Bengali Demographic Thought Through Bibhutibhushan। Robbar
Robbar
  • ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাঙালির স্বর্গ-মর্ত্যের ডেমোগ্রাফি

ডেমোগ্রাফি হল, মানুষের জন্ম, মৃত্যু, অভিবাসন ইত্যাদি তথ্যের ওপর নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট স্থানের জনসংখ্যার আকার, গঠন, বণ্টন ও পরিবর্তন বিষয়ে অধ্যয়ন এবং বিশ্লেষণ করা। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) বাংলায় যে ম্যানমেড দুর্ভিক্ষ হয়, তাতে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসটি এর আশপাশে সময়ে ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। অন্যদিকে, তাঁর ‘দেবযান’ উপন্যাসে ‘স্বর্গ’লোকের যে ডেমোগ্রাফি পাওয়া যায়, তার মূল ভিত্তি হল প্রেম, করুণা আর ভক্তি। এই দুই উপন্যাস মিলে, বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক যেভাবে বাঙালির স্বর্গ, মর্ত্য ও নরকের ছবি এঁকেছিলেন, বর্তমানের বাঙালি সেই ডেমোগ্রাফিক থেকে কতটা স্থানচ্যুত হয়েছে, তা পাঠকরাই নিজের আশপাশ দিয়ে বিচার করবে।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১৮:৩৬   
Facebook WhatsApp Messenger

সরকার আবার জনগণনা শুরু করেছে। কলকাতার ভাড়াবাড়িতে এক শীর্ণকায় মহিলা দুপুরবেলা দরজায় বেল বাজিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করলে, আমার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, জাত আর ঘরে কোনও কালার টিভি আছে কি না? এই সব তথ্য জমা পড়বে রাজদরবারে। সেসব বিশ্লেষণ করে পণ্ডিতরা বাংলা তথা দেশের ডেমোগ্রাফিক খসড়া তৈরি করবেন, তা দিয়ে বণিকরা তাঁদের বেসাতি সাজাবেন আর এক ছাদহীন বাংলার মা পথের ধারে সন্তানের দুধ গরম করতে করতে খালি ভয় পাবেন, এই বুঝি মন্ত্রীমশাই তার সিপাই সান্ত্রী নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলে, ‘ফুটপাথটা কি দুধ গরম করার জায়গা?’

zoom
মন্বন্তর। শিল্পী: চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য

এই ঘটনার প্রায় আড়াইশো থেকে পৌনে তিনশো বছর আগে একজন কবি তাই হয়তো সমগ্র বাঙালি জাতির হয়ে লিখে রেখে গিয়েছিলেন সেই অমোঘ লাইনটি, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ মাছে-ভাতে বাঙালির সে সকল সুখের দিন গিয়াছে। এরপর এই জাত দু’-দুটো মন্বন্তর দেখেছে। দেখেছে স্বাধীনতা, দাঙ্গা আর দেশভাগ। দেখেছে খাদ্য আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নয়ের দশকের মুক্ত অর্থনীতি, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম, ইন্টারনেট, করোনা, অভয়া, আরও কত কী! মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের বিপক্ষে গিয়ে কৌরবদের পক্ষ নেওয়া বঙ্গ, মোঘল যুগের সোনার বাংলা আর আজকে স্মৃতির পচা ঢেকুর তোলা বাঙালির ডেমোগ্রাফি পাল্টাতে পাল্টাতে বর্তমানে এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে বাঙালি বলতে এদেশের লোকেরা বোঝে তাদের, যারা কেবল কলকাত্তাইয়া উচ্চারণে কথা বলবে, যাদের সন্তানদের স্কুলে ফার্স্ট ল্যাঙ্গোয়েজ ‘ইংলিস’ আর সবশেষে অতি অবশ্যই যাহাদিগের ধর্ম হিন্দু। একটা মানুষের মাতৃভাষা (ভিন্ন ভিন্ন ডায়লেক্ট নির্বিশেষে) কী, তা দিয়ে আর এই জাতিটিকে শনাক্তকরণ করা হচ্ছে না। অথচ এই বাংলা ভাষার জন্য দেশে নোবেল এসেছে, কত যৌবন রক্ত দিয়ে একটা দেশ তৈরি করছে, একজন ফিল্মমেকার আমাদের দেখিয়েছেন করুণ অথচ করুণাময়ী বাংলা মায়ের ‘চেয়ে থাকা’ কেমন হয়। ‘কেন চেয়ে আছো গো মা’– তাই প্রতিটি কালে সত্যি হয়ে উঠেছে। আমার ভাড়াবাড়ির দরজায় বেল বাজানো সেই শীর্ণকায় মহিলা, ফুটপাতের দুধ গরম করা মা, হাজার বছর আগে শঙ্করাচার্যকে তর্কে হারিয়ে দেওয়া এক বাঙালি ঘরের বউ– এঁরা প্রত্যেকে আমাদের বাংলার ডেমোগ্রাফিকে যুগে যুগে সমৃদ্ধ করছে, এই বাংলাকে করে তুলেছে স্বর্গ। কিন্তু এসব আলোচনা বুদ্ধিজীবীরা করবেন তাঁদের দিস্তে দিস্তে থিসিস পেপারের জন্য।

zoom
‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র দৃশ্যে ঋত্বিক ঘটক ও শাঁওলি মিত্র

আমি এখানে এসেছি বাঙালির স্বর্গ-মর্ত্যের ডেমোগ্রাফিক তফাতটুকুর একটা সুতো পাঠকদের সামনে খালি রাখতে। এর জন্য আমি বেছে নিয়েছি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের দু’টি উপন্যাস: এক ‘অশনি সংকেত’ এবং দুই ‘দেবযান’।

zoom

বিভূতিভূষণের লেখায় যেভাবে বারেবারে বাংলার গ্রাম, শহর, নদী, পাহাড় আর জঙ্গল ফিরে ফিরে এসেছে, লাইন বাই লাইন বারবার সেসব পড়ে, সমস্ত তথ্য কুড়িয়ে, ওই সকল জায়গার চরিত্রদের বিশ্লেষণ করে, তারপর তা নিয়ে লিখতে শুরু করলে, সেটি শেষ হতে হতে একটা গোটা দশক লেগে যাওয়া আশ্চর্যের কিছুই নয়। তাই পরিসরটাকে একটু ছোট করে নেওয়া। ‘পথের পাঁচালী’, ‘দৃষ্টি প্রদীপ’, ‘আরণ্যক’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘সুন্দরবনে সাত বছর’– এই প্রতিটা উপন্যাসের প্রধান চরিত্ররা বেশ একটা লম্বা সময় ধরে হয় ভিটেছাড়া হয়ে থাকে, নয়তো সম্পূর্ণরূপে নিজেদের ঘর ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। এই সকল বহুল পঠিত উপন্যাস থেকে আমাদের দেশের তখনকার গ্রাম, পাহাড়, জঙ্গল, শহর আর নদী সম্পর্কে যেমন একটা ধারণা উঠে আসে, তেমনই উঠে আসে মানুষজনের অভিবাসন, মৃত্যু এবং জন্ম-সংক্রান্ত নানা ঘটনা, যা সেই সময়ের ডেমোগ্রাফিক স্টাডিসের ক্ষেত্রে জরুরি হয়ে ওঠে। কিন্তু বিভূতির বর্ণনায় থাকা বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে চোখ ফিরিয়ে এইসব তথ্যের কচকচানি নিয়ে নাড়াচাড়া করা বিষম দায় হয়ে দাঁড়ায়। ‘অশনি সংকেত’ বা ‘দেবযান’-এর ক্ষেত্রেও তা বহুল অংশে সত্যি। সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত এই প্রথম উপন্যাসটিতে বর্ণিত বাংলার সুন্দর প্রকৃতিকে কেবল নিষ্ঠুর দর্শক করে রাখার জন্য কালার ব্যবহার করেছিলেন, আর আমি তো কোন ছাড়! তবু এই দুটো উপন্যাসের রচনাকাল কাছাকাছি এবং প্রথমটির মূল উপজীব্য পঞ্চাশের মন্বন্তর, তাই এই নির্বাচন।

zoom
‘অশনি সংকেত’-এর দৃশ্য

খুব সহজ কথায় ডেমোগ্রাফি হল, মানুষের জন্ম, মৃত্যু, অভিবাসন ইত্যাদি তথ্যের ওপর নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট স্থানের জনসংখ্যার আকার, গঠন, বণ্টন ও পরিবর্তন বিষয়ে অধ্যয়ন এবং বিশ্লেষণ করা। এর মাধ্যমে কোনও এলাকা বা গোষ্ঠীর মানুষের পরিসংখ্যানভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য– যেমন বয়স, লিঙ্গ, আয়, শিক্ষা, পেশা, জাতি, ধর্ম, ভৌগোলিক অবস্থান, বৈবাহিক অবস্থা, ভাষা ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ডেমোগ্রাফিক তথ্য দিয়ে বুঝতে পারা যায় যে, কোন বয়সের ও আয়ের গ্রাহকেরা কোন কোন জিনিস বেশি কিনছে, কোন এলাকায় কী সরকারি পরিষেবা দরকার, জনসংখ্যা বাড়ছে না কি কমছে এবং তা কেন ইত্যাদি। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) বাংলায় যে ম্যানমেড দুর্ভিক্ষ হয়, তাতে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসটি এর আশপাশে সময়ে ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটির লেখাও অসমাপ্ত রয়ে যায়।

অন্যদিকে, ‘দেবযান’ উপন্যাসটি ১৯৪৪ সালে বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটি মৃত্যু ও জীবন বিষয়ক উপলব্ধি নিয়ে রচিত। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’-র মতো এখানেও সারা উপন্যাসের বিভিন্ন অংশজুড়ে আমরা দেখি, হিন্দু বাঙালির স্বর্গ, মর্ত্য ও নরকের এক বিস্তৃত বর্ণনা। এই দুই উপন্যাস মিলে, বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক যেভাবে বাঙালির স্বর্গ, মর্ত্য ও নরকের ছবি এঁকেছিলেন, বর্তমানের বাঙালি সেই ডেমোগ্রাফিক থেকে কতটা স্থানচ্যুত হয়েছে, তা পাঠকরাই নিজের আশপাশ দিয়ে বিচার করবে।

অশনি সংকেতের গল্প যে গ্রামখানি ঘিরে গড়ে ওঠে, গল্পের শুরুতেই তার বর্ণনা মেলে, ‘গ্রামখানিতে এরাই একমাত্র ব্রাহ্মণ পরিবার, আর সবাই কাপালী ও গোয়ালা। নদীর ধারে এ গ্রাম বেশি দিনের নয়। বসিরহাট অঞ্চলের চাষী, জমি নোনা লেগে নস্ট হওয়াতে সেখান থেকে আজ বারো তেরো বছর আগে কাপালীরা উঠে এসে নদীতীরের এই অনাবাদী পতিত জমি সস্তায় বন্দোবস্ত করে নিয়ে গ্রামখানা বসিয়েছিল। তাই এখনও এর নাম নতুন গাঁ।’

zoom
‘অশনি সংকেত’-এর শুটিং-এ সত্যজিৎ রায়-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

মাকোন্দো গ্রামের মতো, বাইরে থেকে একদল প্রান্তিক মানুষ এসে একটা গ্রাম তৈরি করে। তারপর সেখানে তারা একঘর ব্রাহ্মণ বসায়। সেই পরিবারের মাথা গঙ্গাচরণ বেঁচে থাকার তাগিদে কখনও পাঠশালা চালায়, কারওর বাড়ি পুরোহিতগিরি করে আবার কখনও কবিরাজি। তার বউ অনঙ্গের যাত্রাপথ দেখলে বোঝা যায়, তারা কতটা ছিন্নমূল। অনঙ্গ বউয়ের বাপের বাড়ি ছিল হরিহরপুরে, সেখান থেকে বিয়ে হয়ে আসে ভাতছালা, তারপর সেখান থেকে স্বামীর সঙ্গে ভাগ্যান্বেষণে এসে পৌঁছয় বাসুদেবপুর, সেখানে তার স্বামী পসার জমাতে না পারলে তারা চলে আসে এই নতুনগাঁয়ে। উপন্যাসের মাঝে একবার একটা খাওয়ার পদের সূত্রে অনঙ্গকে তার স্বামীর থেকে ইয়ার্কির ছলে ‘বাঙাল’ বলে খোঁটাও শুনতে হয়, ফলে অনঙ্গ বউয়ের পিতৃপুরুষের ছিন্নমূল হওয়ার ইতিহাস হয়তো আরও পুরনো। এসব টালমাটাল কিন্তু সব দুর্ভিক্ষ শুরুর আগেই হয়ে চলেছে। এই গ্রামে ও আশপাশের গ্রামে বাস করা কাপালী, গোয়ালা, বাউরি, জেলে, মুচি, বাগদি, মালো, কামার, ময়রা, সমাজের তথাকথিত উচ্চ জাত বাঁওন– প্রত্যেকেরই অবস্থা কিন্তু হরে দরে ওই একই, জলে ভাসমান কচুরিপানার মতো। এছাড়া জাতিভিত্তিক পাড়া বা বসতি বিন্যাস এখানে দেখা যায়। গ্রামগুলিতে বিভিন্ন জাতের মানুষের বসবাসের জন্য আলাদা আলাদা পাড়া ছিল। উপন্যাসে গোয়ালপাড়া, বাউড়িপাড়া, মুচিপাড়া, জেলেপাড়ার মতো আলাদা বসতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর দুর্ভিক্ষ শুরু হলে পরিবেশ আরও নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতম হয়ে ওঠে। ত্রিপুরা-সহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে পরিবার শুদ্ধ মানুষরা এসে যখন দোরের কাছে বলে, ‘ফ্যান খাইতাম, ফ্যান খাইতাম’ তখন অনঙ্গ বউয়ের কাছে তাদের সে বাংলা ভাষা, বিদেশি ভাষার মতো শুনতে লাগে। চালের দাম বাড়তে থাকে হু হু করে, এক মণ চালের দাম ৪ টাকা থেকে নিমেষে ৬ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৪০ টাকা, ৬০ টাকা, এমন করে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। একটা বিরাট মেটে আলু তুলতে গিয়ে তিনটি মেয়ে কীভাবে নিজেদের ইজ্জত বাজি রাখে, সে গল্প কখনওই সরকারি ডেমোগ্রাফির হিসেবে পড়বে না।

zoom
‘অশনি সংকেত’-এর দৃশ্য

তারপর সেই আলু খাওয়ার দৃশ্যখানা মনে করিয়ে দেয়, ভ্যান গগের সেই বিখ্যাত ছবি আর বেলা তারের ‘তুরিন হর্স’-এর কথা। আমরা দেখি, সমাজে ক্ষমতার বিন্যাসে পরিবর্তন। কামদেবপুর পাঠশালার সেকেন্ড পণ্ডিতের চাকরি যায় এক গোয়ালা ছেলের জন্য। গ্রামের সম্মানিত বাঁওন গঙ্গাচরণ শহরের রেশন অফিসে গিয়ে মুখ ঝামটা শোনে। টাকা তার মূল্য হারায়। লোকে জিনিসের বদলে কলাইয়ের ডাল নিয়ে যায়। পেটের জ্বালা মেটাতে, একটু চালের আশায় হরি কাপালীর ছোট বউয়ের মতো অনেককে অন্ধকার রাতে ইটখোলার ঠিকাদারের কাছে গিয়ে নিজের সম্মান বিকিয়ে আসতে বাধ্য হতে হয়। মতি মুচিনীর মৃত্যু মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, দুর্ভিক্ষ এবার একে একে সবাইকে খাবে। উঁচু-নিচু কেউ পাড় পাবে না।

zoom
‘অশনি সংকেত’-এর দৃশ্য

লেখক যখন এই মর্ত্যভূমিতে একটু একটু করে নরকের ছবি আঁকছেন, তখনই গল্পের নানা ফাঁকফোঁকর দিয়ে টুকরোটাকরা স্বর্গ বেরিয়ে পড়তে থাকে। এত অনাহারের মধ্যেও বিভিন্ন নারী চরিত্ররা মা অন্নপূর্ণার মতো সময় সময়ে, নিজেদের মুখের গ্রাস অন্যদের পাতে তুলে দেয়। অনঙ্গ বউ দুর্গা ভট্টাচার্যের পরিবারকে যেমন ফেরায় না, আবার তার শূন্য ভাড়ার ভারতে কোনও না কোনও প্রতিবেশি মহিলা লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে চাল দিয়ে যায়। কিংবা গঙ্গাচরণের হাতে এক ভিনগাঁয়ের বিধবা মেয়ে যখন চুরি করে চাল তুলে দেয়, সম্পূর্ণ বাঙালি জাতকে লেখক যেন বাঁচিয়ে তোলেন। শেষে দুই ব্রাহ্মণ সন্তান যখন মৃত মতি মুচিনীর সৎকারের জন্য হাত লাগায়, তখন মনে একটু শান্তি হয় এই ভেবে যে, একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ লেখকও চান, এসব ঠুনকো জাতপাতের ওপরে উঠে বাঙালি বাঁচুক। যেমন কামদেবপুরের ধর্মীয় সহাবস্থান আরেকটি বেহেস্তের দরজা আমাদের জন্য খুলে দেয়। সেখানে মহামারী থেকে গ্রামকে বাঁচাতে হিন্দু-মুসলমান– উভয়ে মিলে চাঁদা তুলে কাজ করার উল্লেখ রয়েছে।

zoom
‘অশনি সংকেত’-এর শুটিংয়ে পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ছবিঋণ: নিমাই ঘোষ

এখান থেকেই ‘দেবযান’-এর দিকে ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেবযান’ উপন্যাসে ‘স্বর্গ’লোকের যে ডেমোগ্রাফি পাওয়া যায়, তার মূল ভিত্তি হল প্রেম, করুণা আর ভক্তি। স্বর্গ এখানে বহুস্তরবিশিষ্ট এক জগৎ। বিভিন্ন স্তরে উন্নত চেতনার জীবরা সব থাকে। যার চেতনা ও উপলব্ধি যত বেশি সে তত উন্নত স্তরে থাকেন। সেখান থেকে পৃথিবীর মতো মোহ-মায়ার স্তরে নামতে গেলে তাদের কষ্ট হয়। আবার লেখক এখানে পৃথিবীও তৈরি করেছেন অনেকগুলো। ধীর পৃথিবী নিম্নস্তরের মানুষদের জন্য। আবার দ্রুত পৃথিবী তাদের জন্য, যাদের আর বেশি কর্মফল বাকি নেই। সেখানে স্ত্রী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাও নিষ্পাপ চোখে দেখা হয়, ঠিক আমাদের আউলিয়াদের মতো। লেখকের এই স্বর্গে ‘ঈশ্বর বিশ্বাসী’ আর ‘নাস্তিক’ পাশাপাশি স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। যেমনটা আমাদের মর্ত্যে হওয়ার কথা ছিল। ‘হোলি স্পিরিটরা’ই ধীরে ধীরে দেবত্বে উন্নত হয়। কেউ হয়ে ওঠে করুণার দেবী, কেউ আবার প্রণয়ের। কেউ কেউ কবি হয়ে কিংবা প্রকৃতির গান গেয়েই অনন্ত কাল ধরে স্বর্গে বাস করে চলেছেন। কেউ আবার জগতের মায়া কাটিয়ে এই পৃথিবীরই কোনও এক গোপন ডেরায় কাল অতিবাহিত করছেন। বিভিন্ন দেশের মানুষ তাদের এক ‘অজানা অনন্ত কিছু’কে নিজের নিজের ভগবানের নাম দিয়ে শান্তিতে মিলেমিশে আছে। যেমন গল্পের দুই মূল চরিত্র যতীন আর পুষ্প বাল্মিকীর আশ্রমে গেলে, তিনি সীতাকে তাঁর সৃষ্ট এক চরিত্র হিসেবেই তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই সীতা তাদের আবার নিয়ে চলেন রাশিয়ার এক যুদ্ধক্ষেত্রে অন্য ধর্মের মানুষদের সাহায্য করতে। মহাবিশ্বের এক পথিক তাদের কাছে ব্রহ্মাণ্ডকে তুলে ধরেন শুধুমাত্র এক আবিষ্কারের জগৎ হিসাবে। সেখানে দেবতা থাকতেও পারে আবার না-ও পারে। ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ, রাজযোগ আর কর্মযোগ– সবরকম পথেরই সহবস্থান সেখানে। এ শুধু এক মরণোত্তর ত্রিকোণ প্রেমের গল্পই খালি থাকে না, এ হয়ে ওঠে এই মর্ত্যভূমিকেই স্বর্গরূপে গড়ে করে তোলার এক জরুরি পাঠ।

zoom
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

তর্কবাগিশ বাঙালির ডেমোগ্রাফিক চেহারা তো এমনই হওয়ার কথা ছিল। যে অপরকে শুনবে, বুঝবে, জায়গা করে দেবে। স্বর্গের সমাজে দুঃখ-কষ্টের প্রকৃতি ভিন্ন। পৃথিবীর মতো অভাব, ক্ষুধা, সামাজিক অপমান এখানে নেই। এখানে আছে কেবল নিজেকে জানা আর অনন্তকে বোঝার এক অনন্ত পরিসর।  স্বর্গে সময় ও বয়সের ধারণা আলাদা। পুষ্পর ক্ষেত্রে যতীন দেখে যে বহু বছর পরেও তার উপস্থিতি এক বিশেষ অবস্থাতেই রয়েছে। এখানে অর্থ ও সম্পত্তি দিয়ে সামাজিক মর্যাদা বিচার হয় না। বিভূতিভূষণের এই স্বর্গে আত্মার বিকাশই প্রধান। ‘স্বর্গ’ আসলে একটি  আধ্যাত্মিক অবস্থা। পুষ্পর কাছে যতীনের সঙ্গে ছোট্ট কুটিরে এক সংসারও ‘স্বর্গ’ হতে পারে। তার কাছে ভালোবাসা ও আত্মিক সম্প্রীতিই স্বর্গের আসল পরিচয়। কিন্তু দুই বাংলার ডেমোগ্রাফিতেই এখন শুধু বেকারত্ব, রোগ আর অন্ধভক্তির বাস। ওরা একটু বিভূতিভূষণ পড়ুক, লালন শুনুক আর ‘গল্প হলেও সত্যি়’র মতো সিনেমা দেখে মন ভালো রাখুক– এটুকুই চাওয়া।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন নিলয় সমীরণ নন্দী-র অন্যান্য লেখা

………………….

Aranyaka Ashani Sanket Béla Tarr bengali literature Bengali Society Bibhutibhushan Bandyopadhyay census Debjan Demographic Thought Galpo Holeo Satti pather panchali Rural Bengal Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Turin Horse Vincent van Gogh যুক্তি তক্কো আর গপ্পো

Share this article on