

ধামসার শব্দ, নাচের ছন্দ, শালকাঠের গন্ধ, মেলার ভিড় আর আকাশছোঁয়া সাদা ছাতার ছবি থেকে যায় স্মৃতিতে। যে উৎসবের গড়ন, রীতি– রাজপরিবারের দরবার ছাড়িয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। একদিকে বৃষ্টির জন্য মানুষের প্রার্থনা, অন্যদিকে শস্যের জন্য কৃতজ্ঞতা; একদিকে রাজপরম্পরার স্মৃতি, অন্যদিকে আদিবাসী সমাজের মিলনক্ষেত্র; একদিকে পুরাণ ও লোকবিশ্বাস, অন্যদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সম্পর্ক– সব মিলিয়ে ছাতা পরব বাংলার জীবন্ত লোক-ঐতিহ্য।
প্রচ্ছদের ছবি: মোহন পরামাণিক
ভাদ্রের শেষ বিকেল। পুরুলিয়ার চাকলতোড়ের মাঠের চারপাশে তখন মানুষের ঢল। কোথাও ধামসার দ্রিম দ্রিম শব্দ, কোথাও মাদলের ছন্দ। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝুমুরের সুর। মেয়েদের পরনে রঙিন শাড়ি, মাথায় গোঁজা ফুল। মেলার সারি সারি দোকানে সাজানো ধামসা-মাদল। প্রসাধনী দ্রব্য থেকে হাঁসমুরগি, হাঁড়িয়া, মহুল, মদ, আসবাবপত্র থেকে আনাজপাতি– বিবিধ পসরার উপস্থিতি এই পরবের মেলায়। আর সেই বিপুল জনসমুদ্রের মাথার ওপর আকাশ ছোঁয়া এক বিশাল সাদা ছাতা। এই ছাতা বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার ছাতা নয়। এ ছাতা বৃষ্টি ও শস্যকামনার প্রতীক, রাজশক্তির স্মৃতি, লোকবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং আদিবাসী জনজীবনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। পুরুলিয়ার চাকলতোড়ের ছাতা পরব তাই শুধু একটি মেলা নয়। এটি মানভূমের লোকস্মৃতির এমন এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে পুরাণ, কৃষিজীবন, রাজপরম্পরা এবং আদিবাসী জনজাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক যাপন।

বাংলার লোকজীবনে ছাতা মানে আশ্রয়, ভরসা। সেই অর্থেই হয়তো ছাতা পরবের প্রতীকী তাৎপর্য আরও গভীর। শালকাঠের দণ্ডের মাথায় বাঁশের কাঠামোয় সাদা কাপড়ে তৈরি যে ছাতা তোলা হয়, তা লোকবিশ্বাসে কখনও ইন্দ্রদেবের ছাতা, কখনও বিজয়ের প্রতীক, কখনও বা প্রজাদের রক্ষার প্রতীক।
পুরুলিয়া শহর থেকে ১৭ কিমি দূরে চাকলতোড়। চাকলতোড়ের মাঠে বিশাল শালকাঠের ম্যারাপ বাঁধা। একটা বিশাল শালকাঠের দণ্ডের মাথায় বাঁশের কাঠামো। সেই বাঁশের আগায় বানানো হয় সাদা মখমল কাপড়ে মোড়া ছাতা। ম্যারাপের মাঝেই কপিকল পদ্ধতিতে আটকে ছাতাটাকে পতাকার মতো উঁচুতে খাড়া করে তোলা হয়। যেখানে ছাতা উত্তোলন হয়, সেই স্থানকে ‘ছাতাটাঁড়’ বা ‘ছাতামাড়’ বলে। পুরোহিতমশাই ওই শালের গুঁড়ির নিচে বসে কুলদেবতার পুজো করেন। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী ভাদ্র সংক্রান্তির বিকেলে রাজপরিবারের উত্তরসূরি যখন রাজবেশে ছাতাটাঁড়ের দিকে আসেন, তখন হাজার হাজার মানুষের চোখ তাঁর দিকে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ ফুল ও দুর্বাঘাস ছুড়ে তাঁর মঙ্গল কামনা করেন। কাঁসর, ঘণ্টা, শঙ্খ, শিঙা, ধামসা, মাদলের তালে তালে আকাশ-বাতাস মুখরিত। পরনে রাজবেশ, মাথায় উষ্ণীষ, পায়ে নাগরাই, কোমরবন্ধে ঝুলছে কৃপাণ, হাতে খোলা তলোয়ার– রাজকীয় সাজে তাঁর আগমন আজও উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। একসময় ঘোড়া বা পালকিতে আসার রীতি থাকলেও এখন সেই জায়গা নিয়েছে গাড়ি।
ছাতা তোলার মুহূর্তটি যেন সমগ্র পরবের নাটকীয় চূড়ান্ত দৃশ্য। রাজা প্রথমে দেবরাজ ইন্দ্রকে স্মরণ করে ছাতার চারপাশ ঘোরেন। পরপর তিন পাক। তারপর সাষ্টাঙ্গে কুলদেবতাকে প্রণাম করেন। রাজার সঙ্গে উপস্থিত সকলেও প্রণাম জানান। তারপর রাজা হেঁটে উঁচু একটা বেদির ওপরে ওঠেন। একটা সাদা রুমাল ওড়ার সংকেতের সঙ্গে সঙ্গে শালকাঠের কাঠামোর সাহায্যে বিশাল সাদা ছাতা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠে যায়। চারপাশে তখন হাততালি, ধামসা-মাদল ও মানুষের উচ্ছ্বাস। কোনও সংস্কৃত মন্ত্রপাঠ নয়। নিজস্ব ভাবনা এবং স্বতন্ত্র ঘরানার মিশেলে হয় পুজো। পরেরদিন বিকেলবেলা নামানো হয় ছাতা। ছাতা তোলেন ক্ষত্রিয় রাজবংশের উত্তরসূরি, কিন্তু মেলার প্রাণ আদিবাসী সমাজ। এই আপাত বৈপরীত্যই চাকলতোড়ের ছাতা পরবকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। রাজদণ্ড নেই, রাজ্যপাট নেই, প্রজাশাসনের সেই পুরনো কাঠামোও নেই। কিন্তু এখনও টিকে আছে রীতির মূল রূপরেখাটি। উৎসবের আচার তাঁকে একদিনের জন্য আবার ‘রাজা’ করে তোলে। ইতিহাসে রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে, রাজা এখানে আর শাসক নন। তিনি উৎসবের একটি প্রতীকী চরিত্র– যাঁর হাত দিয়ে ছাতা ওঠে, আর সেই ছাতার নিচে একত্রিত হয় জনসমাজ। এখানেই ছাতা পরবের এক আশ্চর্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।
আসলে ছোটনাগপুর মালভূমি এলাকার প্রচলিত বিশ্বাস, বৃষ্টি কামনার অনুষ্ঠানই ‘ছাতা পরব’। শুধু মানভূম নয়, বরাভূম, ধলভূম, সিংভূম, ভঞ্জভূম, মল্লভূম এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লৌকিক উৎসব এই ছাতা পরব। ছোটনাগপুর মালভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টি ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত নানা লোকাচারের মধ্যে ইঁদ ও ছাতা পরবের অবস্থান। মল্লরাজ্যে ইঁদকে বলে ‘সনপেটা’। আর বরাবাজারে ‘সুনিয়া’। ভাদ্রের শুক্লা দ্বাদশীতে ইঁদপরব আর সংক্রান্তিতে ‘ছাতা পরব’ আয়োজিত হয়।

লোকব্যাখ্যা অনুসারে, ‘ইন্দ্র’ থেকেই স্থানীয় উচ্চারণে ‘ইঁদ’ শব্দটির উৎপত্তি। ছাতা পরবের উৎস সন্ধানে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় এই পুরাণগাথা। একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ মাসে রোহিণী নক্ষত্রের আবির্ভাবের সময় বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্র মর্ত্যে আসেন। টানা তিনমাস বৃষ্টিতে শুষ্ক পৃথিবী শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠে। ভাদ্রের পূর্ণিমা তিথিতে ইন্দ্র ফিরে যান স্বর্গে। ছাতা পরব আসলে স্বর্গের ইন্দ্র দেবতার কাছে মর্ত্যের রাজাদের আনুগত্য প্রদর্শন। ‘টাঁড়’ বলতে বোঝানো হয় অপেক্ষাকৃত শুকনো, বিস্তৃত জমি– যে জমিতে জল না এলে কৃষি সম্ভব নয়। ফলে বৃষ্টির দেবতার প্রতি প্রার্থনা কৃষিজীবী মানুষের কাছে নিছক ধর্মীয় আচরণ নয়, জীবনেরই প্রয়োজন।
কিন্তু ছাতা পরবকে শুধু ইন্দ্রপূজা হিসেবে দেখলে এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চোখ এড়িয়ে যায়– বৃক্ষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। বিশাল শালকাঠের দণ্ডের উপর ছাতা তোলার রীতি উৎসবের কেন্দ্রীয় অংশ। আদিবাসী সমাজে শালগাছের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। সেই অর্থে ছাতা পরব শস্যোৎসবের পাশাপাশি বৃক্ষপূজার উৎসব ও বৃষ্টির কামনার উৎসব। এখানে প্রকৃতি নিছক পটভূমি নয়। বৃষ্টি, মাটি, শস্য, বৃক্ষ এবং মানুষের জীবন– সব কিছু মিলিয়েই উৎসবের অর্থ তৈরি হয়।
পুরুলিয়া অঞ্চলের রাজারা এই উৎসবকে নিজেদের কায়েমী স্বার্থের পরিচয়বাহী করে তুলেছে জনমানসে। ইঁদপরব আসলে ছিল স্থানীয় রাজার আধিপত্য ও প্রভুত্ব ঘোষণার উৎসব। তরুণদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন–
“রাজা পালন করতেন ইঁদ, ভূস্বামীরা পালন করেন ছাতা পরব। ইঁদে জাঁকজমক ছিল বেশী। পরবের কদিন আগে সপারিষদ রাজা বেরুতেন শিকারে। বাছাই করতেন ইন্দ্রদণ্ড বা ইঁদ-ডাং করার মত উপযুক্ত গাছ। পূজা করার পর কুড়ুল দিয়ে রাজা আগে আঘাত করতেন গাছটিকে। পারিষদেরা পরে সেটি কেটে এনে তুলতেন ইঁদটাড়ে। সাধারণত গাছটি হত দীর্ঘ ও ঋজু শালবৃক্ষ । ইঁদ-ডাংয়ের মাথায় বাঁধা হত কাপড় দিয়ে মোড়া বাঁশের ছাতা। পরবের দিনে ছাতাসহ দণ্ডটি উত্তোলিত করতেন রাজা। সমবেত সুরে গান হত,
‘রাজার বিটির ইঁদ আর হামদের জাওয়া গো
ডেগে ডেগে পঞ্চডেগে উঠে রাজার ইঁদ গো
কে কে যাবে ইঁদ দেখতে হামরা দিব কড়ি গো
ভেগে ডেগে পঞ্চডেগে উঠে রাজার ইঁদ গো!’…”

পুরুলিয়া জেলায় বরাবাজারের ইঁদ এবং চাকলতোড় ও বোঙ্গাবাড়িতে ছাতা পরব প্রসিদ্ধ। এই পরবের শুরুর কাহিনিও অবশ্য একরৈখিক নয়। এক মুখ থেকে অন্য মুখে এই লোকগাথা বদলাতে থেকেছে নদীর বহমান স্রোতের মতো। এই কাহিনিতেও মিশেছে নানা রং, পাঠান্তর। কিন্তু, এটি কোনও গল্পকথা নয়, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময় ও ঐতিহাসিক চরিত্ররা। কথিত আছে, বর্তমান পঞ্চকোট রাজবাড়ির প্রজন্মের পূর্বসূরি জনৈক শত্রুঘ্ন প্রসাদ সিংদেও আজ থেকে বহু বছর আগে এটির সূচনা করেছিলেন। সেসময় হানাদার বর্গীর দল গ্রামে ঢুকে আক্রমণ করে লুঠ করে নিয়ে যেত হাঁস মুরগি গরু ছাগল সবকিছুই। এমনকি মহিলা-সহ ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকেও। লুটপাটের পর চারিদিকে শ্মশান হয়ে যেত। তখন স্থানীয় মানুষজন– মাঝি, মাহাতো, আদিবাসীরা সমবেত হয়ে রাজার কাছে নালিশ জানায়। রাজা তখন সকলকে বটগাছের তলায় জড়ো হতে নির্দেশ দেন। সবাই হাজির। এদিকে বর্গীরা আসতেই রাজার আদেশে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্গীদের ওপর। বহু আদিবাসী প্রাণ হারান। কিন্তু বন্দি হওয়ার পর বর্গী সর্দার সন্ধির আহ্বান জানান। রাজা রাজি হন প্রজাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তিনি একটা উঁচু মঞ্চ তৈরি করে ঐ বৃদ্ধ বটবৃক্ষকে সাক্ষী রেখে শান্তি ঘোষণা করেন। তাঁর এই শান্তির বাণী যাতে সবাই জানতে পারে, সেজন্য খুব উঁচু একটা দণ্ডের মাথায় ছাতা বেঁধে দেওয়া হয়। যাতে অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। এই ‘ছাতা’ আসলে রাজার দৃপ্ততা, প্রজাদের নিরাপত্তা রক্ষা, শৌর্য, বীর্য এবং প্রজাদের প্রতি চরম আনুগত্যের প্রতীক হয়ে বিরাজমান। এখন যে মাঠে ছাতা পরব হয় সেটির নাম ‘ছাতা মাঠ’। জানা যায়, বর্গীনেতা ভাস্কর পণ্ডিত এখানে ছাউনি ফেলেছিলেন ১৭৪৩ সালে। তাই? ইনিই কি সেই বর্গীনেতা?
কারও কারও অভিমত, অনেক কাল আগে চাকলতোড়ের রাজা শত্রুঘ্ন প্রসাদ সিংদেও পরাজিত করেছিলেন ভূমিজ সর্দার রাজা গঙ্গানারায়ণ সিংদেওকে। তারপর গঙ্গানারায়ণের অনুগত সৈন্যসামন্ত, ভূমিজ, সর্দার, আদিবাসী প্রজারা শত্রুঘ্নর ছত্রছায়ায় আসেন। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও প্রতি বছর ভাদ্র সংক্রান্তিতে এই চাকলতোড়ের রাজা ছাতা উত্তোলন করেন।
ছাতা পরবের শুরুর বিষয়ে আরও ভিন্ন মত রয়েছে। একসময় পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজবংশের কোনও এক রাজা যুদ্ধে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ফিরে আসেননি বহুদিন। সবাই চিন্তিত। তাহলে কি কোনও দুঃসংবাদ মিলতে চলেছে? অবশেষে ভাদ্র সংক্রান্তির দিন রাজার যুদ্ধ জয় করার খবর এল রাজবাড়িতে। আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল রাজ্যে। রাজার যুদ্ধজয়ের বিজয়বার্তা প্রজাদের বাড়িতে বাড়িতে পৌছে দিতে সেদিন উঁচু দণ্ডের মাথায় সাদা কাপড়ের ছাতা তোলা হয়েছিল। পঞ্চকোট রাজবংশের অন্যতম উত্তরপুরুষ সোমেশ্বর লাল সিংহ দেও-এর কথা থেকে জানা যায়, ‘পঞ্চকোটের রাজারা খুবই প্রজাবৎসল ছিলেন। তাই যখন রাজার বিজয় উৎসবের খবর রাজ্যে পৌঁছল, তখন সকলে মিলে আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। আর এই ছাতা সাদা রঙের। আমাদের কুলদেবতা শ্যামরঘুবর। তাঁর ছাতার রংও সাদা। সেই ছাতা তুলেই বিজয়ের খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।’ তিনি জানান, পরবর্তী কালে পঞ্চকোট থেকে এই উৎসব চাকলতোড়ের রাজাদের কাছে চলে যায়। ইতিহাস বলছে, পঞ্চকোটের রাজধানী যখন কাশীপুরে স্থানান্তরিত হয়ে এসেছিল, তখন এখানেই ভাদ্র সংক্রান্তিতে ছাতা তোলা হত। আজও কাশীপুরে ‘ছাতামাড়া’ নামে একটি জনপদ রয়েছে।

পুরুলিয়ার অন্যতম লোকগবেষক, ড. সুভাষ রায় ছাতা পরবের সূচনালগ্ন সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক কাহিনির সন্ধান দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, পঞ্চকোটরাজ নীলমণি সিংদেও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁরই নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ৫ আগস্ট পুরুলিয়ার মানুষ বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। ট্রেজারি থেকে ১ লক্ষেরও বেশি টাকা লুঠ হয়। দু’-তিনশো কয়েদিকে জেল থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ইংরেজরা পুরুলিয়া থেকে পালিয়ে গিয়ে রানীগঞ্জে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ ২৩ দিন পুরুলিয়া জেলা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়। ঠিক একই সময়ে সাঁওতালরাও ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই সাঁওতাল শক্তিকে কাজে লাগান নীলমণি সিংদেও। সকলেই সম্মিলিতভাবে ব্রিটিশদের বিরোধিতা করে। প্রচলিত কথায় শোনা যায়, ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে পঞ্চকোটরাজ-এর নির্দেশে হাজার হাজার সাঁওতাল আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই সমবেত হন এই চাকলতোড়ের বিস্তীর্ণ মাঠে। তাঁরা সকলেই শপথ নেন সমবেত আন্দোলনে নামার। এবং এই দিনটিতে সমস্ত সাঁওতাল সমাজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন প্রতি বৎসর তাঁরা এই দিনটিতে রাজার সঙ্গে মিলিত হবেন। এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৮৫৭ সাল থেকে সমানভাবে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ছাতার মাঠের পাশেই আছে ছাতা পুকুর। সেই নিয়েও আদিবাসী সমাজে নানা গল্প প্রচলিত। জনশ্রুতি রাজা লাল সিংদেও-এর পূর্বপুরুষরা যখন এই পুকুর খনন করছিলেন, তখন সেই পুকুরের মাঝখান থেকে একটি সোনার ছাতা ভেসে ওঠে। ওইটিই আজকের ছাতার উৎস।
আগে ছাতা তোলার পর সম্ভাব্য কৃষিকাজ সম্পর্কে খোঁজ নিতেন রাজা, বেঁধে দিতেন খাজনা। রাজগুরু, রাজপুরোহিত-সহ সমাজের বিশিষ্টজনেরা রাজাকে ১৬ আনা খাজনা দিয়ে ফসলি সনের সূচনা হয়েছিল। রাজা তার পরিবর্তে সকলকে পান, মিষ্টি বিতরণ করে রাজগুরু, রাজপুরোহিতকে তার দ্বিগুণ অর্থ ফেরত দিতেন।
প্রচলিত বর্ণনায় চাকলতোড়ের ছাতা পরবের বয়স প্রায় ৫০০ বছর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের কাঠামো বদলেছে। আগে মেলা ছিল তুলনায় কম সংগঠিত। দেশীয় রাজার সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নানা বিষয়ে মতভেদও হয়েছে। আনুমানিক ১৯৮২ সাল থেকে কমিটি গঠনের মাধ্যমে মেলা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেলার ব্যাপ্তির সঙ্গে বদল হচ্ছে মেলা-পরবের চরিত্র। যে কারণেই পরবের প্রচলন হোক না কেন, চাকলতোড়ের ছাতা পরব আজ আদিবাসী মানুষদের মিলনক্ষেত্র এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের অন্যতম স্থান।

চাকলতোড়ের ছাতা পরবের প্রকৃত প্রাণ হাজার হাজার আদিবাসী মানুষের সমাগম। ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে গোধূলিবেলায় কাঁসাইপার পরগনার চাকলতোড় ছাতা-ময়দানে রাজদর্শনের জন্য ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ। সাঁওতাল নারী-পুরুষ, শিশু, প্রবীণ– দল বেঁধে কেউ হাঁটছেন, কেউ সাইকেলে, কেউ বাস বা ছোট গাড়িতে করে আসছেন। কেউ আগের রাতেই এসে থেকে যাচ্ছেন। ভিড়ে মিশে থাকে লাগোয়া ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, এমনকী ছত্তিশগড় থেকে আসা মানুষও। তাই লোকমুখে ফেরে– ‘বরাবাজারের ইঁদ আর চাকলতোড়ের ছাতা রে/ মেলা দেখিতে লোক চলে কাতারে কাতারে।’ ছাতা পরব উপলক্ষে ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে রাজদর্শনের এই প্রথা আবহমানকাল ধরে চলে আসছে বাংলার প্রান্তিক এই জেলায়।
ছাতা পরবের মাঠে ধর্মীয় আচার শেষ হলেই যেন আর একটি পৃথিবী খুলে যায়। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছোট-বড় নানা মাপের ধামসা-মাদলের পসরা। আদিবাসী শিল্প ও সংগীতের সঙ্গে এই বাদ্যযন্ত্রগুলির সম্পর্ক এতটাই গভীর যে মেলায় তাদের উপস্থিতি উৎসবের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। রাতভোর চলে নাচ গান। মেলার এক কোণে মঞ্চ বেঁধে হয় পুরুলিয়ার নাচনিদের অনুষ্ঠান। ধামসা-মাদলের ছন্দে দাঁড় নাচ, পাতা নাচ, ছৌ, ঝুমুর গানে মেতে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। মেয়েরা গেয়ে ওঠে–
‘তুমদা দুহলাও, বানাম রাহুলাও
ধমসা হুদড়াও নওয়া জীবন আধবাম
ঞাম– আ– আ।’
বাজুক বাঁশি, মাদল ও ধামসা, এই রঙিন দিন আর ফিরবে না। ভরা ভাদ্রে আদিবাসীদের ছাতা পরবের যৌথ নৃত্যে কাশফুলের দোলার ছন্দ জাগে।
ছাতা পরবের আর একটি বিশেষ সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। বিশাল শাল গাছের খুঁটির উপর বিরাট ছাতার নিচে সমবেত কয়েক হাজার আদিবাসী যুবক-যুবতীর জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই পরব তাদের কাছে ভালোবাসা আদানপ্রদানের একটি পবিত্র পার্বণ। জনৈক গ্রামবাসীর কাছে জানা যায় যে, ‘অযোধ্যা পাহাড়ে দিশুম সেন্দরা– যাঁকে কেউ কেউ শিকার উৎসব বলে থাকেন, তাতে অংশ নেওয়া যেমন আমাদের সমাজের পুরুষদের কাছে গৌরবের, তেমনই ছাতা পরবে সামিল হওয়া মেয়েদের কাছে সম্মানের। সাংস্কৃতিক এই উৎসবের ময়দান থেকে অনেকে জীবনসঙ্গিনীও খুঁজে নেন। এই প্রথা চালু রয়েছে আমাদের মধ্যে। আমাদের ভাষায় যাকে বলা হয় কুঁডেল-ঞাপাম।’ এখানে তাই মেয়েদের ভিড় বেশি। যেসব মেয়েরা অসুখী কিংবা শ্বশুরবাড়িতে স্থান পায় না কিংবা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে– মেলা প্রাঙ্গণে তারা খুঁজে বেড়ায় মনের মানুষকে। নিয়ম, লোকলজ্জা, মানসম্মানের ভয় সব কিছুই তখন তুচ্ছ হয়ে যায়। ছাতা পরবের ‘ছাতা’ যেন ঢাল হয়ে রক্ষা করে তাঁর ‘ভালোবাসা’। তরুণদেব ভট্টাচার্য লিখছেন– ‘শ্বশুরবাড়ি থেকে পালানো বধূদের হদিস পাওয়া যায় চাকলতোড়ের মেলায়। সেসব বধূদের ধরা হয় এখানে। এখানে ফুল ও সঁয়া পাতানোও চলে। মেলার মাঠে বন্ধুত্ব গ্রথিত হলে বজায় থাকে আজীবন।’ নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই দিকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে ছাতা পরবের মেলা হয়ে ওঠে পরিচয়, বন্ধুত্ব, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সামাজিক ক্ষেত্র। যেখানে মানুষ শুধু দেবতার উদ্দেশে নয়, বরং আসে নিজেদের সমাজের সঙ্গে, নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য। এভাবেই এই লোকউৎসব আজও জীবন্ত, কারণ মানুষ এই উৎসবকে শুধু দর্শন করে না– নিজের জীবন, সম্পর্ক, স্মৃতি ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বহন করে।

উৎসব শেষ হয়। মানুষ ফিরতে শুরু করে নিজেদের গ্রামে। কিন্তু মাঠের ধামসার শব্দ, নাচের ছন্দ, শালকাঠের গন্ধ, মেলার ভিড় আর সেই আকাশছোঁয়া সাদা ছাতার ছবি থেকে যায় স্মৃতিতে। যে উৎসবের গড়ন, রীতি– রাজপরিবারের দরবার ছাড়িয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। ছাতা পরবের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এখানেই। এটি একদিকে বৃষ্টির জন্য মানুষের প্রার্থনা, অন্যদিকে শস্যের জন্য কৃতজ্ঞতা; একদিকে রাজপরম্পরার স্মৃতি, অন্যদিকে আদিবাসী সমাজের মিলনক্ষেত্র; একদিকে পুরাণ ও লোকবিশ্বাস, অন্যদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সম্পর্ক– সব মিলিয়ে ছাতা পরব বাংলার জীবন্ত লোক-ঐতিহ্য। এই সব কিছুকে একত্রে গ্রথিত করেছে এক বিশাল সাদা ছাতা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved