্রসঙ্গে আর অগ্রসর না হয়ে ফ্রের আঁরি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘আটটা বাইজ্যা গ্যাছেগা। সকাল অইতে কিছু খান নাই?’
আমি দু’পাশে মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝালাম।
তিনি শশব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমাকে তাড়াতাড়ি একটা লম্বাটে ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে প্রশস্ত ডাইনিং টেবিল আর তার চারপাশে খুদে খুদে গদি-আঁটা কতগুলো চেয়ার। আমাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে আমার পাশের চেয়ারে বসলেন তিনি। অদূরে গায়ে সাদা অ্যাপ্রন পরে একজন গ্রামের মহিলা গ্যাসের চুলায় তাওয়া বসিয়ে খুটখুট করে কী যেন রান্না করছিলেন। আমাদের দেখে সেই মহিলার কাজের তৎপরতা বেড়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রেডটোস্ট, ডিমভাজা, জ্যাম, জেলি, নোনতা বিস্কুট, গরম গরম কফি সবই চলে এল। ফাদার শুধু এক কাপ চা নিলেন। বিস্কুট, জ্যাম, জেলি দেখিয়ে বললেন, ‘ব্যাবাক আইটেম আমাগো আশ্রমেই বানানো অয়!’
আমি হেঁ-হেঁ করে হেসে বললাম, ‘তা তো বটেই! তা তো বটেই!’

পেটপুজোর মধ্যে টুকটাক গল্প হতে লাগল। ফাদার অকৃত্রিম বাঙাল ভাষায় কথা বলছিলেন। কী নিয়ে গপ্পো হচ্ছিল, সেসব এখন আর মনে নেই। কাজেই বানিয়ে বানিয়ে সংলাপ না-লেখাই ভালো।
খাওয়াদাওয়ার পর তিনি আমাকে এই কিচেন-কাম-ডাইনিং রুমের পিছনে সুনিবিড় শালের জঙ্গলের দিকে নিয়ে গেলেন। গাছগুলো সামান্য দূরত্ব রেখে রেখে আশ্রমপ্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে, মধ্যিখানে সরু পথের অস্ফুট আভাস। দু’পাশের ঘাসজঙ্গলে ওই সকালেও অতন্দ্র ঝিঁঝি ডাকছিল।
ফাদার ফ্রের আঁরি ফস্ করে রোবের পকেট থেকে সিগারেট বের করে এনে ধরালেন, আমারও হাতে একখানা দিলেন কপারের লাইটার-সহ। আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, কেননা ফাদারদের অন্যের সামনে স্মোক করতে আমি এর আগে দেখিনি। আমি এতদিন ভাবতাম, ফাদাররা অধূমপায়ী। কিন্তু সেটা আমার অজ্ঞানতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লম্বা করে ধোঁয়া ছেড়ে ফাদার আঁরি এই দ্বিতীয়বার আমাকে চমকে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, ‘আপনি তো এখানকার লোক নন। সেটা আমি আপনার ভাষা ও উচ্চারণরীতি থেকেই বুঝেছি। আপনি তো কলকাতার লোক! ঠিক বলছি তো?’

এবার আর বাঙাল ভাষা একেবারেই নয়, খাস কলকাত্তাই ভাষা। ব্যাপার কী? ইনি কতরকমের ভাষা জানেন?
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক। আমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। কলকাতার।’
কথাটা শুনেই তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন হঠাৎ। মুখ লাল করে রীতিমতো ঝাঁঝালো স্বরে প্রশ্ন করলেন আমাকে, ‘আমি কতবার আর ড্যানিয়েলকে বলব বলুন তো আমার কাছে লোক না পাঠাতে?’
আমি তাঁর কথার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম, ‘ড্যানিয়েল কে, ফাদার? আমি তো তাঁর কাছ থেকে আসিনি। ড্যানিয়েল বলে কাউকে আমি চিনি না।’
‘ড্যানিয়েল পাঠায়নি আপনাকে?’
‘বললাম তো, না। কে ড্যানিয়েল?’
‘সে আছে একজন আমার বন্ধু। প্রিস্ট। এখন শ্রীরামপুরে পোস্টেড,’ এই পর্যন্ত বলেই থেমে গেলেন তিনি। তারপর কী যেন ভিতরে ভিতরে চিন্তা করতে করতে বলতে লাগলেন, ‘আপনি তাহলে ড্যানিয়েলের লোক নন… ও, আমারই ভুল হয়েছিল… আচ্ছা, তাহলে আপনার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী?’
‘কিছুই না, ফাদার। গড়ের পুকুরের ধারে আমি আর আমার এক বন্ধু দেবব্রত পানিফল কিনে খাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম, আপনি সাইকেলে করে যাচ্ছেন। শুনলাম, আপনার নাম হরিবাবা। নামটা শুনে অবাক হয়েছিলাম।’
ফাদার হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, আঁরি থেকে হরি। কলকাতায় যখন ছিলাম, তখন আবার লোকে বলত– হেনরি। তবে সে অনেক অনেক বছর আগে।’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, ওই নাম থেকেই আমার আগ্রহ জন্মাল। তারপর গাঁয়ের লোকের কাছে আপনার আশ্রমের কথা শুনলাম।’
পুনরায় তাঁর মুখে মেঘ ঘনাল। চিন্তিত ভঙ্গিমায় ফাদার বললেন, ‘কিন্তু আমার আশ্রম সম্পর্কে ওদিককার লোকের ধারণা মোটেই ভালো নয়!’
আমি উত্তর দিলাম, ‘লোকের কথায় প্রভাবিত হওয়ার মতো মানুষ আমি নই। যাই হোক, তারপর শুনলাম আপনার আশ্রমে আসার পথ বেশ বিপদসংকুল, পদে পদে বিপদের সম্ভাবনা। তো সেসব অ্যাডভেঞ্চারের আকর্ষণে আর আপনার এই আশ্রমের অদম্য টানে নিতান্তই কৌতূহলের বশে এসে পড়েছি। আমি খুবই সাধারণ চাষাড়ে টাইপের লোক, অনাবশ্যক কৌতূহল প্রকাশ করে ফেলেছি, আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন, ফাদার!’
‘আরে না-না, এসব কেন বলছেন, বলুন তো! এখানে তো কেউ আসে না সচরাচর, আপনি এসেছেন, এ আমার পক্ষে বড়ই আনন্দের ব্যাপার,’ তারপরেই প্রসন্ন উজ্জ্বল দু’টি চোখ আমার মুখের ওপর স্থাপন করে বললেন ফাদার আঁরি, ‘আপনার বয়েসে অবিকল আপনারই মতো ছিলাম আমি, জানেন?… এরকমই প্রাণবন্ত, এরকমই উৎসাহী… ড্যানিয়েলও অনেকটা এরকমই ছিল… কোথায় গেল বলুন তো আমাদের সেসব উজ্জ্বল দিন?’
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved