

ড্রয়িংরুম থেকে নেশন স্টেট পর্যন্ত এই অস্থির যাত্রায় ভারত যেন নিজেরই একটি নতুন সংজ্ঞা খুঁজছিল। আশির দশকের জনপ্রিয় সিনেমা সেই সংজ্ঞা দিতে পারেনি– কিন্তু সংজ্ঞা খোঁজার ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং বিভ্রান্তিটুকু অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে ধরে রেখেছিল। জাতীয় সংস্কৃতির অন্তঃস্থল, যেখানে আধুনিকতা প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু তাকে ‘ভারতীয়’ নৈতিকতার সীমা মানতে হয়। আশির দশকের ফ্যামিলি মেলোড্রামায় সেই বিমূর্ত ঘর বারবার আক্রান্ত হয়।
–নির্বেদ! চোখে অনভিপ্রেত অশ্রু ভার,
হুঁকো টানে আর ফাঁসিকাঠ দ্যাখে স্বপ্নে।
পাঠক, তুমিও চেনো এ-পিশাচরত্নে,
–কপট পাঠক, –দোসর, –যমজ ভাই আমার।
[শার্ল বদলেয়ার। অনুবাদে, বুদ্ধদেব বসু।]
আশির দশকের জনপ্রিয় হিন্দি ছবির প্রসঙ্গে হঠাৎ বদলেয়ারের অবতারণা কেন? সাহিত্যানুরাগী মাত্রেই চিনবেন Les Fleurs du mal-এর সূচনা-কবিতা ‘Au Lecteur’-এর এই বিখ্যাত সমাপ্তি– যেখানে কবি শেষ পর্যন্ত পাঠককেও নিজের পাপ, বিকার এবং নির্বেদের অংশীদার করে নেন। যে বিকারকে আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি আর আত্মপ্রসাদ লাভ করি, সে আমাদের অপরিচিত নয়; বরং ‘দোসর’, ‘যমজ ভাই’। উনিশ শতকের আধুনিকতা সম্পর্কে গভীরভাবে বিদ্বিষ্ট বদলেয়ারকে বর্তমান আলোচনায় ঢোকানোর কারণও এখানেই– দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, সমাজ, এমনকী নিজের সম্পর্কে এক সিনিসিজম যা বিষিয়ে দেয় বিচার, বিবেক এবং সবশেষে আর্ট-কে। আশির দশকের ভারতের হিন্দি ছবি, তার আখ্যান এবং রাজনীতির মিশেলে প্রায় এরকমই কষায়। জরুরি অবস্থার স্মৃতি ততদিনে ফিকে হয়ে এসেছে; সাতের দশকের বামমার্গীয় আদর্শ অস্তমিত, ইন্দিরা গান্ধী দেশের মসনদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিচ্ছিন্নতাবাদ, উগ্রবাদ এবং জাতিদাঙ্গা, যেন ফরাসি বিপ্লবের পর সমাজের পুনর্মূষিকত্ব প্রাপ্তি। বদলেয়ারের তাতে নির্বেদপ্রাপ্তি হচ্ছে, আর আশির সিনেমা বেছে নিচ্ছে পৈশাচিক চরিত্রনির্মাণ, চড়া অতিনাটকীয়তা– শাকালের হাসি, মোগ্যাম্বোর আস্ফালন, ডিস্কোর চাকচিক্য, পারিবারিক মেলোড্রামার নীতিকথা কিংবা আইনকে পাশ কাটিয়ে সমাজরক্ষার পৌরুষ।
“কিন্তু পাপের জঘন্য সংসারে
যত শার্দুল, শৃগাল, শকুন, সর্প,
বৃশ্চিক, কীট, মর্কট করে দর্প
নেচে, কুদে, ফুঁশে উৎকট চীৎকারে।”

ভারতীয় হিন্দি সিনেমা কখনও ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রসাদ-বঞ্চিত হয়নি; অরুণা বাসুদেব, আশিস রাজাধ্যক্ষ, মাধব প্রসাদ, রবি বাসুদেবন, সুমিতা চক্রবর্তীর ছয়-সাত বা নয়ের দশকের ওপর লেখালিখি তার প্রমাণ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আশির হিন্দি ছবি সম্পর্কে ফিল্ম স্টাডিজ অ্যাকাডেমিয়া বিচিত্রভাবে নীরব; যেন সেই নীরবতায় মিশে আছে খানিক তাচ্ছিল্য: জ্যোতিকা ভির্দির ভাষায় “belabored, discontinuous, and poorly executed” সিনেমায় বোঝাই এই আশির দশক। কপট পাঠকের মতোই, হয়তো কপট দর্শকও তার যমজকে চিনতে একটু দেরি করে। তার আগের দশককে চেনা সহজ, কারণ সেখানে আছে দিওয়ার (১৯৭৫), শোলে (১৯৭৫), ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, শহুরে শ্রমজীবী মানুষের ক্রোধ। আশির পরের দশকটি বোধহয় এই প্রেক্ষিতে আরওই স্পষ্ট, কারণ তার সর্বাঙ্গে আছে উদারীকরণের অভিজ্ঞান– বহুজাতিক পুঁজি, এনআরআই, শাহরুখ খান, নতুন মধ্যবিত্ত এবং ক্রমশ বিশ্বায়িত ভারত। এই দুইয়ের মাঝের আশির দশকটি যেন ঠিক কোথাও পৌঁছয় না, রাজনৈতিক প্রশ্নগুলিও সেখানে আগের দশকের তুলনায় অনেক বেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, তার হিন্দি ছবিগুলিও এমন এক ভারতের চলচ্ছবি, যে জানে তার অতীত আর ফিরে আসবে না, অথচ ভবিষ্যৎটি ঠিক কেমন হবে তখনও তার জানা নেই। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থাটি শুধু সিনেমার ছিল না তা আগেই বলেছি। সাতের দশকে রাজনৈতিক সামাজিক, নেহরুবাদী সমাজতন্ত্র এবং জরুরি অবস্থার স্মৃতি তখনও জীবন্ত; অন্যদিকে দিগন্তে দেখা যাচ্ছে বাজারমুখী অর্থনীতি, ভোগ্যপণ্য, টেলিভিশন, ভিসিআর, বিজ্ঞাপন এবং ক্রমশ দৃশ্যমান এক নতুন মধ্যবিত্ত। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮০-তে আবার ক্ষমতায় ফিরছেন, তার আগের জনতা দল সরকার পাঁচ বছরও টেকেনি, পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জাতিগত সংঘাত তীব্র হচ্ছে, নারী এবং নিম্নবর্ণের সামাজিক অধিকারের প্রশ্নও নতুন জোর পাচ্ছে। অর্থাৎ পুরনো রাষ্ট্রনৈতিক মতৈক্য ভাঙছে, কিন্তু তার জায়গায় কী আসবে তা তখনও স্থির নয়। অনুষ্টুপ বসুর ভাষায় যে ‘kinetic, worldly traffic of goods, bodies, and images’– তার অভিঘাত ইতিমধ্যেই ঘরের দরজায় এসে পড়েছে। ফলে আশির দশকের জনপ্রিয় সিনেমা এক অদ্ভুত দ্বৈততায় বাস করে: নতুন জিনিসের প্রতি আকর্ষণ, কিন্তু নতুন নীতিবোধের প্রতি ভয়।

এই ভয় প্রথমেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুমে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বহুল আলোচিত ঘর/বাহির বিন্যাসে ‘ঘর’ কেবল ব্যক্তিগত পরিসর নয়; জাতীয় সংস্কৃতির অন্তঃস্থল, যেখানে আধুনিকতা প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু তাকে ‘ভারতীয়’ নৈতিকতার সীমা মানতে হয়। আশির দশকের ফ্যামিলি মেলোড্রামায় সেই বিমূর্ত ঘর বারবার আক্রান্ত হতে দেখি। ‘অগর তুম না হোতে’ (১৯৮৩) ছবিতে কর্মজীবী নারীকে সাময়িক এজেন্সি দেওয়া হয়, কিন্তু ছবির পরিসমাপ্তি তাকে আবার মাতৃত্ব ও সংসারের ভিতরেই স্থিত করে, এবং সাশ্রুনয়নে নারী তা মেনেও নেয় কারণ গৃহনৈপুণ্যেই যে নারীর মোক্ষ! ‘অর্থ’ (১৯৮২) ছবিতে ত্যক্তা স্ত্রী স্বামীকে প্রত্যাখ্যান করেন, নিজের কাজ খুঁজে নেন, নিজের জীবনও গড়ে তুলতে চান; তবু তার স্বাধীনতার চূড়ান্ত নৈতিক স্বীকৃতি আসে আবার মাতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। ‘মাসুম’-এর (১৯৮৩) প্রথমার্ধে নায়কের অবৈধ সন্তান রাহুল যেন এই টানাপোড়েনের মূর্তরূপ হিসেবে হাজির হয় একেবারে ড্রয়িংরুমের মধ্যে, তাকে না-করা যায় বর্জন (কারণ মাতৃত্বের আদর্শ তাতে খর্ব হয়), না-দেওয়া যায় সংসারের সভ্য হওয়ার ছাড়পত্র (তাহলে পারিবারিক শুদ্ধতা বলে আর কিছু বাকি থাকে না যে)। ফলে ‘অর্থ’, ‘মাসুম’, ‘বসেরা’ (১৯৮১), ‘জুদায়ি’ (১৯৮০), এমনকী অপেক্ষাকৃত হালকা হাস্যরসের ছবি ‘খুবসুরত’ও (১৯৮০) এক অর্থে একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে করে: কতটা বদলালে ঘর আর ঘর থাকে না? এবং আশির দশকের অধিকাংশ উত্তরই শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের চেয়ে রক্ষণশীল পুনঃস্থাপনকেই বেছে নেয়।

রক্ষণশীলতার ধর্মই সীমা লঙ্ঘন। সাতের দশকের বাম উদারনীতির হাত এড়াতে ভারতীয় সমাজ যেন আড়মোড়া ভাঙছিল ঘনঘন। এসব সময়ে ড্রয়িংরুমের সীমানা খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়, পরিবার ছাড়িয়ে রক্ষণশীলতা দেশের রাজনীতির আঙিনায় উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করে। আশির দশকের দ্বিতীয় বড় সিনেমাটিক মুভমেন্টে পরিবার এই সুযোগে ধীরে ধীরে নেশন স্টেটের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। অবশ্য এসব ডামাডোলের ক্ষেত্রও তো প্রস্তুতই ছিল। নেহরুবাদী সেকুলারিজম ক্ষয়ে যাচ্ছে; পাঞ্জাব ও অসমে বিচ্ছিন্নতাবাদ, জাতি ও লিঙ্গসাম্যর নতুন দাবি, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং বাজারমুখী অর্থনীতির সূচনা– সব মিলিয়ে ‘ভারত’ নামের একক রাজনৈতিক সত্তাটিই যেন নতুন করে নিজের সীমা নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছিল। ফলে প্রশ্নটি আর শুধু কে ঘরের লোক আর কে বাইরের নয়; কে ‘ভারতীয়’, এবং কে সেই ভারতের শত্রু। নিজের জাতীয় পরিচয় যত অনিশ্চিত হয়, ‘অপর’-কে তত বেশি দৃশ্যমান, বিচিত্র এবং ভয়াবহ করে তোলার প্রয়োজন পড়ে। ‘শান’-এর (১৯৮০) শাকাল, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’র (১৯৮৭) মোগ্যাম্বো কিংবা ‘কর্মা’র (১৯৮৬) ডক্টর ড্যাং তাই সাধারণ সমাজবিরোধী নয়। তাদের নির্দিষ্ট দেশ নেই, ইতিহাস নেই, স্বাভাবিক সামাজিক পরিচয়ও নেই; তারা গ্যাজেট, সমুদ্রের নিচের বাঙ্কার, প্রাইভেট আর্মি এবং ঘনঘন বিজাতীয় উচ্চারণে ইংরেজি বলা এক গ্লোবাল ‘অপর’। শান-এ নায়কদ্বয় অমিতাভ বচন আর শশী কাপুর, যাঁরা কয়েক বছর আগেই ‘দিওয়ার’-এর (১৯৭৫) মাধ্যমে রাষ্ট্রের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, তাঁরা শাকালের বিরুদ্ধে প্রায় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি, দেশের স্বার্থরক্ষায় অতন্দ্র সেনানী। ভিলেন পালানোর চেষ্টা করলে এনকাউন্টারের কায়দায় গুলি চালাতে পিছপা হন না। ‘ইনকিলাব’ (১৯৮৪) আরও এক ধাপ এগয় এই লাইনে। সেখানে সৎ জনপ্রতিনিধি অমরনাথ প্রবল দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রীসভাকে গুলি করে মেরে ‘দেশশুদ্ধি’ করেন, এবং এই ভয়ঙ্কর এক্সট্রা-লিগ্যাল হিংস্রতাকে আশির দশক শেষ পর্যন্ত প্রায় মুক্তিদাতার কাজ হিসেবেই গ্রহণ করে। হানা আরেন্টের একনায়কত্বপন্থী গণ-রাজনীতির স্মৃতি এখানে অস্বস্তিকরভাবে ফিরে আসছে: একনায়ককেকে ঘৃণা করা এবং একইসঙ্গে শক্তিমান, বিবেকবান একনায়কের আকাঙ্ক্ষা– দুই-ই যেন একই কল্পনায় সহাবস্থান করছে।

‘মিস্টার ইন্ডিয়া’তে এই অলীক কল্পনা প্রযুক্তির সঙ্গে মিশে আরওই অদ্ভুত। অরুণ ভার্মার চরিত্রে অনিল কাপুর প্রথমে একটি প্রায়-আদর্শ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ভদ্রলোক– অনাথ শিশুদের নিয়ে তার ঘর। কিন্তু বিদেশি হানাদার মোগ্যাম্বো সেই ঘর আক্রমণ করলে অরুণকে মিস্টার ইন্ডিয়া হতে হয়: এমন এক অদৃশ্য জাতীয় রক্ষক যার চোখের বাইরে কিছুই নেই। এ কাজে তাকে সাহায্য করে একেবারে সরাসরি সায়েন্স ফিকশনের পাতা থেকে উঠে আসা, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি একটি অদৃশ্যকরণের যন্ত্র– প্রতিফলিত আলোকে বাঁকিয়ে দিতে সক্ষম একটি ব্রেসলেট। মিস্টার ইন্ডিয়াও সানন্দে পরিণত হন এক দেশব্রতী ভারতীয় সুপারহিরোয় যে শেষ দৃশ্যে মোগ্যাম্বোকে তার গোপন ঘাঁটিশুদ্ধ সলিলসমাধি দেয়। আমরা অনায়াসেই আন্দাজ করতে পারি দেশজ সুপারহিরোটির পরবর্তী কার্যকলাপ– তার হাত থেকে রেহাই পাবে না কোনও অপরাধী, চুপিসাড়ে সে ঢুকে পড়বে আমার-আপনার অন্দরমহলে, নজর রাখবে রাষ্ট্রের প্রতিভূ হয়ে। ‘কর্মা’-য় ছবিটা আরও এক ধাপ এগয়। রানা বিশ্বপ্রতাপ সিংয়ের নিজের পরিবার ডক্টর ড্যাংয়ের হাতে ধ্বংস হয়েছে; বদলা নিতে তিনি বেছে নেন জেলের তিন দাগী আসামিকে– একজন হিন্দু, একজন মুসলমান, একজন খ্রিস্টান। অর্থাৎ হাতের কাছে তৈরি হয়ে যায় এক ক্ষুদ্র ভারতবর্ষ, যার রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান এবং পরিবারের কর্তা– সবই বিশ্বপ্রতাপ নিজে। প্রথমে অবশ্য বন্দিরা এই দেশপ্রেমিক পারিবারিক ব্যবস্থায় ঢুকতে খুব আগ্রহী ছিল না; তাদের প্রেম আছে, ভবিষ্যৎ আছে, বেঁচে থাকার সাধও আছে। খৈরুদ্দিন তো সোজাসুজি প্রশ্ন করে বসে, বিশ্বপ্রতাপ কি তাদের মানুষ হিসেবে দেখছেন, না নিজের প্রতিহিংসার কুকুর হিসেবে ব্যবহার করছেন? কিন্তু ছবিতে এই প্রশ্নের আয়ু খুবই কম। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেমিকারাও দলে এসে পড়ে, দ্বিধা গলে যায়, তিন অপরাধী হয়ে ওঠে দেশের সন্তান। যে মানুষটি নিজের পরিবার হারিয়েছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত গোটা দেশকেই পরিবার বানিয়ে ফেলেন– এবং সেই পরিবারের আদর্শ রূপটি আশ্চর্যভাবে একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া। এখানে দেশরক্ষা আর ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ফারাক প্রায় মুছে যায়; সিনেম্যাটিক পৌরুষ আর বন্দুক একই ফ্রেমে এসে দাঁড়ায়। শাকাল থেকে ড্যাং পর্যন্ত যাত্রাটি তাই শুধু ভিলেনের বিবর্তন নয়; পরিবারের রক্ষাকর্তা থেকে দেশের সেনানী হয়ে ওঠারও ইতিহাস।

সুধী পাঠককে ক্ষণিকের তরে অন্যদিকে চোখ ফেরাতে অনুরোধ করি। আশির দশকের সেই বিখ্যাত বাহুল্যকে মনে আছে? বাপ্পি লাহিড়ী, মিঠুন চক্রবর্তী, ডিস্কো, সিন্থেসাইজার, চকচকে বিদেশি পোশাক, ভিডিও ক্যাসেট, গাড়ি, ভিলেনের বিচিত্র ফিউচারিস্টিক বাসস্থান– এসবই তৎকালীন সিনেমার অভিজ্ঞান, এবং এই সিনেমা একইসঙ্গে গ্লোবাল আধুনিকতাকে ভয় পায় এবং তার ইন্দ্রিয়জ আনন্দে ডুবে থাকে। ঘরের নারী ‘westernized’ হলে সমস্যা, কিন্তু ড্রয়িংরুম-এ কালার টেলিভিশন চাই; বিদেশি কালচার সন্দেহজনক, কিন্তু শাকালের হেডকোয়ার্টার জলের তলায় কাচঘেরা না-হলে স্পেকট্যাকল-টা যেন ঠিক জমে না। এই বৈপরীত্যই এই দশকটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। রক্ষণশীলতা এখানে আধুনিকতার বিপরীত নয়; বরং আধুনিকতার সামগ্রী গ্রহণ করে তার সামাজিক ফলকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে থাকে ক্রমাগত।

ফলে আশির দশকের হিন্দি জনপ্রিয় সিনেমাকে কেবল ‘খারাপ ছবি’র দশক বলে সরিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তাতে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরা পড়ে না। হয়তো একটি ‘অসম্পূর্ণ’ দশক বলা যায়, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কখনওই নয়। ক্লেয়ার পার্কিন্স এবং কনস্তানতিন ভেরেভিস যে ‘bad’ বা paracinematic text-কে সামাজিক সময়ের দলিল হিসেবে পড়ার কথা বলেন, আশির দশকের জনপ্রিয় হিন্দি ছবি সেই পাঠের এক অসাধারণ ক্ষেত্র। এই ছবিগুলি অতীতের প্রেত বহন করে– এমার্জেন্সি বা সত্তরের রাষ্ট্রবিরোধী ক্রোধের প্রেত। একইসঙ্গে তারা ভবিষ্যতের ভূতও দেখতে পায়– ভোগবাদী মধ্যবিত্ত, প্রযুক্তি ও নজরদারি এবং রাষ্ট্রের আইনকানুনের বাইরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের কাজ করা দেশপ্রেমী সুপারহিরোর ভূত। ড্রয়িংরুম থেকে নেশন স্টেট পর্যন্ত এই অস্থির যাত্রায় ভারত যেন নিজেরই একটি নতুন সংজ্ঞা খুঁজছিল। আশির দশকের জনপ্রিয় সিনেমা সেই সংজ্ঞা দিতে পারেনি– কিন্তু সংজ্ঞা খোঁজার ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং বিভ্রান্তিটুকু অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে ধরে রেখেছিল। আর সেই কারণেই, ত্রিশঙ্কু এই দশকের চলচ্ছবি আজ এত অস্বস্তিকরভাবে ঘুরে ঘুরে আসে, ফিরে দেখার দাবি জানায়। প্রশ্ন করে, অনেক দেরি হয়ে যায়নি তো?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved