


অন্ধকারের আড়ালে কত আশ্চর্য সত্য এই কয়েক বছরে কথা বলে গেল আমার সঙ্গে! সেই মুকুরটিলা, নারায়ণ কবিরাজ, সতী ভৈরবী ও তাঁর আশ্রম, মনু নদী, গড়ের পুকুর, ফ্রের আঁরি, অমল আশ্রম, দেবব্রতর মা মিতা বা মিতালি… কী অদ্ভুত সব জীবন। আমাদের পরিচিত পৃথিবীর বাইরে এদের স্বতন্ত্র অবস্থান। সুপরিচিত চিন্তা ও বস্তুর অবয়বের থেকে কত আলাদা এই সব অঘটন ঘটনা!
২৪.
‘আপনি কি সমস্তই স্বীকার করেছিলেন, ফাদার, রিকনসিলিয়েশনের সময়? স্বীকার করেছিলেন, আপনি ওই ছেলে দু’টিকে সে-রাত্রে আশ্রয় দিয়ে ভুল করেছেন?’
আমার প্রশ্ন শুনে পুনরায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফ্রের আঁরি। বললেন, ‘হ্যাঁ, স্বীকার করেছিলাম যে, আমি আলোক আর সুধীরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আমি ভুল করেছি কিংবা সেজন্য আমি অনুতপ্ত– এমন কিছুই আমি কর্তৃপক্ষের সামনে বলিনি। বরং বলেছিলাম, বিপন্নকে আশ্রয় দেওয়া আমার ধর্ম। শুধু ধর্ম বলেই নয়, এই ছাত্ররা আমার বন্ধু, আমার ঘনিষ্ঠ জন। এদের বিপদে আমি পাশে দাঁড়িয়েছিলাম বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। অনুরূপ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে উদ্ভূত হলেও আমি একই কাজ করব। অন্য কিছু করতে পারব না। এটাই আমি বলেছিলাম।’
‘তাহলে তো মুশকিল!’
‘হ্যাঁ, মুশকিল। মুশকিলই হল। আমাকে নিয়ে আমার সিনিয়ররা কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না প্রথমে। তারপর অনেক আলাপ-আলোচনা করে আমাকে তাঁরা নর্থ-ইস্ট বেল্টে পাঠিয়ে দেওয়া মনস্থ করলেন। আমাকে এই রাজ্যের রাজধানী-শহরে পাঠানো হল। ছোট একটা স্কুলে। তবু স্কুলে তেমন কোনও দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হল না। পরিবর্তে গ্রামেগঞ্জে নানা ধরনের সেবামূলক কাজকর্ম কি প্রচারকাজের জন্য আমাকে পাঠানো হচ্ছিল।’
‘এভাবেই আমতলিতে এসেছিলেন আপনি, ফাদার?’
‘ঠিক। এভাবেই আমি এসে হাজির হই আমতলিতে। আমতলিই শুধু নয়। আমতলি, কুলতলি, গড়ের পুকুর, ফুলকুমারী– আশেপাশের সবকটা গ্রামেই ঘুরে ঘুরে কাজকর্ম করেছি।’

‘সেটা কত সাল হবে আনুমানিক?’
‘সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। এদিকের অবস্থা তখন বেশ অন্ধকার। শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য-সচেতনতা নেই, চরম দারিদ্র আর কুসংস্কারে ভরে আছে গ্রামগুলো। প্রথমে আমার সেটাই মনে হয়েছিল। পরে ওই ধারণাটা পালটায়।’
‘পালটালো কেন?’ আমি সমুৎসুক হয়ে উঠি।
ফ্রের আঁরি বললেন, ‘দ্যাখো, মিশনারি সেবাব্রতীরা প্রায়শই মনে করে, সারা দুনিয়াটা অন্ধকারে ভরে আছে আর আলোর প্রদীপটি কেবল তাদের হাতেই রয়েছে। এবং দুনিয়া যেন তাদেরই সাহায্যের জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। আসলে এই জিনিসটা আমাদের শেখানো হয় ট্রেনিং-এর সময় থেকেই। অমনটা ভাবলে শরীরে মনে খুব একটা জোশ আসে আমাদের। কিন্তু বাস্তব ছবিটা তো তা নয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আমি বুঝেছি, আমরা যেগুলোকে অন্ধকার বলছি, সেগুলো হয়তো আছেই, কিন্তু সেগুলোর পাশাপাশি আলোও আছে অনেকটা– যা আমরা লক্ষ করতে ভুলে যাই…’
‘আলো?’
‘হ্যাঁ, আলো। সাধারণ মানুষের সরল আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, সহজ ব্যবহার, স্নেহকাতর মন, জীবিকানির্বাহ করার জন্যে তাদের উদয়াস্ত পরিশ্রমের ক্ষমতা– এগুলো আলো নয়? আমরা যেন সারাদিন বলে চলেছি কবিতার ভাষায়– মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও। সেকথা ঠিক। মানুষ কাঁদছে। কিন্তু তার পাশাপাশি সে হাসছেও হা-হা করে। গানও গাইছে মানুষ। এত যন্ত্রণার মধ্যেও মানুষের সেই স্বাভাবিক আনন্দময়তা মরে যায়নি। আচ্ছা ধরে নাও, কোনও-না-কোনও উপায়ে তুমি আজ থেকে হাজার দুয়েক বছর আগের সেই গ্যালিলি প্রদেশের ন্যাজারেথ গ্রামে গেলে…’
আমি বেশ চনমনে হয়ে উঠলাম ভাবনাটা শুনে। বললাম, ‘বেশ, গেলাম ন্যাজারেথে। তারপর?’
‘তা সেখানে গিয়ে তুমি কী দেখবে? রোমান শাসকদের নিপীড়ন, ট্যাক্স-কালেক্টরদের অত্যাচার, ধর্মযাজকদের ভুলভাল ধর্মব্যাখ্যা, সাধারণ মানুষের মুখ বুজে সব সয়ে যাওয়া আর মেশায়ার স্বপ্নে স্থবির, বিভোর হয়ে থাকা একটা অবনত সমাজ– এই সবই তো দেখবে তুমি। এগুলো অন্ধকার, আমি মানছি। কিন্তু তুমি যদি দেখতে ভুলে যাও, কীভাবে এত অবদমন সত্ত্বেও মানুষ আশা হারাচ্ছে না, রাতদিন খাদ্যবস্ত্রের জন্যে খাটাখাটনি করে চলেছে, কীভাবে এই দেশময় নিপীড়নের বিরুদ্ধে একজন জন দ্য ব্যাপটিস্ট উঠে দাঁড়িয়েছেন… যদি তুমি দেখতে ভুলে যাও, সত্যনিষ্ঠ একজন কার্পেন্টার ইয়োশেফের জীবন, তাঁর স্ত্রী সরলা মিরিয়মের পবিত্র বিশ্বাসভরা দিনযাপন… যদি ভুলে যাও মেরিতনয় ইয়েশুয়ার বালকরূপ… তাহলে তোমার দেখাটা খুব একপেশে আর বিফল হয়ে যাবে না কি?’
আমি ভাবতে লাগলাম। কথাটা বেশ ভালোই বলেছেন ফাদার। আমরা প্রায়শই এই যে সমাজের কালো একটা ছবি আঁকি, তার নেপথ্যে সক্রিয় থাকে আমাদেরই প্রবল অহংকার। আসলে ওই অন্ধকার ছবি এঁকে প্রায়শই অন্ধকারকেই আমরা ভ্যালিডেট করতে চাই, অন্ধকারকেই স্থায়ী করে রাখতে চাই। যেন আলো কেবল আমাদেরই মধ্যে আছে। আর সেই আলো আমাদের চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়ে জগৎকে ধন্য করতে হবে। ওই আলোক-বিকিরণের পূর্বশর্ত হল জগৎ অন্ধকারে ডুবে আছে, এটা ধরে নেওয়া। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তা তো পুরোপুরি সত্যি নয়। মানুষের উপকার করতে গিয়ে নিজেদেরই হৃদয়ের বিস্তার ঘটে আমাদের, নিজেদেরই যথার্থ উপকার করি আমরা।
আমার চিন্তার মাঝখানেই কথা বলে উঠলেন ফ্রের আঁরি, “এক কথায়, এই সব দেখতে দেখতে আমি স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রেমে পড়ে গেলাম। মানুষের সঙ্গে আমার এতটা মেশামেশি চার্চ-কর্তৃপক্ষ ভালো চোখে দেখছিল না মোটেই। এর আগে আমার কলকাতার জীবনে তো একটা দাগ লেগে ছিলই; আমি পুলিশের তাড়া-খাওয়া ছাত্রদের আশ্রয় দিয়েছিলাম বলে। অন্যদিকে আমারও আর ভালো লাগছিল না চার্চের জীবনের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি। মনাস্ট্রিতে যেন সেই একই চাকা প্রতিদিন একইভাবে মন্থরগতিতে ‘ক্যাঁচর-ক্যাঁচর’ শব্দে ঘুরে চলেছে। ওখানে নিরাপত্তা আছে, কিন্তু স্বাধীনতা অণুমাত্র নেই। আমি জাতে ফরাসি। আমাদের রক্তের মধ্যেই আছে– লিবারতে, এগালিতে, ফ্রাতারনিতে। স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী। অনেক ভাবলাম আমি। শেষে স্থির করলাম, চার্চ ছেড়ে বেরিয়ে যাব। এইসব মানুষের মধ্যে থাকব। এদেরই জন্যে কিছু করব আমার সীমিত সাধ্যানুসারে।”
‘সেই থেকেই কুহুডাঙায় এলেন?’
“হ্যাঁ, এলাম। প্রথমে কাজ ছোট করেই আরম্ভ করেছিলাম কয়েকজনকে নিয়ে। শুরুর দিকে এখানকার লোক আমাকে বিশ্বাস করত না। অনেক বাধা এসেছিল, অনেক বিরোধিতা। লোকে ভেবেছিল, আমার নিশ্চয়ই কিছু ধান্দা আছে। তারপর দিনে দেখে রাতে দেখে তবে লোকে আমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করল। চাষবাস, পশুপাখিপালন, সেলাই-ফোঁড়াই– এই সব কাজে সমাজের নিচুতলার মানুষেরা এসেই হাত লাগায়, যে যার নিজের মতো ঘরবাড়ি তোলে। আমি কাউকে কনভার্ট করার চেষ্টা করিনি। যদি তা করতাম, তাহলে দু’দিনের মধ্যে এরা আমার মতলব বুঝে নিয়ে আমাকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিত। যদি কোনও মানুষ নিজের থেকে খ্রিস্টের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর অনুসারী হতে চায়, যদি খ্রিশ্চান হতে চায়, তাকে বাধা দেওয়া অন্যায়। কিন্তু তার থেকে অনেক বড় অন্যায়, অনেক বড় পাপ খাদ্য-বস্ত্র-নিরাপত্তা বা সামাজিক সুযোগসুবিধার লোভ দেখিয়ে হতদরিদ্র মানুষকে ধর্মান্তরিত করা। ফোর্সড কনভার্সন ইজ আ কার্সড ডিজিজ, ইটস আ ক্রাইম এগেইন্সট গড অ্যান্ড ম্যান। আমি এমনই বুঝি। আর এইটুকু মনে রেখেছিলাম বলেই এরা আমাকে এত ভালোবাসে, এতটা আপনজনের মতো দেখে এরা।”

আমি বললাম, ‘কিন্তু ফাদার, আপনার আশ্রম সম্পর্কে আমতলির দিকে তো মানুষের ধারণা ভালো নয়…’
হাঁটতে হাঁটতে একটা বড়ো পাথরের চাঁইয়ের ওপর এসে বসেছিলাম আমরা। চারিদিকে সাঁঝের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। পানমরিচা আর ধঞ্চে গাছের ঝুপসি হয়ে থাকা জঙ্গলে কোনো নাম-না-জানা পোকা ‘কিটির্ কিটির্’ অবিরত শব্দে অন্ধকারের কষ্টিপাথর কেটে চলেছে। কখনও কখনও জলের কল্লোলধ্বনির মধ্যে নদীর পাড়ভাঙার ঝুপঝাপ আওয়াজ। চাঁদহীন অন্ধকার আকাশে বসেছে নক্ষত্রের বাসর। একটা এরোপ্লেন অনেক উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, কোনও শব্দ নেই, শুধু তার আলো জ্বলছে, নিভছে থেমে থেমে। সেইদিকে তাকিয়ে থেকে থেকে অবশেষে ব্যথাভরা স্বরে ফ্রের আঁরি বললেন, ‘আমতলি অঞ্চলে আমাদের আশ্রমের দুর্নামের আসল কারণ গড়ের পুকুরের রাজবাড়ি…’
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাজবাড়ি? কেন?’
তিনি বললেন, ‘ওই রাজবাড়ি কুখ্যাত হয়ে আছে পৈশাচিক অত্যাচারের জন্য। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ প্রভুদের তোষামোদ করে এই রাজারা নিজেদের স্বার্থ কায়েম করে রেখেছিল। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে নানা শর্তসাপেক্ষে নিজেদের রাজপাট ভারতের অঙ্গীভূত করে। দীর্ঘকাল এরাই ছিল ওই অঞ্চলের হর্তাকর্তাবিধাতা। আর ছিল ওদের রক্তের দোষ। শিরায় ধমনীতে বইত ওদের লাম্পট্য আর অমিতাচারের জীবাণু। সিজলেস ফ্লো অব লাস্ট অ্যান্ড ইনসেস্ট।’
আমি বললাম, ‘ঠিক। আমাকে দেবব্রতও বলছিল ওই কথা…’
‘দেবব্রত? কোন দেবব্রত? নারায়ণ কবিরাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট দেবব্রত?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
কথাটা শুনেই ফাদার কেমন থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন। ক’দিন আগেই কুহুডাঙার ব্যাপারে কথা উঠতেই দেবব্রতও চুপ মেরে গিয়েছিল। এই দুই ‘চুপ করে যাওয়া’-র মধ্যে কোনও নিঃশব্দ সংযোগ আছে কি না, ভাবছিলাম।
অন্ধকার ঠেলে একসময় কথা বলে উঠলেন ফাদার, ‘আমি যখন আমতলির দিকে যাতায়াত করি, তখনও ওই রাজবাড়ির কুখ্যাতি আমার কানে আসত। তখন সেখানে শালিখঠাকুরের বেলেল্লাপনা চলছে।’
‘শালিখঠাকুর? সে আবার কী?’
‘রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা তখন বিদেশে ভাগলবা। সব সম্পত্তি তারা যার হাতে গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছে, সে লোকটা সম্পর্কে রাজার শ্যালক। এতটাই দুরাচারী ছিল যে, লোকজন তাকে শ্যালকঠাকুর না বলে শালিখঠাকুর নামে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করত। তো সেই শালিখ বা শ্যালক যাই হোক, তার ছিল সুন্দরী যুবতীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত লোলুপতা। পুকুরঘাট থেকে যখন-ইচ্ছে-তখন পাইক কি বরকন্দাজ দিয়ে মেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে ভোগ করায় সে ছিল সিদ্ধহস্ত। আর ভোগ করার পর সেই মেয়েদের কাউকে কাউকে সে দাসীবাঁদি করে রেখে দিত গড়ের মধ্যে। অনেককে আবার গড় থেকে বের করেও দিত। তখন সেই হতভাগিনী মেয়েগুলি সমাজে স্থান পেত না। কেউ তাদের আর নিত না সমাজে। ওরা তখন কুলতলির একধারে কুঁড়েঘর করে পড়ে থাকত কোনওমতে। সমাজে অপাংক্তেয়া। এভাবেই ওই অঞ্চলে পতিতাপল্লি গড়ে উঠেছিল…’
আমি সরোষে বললাম, ‘বিচিত্র ভণ্ডামি এই সমাজের…’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। সোসাইটি ইজ আ হিপোক্রিট ইন্সটিটিউশন। ডাউটলেসলি। আমি এই অসহায়া মেয়েদের এই আশ্রমে নিয়ে এসেছিলাম। তাদের নতুন করে বাঁচার সুযোগ দিয়েছি। এখন তুঁত-চাষের কাজে ওরা হাত পাকিয়েছে। মাটির পটারিও ওরাই বানায়। তো এই কারণে ওদিককার গাঁয়ের লোকেরা আমার এ আশ্রমকে ঘৃণার চোখে দেখে। এ আশ্রম যেন একটা আশ্রয় পতিতাদের– এরকম বাজে ধারণা। এই আর কি!’
কেমন বেদনায় স্তিমিত হয়ে এল ফ্রের আঁরির কণ্ঠস্বর। বললেন, ‘আর দেবব্রত? সেও এক করুণ কাহিনি। দেবব্রতর বাবা টিউবারকুলোসিসে মারা যান দেবব্রতর শৈশবেই। দেবব্রতর বিধবা মা একলা হাতে ছেলেটিকে বড় করে তুলছিলেন। গড়ের পুকুরের কাছাকাছিই ছিল ওদের ঘর। একদিন ঘাটে স্নান করতে গিয়ে দেবব্রতর মা শালিখঠাকুরের বিষাক্ত নজরে পড়ে যান। সেই দিনটা দেবব্রতর মা শালিখঠাকুরের লোকজনের হাত থেকে কোনওমতে বেঁচে যান। কিন্তু তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী। দিনের পর দিন শালিখের থাবা থেকে যে তিনি বাঁচতে পারবেন না, এটা সহজেই বুঝে যান তিনি। পরের দিন ভোরেই একে ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কুহুডাঙায় এই আশ্রমের দিকে এগচ্ছিলেন। চলে আসতে চেয়েছিলেন এখানে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত…’
অধীর হয়ে মাঝপথেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘শেষ পর্যন্ত কী? কী হয়েছিল?’
‘উনি কুহুডাঙায় পৌঁছতে পারেননি। তাঁর খবর আর কেউই জানত না। দেবব্রতকে প্রতিপালন করেন নারায়ণ কবিরাজই। কেউ বলে, দেবব্রতর মা পথিমধ্যে শালিখঠাকুরের লোকেদের হাত থেকে বাঁচতে বিষ খেয়েছিলেন। কেউ বলে, শালিখের লোকজন ওঁকে অত্যাচার করে মেরে ফেলে। কী হয়েছিল, আমিও ঠিক জানি না। তবে হবে ওরকমই কিছু…’
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী নাম ছিল দেবব্রতর মায়ের? জানেন?’
চিন্তা করতে করতে ফ্রের আঁরি বললেন, ‘দেবব্রতর মা… কী যেন নাম… সম্ভবত মিতা… হ্যাঁ, মিতাই হবে বোধহয়… ওরকমই কিছু একটা নাম… আমার ঠিক মনে নেই এত দিন পরে…’

অন্ধকারের মধ্যে চমকে উঠলাম আমি। দেবব্রতর মায়ের নাম ছিল মিতা? আর আমি কুহুডাঙা আসার পাহাড়ি পথে সেই যে করোটি দেখেছিলাম, হাতে তুলে নিয়েছিলাম, মনে মনে তার নাম দিয়েছিলাম মিতালি। এই দুটো নাম এত কাছাকাছি হল কীভাবে? তবে কী?
আকস্মিক সমাপতনের বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আমি বসে থাকি অন্ধকারে। ভাবি এই অন্ধকারের আড়ালে কত আশ্চর্য সত্য এই কয়েক বছরে কথা বলে গেল আমার সঙ্গে! সেই মুকুরটিলা, নারায়ণ কবিরাজ, সতী ভৈরবী ও তাঁর আশ্রম, মনু নদী, গড়ের পুকুর, ফ্রের আঁরি, অমল আশ্রম, দেবব্রতর মা মিতা বা মিতালি… কী অদ্ভুত সব জীবন। আমাদের পরিচিত পৃথিবীর বাইরে এদের স্বতন্ত্র অবস্থান। সুপরিচিত চিন্তা ও বস্তুর অবয়বের থেকে কত আলাদা এই সব অঘটন ঘটনা!
আয়নাতে শুধু নিজের মুখটুকুই দেখা যায়, কিন্তু আয়নার ওপাশে কী আছে? মানুষের চেতনার অন্তরালে কী এক আশ্চর্য ভুবন! ইন্দ্রিয়চেতনার পরিধির ওদিকে কোন সম্বোধির বিপুল বিস্তার? ওগো আমার গোপন, ওগো চির-সংগোপন! তুমি তো শুধু অতীন্দ্রিয়ের অন্ধকার আড়াল থেকে উঠে এসে মৃদু স্বরে কথা বলে যাওনি আমার সঙ্গে! আমাদের চেনা পৃথিবীর চেনা ছকের বাইরে অদেখা, অচেনা কত অজস্র মানুষের বিস্ময়কর জীবনস্রোত হয়ে নিত্য তুমি বয়ে চলেছ যে! তারই দুয়েকটি মাত্র অব্যর্থ ইঙ্গিতে আমাকে তুমি ভাসিয়ে নিয়ে চলেছ এত দূ্রে বলো না কোথায়? দিনানুদৈনিক জীবনযাত্রার ব্যর্থ উপত্যকা থেকে উদ্যত বাজপাখির নখরধৃত মূষিকের মতো তুমি আমাকে তুলে নিয়ে গেলে ঊর্ধ্বে, আরও ঊর্ধ্বে… হে অন্তরীক্ষে ধাবমান অগ্নিঝটিকার মেঘ! তোমার কৃপায় গ্রিক পুরাণের ইকারুসের মতো আমিও নভোমণ্ডলে উড্ডীন হয়েছি আগুনডানায়… সেইখানেই তোমার এই সব নিগূঢ় ইশারার অনিবার্য সার্থকতা… তোমার ‘আয়নার ওধারে’ তাই তো শুধু অতীন্দ্রিয় চেতনার উন্মোচন-আখ্যানই নয়… তোমার ‘আয়নার ওধারে’ শেষ পর্যন্ত মানুষেরই গল্প… অগণিত অচিন মানুষের গল্প।
…… সমাপ্ত ……
……………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved