Sarat Chandra and His Parental Love for His Pet Dog। Robbar
Robbar
  • ১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শরৎচন্দ্রের পয়া পোষ্য

দেশি কুকুর। নাম ভেলু। যাকে পুত্রস্নেহে মানুষ করতেন শরৎচন্দ্র। কারণ যেদিন ভেলুকে কিনেছিলেন, সেদিন প্রচণ্ড অর্থকষ্ট থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। বাড়িতে সেদিন ২০০ টাকার মানি অর্ডার এসেছিল। সেই কারণেই ভেলুকে ভীষণ রকমের ‘পয়মন্ত’ মনে করতেন তিনি। রেঙ্গুন থেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে পাকাপাকিভাবে কলকাতাতে চলে আসেন যখন, তখন তিনি ভেলুকে বার্মাতে ফেলে আসেননি। সঙ্গে করে এনেছিলেন।

প্রচ্ছদ: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ২০:০৭   
Facebook WhatsApp Messenger

১৯০৩ সাল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা থেকে কাজের সূত্রে যান ব্রহ্মদেশে। কিন্তু সেখানকার জলহাওয়া তাঁর শরীরের বিপক্ষে যায়। প্রায়শই নানা অসুখ-বিসুখে ভুগতে থাকেন তিনি। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান ১৯১৬ সালে, ফোলা রোগে আক্রান্ত হয়ে। এই রোগে কথাশিল্পীর পা দু’খানা ভীষণ রকমের ফুলে ওঠে। চিকিৎসকের নির্দেশে রেঙ্গুন ত্যাগ করে সে বছরেরই এপ্রিলে ফিরে আসেন কলকাতায়, পাকাপাকিভাবে।

কলকাতায় ফেরা মনস্থির করেছিলেন যখন, তখনও শরৎচন্দ্রের সেখানে মাথা গোঁজার বাসস্থান ছিল না। ভাই প্রকাশচন্দ্রকে চিঠি লিখলেন তিনি। কম টাকায় একখানা তিন ঘরের বাড়ি চাই তাঁর। প্রকাশচন্দ্র তাঁদের দিদি অনিলা দেবীর কাছে সেই নির্দেশের কথা জানান। অনিলা দেবী থাকতেন হাওড়া জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। তিনিই দায়িত্ব নিয়ে তাঁর মেজ দেওরের মেয়ে রাণুবালা দেবীর কাছে পাঠিয়ে দেন শরৎচন্দ্রকে। এই রাণুবালা দেবী থাকতেন হাওড়ার বাজে শিবপুর এলাকায়। সস্ত্রীক শরৎচন্দ্রের জন্য ৬ নম্বর বাজে শিবপুর ফার্স্ট বাই লেনে তিনখানা ঘরবিশিষ্ট বাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এই ৬ নম্বর বাজে শিবপুরে শরৎচন্দ্র ন’-দশ মাস থাকেন। তারপর পাশেই ৪ নং বাজে শিবপুর ফার্স্ট বাই লেনে আর-একটি বাড়িতে ভাড়া চলে যান। প্রায় ন’বছর ভাড়া ছিলেন এই ঠিকানায়।

zoom
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শরৎচন্দ্র যখন বাজে শিবপুরের বাড়িতে সস্ত্রীক থাকতেন, তখন তাঁদের সঙ্গে থাকত আরেকজন। তার নাম ভেলু। ভেলু– কোনও মানুষ নয়, সে ছিল কথাশিল্পীর পোষা আদরের কুকুর। ১৯১৪ সালে, রেঙ্গুনে থাকাকালীন আট আনা দিয়ে ভেলুকে কিনেছিলেন শরৎচন্দ্র। ভেলু ছিল দেশি কুকুর। গায়ের রং সাদা-কালো মেশানো। চেহারা গোলগাল ও অনেক লম্বা। 

ভেলুকে পুত্রস্নেহে মানুষ করতেন শরৎচন্দ্র। কারণ যেদিন ভেলুকে কিনেছিলেন, সেদিন প্রচণ্ড অর্থকষ্ট থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। বাড়িতে সেদিন ২০০ টাকার মানি অর্ডার এসেছিল। সেই কারণেই ভেলুকে ভীষণ রকমের ‘পয়মন্ত’ মনে করতেন তিনি। রেঙ্গুন থেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে পাকাপাকিভাবে কলকাতাতে চলে আসেন যখন, তখন তিনি ভেলুকে বার্মাতে ফেলে আসেননি। সঙ্গে করে এনেছিলেন।   

বাজে শিবপুরে থাকার সময় যখন কোনও সাহিত্যিক, পত্রিকার সম্পাদক, আত্মীয়স্বজন এবং অনুরাগীরা শরৎচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে সেই ভাড়াবাড়িতে যেতেন– প্রত্যেকেই ভেলুর কাছ থেকে জাঁকালো অভ্যর্থনা পেতেন। কেমন সেই অভ্যর্থনা? বিবরণ পাই ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেনের বর্ণনায়। তিনি লিখেছেন, ‘শরৎচন্দ্রের একটা কুকুর ছিল– তিনি বিলাতী নহেন খাঁটি দেশী। তার নাম ছিল ভেলু। শরৎচন্দ্র কুকুরটির এ নামকরণ কেন করেছিলেন জানিনে কুকুরটি দেখতে ছিল কদাকার আর তার আচরণ ছিল অতি অভদ্র। যে কেউ শরৎচন্দ্রের শিবপুরের বাসায় গিয়েছেন, তিনিই জানেন যে, অভ্যাগতকে কী বিপুল গর্জনে ভেলু অভ্যর্থনা করত, শরৎ-দর্শনপ্রার্থীবৃন্দ ভেলুর এই সম্ভাষণে আত্মরক্ষার্থে দশ হাত পিছিয়ে পড়তেন।’ মানুষজন যখন ভেলুর এই গর্জনে ভয় পেতেন, তখন ঘরের ভিতর থেকে শরৎচন্দ্রএই ভেলু’ বলে ডাক দিতেন, ভেলু তখন শান্ত-শিষ্ট হয়ে মালিকের কোলে গিয়ে বসত।

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

‘বিপ্লবী শরৎচন্দ্রের জীবন প্রশ্ন’ গ্রন্থের লেখক শৈলেশ বিশীর কথা এ-বিষয়ে মনে পড়ছে। তিনি শরৎচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন তাঁর বন্ধু পবিত্রকে। পবিত্র সেই ভেলুর বর্ণনা দিয়ে, সাবধান করে যা বলেছিলেন– সেটি হল ‘‘বাজে শিবপুরে… শরৎদার বাড়ি ঢুকতেই একটা লোমশূন্য কুকুর তোমাকে ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করে আসবে, চাই কি এক কামড় দিতেও পারে, তুমি একেবারে ‘নট ইজ দি নড়নচরণ’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে’– কেননা দেবদর্শন করতে গেলে দ্বার দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।’’ বন্ধুর কথামতো শৈলেশ বিশী যখন শরৎচন্দ্রের বাড়ি ঢুকেছেন, অমনি ভেলু বিশাল গর্জন করে এসে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে শুঁকতে আরম্ভ করল অবস্থা বেগতিক শরৎচন্দ্রই ভেলুকে সরে যেতে নির্দেশ দিলেন। প্রভুর কথা শুনে কিছুটা শান্ত হল ভেলু। তারপর সামান্য কথোপকথন চলল। সময়মতো চায়ের কাপ-প্লেটও এল। কিন্তু ভেলু তার দুর্গন্ধযুক্ত এবং পোকা-ভর্তি গা নিয়ে কাপ-প্লেটের কাছে গা ঝাড়তে লাগল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিন চায়ে চুমুক দিতে হয়েছিল, পাছে কথাশিল্পীর মনে আঘাত না-লাগে!

এই সমস্ত বর্ণনায় বোঝাই যায় যে, ভেলু বদমেজাজি। কদাকারও বটে। তবুও ভেলুর গুণের প্রশংসা শরৎচন্দ্র অবলীলায় করতেন। সক্কলকে নিশ্চিন্ত করতেন যে, ভেলুর থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জলাতঙ্ক না-হওয়ার অভয় দিয়ে শরৎচন্দ্র একটা গল্প বলতেন। তা হল: রাস্তা দিয়ে এক ভদ্রলোক হেঁটে যাচ্ছিলেন। একতলা ছাদ থেকে লাফ মারে ভেলু। ঘ্যাঁক করে এক কামড়। পায়ের এক খাবলা মাংস তুলে নিয়েছিল সে। আক্রান্ত লোকটিকে ডেকে শরৎচন্দ্র বুঝিয়ে-সুুঝিয়ে ১০ টাকা দিয়ে বিদায় করেছিলেন। তারপর তিনি ভেলুকে পাঠিয়েছিলেন ট্রপিকালে লালারস পরীক্ষার জন্য। এবং সেই পরীক্ষায় ভেলু সসম্মান উত্তীর্ণ হতে পেরেছিল। এরপর থেকে ভেলুকে শরৎচন্দ্র বছরে দু’বার ট্রপিকালে লালারস পরীক্ষা করতে পাঠাতেন। কারণ সবসময়ই ভেলু লেখকের আদর খাওয়ার জন্য কোলে-গায়ে উঠে পড়ত। আদরের আঁচড়-কামড় স্বয়ং শরৎচন্দ্রকেও কম খেতে হয়নি!

এই বাজে শিবপুরে থাকার সময়ই ভেলু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ১৯২৫ সালের ১০-১১ এপ্রিল শরৎচন্দ্রকে ঢাকার মুন্সিগঞ্জের সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্বের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আদরের ভেলুকে অসুস্থ অবস্থায় রেখেই মুন্সিগঞ্জে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ঢাকা থেকে যখন সম্মেলন শেষ করে বাড়ি ফিরে আসেন, তখন ভেলু আরও অসুস্থ। যথেষ্ট চিকিৎসা সত্ত্বেও ভেলুকে আর বাঁচানো যায়নি। এ-ঘটনা শরৎচন্দ্রকে ভীষণভাবে কষ্ট দিয়েছিল। যার বিবরণ আমরা তাঁর মামা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে দেখি। ২৮ এপ্রিল, ১৯২৫ সালের সেই চিঠিতে লেখা, ‘শরীরটা তেমন সুস্থ নয়। ভেলু বেঁচে নেই। গত বৃহস্পতিবারের আগের বৃহস্পতিবার আমি ঢাকা থেকে সকালে এসে পৌঁছই। তখনি বেলগেছে হাসপাতাল থেকে তাকে মোটর করে বাড়ী আনি। এসেই সে অত্যন্ত পীড়িত হয়ে পড়ে।সাতদিন সাত রাত খাইনি, ঘুমাইনি– তবুও পরের বৃহস্পতিবার ভোর ৬টার সময় তার প্রাণ বার হয়ে গেল। শেষ দিনে বড় যন্ত্রণা পেয়েই সে গেছে।’

zoom

আসলে শরৎচন্দ্রের পশুদের প্রতি প্রেম ছিল ভীষণ গভীর। তা না-হলে কি তিনি ‘মহেশ’-এর মতো চোখে জল আনা গল্প লিখতে পারতেন? মহেশ’ গল্পে গফুর যেমন মহেশকে সন্তানস্নেহে লালন-পালন করেছিলেন, তেমনই বাস্তব জীবনে ভেলুকে তিনি সন্তানস্নেহে বড় করেছিলেন। ভেলু মারা যাওয়ার পর তিনি বহু দিন কোনও কুকুর পোষেননি।

যদিও, কিছু সময় পর, শরৎচন্দ্রের কাছে আরেকটি কুকুর পোষ মানেযার নাম ছিল: বাঘা।

bengali literature Indian Author Pet Dog Pet Lover Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sarat Chandra Chattopadhyay

Share this article on