

আটের দশকেই দেশ থেকে অনেক দূরে বসে একজন প্রচলিত ধারার বাইরে দৈনন্দিন জীবন নিয়ে গান রচনা করছিলেন, তা পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন তাঁর গানবাজনার দল ‘নাগরিক’-এর বন্ধুদের। সেই বন্ধুরা ‘অন্য কথা অন্য গান’ নাম দিয়ে বিড়লা একাডেমি ও অন্যান্য জায়গায় অনুষ্ঠান করছিলেন। সেই রচয়িতা সুমন চট্টোপাধ্যায় (পরে কবীর সুমন) আটের দশকের শেষে দেশে ফিরে পুরোপুরি সংগীতচর্চায় নিবেদিত হলেন। ১৯৯২-তে যে সুমন চট্টোপাধ্যায় ‘তোমাকে চাই’ ক্যাসেটে ‘তোমাকে চাই’-সহ অন্যান্য গানে বাংলা গানের একটা দিকবদল ঘটাবেন– তার প্রস্তুতি চলছিল আটের দশকেই।
১৯৮৮ হবে, এক খ্যাতনামা সাপ্তাহিক পত্রিকা ঠিক করল যে এক সংখ্যার প্রচ্ছদকাহিনি হবে আধুনিক বাংলা গানের ক্রমশ আকর্ষণ হারানো নিয়ে। আধুনিক গানের স্মরণীয় কয়েকজন শিল্পী ও এক গীতিকার-সুরকার, যথা– জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন ও প্রবীর মজুমদারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল এ-বিষয়ে। প্রচ্ছদকাহিনির শীর্ষ-নাম দেওয়া হয়েছিল– ‘গানবাজনা থেকে বাজনাগান’। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য কথাপ্রসঙ্গে যথার্থই বলেছিলেন, ‘আগে ছিল গানবাজনা, এখন হয়েছে বাজনাগান।’ বস্তুত সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন যে, মোটামুটিভাবে সাতের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্তও আধুনিক গানের যে উজ্জ্বল চেহারা ছিল, ক্রমশ তা ফিকে হতে শুরু করে, আর আটের দশকে তার অবস্থা আরও সঙ্গীন।

একসময় প্রতি মাসে গানের রেকর্ড বেরত, সেই সঙ্গে রেকর্ড তালিকা। পাঁচের দশকের মধ্য পর্ব পর্যন্ত এরকম চলেছিল। তারপর তা কমে আসে। এবং যাবতীয় আকর্ষণ কেন্দ্রীভূত হয়েছিল শারদীয় পুজোর সময় প্রকাশিত আধুনিক গানের সম্ভার নিয়ে। পুজো ছাড়া বসন্তে ‘বসন্তবন্দনা’ হিসেবেও কিছু নতুন রেকর্ড প্রকাশ পেত। প্রধান রেকর্ড কোম্পানি– হিজ মাস্টার্স ভয়েস। পুজোয় নতুন গানের কথা, শিল্পীদের ছবি ও অন্যান্য তথ্যাদি নিয়ে রঙিন ‘শারদ অর্ঘ্য’ প্রকাশিত হত যার আকর্ষণ নতুন গানের থেকে কিছুমাত্র কম ছিল না। বহু সংগীতপ্রমী মানুষ নতুন গানের সঙ্গে ওই ‘শারদ অর্ঘ্য’-এর জন্য অপেক্ষা করতেন। কিন্তু এই অবস্থাটাই বদলে যেতে শুরু করল সাতের দশকের মাঝামাঝি থেকে। এবং আটের দশকে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে ‘শারদ-অর্ঘ্য’ প্রকাশ একসময় বন্ধ করে দিতে হল। ‘শারদ-অর্ঘ্য’ শেষ বেরয় ১৯৮৮-তে। আধুনিক গানের এই অবনমনের নানা কারণ। ছয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দু’টি গানের ৭৮-পাকের রেকর্ড হত, তারপর এল মাইক্রোগ্রুভ, ৪৫ আরপিএম স্ট্যান্ডার্ড, ই-পি, সুপার সেভেন। ছয়ের দশকে এসে গিয়েছিল লং-প্লে রেকর্ড। সাতের দশকে দু’টি গান থেকে হল চারটি বা ছ’টি গানের ই-পি বা সুপার সেভেন রেকর্ড, আটের দশকে লং-প্লে। সে-সময়েই রেকর্ড প্রকাশও স্তিমিত হয়ে আসে, শুরু হয় ক্যাসেট যুগ। দু’টি গানের জন্য যে অভিনিবেশ, শ্রম, মেধা দেওয়া হচ্ছিল, চারটি-ছ’টি-বারো-চোদ্দটি গানের জন্য ঠিক সেই পরিমাপে তা দেওয়া গেল কি? তা ছাড়া যে-সমস্ত শিল্পী, গীতিকার-সুরকারের সূত্রে পাঁচের দশকে আধুনিক গান উত্তুঙ্গ শিখরে পৌঁছেছিল, তাঁদের ক্ষমতা একটা স্যাচুরেশন পয়েন্টে পৌঁছে গিয়েছিল আটের দশকে। যে সলিল চৌধুরী পাঁচ-ছয়ের দশকে যখনই যে-গান তৈরি করেছেন– তার প্রায় সব জনাদর পেয়েছে; যে সলিল-হেমন্ত একটা অত্যন্ত সফল জুটি– কিন্তু আটের দশকে কী হল? ১৯৮১-’৮২তে সলিল চৌধুরীর কথায়-সুরে বেশ কিছু গান গাইলেন হেমন্ত। ১৯৮১-তে ছ’টি গানের লং-প্লে, ১৯৮২-তে চারটি গানের রেকর্ড। তার মধ্যে তিন-চারটি গান ভালো হলেও পাঁচের দশকের ‘পথ হারাবো বলেই এবার’, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম’ বা ছয়ের দশকের ‘শোনো কোনো একদিন’, ‘আমায় প্রশ্ন করে’-র মতো চিত্তাকর্ষক কি? হেমন্তর কণ্ঠ আটের দশকে একটু ক্লান্ত, তারপর তো ১৯৮৯-তে চলেই গেলেন। লতা মঙ্গেশকর গাইলেন সলিল চৌধুরীর কথায়-সুরে ১৯৮৮-তে। আটটি গানের মধ্যে তিনটি আগে অন্য শিল্পীর গাওয়া– হেমন্তর ‘রানার’ আর পিন্টু ভট্টাচার্যের ‘আমি চলতে চলতে থেমে গেছি’, সুবীর সেনের ‘ধরণীর পথে পথে ধূলি হয়ে রয়ে যাব’। শোনালেন বটে, একেবারেই নিছক সংযোজন হয়ে রইল, অন্তত ‘রানার’। অন্যান্য গানের মধ্যে ‘সবার আড়ালে’ গানটির সুরে আগেই আমরা পেয়েছি বেতারের রম্যগীতি-তে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গুরু গুরু গুরু’ এবং সবিতা চৌধুরীর আধুনিক ‘তুমি কি কখনও’। আরেকটি গান ‘ভুলো না প্রথম সে দিন’, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ১৯৭৩-এ গাওয়া ‘কিছু আর কহিব না’-র সুরের অনুরূপ। ১৯৭০-এ মানস মুখোপাধ্যায় গেয়েছিলেন ‘ও আমার প্রাণ সজনী চম্পাবতী কন্যা’, কথা কিছুটা বদলে লতাকে দিয়ে এখানে গাওয়ালেন সলিল। কেবল ‘সাত সকালে মনের দোরে’ আর ‘এই জীবন কখনো দহন’ নতুন গান। সলিল চৌধুরীর পাশে আমাদের মনে পড়ে নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্তের কথা। কিন্তু আটের দশক পায়নি এই দিক-ফেরানো সুরকারদের। নচিকেতা ১৯৭৬-এ, সুধীন দাশগুপ্ত ১৯৮২-তে প্রয়াত হন।

নতুন গান সেভাবে দাগ কাটতে পারছে না দেখে পুরনো সুখ্যাত গান ফিরিয়ে আনা হতে লাগল। যেমন ১৯৮৩-র পুজোর একটি দীর্ঘ বাদন রেকর্ডে অনুপ ঘোষালকে দিয়ে গাওয়ানো হল একদা গৌরীকেদার ভট্টাচার্যের ‘এনেছি আমার শতজনমের প্রেম’, তালাত মাহমুদের ‘দুটি পাখি দুটি তীরে’, ‘আধোরাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়’ এবং হৈমন্তী শুক্লাকে দিয়ে উৎপলা সেনের ‘রাতের কবিতা শেষ করে দাও’, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘যদি ভুলে যাও মোরে’। ১৯৮৫-র পুজোর রেকর্ডেও অনুপ ঘোষালকে ‘হারানো দিনের নব গীতিকা’ শীর্ষক লং-প্লে রেকর্ডে গাইতে হল অতীতের বিখ্যাত শিল্পীদের বিখ্যাত গান: সুধীরলাল চক্রবর্তীর ‘মধুর তোমার মায়ের হাসি’, ‘ও তোর জীবন-বীণা আপনি বাজে’, কুন্দনলাল সায়গলের ‘এখনি উঠিবে চাঁদ’, ‘নাই বা ঘুমালে প্রিয়’, কৃষ্ণচন্দ্র দে-র ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’, ‘শুনছ সখি, শুনছ সখি’, সন্তোষ সেনগুপ্তের ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা’, সত্য চৌধুরীর ‘পৃথিবী আমারে চায়’ ইত্যাদি। পুরনো দিনের গানের মার নেই। ১৯৮৩-তে কমল দাশগুপ্ত সুরারোপিত সত্য চৌধুরী, তালাত মাহমুদ প্রমুখের জনপ্রিয় গানগুলি ফিরোজা বেগম শোনালেন। পুরনো বিখ্যাত গানের মার নেই, অতএব… কোনও কোনও রেকর্ডে এমন হল যে, নতুন গানের সঙ্গে পূর্ব প্রকাশিত গান ঢুকিয়ে দিতে হল। যেমন ১৯৮৫-তে অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর ‘কত সংলাপ, কত আলাপ’ লং-প্লে রেকর্ডে নতুন গান– অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে ‘চন্দ্রদ্যুতি রাত্রি এসে বলে’, ‘যা ছিলাম তাই আছি’, ‘কত সংলাপ, কত আলাপ’-এর পাশে শিল্পীরই আগে গাওয়া সলিল চৌধুরীর ‘চঞ্চল সোনালী পাখনায়’, ‘ফাগুনকে ডাকলাম’, ‘কে যাবি আয়’ (এই গানটি প্রথমে ‘ভোর হয়ে এল’ ছবিতে প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায় গেয়েছিলেন, পরে লতা মঙ্গেশকর), সুধীন দাশগুপ্তের সুরে ‘এত বড়ো আকাশটাকে ভরলে জোছনায়’ রাখা হল। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্রের গান বেসিক আধুনিক গানের এই রেকর্ডেও স্থান দেওয়া হল– ‘স্বাতী’ (১৯৭৭) ছবির হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুরারোপিত ‘যেতে যেতে কিছু কথা’ ( ছবিতে গেয়েছিলেন মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অরুন্ধতী)। অতীতের গানের ওপর অনেক শিল্পীকেই, বলা ভালো রেকর্ড-কোম্পানিকে, ভরসা করতে হল বাণিজ্যিক কারণেই। ১৯৮৩-তেই পুজোর গানের চারটি গানের ই-পি রেকর্ডে বনশ্রী সেনগুপ্ত, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, অশোক রায়ের গানের সঙ্গে শোনান কমল ঘোষের লেখা রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে একদা-বিখ্যাত গান, তালাত মাহমুদের ‘চাঁদের এত আলো’। ১৯৮০-তে পুজোর গানে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের চারটি গানের ই-পি রেকর্ডে দু’টি নতুন, দু’টি আগের। ‘শ্যামলবরণী ওগো কন্যা’, ‘ক্লান্তি নামে গো’-র পাশে নতুন গান– ‘সজল সজল মেঘ করেছে’ ও ‘মেঘবরণ কালো চুলে ঢেকে’। এমন উদাহরণ আরও আছে। এসব প্রমাণ করে যে, নতুন ভালো গান-সৃষ্টি সীমিত হয়ে পড়েছিল আটের দশকে। আগের উল্লেখযোগ্য শিল্পীরাও– ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন প্রমুখ তখন আর সেভাবে সক্রিয় নন। তবে সবটাই অন্ধকার নয়। পাশাপাশি আটের দশকেই আমরা উপহার পেয়েছি মান্না দে-র কণ্ঠে সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’ (কথা: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার), ‘সে আমার ছোট বোন’ (কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়), প্রভাস দে-র সুরে ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’ (কথা: জহর মজুমদার), ‘দীপ ছিল শিখা ছিল’ (কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়), লতা মঙ্গেশকরের ‘ভালো করে তুমি চেয়ে দেখো’ (কথা: শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর: ভূপেন হাজারিকা), ‘তুমি তো শীতল চন্দন-বৃক্ষ’ (কথা: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর: হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর)। সাতের দশকের শেষদিকে ভূপেন হাজারিকা ‘আমি এক যাযাবর’, ‘বিস্তীর্ণ নদীপারে’ প্রভৃতি গেয়ে সাড়া জাগিয়েছিলেন। আটের দশকে তাঁর ‘একটু গেলেই অথৈ সাগর’ (কথা: শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর: ভূপেন হাজারিকা), ‘আমায় একজন সাদা মানুষ দাও’ (কথা ও সুর: ওসমান ফকির) উল্লেখযোগ্য।

এই সময়ে কয়েকজন নবীন শিল্পী সংগীত-জগতে প্রবেশ করেন– শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, মুনমুন ঘোষ, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈকত মিত্র, ইন্দ্রনীল সেন প্রমুখ। এঁদের মধ্যে মুনমুন ঘোষ ছাড়া সকলেই এগিয়ে গিয়েছেন।
সাতের দশকের মাঝামাঝি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে স্থাপিত হয় বাংলা রক ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। সঙ্গে ছিলেন আব্রাহাম মজুমদার, রঞ্জন ঘোষাল, তাপস দাস, প্রদীপ চ্যাটার্জি প্রমুখ। তাঁদের গান মূলধারার আধুনিক গান থেকে আলাদা। সমকালীন নানা বিষয়ে তাঁরা গান বাঁধলেন জ্যাজ, ফোক, বাউল ও অন্যান্য ধারার সংগীত মিশিয়ে। পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব তাঁদের গানে খুবই প্রত্যক্ষ। গতানুগতিক গড্ডালিকা প্রবাহের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ যেন তাঁদের গান। কিন্তু ১৯৮১-তে তাঁরা থেমে গেলেন। কেননা তাঁরা দেখলেন– যাঁদের কাছে পৌঁছতে চাইছেন, তাঁরা এগুলো সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না। তবে ১৯৯৫-তে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ আবার ফিরে এসেছিল, সম্ভবত সুমন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতার উত্থানে। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব তখন লক্ষ করা গেল রঞ্জনপ্রসাদের গানে। ‘জ্যামাইকা ফেয়ারওয়েল’ অবলম্বনে রঞ্জনপ্রসাদের ‘পথের প্রান্তে কোন সুদূর গাঁয়ে’ সমাদর পেয়েছিল। প্রতুল মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন কবির কবিতায় সুর দিয়ে গাইতে শুরু করলেন। নিজেও রচনা করলেন গান। লোকের মুখে মুখে ফিরেছিল বাংলা ভাষার স্বপক্ষে লেখা ‘আমি বাংলায় গান গাই’।

১৯৮১-তে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওই একই পথে হাঁটতে চাইল কয়েকজন তরুণ-তরুণী। তাঁরা ১৯৮২-তে তৈরি করলেন ‘নগর ফিলোমেল’। দু’-এক বছর বাদে জ্ঞানমঞ্চে, কলামন্দির প্রেক্ষাগৃহে বড় অনুষ্ঠান করলেন তাঁদের গান নিয়ে। ১৯৮৬-তে এইচএমভি থেকে প্রকাশ পেল তাঁদের গানের লং-প্লে– ‘সহর সংগীত আমরা গান গাই যে সুরে’। গানগুলি সমসময়ের মহানগরের রোজনামচা– লিখেছিলেন মূলত গৌতম নাগ, তা ছাড়া হর্ষ দাশগুপ্ত। অধিকাংশ সুর করেছিলেন ইন্দ্রজিৎ সেন, গেয়েওছিলেন। হর্ষ দাশগুপ্তও সুর করেছিলেন। কিন্তু একইভাবে তাঁদের গান বিদেশি গানের আঙ্গিকেই। তবে তার মধ্যেই কিছু কিছু গানের আলাদা প্রসাদগুণ ছিল। যেমন ইন্দ্রজিৎ সেন ও রিমলি সেনগুপ্তের গাওয়া ‘বিজনের চায়ের কেবিন’ (কথা: গৌতম নাগ, সুর: ইন্দ্রজিৎ সেন)। এই রেকর্ডে তাঁরা অন্যান্য গানের সঙ্গে আরও গেয়েছিলেন ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-র ‘অজানা উড়ন্ত বস্তু’ ও রঞ্জনপ্রসাদের ‘বিমগ্ন উদাসীন’। এই রেকর্ডে আর কণ্ঠ দিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন ও ইন্দ্রানী সেন। কিন্তু ‘নগর ফিলোমেল’ও টিকল না। এই সংগঠনও তার পর কোথায় হারিয়ে গেল। আসলে এঁদের এই ধরনের গান গ্রহণের মানসিকতাই বোধহয় তখনও তৈরি হয়নি।

আটের দশকেই দেশ থেকে অনেক দূরে বসে একজন প্রচলিত ধারার বাইরে দৈনন্দিন জীবন নিয়ে গান রচনা করছিলেন, তা পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন তাঁর গানবাজনার দল ‘নাগরিক’-এর বন্ধুদের। সেই বন্ধুরা ‘অন্য কথা অন্য গান’ নাম দিয়ে বিড়লা একাডেমি ও অন্যান্য জায়গায় অনুষ্ঠান করছিলেন। সেই রচয়িতা সুমন চট্টোপাধ্যায় (পরে কবীর সুমন) আটের দশকের শেষে দেশে ফিরে পুরোপুরি সংগীতচর্চায় নিবেদিত হলেন। ১৯৯২-তে যে সুমন চট্টোপাধ্যায় ‘তোমাকে চাই’ ক্যাসেটে ‘তোমাকে চাই’-সহ অন্যান্য গানে বাংলা গানের একটা দিকবদল ঘটাবেন– তার প্রস্তুতি চলছিল আটের দশকেই।

বেসিক আধুনিক গানের মতোই পাঁচ-ছয়-সাতের দশকে যত সংখ্যায় মনে রাখার মতো বাংলা ছায়াছবির গান পাওয়া গেছে, আটের দশকে তার চেয়ে কম। আগে নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত আকর্ষণীয় কত গান তৈরি করেছেন, তাঁরা আর নেই তখন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সর্বাধিক বাংলা ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৮৯-তে মৃত্যুর আগে আটের দশকে ‘দাদার কীর্তি’ (১৯৮০), ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ (১৯৮৫) ছবিতে চমৎকার কাজ করলেন। বিশেষত ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’-য়। তরুণ শিবাজী চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে হেমন্ত গাওয়ালেন ‘খোঁপার ওই গোলাপ দিয়ে’, ‘এই ছন্দ এ আনন্দ’ এবং অরুন্ধতী হোম চৌধুরীকে দিয়ে ‘যত ভাবনা ছিল’। আজও শিবাজী-অরুন্ধতীকে যে-কোনও অনুষ্ঠানে এই গান গাইতেই হয়। সময় পেরিয়েই বেঁচে আছে এসব গান। ১৯৬৯-এ ‘পান্না হীরে চুনী’-তে সংগীত পরিচালনা করে প্রথম সকলের নজর কেড়েছিলেন, আটের দশকে তিনি একজন অন্যতম সফল ও যোগ্য সংগীত পরিচালক। তাঁর রকমারি সুরে জনপ্রিয়তা পায় কিশোরকুমারের কণ্ঠে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘হয়তো আমাকে কারো মনে নেই’ (প্রতিশোধ, ১৯৮১), ‘ওপারে থাকব আমি’, ‘কি উপহার সাজিয়ে দেব’ (জীবন মরণ, ১৯৮৩), ‘অনেক জমানো ব্যথা’ (পারাবত প্রিয়া, ১৯৮৪), ‘এই তো জীবন’ (অমরকণ্টক, ১৯৮৬), আশা ভোঁসলের ‘বৃষ্টি থামার শেষে’ (পারাবত প্রিয়া), ‘এ মন আমার’ (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬), লতা মঙ্গেশকরের ‘আমি যে কে তোমার’ (অনুরাগের ছোঁয়া)। রাহুল দেববর্মন ছয়ের দশক থেকে বাংলা আধুনিক গানে সুর দিতে শুরু করলেও বাংলা ছবিতে তাঁর অধিকাংশ কাজ আটের দশকে। তাঁর সুর, ছন্দবিন্যাস, যন্ত্রায়োজন সবই অন্যরকম, স্বকীয়তায় পূর্ণ। তাঁর মন-মাতানো সুরে প্রাণবন্ত হয় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা লতা মঙ্গেশকরের ‘আমার স্বপ্ন যে’, ‘ওঠো ওঠো সুরযাই রে’ (অনুসন্ধান, ১৯৮১), কিশোরকুমারের ‘ছেড়ো না ছেড়ো না’ (অন্যায় অবিচার, ১৯৮৫), স্বপন চক্রবর্তীর লেখা আশা ভোঁসলের ‘তোলো ছিন্নবীণা’ (একান্ত আপন, ১৯৮৭)। বাপী লাহিড়ী প্রধানত সুরকার, আবার গানও গেয়েছেন। তাঁর সুরে জনাদর পেয়েছিল কিশোরকুমারের ‘এই তো জীবন’, ‘শুধু তুমি নও অবলাকান্ত’ (ওগো বধূ সুন্দরী, ১৯৮১), লতা মঙ্গেশকরের ‘মঙ্গলদীপ জ্বেলে’ (প্রতিদান, ১৯৮৩, বাপী নিজেও গেয়েছিলেন), আশা ভোঁসলে-কিশোরকুমারের ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, আশা ভোঁসলের ‘মনটা আমার হারিয়ে গেছে’ (অমরসঙ্গী, ১৯৮৭), কিশোরকুমারের ‘এ আমার গুরুদক্ষিণা’ (গুরুদক্ষিণা, ১৯৮৭)। শ্যামল মিত্রের সুরে কিশোরকুমার চমৎকার গেয়েছিলেন ‘কলঙ্কিনী’ (১৯৮১) ছবিতে ‘কিছু কথা ছিল চোখে’। উল্লেখ্য, কিশোরকুমার ও শ্যামল মিত্র দু’জনেই প্রয়াত হন ১৯৮৭-তে। আর লক্ষণীয় ছয়ের দশকের শেষে, সাতের দশকে কিশোরকুমার যেভাবে সক্রিয় ছিলেন আধুনিক গানে, আটের দশকে ততটা নয়, অথচ আটের দশকে সিনেমার গানে পুরুষ কণ্ঠে কিশোরকুমারেরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য।

রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চা বেড়েছিল রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের সময় থেকেই। নিয়মিত রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে। আটের দশকেও তা অক্ষুণ্ন ছিল। আটের দশকে রেকর্ড গিয়ে ক্যাসেট যুগ শুরু হয়। নানা নতুন রেকর্ড কোম্পানি গজিয়ে ওঠে এবং রবীন্দ্রসংগীতের নানা ক্যাসেট বার করতে থাকে। অনেক নতুন মুখও উঠে আসে তখন। সেসময় নজরুলের গানও প্রকাশিত হয়েছে, তবে রবীন্দ্রসংগীতের তুলনায় কম। আর রজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলাল-অতুলপ্রসাদের গানের চর্চা তো একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছিল। এই নিয়েই আটের দশকের বাংলা গান। পুরনো স্রোতের অবরোধ, নতুন স্রোতের প্রাণসন্ধান।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved