political scenario of developing india in 1980s | Robbar
Robbar
  • ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতির ‘আট’-ঘাট

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ৪০ বছর অন্তর পুরোনো ফ্যাশন ফিরে আসে। ২০২৬-এ তাই ফিরে এসেছে ১৯৮৬। টিকটক-এআই ’৮৬-কে ফেরত চাইছে। ’৮০-এর দশক রাজনীতিতে বাস্তবতা আনল। বলল, গ্রিড ইস গুড। পাওয়ার– পয়সা সব দিখানা হ্যায়। জো দিখতা হ্যায় ওহি বিকতা হ্যায়। ’৮০-র দশকের ওয়াল স্ট্রিট ব্যাংকার হয়ে বলল, চাই স্ট্রংম্যান, চাই বিগ পাওয়ার।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১৭:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger

রাইসিনা হিলসে রাষ্ট্রপতি ভবনের বিশাল অট্টালিকা। সেই প্রাসাদের ভিতরে নিজের অফিসঘরে বড় হাতলওয়ালা চেয়ারে উপবিষ্ট জ্ঞানী জৈল সিং। একবার দু’ হাত দিয়ে নিজের গোলাপি রঙের পাগড়িটাকে ঠিক করে নিলেন। তারপর শক্ত করে হাতল দু’টি ধরলেন দু’ হাত দিয়ে। উত্তেজনায় তিনি তখনও থরথর করে কাঁপছেন। চোস্ত পায়জামা আর লম্বা কুর্তা পরিহিত রাষ্ট্রপতি। পা দুটো দ্রুত নাচাচ্ছেন। বিরাট টেবিলটার ওপর রাখা একটি ফাইল। সেই ফাইলে বদ্ধ একটি চিঠি। চিঠিটি যাচ্ছে দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কাছে। বলা হচ্ছে– আপনি ইস্তফা দিন!

zoom
রাজীব গান্ধী

সালটা ১৯৮৭। সেই আটের দশক, যখন বলিউডে রাজেশ খান্নার ‘গুরু পাঞ্জাবি’ আসব আসব করছে। যখন বেলবটম আর ডগ কলারের জামা পরে নায়কেরা গান গাইছেন– ঠিক তখন সেই আটের দশকে রাষ্ট্রপতি ভবনে রচনা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের এক অভিনব ব্লু-প্রিন্ট। আটের দশকের রাজনৈতিক রঙ্গ।

সে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের কাহিনি। রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধানমন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে বলছেন। আইনমন্ত্রী অশোক সেন রাষ্ট্রপতির চিঠির আইনি খসড়া করে দিয়েছেন।

সপ্তম রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ ডেপুটি সেক্রেটারি আর এক সর্দারজি ফরেন সার্ভিস অফিসার কে সি সিং-এর উইলিংটন ক্রিসেন্টের বাংলোতে এসে হাজির হলেন মধ্যপ্রদেশের ডাকসাইটে নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিদ্যাচরণ শুক্ল। শুক্ল, কে সিং সিং-কে বললেন, এখন আমার গাড়ি নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়া যাবে না। গোয়েন্দারা নজর রাখছে। এরপর কে সি সিংয়ের ছোট ময়ূরপঙ্খী ফিয়েট গাড়িতে চেপে তাঁরা গেলেন জৈল সিংয়ের কাছে।

zoom
বিদ্যাচরণ শুক্ল। আলোকচিত্র: উমেশ ব্যাস

শুধু তো বিদ্যাচরণ শুক্ল নন, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ, অশোক সেন এমনকী অরুণ নেহরুর মত রাজীব গান্ধীর একদা ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধুও প্রধানমন্ত্রীকে বিতাড়নের নকশা রচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

অতএব?

হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো ১৯৮০!

আজ আর সেদিনে তো কত তফাত!

সেদিন তো ভারতে মোবাইল ফোন পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি। তাই স্মার্টফোন ছিল না, তবু সেই বেলবটম আর ডগ কলারের ইস্টম্যানকালার যুগেও দিল্লি ছিল একইরকম ষড়যন্ত্র নগরী। মুঘল আমল থেকে ’৮০-র শাহি দিল্লির দেওয়ালেও কান পাতা যায়। শোনা যায় নানা ধরনের ফিসফিস-ষড়যন্ত্র।

ইন্দিরা হত্যার পর যখন তাঁর খণ্ডবিখণ্ড শরীর অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিসিনে শায়িত। বাংলা থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায় আর বরকত গনিখান চৌধুরীকে নিয়ে চলে এলেন রাজীব। তখন রাষ্ট্রপতি ইয়েমেনে স্টেট ভিজিটে ব্যস্ত।‌ ১ নম্বর সফদরজং-এ সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে ইন্দিরা গুলিবিদ্ধ হন। জৈল সিং সেদিনই বিকেলে সাড়ে চারটার সময় চলে আসেন। সেদিনই সন্ধেয় রাজীব গান্ধী শপথ গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি ভবনে।

zoom
ইন্দিরা গান্ধী। আলোকচিত্র: রঘু রাই

’৮৪ আর ’৮৭ সালে আসমান-জমিন দূরত্ব। রাজীব গান্ধীর কানে আসছে নানা গুজব। বিশ্বনাথ প্রতাপ তখন বোফর্স ইস্যু তুলতে শুরু করছেন। ফেয়ার ফ্যাক্সকে দিয়ে বিশ্বনাথ প্রতাপ অর্থমন্ত্রী হিসেবে রিলায়েন্সের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন। তাতে তাঁর অর্থমন্ত্রিত্ব চলে যায়। বিশ্বনাথ প্রতাপ সাবমেরিন কেলেঙ্কারি নিয়েও তখন সোচ্চার। অবস্থা এমন হয় যে বিদ্যাচরণ শুক্ল জৈল সিং-কে বলেন, ‘অশোক সেনকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হল আইনমন্ত্রী পদ থেকে। কেন? পশ্চিমবঙ্গে ভোটে কংগ্রেস হেরেছে বলে। এমতাবস্থায় অশোক সেনকে প্রধানমন্ত্রী করে দিন।’

অতি উৎসাহী জৈল সিং– তিন সেনাবাহিনীর প্রধান তিনি। তাদের ডেকে ‘ক্যু’ করার পরিকল্পনা করেছেন। তখন বিরোধী নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আডবাণী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বলেন, এমন সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করবেন না। দোহাই। এতে আমাদের দেশের গণতন্ত্রের হত্যা হবে। বদনাম হবে। ভোট হোক। মানুষের সমর্থন পেলে আমরা ক্ষমতায় আসব। ভাবা যায় বলুন তো? বিরোধীদের এই চরিত্র– এ-ও তো আমাদের আটের দশক।

zoom
অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আডবাণী

১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ’৮৯ সাল পর্যন্ত রাজীব CJ-7 বা বাংলার জিপ ব্যবহার করতেন।‌ আমেরিকা থেকে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে সে জিপ এল। আসলে জিপের সঙ্গে রাজনেতার সম্পর্ক ’৮০ দশকে দারুণ জনপ্রিয় হয়। জিপগুলোর ডাকনাম ছিল নেতাজি-জিপ।

মোবাইল ফোন এল অনেক পরে, ১৯৯৫ সালে। কিন্তু এমটিএনএল-এর মোবাইল ফোন সার্ভিস চালু হল এই দিল্লিতেই! কার-ফোন এল শুধু তিন ডজন। ভিভিআইপি রাজনৈতিক নেতাদের জন্য। বলিউডের কিছু স্টারের জন্যও এই ফোনের ব্যবস্থা করা হয়।

রাজনৈতিক নেতারা আটের দশকে সব রাজনৈতিক দলে খ্যাপলা জাল ফেলে ভোট ধরছে। এক বিদেশি সাংবাদিক, বোধহয় ‘টাইম’ পত্রিকার। তিনি এসেছেন আমার কাছে!

আমেরিকান অ্যাকসেন্টে তিনি বললেন, ‘হোয়াট ইজ ইন্ডিয়াস ফিউচার?’

রাজনেতা বললেন, ‘আমরা ডেভেলপিং কান্ট্রি।’

’৮০-তেও ডেভেলপিং আর বিশ্বকর্মা-বিশ্বগুরু হয়েও তো ডেভেলপিং কান্ট্রি আজও! উত্থানও নেই, পতনও নেই।

zoom
আশির নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর জয়

তবে ’৮০-তে ইন্দিরা আবার ফিরে এলেন। শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন হচ্ছে। ইন্দিরা ফেজ-টু। ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া। ’৮৩-’৮৪ সালে খালিস্তান চাই। ’৮৪-র জুন মাসে স্বর্ণমন্দির সেনা অপারেশন ব্লু স্টার। ’৮৪ সালে ইন্দিরা হত্যা।

’৮৪ সালের ডিসেম্বরে ভোপাল গ্যাস লিক। প্রায় ৪০০০ লোকের মৃত্যু। কিন্তু ’৮৪ সালে ৪১৪ আসন নিয়ে রাজীব এলেন। শক্তিশালী সরকার। মিস্টার ক্লিন।

তারপর?

দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে রেগান আর থ্যাচারের দক্ষিণপন্থী ঝড়। ’৮৯ সালে বার্লিন দুর্গের পতন। আর আমাদের দেশে– ’৮৫ সালে শাহবানু মামলা। ’৮৬ সালে রামমন্দিরের তালা খোলা আর ’৮৭-তে ‘মিস্টার ক্লিন’ হয়ে গেলেন বোফর্স গান্ধী! প্রতিরক্ষা কেলেঙ্কারি। তারপর আডবাণীর রথযাত্রা। ’৮৯-তে এলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ।‌

zoom
আডবাণীর রথযাত্রা

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ৪০ বছর অন্তর পুরোনো ফ্যাশন ফিরে আসে। ২০২৬-এ তাই ফিরে এসেছে ১৯৮৬। টিকটক-এআই ’৮৬-কে ফেরত চাইছে। ’৮০-এর দশক রাজনীতিতে বাস্তবতা আনল। বলল, গ্রিড ইস গুড। পাওয়ার– পয়সা সব দিখানা হ্যায়। জো দিখতা হ্যায় ওহি বিকতা হ্যায়। ’৮০-র দশকের ওয়াল স্ট্রিট ব্যাংকার হয়ে বলল, চাই স্ট্রংম্যান, চাই বিগ পাওয়ার।

তবে সময় তো বদলাবেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা খবরের কাগজ, দূরদর্শনের খবর, রাত্তির ঠিক ন’টার সময়। একটা স্কুটারের ডেলিভারির জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছি। ফোন নম্বর ভুলতাম না। রাস্তা মনে থাকত, কারণ তখন গুগল ছিল না। মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, তখন ছিল ‘deep attention’, আর আজ হল ‘hyper attention’।

তবে একথা তো মানতেই হবে– রাজনীতিতে কংগ্রেস যুগের অবসানের পর বিজেপি গোষ্ঠীর দেশে উত্থানের সময়টিও কিন্তু আটের দশক।

’৮৪ সালে অমিতাভ বচ্চন হারিয়ে দিয়েছিলেন পোড়-খাওয়া রাজনৈতিক নেতা হেমবতীনন্দন বহুগুণাকে! লোকসভাতে অমিতাভ এলেন। রাজীবের ছোটবেলার বন্ধু। তারপর?

zoom
নির্বাচনের প্রচারে অমিতাভ বচ্চন

সেই আটের দশকেই ডন অমিত পার্লামেন্ট ছেড়ে নাকে খত দিলেন!

বললেন– ‘ঢের হোয়েছে! একেই বলে সিকান্দার কি মুকাদ্দার!’

এলাহাবাদ উপনির্বাচনে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর পুত্র, কংগ্রেস-প্রার্থী সুনীল শাস্ত্রীকে পরাস্ত করলেন মান্ডারাজা বিশ্বনাথ প্রতাপ। ’৮৯ সাল– শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি। সে-ও তো আটের দশকের শেষ এপিসোড।

সব মিলিয়ে এক লা জবাব সোপ অপেরা!

Amitabh Bacchan Atal Bihari Bajpayee Indian Politics Indira Gandhi Lalkrishna Advani Politics Rajib Gandhi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar V C Shukla

Share this article on