‘নাগরিক’ যে হলিউডে প্রচলিত গতিচিত্রের সাম্যাবস্থা দেখাতে পারেনি, অথবা দেখাতে যায়নি, তার একটি মস্ত কারণ, ঋত্বিক সামাজিক অস্থিতির দিকে তর্জনী নির্দেশ করতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর আখ্যানকে বরং আমরা প্রেমেন্দ্র মিত্রের তীব্র বাক্যগঠন ও সন্দিগ্ধ জলবায়ুর সঙ্গে তুলনা করতে পারি। যদিও ‘নাগরিক’ ছবিতে প্রেমেন্দ্র মিত্রের পারিপাট্য ছিল না, তবু মধ্যবিত্ত জীবনের ভাঙচুর ও অধোগমনের প্রতিচিত্রণ আধুনিক বাংলা গদ্যকারদের মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্রকেই বেশি মনে পড়ায়।
কী যে রহস্য আছে, ১৯৫২ সাল বছরটার মধ্যে! ভেবে দেখছিলাম, এই বছরেই উত্তমকুমারের ‘বসু পরিবার’ ও ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘নাগরিক’ মুক্তি-আসন্ন ছবির তালিকায় ছিল। ‘নাগরিক’ মুক্তি পায়নি কিন্তু একটা জরুরি অনুষঙ্গ রেখে গিয়েছে আমাদের জন্য। উত্তমকুমার যেমন আধুনিকতার জননন্দিত দিকটি উন্মুক্ত করেছিলেন, তেমনই শিল্পের দিক দিয়ে হয়তো ঋত্বিকের ‘নাগরিক’ সমর সেনের থেকে একটু ভিন্ন পথে গিয়ে, উত্তর-স্বাধীনতা পর্বে শিল্পের গতিপথ বুঝতে চেয়েছিল। এই যে এ বছর এসআইআর হয়ে গেল, তাতে অন্তত বোঝা গেল, আমাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে অনুসন্ধান এখনও অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছে। ঋত্বিক কি নবীন নাগরিকতার জন্য কোনও ছাড়পত্র প্রত্যাশা করেছিলেন?

এখানেই আমার মনে হয়, যেভাবে আমরা ঋত্বিক ঘটককে ভারতীয় আধুনিক চলচ্চিত্রের প্রথম পথিক ভাবি, বা যেভাবে আমরা এই ছবিটিকে রাজনীতিগতভাবে অগ্রণী ভূমিকায় দেখি, শুধুমাত্র ইন্টারন্যাশনাল গানের প্রয়োগে নয়, সমস্যাপটের আধুনিকীকরণেও তা বোধহয় যথেষ্ট নয়। এখন মনে হয়, ‘নাগরিক’, সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখা এক শহরবাসীর ইতিকথা। আধুনিকতার উপপাদ্যটিই ঋত্বিক অন্যভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন। ঋত্বিকের নায়ক রামু সত্যজিৎ রায়ের অপুর তুলনায় অনেক মলিন-লোকের বাসিন্দা। একটু চেষ্টা করলেই বোঝা যায়– ঋত্বিকের ইতিহাস পাঠ ভিন্ন গোত্রের। এই তর্কটিকে একটু বাড়ালে অবশ্য উত্তমকুমারের ‘শাপমোচন’-এর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের অপু পর্যায়ের তুলনা করা যায়। তবু তা আমাদের তত আলোচ্য নয়, আপাতত দেখছি ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রে অপূর্ব কুমার রায় শহরে পা দিয়েই রিসান রোড ও ট্রামলাইন, বিদ্যুৎবাতি ও মুদ্রণালয়, রসায়নাগার ও শ্রেণিকক্ষের মধ্য দিয়ে নগরায়নের সঙ্গে, শিল্প সভ্যতার সঙ্গে প্রগতির একটি সামতলীয় ও রৈখিক যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছিল। অপরদিকে রামু শহরের হৃতচক্ষু ও নিরাশার প্রবেশ দেখতে পায়। উত্তর-ঔপনিবেশিক আবহে নাগরিক জীবনযাত্রার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য নাগরিকতা বিষয়েও দু’রকম মনোপ্রবণতার রেখাচিত্র উপহার দিয়েছে। এরকম ভাবা যেতেই পারে যে, মার্কসবাদী চেতনা, বিশেষত সোভিয়েত ‘নির্মাণবাদী’ ঐতিহ্য ঋত্বিকের দৃশ্যবিন্যাসকে অন্যদিকে নিয়ে যায়, কিন্তু একইসঙ্গে মেনে নিতে হবে– ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রজীবনে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির অনিশ্চিত সম্পর্ক ও দোলাচল ‘নাগরিক’ ছবি থেকেই ধরা পড়তে শুরু করেছে।

এ ছবি যে হলিউডে প্রচলিত গতিচিত্রের সাম্যাবস্থা দেখাতে পারেনি, অথবা দেখাতে যায়নি, তার একটি মস্ত কারণ, ঋত্বিক সামাজিক অস্থিতির দিকে তর্জনী নির্দেশ করতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর আখ্যানকে বরং আমরা প্রেমেন্দ্র মিত্রের তীব্র বাক্যগঠন ও সন্দিগ্ধ জলবায়ুর সঙ্গে তুলনা করতে পারি। যদিও ‘নাগরিক’ ছবিতে প্রেমেন্দ্র মিত্রের পারিপাট্য ছিল না, তবু মধ্যবিত্ত জীবনের ভাঙচুর ও অধোগমনের প্রতিচিত্রণ আধুনিক বাংলা গদ্যকারদের মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্রকেই বেশি মনে পড়ায়। বাস্তবিক ঋত্বিকের প্রথম ছবি দেশবিভাগের সমস্যাকে আক্ষরিক অর্থে স্পর্শ করেনি। কিন্তু আরও গভীরভাবে শিকড়ের উন্মীলনকে উপজীব্য ভেবেছে।

এখানে স্বপ্নের একটি পলকা আস্তরণ ছিল, কিন্তু তা যে পলকা তা বোঝার জন্য আমাদের কোনও উন্নত মেধার আশ্রয় নিতে হয় না। আমরা পরিণতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে রাখি। ক্যামেরার চলাচল, চরিত্রদের অবস্থান ও সংলাপ বোঝায় যে, সংশ্লিষ্ট শিল্পী একটি অতিরিক্ততার তটরেখায় নোঙর ফেলেছেন, কেননা তাঁকে একটি বক্তব্যের আলোকবিন্দুতে পৌঁছে যেতে হবে। পাঠককে আমি অনুরোধ করব অনুমান করতে যে, কেন ঋত্বিক ঘটক বাস্তবের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছেন! তাঁর একটি বক্তব্য রয়েছে। ও সেই বক্তব্যকে তিনি অবিরত নানাভাবে নিম্নলেখ করতে চান। এজন্যই হয়তো ঋত্বিকের নির্মাণে বাংলা সিনেমার প্রচলিত উপকরণ নজরে পড়ে না। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে অভিব্যক্তিবাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

একজন মার্কসবাদী শিল্পী দৃশ্যভাষার সঙ্গে শব্দভাষায় সমানাধিকার দাবি করছেন, এ-ও কি অভিনব নয়? মৃত্যুর ধাতব পদধ্বনি অথবা আরও কিছু কোলাহল এবং আরোহী ও অবরোহী বাকপ্রতিমা প্রমাণ করে– তরুণ ঋত্বিক মানুষের প্রকাশ-ক্ষমতার প্রসঙ্গে, চিত্রিত ভাষার সর্বজনীনতা সত্ত্বেও শব্দসরণীকে গৌণ মনে করেন না। আমি এ প্রসঙ্গে ১৯২৮ সালে আইজেনস্টাইন, পুদাভকিন, আলেকজান্দ্রাভের শব্দ-সম্পর্কিত ইস্তাহারের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করব, যেখানে বিপ্লবোত্তীর্ণ সোভিয়েত ভূমিতে তাঁরা এমন একটি চলচ্চিত্রীয় সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন– যা শুধু শব্দকে ছবির সমান গুরুত্বই দেবে না, উপরন্তু অনুমতি দেবে ইমেজ নিরপেক্ষ আত্মপ্রকাশে। জাঁ লুক গোদারও ১৯৬২ সালের অব্যবহিত পরে সাউন্ড ট্র্যাকের প্রামাণ্যতা সম্পর্কে জোরালো আস্থা জানিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচের দশকের শুরুতে ঋত্বিক ঘটক, এ ছবির সহস্র দুর্বলতা মেনে নিয়েই বলব, একটি অনন্যসাধারণ ব্যতিক্রমের সূত্রপাত করলেন। এই পার্থক্যকে শুধু বাংলা ছবির চিরাচরিত সংলাপ-প্রাধান্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ঠিক নয়। ঋত্বিকের শব্দপটে মিশ্র স্বর ও নানারকম ধ্বনিসমন্বয়ের প্রয়াস ছিল। সত্যজিৎ রায় ও তাঁর সুখ্যাত বন্ধুরা যেভাবে নির্বাক ছবির দৃশ্যমাত্রায় ‘সম্ভাবনা’ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যেভাবে লুকোনো ধ্বনিপথ তাঁদের কাছে দৃশ্যের একরকমের স্বয়ম্ভরতা রচনা করেছিল, সেভাবে ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্রকে দেখতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। তিনি প্রথম থেকেই একাকী পদাতিক, আমাদের সিনেমার পরিধি এ জন্যই তাঁকে ধারণ করতে অস্বস্তি বোধ করে।

দীনের তুচ্ছতা, লোভের গ্লানি ও স্বার্থের দহন কীভাবে তুচ্ছ হয়ে যায় বেহালার নির্জন সংলাপে! আমি তো এতদিন খেয়ালই করিনি, তারকভস্কির প্রথম ছবিও ‘স্টিম রোলার ও ভায়োলিন’: বেহালায় ছর ও যন্ত্রের ধ্বনি আমাদের জন্য এক বিমূর্ততার পরিসর এঁকে দেয়। এই ছবি থেকেই বোঝা গিয়েছিল, ঋত্বিক ধ্বনির সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved