Bhadu: Rural Bengal's Krishna Chronicles in Songs | Robbar
Robbar
  • ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভাদুর কৃষ্ণ, ভাদুর রাধা

ভাদু উৎসব কবে শুরু হয়েছিল? কীভাবে শুরু হয়েছিল? সে নিয়ে বিতর্ক বহুদূর! লোকমতে ভাদ্র মাসেই ভাদুর জন্ম, ভাদ্র মাসেই ভাদুর মৃত্যু। ভদ্রাবতী পুরুলিয়ার কাশীপুরের রাজা নীলমণি সিংদেও-র মেয়ে। ভদ্রেশ্বরীর সঙ্গে বর্ধমানের রাজকুমারের বিবাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বরবেশে রাজকুমার বিবাহের উদ্দেশ্যে রওনা হলে রাস্তার ডাকাত লাঠিয়ালদের হাতে নিহত হন। ভদ্রাবতী সেদিন লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার লজ্জায় আত্মহত্যা করেন।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ২০:০০   
Facebook WhatsApp Messenger

‘এসো গো ভাদ্রেশ্বরী
ভরা ভাদরে…’

ভাদ্র সংক্রান্তি। ঋতুভেদে বর্ষার মাস অতিক্রান্ত। শরৎ এসেছে অথচ আকাশ এখনও নীল রং ধরেনি; অবিরত ধারাবর্ষণ! সাদা মেঘের ভেলা মুহূর্তে বর্ষাতি রূপ ধরছে। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরও বিভ্রান্ত জলবায়ুর সঠিক পূর্বাভাস জানাতে! কৃষাণির মনে আনন্দ নেই, অতিবৃষ্টিতে ভেসে যেতে বসেছে ধানের সোনালি ভবিষ্যৎ। সাঁওতাল রমণী দেওয়ালে আলপনা আঁকতে ভুলে গিয়েছে! কর্মহীন জনজীবন। তবুও উমার আসার সময় হল। কুমোরপাড়ার খড়ের কাঠামোতে দুমাটি পড়ে গেছে। রোদের অভাবে ডোম ঘরে নরম আগুনে তাতিয়ে নিচ্ছে ঢাকের ছাউনি। উমার আগমনের প্রতীক্ষায় মা মেনকার মনেও রামপ্রসাদী সুর–

যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী,
উমা নাকি কেঁদেছে হে।
নারদ মুখে শুনিলাম গিরি,
উমা অন্ন চায়নি হে।।’

zoom
ভাদু উৎসব। আলোকচিত্র: অর্ণব অঞ্জন

এমনই বৃষ্টিমুখর শরৎ সন্ধ্যায় রাঢ়বঙ্গে প্রাচীনারা তাঁদের ঘরের মেয়ে ভাদুর আগমনেও গেয়ে ওঠেন

‘ভাদুর আগমনে।
কি আনন্দ হয় গো মোদের প্রাণে।।
ভাদু আজকে এল ঘরে গো এল গো শুভদিনে।’

শ্রীমত্যা বিমলা প্রামাণিক। বয়স ৮৬ পেরিয়েছে। ভগবান এখনও ডাকেনি বলে দুঃখের শেষ নেই, আবার নাতির ছেলেমেয়ের মুখ দেখে যাবে বলে আরও কয়েকটা ভাদ্র রয়ে গেলেন। তাঁর খুব ইচ্ছা এবার ভাদু আনবে ঘরে। বেলিবুড়ি, গীতাবুড়ি, মায়াবুড়ি সক্কলকে বলে রেখেছে, ওলো! আমার নাতির ভাদু হয়েছে! এবছর ঘরে ভাদু আনব। ভাদু আসবে বলে সে কী আনন্দ! হবে নাই বা কেন? মনের অলিন্দে জমে থাকা কতশত ভাদুগান আবার গেয়ে উঠবে সমস্বরে! রামকথা, কৃষ্ণকথা, কালীকথা; কত কথা জমে আছে ভাদুগানে। যেসব কথা পাঁচালির ঢঙে সুর না-দিলে রাতে ঘুম হয় না! গুণগুণ সুরে মহড়া চলে সারা বছর। ভাদ্রমাস এলেই ভাদ্রেশ্বরীকে নিবেদন করা হবে সেসব গান।

ভাদুর ভজন-পূজন শুরু হয় ভাদ্রমাসের প্রথম দিনে। একমাস ধরে চলতে থাকে ভাদুগানের সান্ধ্য আসর। তারপর সেই বহু প্রতীক্ষিত সংক্রান্তির দিন, জাগরণের দিন; ভাদু বন্দনার দিন। ভাদু দেবী বলে তার একটি নির্দিষ্ট মূর্তির অবয়ব আছে। গোলাপি আভাযুক্ত পীতবর্ণের মূর্তি। হাতে পদ্মফুল, গলায় মালা। কখনও রাধাকৃষ্ণকে কোলে নিয়ে, আবার কখনও পদ্মাসনে অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কখনও আবার বাঁ-হাতের উল্টোদিকে একটি টিয়াপাখি থাকে। কোঠাবাড়ির সিঁড়িতে রঙিন কাপড় দিয়ে সাজানো হয় ভাদুর মন্দির। রকমারি কাগজ ফুল দিয়ে সে কী অলংকরণ! সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে থালাভর্তি লুচি, পায়েস, মণ্ডা, সুজির বরফি, হরেকরকম ফল।

zoom
আলোকচিত্র: তীর্থঙ্কর ওঝা

ভাদু উৎসব কবে শুরু হয়েছিল? কীভাবে শুরু হয়েছিল? সে নিয়ে বিতর্ক বহুদূর! তবে, লোকমতে ভাদ্র মাসেই ভাদুর জন্ম, ভাদ্র মাসেই ভাদুর মৃত্যু। ভদ্রাবতী পুরুলিয়ার কাশীপুরের রাজা নীলমণি সিংদেও-র মেয়ে। ভদ্রেশ্বরীর সঙ্গে বর্ধমানের রাজকুমারের বিবাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বরবেশে রাজকুমার বিবাহের উদ্দেশ্যে রওনা হলে রাস্তার ডাকাত লাঠিয়ালদের হাতে নিহত হন। ভদ্রাবতী সেদিন লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার লজ্জায় আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীকালে রাজকুমারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে রাজা এই ভাদু উৎসবের প্রচলন করেন। এ বিষয়ে লোকসংস্কৃতবিদ ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য ভিন্নমত পোষণ করেন, ‘আনুমানিক ১৮১৩ খৃষ্টাব্দে মানভূম জিলার পঞ্চকোটের রাজধানী কাশীপুরে নীলমণিসিংহ দেবশর্মা নামে এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তাঁহার ভদ্রেশ্বরী নামে এক সুন্দরী কন্যা ছিল। ভদ্রেশ্বরী বয়ঃপ্রাপ্তা হইলেন, কিন্তু তাঁহার বিবাহের কোন সম্ভাবনা দেখা গেল না। রাজান্তঃপুরের মধ্যে অধিকাংশ অনূঢ়া রাজকন্যার জীবন যে ভাবে কাটিয়া যায়, তাঁহার জীবনও সেই ভাবেই কাটিতেছিল। এই ভাবেই একদিন ভদ্রেশ্বরী পরলোক গমন করিলেন। প্রাণাধিকা কন্যার অকাল পরলোকগমনে রাজা নিদারুণ ব্যথিত হইলেনতিনি তাঁহার রাজ্যমধ্যে প্রচার করিয়া দিলেন যে, রাজকন্যার স্মৃতিরক্ষার জন্য ভাদ্রমাসে পল্লীতে পল্লীতে তাঁহার নামে উৎসব পালন করিতে হইবে। প্রজাগণ সানন্দে আদেশ পালন করিল। তারপর মানভূম হইতে তাহা বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম প্রভৃতি অঞ্চলে বিস্তার লাভ করিল। আধুনিককালে রচিত বহু ভাদুগানের ভিতর দিয়াই এই বিষয়টির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সহজেই বুঝিতে পারা যায় যে, বহু পূর্ব হইতেই এই উৎসব এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ইহার সঙ্গে কাশীপুররাজ ও তাঁহার কন্যার নাম আসিয়া যুক্ত হইয়াছে। কাশীপুর রাজপরিবারের এই বিবরণটি ঐতিহাসিক সত্য। (শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য, ‘বাংলার লোকসাহিত্য’, ক্যালকাটা বুক হাউস, ১৯৭৩)

ভাদুগানের মূল সুরটি গড়ে উঠেছে রাজকুমারী ভাদুর অকালপ্রয়াত হওয়ার বিষাদময় লোককথাকে কেন্দ্র করে। পঞ্চকোটের পরিবারের রাজ দরবারে মার্গসংগীতের ঢঙে দরবারি ভাদু গাওয়া হত। ধ্রুবেশ্বরলাল, প্রকৃতীশ্বরলাল, রাজেন্দ্রনারায়ণ সিংহদেও ছিলেন এই ধারার প্রবর্তক। গ্রামীণ নারীদের কণ্ঠে এই গান একেবারে অন্য রূপ পেয়েছে। গার্হস্থ্য-জীবনের হাসিকান্না, সুখদুঃখের দোলাচলতায় পাঁচালি ঢঙের এই গানে মিশে গেছে রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণকথায়।

zoom
দেবী ভাদু

মধ্যযুগের কাব্যের মতোই বন্দনাগানে সূচিত হয় ভাদু আরাধনা–

‘নম নম নম ভাদু
নম তোমার চরণে।
কাল পূজেছি সাদা ফুলে
আজকে নীল বরণে।’

এরপর গানের মধ্যে আসে কালীয়দহেরকথা, শ্রীকৃষ্ণের কালীয়াদমনের কথা–

‘কালী কালী করি আমরা
কালীদহে ঝাঁপ দিব।
কালীদহে দাঁড়ায় কৃষ্ণ
নাগের মাথায় পা দিয়ে।
কালী কালী করি আমরা
কালীদহে ঝাঁপ দিব।’

কালীয় নাগের বিষে যমুনার জল কালো হয়ে গিয়েছিল, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। এমন সময় কৃষ্ণ দুষ্টের দমন করতে বিষজলে ঝাঁপ দিলেন। রাঢ়বঙ্গের জল-জঙ্গলে বিষধর সাপের সঙ্গেও আদিবাসী নিম্নবর্গের মানুষ প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচে। কৃষ্ণের কালীয়দমন প্রসঙ্গটি ভাদুগানের আধারে বর্ণিত হলেও এখানে আসলে প্রকৃতির উপর মানুষের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেছে।

ভাদুগানের আসরে প্রাচীনরা কৃষ্ণকে সুযোগ পেলেই কখনও বাৎসল্য প্রেমে কখনও আবার শৃঙ্গাররসের আধারে নিজের করে তোলেন। যশোদা মায়ের আদরের দুলাল কানাইয়ের দুরন্তপনা ও মাখন চুরির ঘটনা গ্রামীণ নারীরা পরম স্নেহে ভাদুগানের চুটকি বা পাঁচালির সুরে গেয়ে থাকেন। এখানে কৃষ্ণ কোনও অধীশ্বর নন, বরং ঘরের এক দুষ্টু-মিষ্টি ছেলে।

zoom

‘আমাদের ভাদুর ঘরে এলো
ব্রজের গোপাল রে,
মাখন চুরির দায়ে কানাই
কান্দে জিলিমিলি রে॥
যশোদা মাতা বাঁধতে যায় রে
ননীচোরা কালো শশী,
বাঁধন মানেনা যে তার,
সে যে নিখিল ভুবন বাসী॥’

কৃষ্ণকে এখানে ব্রজের গোপাল নয়, ঘরের ছেলে হিসেবে ঘরের মেয়ে ভাদু-র আসরে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। কানাইয়ের এই বন্ধন ও বন্ধনমুক্তির মধ্যে দিয়ে চিরকালীন মাতৃ-হৃদয়ের স্নেহের আকুলতা স্ফুরিত হয়।

রাধা যখন সখীদের নিয়ে মথুরার হাটে দই-দুধ বিক্রি করতে যান, তখন যমুনার ঘাটে কৃষ্ণ তাঁর পথ আগলে দাঁড়ান এবং খেয়া পারানির শুল্ক দাবি করেন। এটি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বিখ্যাত দানলীলার প্রসঙ্গ। ভাদুগানে এই খুনসুটি ও চোখের ইশারা অত্যন্ত মধুর শৃঙ্গার রসে প্রকাশ পায়,

‘সব সখিকে পার করিব গো
লিব গো আনা আনা।
রাধিকাকে পার করিলে
লিব গো কানের সোনা।
দাও গো ষোল আনা
নহিলে আমি পার করিতে পারিব না।’

মাঝেমাঝে ভাদু এবং রাধা দুজনে একই সত্তা হয়ে ওঠে। শাশুড়ি-ননদ-বেষ্টিত সংসারে দুজনেরই লোকলজ্জার ভয়। সাজগোজ, বাইরের লোকের সঙ্গে সাক্ষাতের উভয়ের ঘরের বাইরে কঠিন কপাট,

‘হলুদ বনের ভাদু তুমি গো
হলুদ কেন মাখো না।
শাশুড়ি ননদের ঘরে
হলুদ মাখা সাজে না।’

zoom
ভাদু বিসর্জন। আলোকচিত্র: দেবমাল্য দাস

শৃঙ্গাররস কেবল মিলনেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শ্রেষ্ঠত্ব বিরহ ও মান-অভিমানে। যাকে শাস্ত্রে বলে বিপ্রলম্ভ শৃঙ্গার। কৃষ্ণ অন্য কোনও সখীর কুঞ্জে গেছেন বা রাধাকে অবহেলা করছেনএই অভিমানে রাধা যখন মুখ ফিরিয়ে নেন, তখন কৃষ্ণ তাকে মান ভাঙানোর জন্য অনুনয় করেন,

‘মান করো না, মান করো না
ওগো রাধেরানী,
তোমার তরে এনেছি আজ
বনের মালতীখানি॥
ভাদর মাসের আঁধার রাতে
একা একা কাঁদি,
তোমার পিরিত ডোরে আমি
জীবন আমার বাঁধি॥’

ভাদ্র মাসের বর্ষণমুখর রাতের প্রেমিক বিহনে ভদেশ্বরী আর রাধা দুটিতে মরমে মরেছে। রাধার ব্যাকুলতার সঙ্গে রাধার বিরহ ও মানকে মিলিয়ে বিদ্যাপতি একসময় লিখেছিলেন,

‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর         মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর’

বাঁকুড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের গ্রামের পর্ণকুটিরেও ভাদুকে ঘিরে সেই বিরহ সংগীত রচিত হয়েছে মুখে মুখে আদি-অনাদিকাল হতে। এখানে গ্রামীণ নারীর প্রেম ও বিরহের এক চিরন্তন ছবি ধরা পড়ে। ভাদুগানে রাধা-কৃষ্ণের এই শৃঙ্গার রস আসলে রাঢ় বাংলার সাধারণ নরনারীর মনের গোপন প্রেম, লজ্জা ও অনুরাগেরই এক পবিত্র লোকায়ত রূপ দিয়ে চলেছে।

তথ্যঋণ: দক্ষিণ বাঁকুড়ার প্রচলিত ভাদুগান

bengali folk culture Bengali Folklore bhadu Danleela folk Kaliya Daman Krishna Krishna Lila Mahabharata Radha and Krishna Ramayana Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on