


বাবা বটে বাগেশ্বর! তাঁর দাপটে গোবলয়ে বাঘে গাই-তে এক ঘাটে জল খেতে নামতেও ভয় পায়। ডানপিটে সাংবাদিককে ভরা সভায় কানমোলা খাওয়ান। কোভিডবিধি মেনে ‘নিচুজাত’-এর স্পর্শ বাঁচিয়ে ছয় ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রাখেন। সেই বাবা যখন আমিষ ছাড়ার আদেশ দিচ্ছেন, বুঝতে হবেই এ যে-সে বাণী নয় গো, হে বন্ধু হে প্রিয়। বাবা তো বনগাঁ লোকালের আমলাপাচক বিক্রেতা নন, যে ফ্রি-তে বাণী বিলোবেন। তার কথার গূঢ় অর্থ আছেই আছে, ভেতোগুলো যতই তার তল খুঁজে না পাক।
৩৮.
বুঝলেন? অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম, ঠাকুর হককথাই কয়েচেন! মানে, ওই যে, আক্ষেপে অজগর হয়ে মাঝেমধ্যে আমরা বলি না– ‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে, দয়াহীন সংসারে, … আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।’ সে তো ঠাকুরের খাঁটি কথা। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝছি।
চোখের সামনে দেখুন, মহাপুরুষের ঠেলাঠেলি। বাক্যে তাঁরা এক-একজন বেস্পতি। নিদানের গুঁতোয় গজদাঁত গজিয়ে ওঠার জোগাড়। অথচ বাঙালির ডিএনএ দেখো! এড়েতক্কো ছাড়া অন্নপ্রাশনের ভাত যেন হজম হতে চায় না। দিনেরাতে মহাপুরুষদের আনাগোনা বেড়ে গেছে সোনার বাংলায়। পাড়ার মোড়ে কিংবা রাজপথের টঙে বসে তাঁরা আমিষ-নিরামিষের ডায়েট চার্ট সস্তায় বিলোচ্ছেন। এত প্রাণপাত, অথচ হাড় জিরজিরে বাঙালিগুলোর মন মজে না। কোথায় পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বি, তা নয়, উল্টে নাকখাড়া করে প্রশ্ন-বিচিত্রা সাজাচ্ছে! যেন মাধ্যমিকের মক টেস্ট! সাধে কি আর বলে– তুমি যাও বঙ্গে কপাল তোমার সঙ্গে!

সত্যি বলতে, বাঙালির চিরকাল চোখে ঠুলি। আজ নয়, আদ্যিকাল থেকে। মানুষ চিনতে তার ত্রাহিমাম দশা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকেও তার ‘পাগলা ঠাকুর’ বলে দেখে দিয়েছিল। তারপর রবিঠাকুরকে ‘বুর্জোয়া’ কবি, নেতাজিকে ‘তোজোর টমি’… ইয়ে মানে, প্রতিষ্ঠা-অনুশাসন-পরম্পরার সাক্ষীগোপাল যাকে বলে আর কী, যাগ্-গে যাক্ সে-কথা। পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটলে ডিমের ডেভিল মিইয়ে যাবে, ফিরিস্তির লিস্ট চিত্রগুপ্তের হালখাতাকে ছাপিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে, এমন রাম-রাজত্বে বাঙালি মানুষ চিনতে ভুল করবে! ঠিকই বলেছেন কবি, “রেখেছ বাঙালি ক’রে মানুষ কর নি।”
সেই কোথায় বাগেশ্বর ধাম! জলে-স্থলে, না অন্তরিক্ষে, ঘরকুনো, পেটরোগাগুলো সে-খবর রাখে না, তবু সজ্জন মানুষটা গাঁ-উজিয়ে হানা দিয়েছে। এই তালপোড়া ভাদ্রে গলায় রক্ত তুলে বলেছে, মা-জননীরা পুজোপার্বণে আমিষ খাবেন না, ঘরের পোলাপানদেরও খেতে দেবেন না (অষ্টমীতে যদিও জলপানে বিরতি)। এসব শুনে কোথায় না ‘বাবা, বাবা’ বলে কঁকিয়ে উঠবে, কোথায় না সাশ্রুনেত্রে বাবার পায় লুটোপুটি খাবে, তা নয়, উল্টে গলার শিরা ফুলিয়ে এমন ধর্মপুত্তুরকে বাঙালি ’বিরিঞ্চিবাবা ইজ ব্যাক’ বলে হ্যাশট্যাগ নামাচ্ছে! বলি, ধর্মে সইবে? নরকের বাথরুমেও তো জায়গা হবে না।

বাবা বটে বাগেশ্বর! তাঁর দাপটে গোবলয়ে বাঘে গাই-তে এক ঘাটে জল খেতে নামতেও ভয় পায়। ডানপিটে সাংবাদিককে ভরা সভায় কানমোলা খাওয়ান। কোভিডবিধি মেনে ‘নিচুজাত’-এর স্পর্শ বাঁচিয়ে ছয় ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রাখেন। সেই বাবা যখন আমিষ ছাড়ার আদেশ দিচ্ছেন, বুঝতে হবেই এ যে-সে বাণী নয় গো, হে বন্ধু হে প্রিয়। বাবা তো বনগাঁ লোকালের আমলাপাচক বিক্রেতা নন, যে ফ্রি-তে বাণী বিলোবেন। তার কথার গূঢ় অর্থ আছেই আছে, ভেতোগুলো যতই তার তল খুঁজে না পাক।
এমনিতেই তো বাঙালি পেটরোগা। গেঁটেবাত আর অম্লশূল নিত্যসঙ্গী। পুজোর ক’টা দিন শরীরের ওপর অত্যাচার না করলেই নয়! রাতবিরেতে চোখের মণি লাল করে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা আছে, এমন অবস্থায় গুরুপাকে পিত্তগরম হতে পারে। বায়ু মাথায় চড়তে পারে। এদিক-ওদিক হয়ে গেলে তখন দায় কে নেবে শুনি, সরকার!

তাছাড়া বাগেশ্বর মোটেই কাকেশ্বর নন, আর কুচকুচে নন মোটেই। ঠাঁটেবাটে ধোপদুরস্ত। পারলে বাগেশ্বর ধামে চোখ বুলিয়ে আসুন, দেখবেন সাক্ষাৎ এলডোরাডো। তবু বাবা আমাদের নিরংকারী, গর্বটর্ব ধাতে সয় না। এমন দেবতুল্য মানুষের সঙ্গে মানিকবাবুর মেঘের তুলনা হতে পারে, কিন্তু তাই বলে মানিকবাবুর ‘মহাপুরুষ’, কিংবা রাজশেখর বসুর ‘বিরিঞ্চিবাবা’র সঙ্গে তুলনা কোন পাগলে করে শুনি! ওদের মতো সূর্যকে ঘুম থেকে না তুলে, সেদিনের ছোকরা বুদ্ধর সঙ্গে আড্ডা না মেরে দেশোদ্ধারে নেমেছেন বাবা-বাগেশ্বর। এমন রত্ন ক’টা মেলে!
তাছাড়া নিরামিষে দোষের কী আছে! শাক, শুক্তোয় বুঝি নোলা ভেজে না! আমিষ কি সুইস ব্যাংকের কালো টাকা, যে আসি বলে কাশী যাবে! পুজোয় নাইবা হল, রোল, চাউমিন, বিরিয়ানির মাটনে কামড়। আমিষ না খেলে বাঙালি বেয়ার গ্রিলস হয়ে যাবে না কি! সেই তো ছুটি কাটিয়ে অফিসে ফিরে কাঠি করা! মাংস না খেলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে শুনি।

তার চেয়ে নিরামিষ ভালো। সস্তায় পুষ্টিকর! তবে বাঙালিকে না আঁচড়ালে বিশ্বাস নেই। দেখবেন শারদোৎসবে, থুরি, দুর্গাপুজোয় কোনও লাউঘণ্টর স্টলে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়বে– ‘ মালিককে গিয়ে বল, খোকা এসেছে!’ তারপর বাগেশ্বরের বাণীকে ‘বাপি বাড়ি যা’ ঢঙে উড়িয়ে অর্ডার হাঁকবে– ‘একটা চাউমিন আর চিলি ফিস’!
সাধে কী আর পাখণ্ডি বলে!
…………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য পর্ব
…………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved