how chocolate became an integral part of ad industry | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডার্ক ফ্যান্টাসি

চকোলেটকে যৌন আবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা আজ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র একচেটিয়া উপহার হিসেবেই হোক, কিংবা দেহসুগন্ধি হিসেবে চকোলেটের গন্ধ বিক্রি করার প্রবণতায়, অথবা যৌনক্রীড়ার বিবিধ উপকরণে চকোলেট ফ্লেভারের পরিচিত ব্যবহারে– চকোলেটকে বারবার ‘অ্যাফ্রোডিসিয়াক’ হিসেবে পেশ করার ধরনটি পরিচিত। অর্থাৎ, চকোলেট প্রত্যক্ষভাবেই যৌনকামনা, লিবিডো বা যৌনসুখের উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

শেষ আপডেট: জুলাই ৭, ২০২৬, ১৮:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger

২০০০ সালে লাসে হলস্ট্রাম একটি ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন, নাম– ‘চকোলা’। মূল উপন্যাসটি অবশ্য লেখা হয়েছিল তার ঠিক আগের বছরে, লিখেছিলেন জোয়ান হ্যারিস। গল্পটা এরকম, উত্তুরে হাওয়ার পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে একটা ছোট্ট গ্রামে হঠাৎ থাকতে আসে এক তরুণী, ভিয়ান, সঙ্গে তার ছোট্ট ছয় বছরের মেয়ে। গ্রামে এসে ভিয়ান খুলে ফেলে নিজস্ব একটি ‘চকোলেটারি’, চকলেটের দোকান।

zoom
‘চকোলা’ সিনেমার দৃশ্য

গোড়ার দিকে সেই গ্রামের অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে এই উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা বাতাস-খ্যাপা মেয়েটিকে, বিশেষত রেনো, এক তেএঁটে জেদি পুরুষ। যে কোনওমতেই স্বীকার করে উঠতে পারে না, তার ভালোবাসার মানুষটি তাকে ছেড়ে গিয়েছে স্বেচ্ছায়। কিন্তু গ্রামের অনেকের জীবনের সঙ্গেই ক্রমশ জড়িয়ে যেতে থাকে এই আশ্চর্য চকোলেটের দোকানখানি, হয়ে উঠতে থাকে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞান।

প্রথম ছোঁয়াচটা এসে লাগে ভিয়ানের বাড়িওয়ালির গায়ে, যার ‘কুপ্রভাব’ থেকে নিজের ছেলেকে সরিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল তার নিজেরই মেয়ে! নাতি আর মাতামহীর নিয়মিত সাক্ষাৎ আর পুনর্মিলনের ঠিকানা হয়ে উঠতে শুরু করে ভিয়ানের ওই ছোট্ট দোকান। একসময় তারা ধরাও পড়ে যায় মেয়ের হাতে! তবু, প্রাথমিক টানাপোড়েন আর রাগে ফেটে-পড়া আক্রমণের শেষে এক উৎসবের রাতে নিজের ছেলেকে দিদার সঙ্গে দিলখুশ নৃত্যে মেতে উঠতে দেখে মায়ের মনের বরফে এসে লাগে হৃদয়ের উত্তাপ, চকোলেটের দোকানটুকু যেন হয়ে ওঠে বন্ধ কন্দরের ভিতরে আলোর টুকরো দিশা।

ওই একই চকোলেটের দোকানে কর্মী হিসেবে যোগ দেয় জোসেফিন, স্বামীর কাছে প্রতি রাতে মার আর তীব্র নিপীড়ন সহ্য করাকেই নিয়তি বলে মেনে নিয়েছিল যে। ভিয়ানের এই ‘চকোলেটারি’ তার জীবনেও নিয়ে আসে মুক্তি আর স্বাধীনতার আস্বাদ। চকোলেট সৃষ্টির শিল্প একটু একটু বাসা বাঁধতে থাকে তার হাতের কারুকার্যময় ভঙ্গিতে আর মগজে ঢুকে পড়তে থাকে আত্মবিশ্বাসের আশ্বাস। আর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভিয়ানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জিঘাংসু খেলায় মেতে উঠেছিল রেনো, কিছুতেই ভিয়ানকে শান্তিতে দোকান চালাতে না দেওয়ার শিকলভাঙা পণ ছিল যার, কিছুতেই এক টুকরো চকোলেটও মুখে তুলত না যে, এক মনভাঙা রাতে হঠাৎই এসে হামলা চালায় ভিয়ানের দোকানে!

সুদৃশ্য কাচের শোকেসে থরে-বিথরে সাজানো চকোলেটগুলোর ওপরে এলোপাথাড়ি লাঠির আঘাতে চলে ভাঙচুর পর্ব। শেষে যখন ভাঙা কাচ বেয়ে গলন্ত চকোলেটের ফোঁটা একসময় ঝরে পড়ে তার ঠোঁটের ওপরে, জিভ পায় মেদুর স্বাদের স্পর্শ, আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। তার ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকা দেহটা যেন এতদিনে জানান দেয়, চকোলেটকে অস্বীকার করতে চাওয়ার জটিল মনস্তত্ত্ব। চকোলেটের স্বাদের পরতে পরতে মিশে-থাকা যত্নের যে ছোঁয়া, তা থেকেই যেন এতদিন পালিয়ে বেড়াচ্ছিল সে। তার প্রেমহারা, ভালোবাসাশূন্য, ছন্নছাড়া, আদরহীন জীবনে কোনওভাবেই ওই সুগন্ধি মৌতাতমেশা প্রলোভন যেন না আসে, সতর্ক প্রহরা ছিল তার। প্রেমভাঙা মানুষ যে তীব্র ঈর্ষায় ধূলিসাৎ করে দিতে চায় পৃথিবীর বাকি সমস্ত প্রেমিকযুগলের সৌন্দর্য, একই কাঠিন্য মিশে ছিল তার এতদিনের তুলে-রাখা দেওয়ালে। কিন্তু শেষপর্যন্ত চকোলেটের স্বাদের সামনে তার এই ভেঙে পড়া যেন নিজের পালিয়ে-বেড়ানো ওই সত্তার একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় তাকে, প্রেমের সামনে আভূমি নতিস্বীকার করা ছাড়া আর কোনও গত্যন্তর থাকে না তার।

চকোলেট বিষয়টা আসলে ঠিক এইরকমই স্বাধীনতা আর নিষিদ্ধতার হাতছানির সঙ্গে মিশে গিয়েছে, বহুদিন হল। এতক্ষণ যে সিনেমার গল্প বললাম, সেখানেও চকোলেট নিজেই আসলে একটা চরিত্র হয়ে উঠেছে, যার বহুস্তরীয় স্বাদ গন্ধ আর বর্ণ এক ধরনের মুক্তির চেতনা তৈরি করে। সেই মুক্তিকে ঠিক পরিত্রাণ বা নিবৃত্তি বলা চলে না, বরং তার সঙ্গে অনেক বেশি যোগ রয়েছে বন্ধনমুক্তির, ‘লিবারেশন’-এর।

প্রাচীন মেসোআমেরিকান ভূপ্রকৃতিতেই প্রথম শুরু হয়েছিল চকোলেট উৎপাদনকারী কোকোর বাণিজ্যিক চাষ। তারপর আফ্রিকা, আমেরিকা আর ইউরোপের ঔপনিবেশিক বাণিজ্যপথ পেরিয়ে যেভাবে গোটা পৃথিবীতে রাজত্ব শুরু করল চকোলেট, তার অন্তরালে কবেই চলে গিয়েছে গোড়ায় লুকিয়ে থাকা বর্ণবিদ্বেষের ইতিহাস! উপনিবেশ স্থাপন করে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের দিয়ে কোকো চাষের শ্রমদান করানো থেকে শুরু করে চকোলেটের একচেটিয়া ব্যবসায় কালো চামড়ার প্রবেশাধিকার বন্ধ করে রাখা পর্যন্ত বহুদূর জল গড়িয়েছিল এককালে।

বার্সেলোনার বিখ্যাত চকোলেট কোম্পানি– ‘চকোলেটস আমাতিয়ে’ যেমন ১৯১৪ সালে নিজেদের নতুন প্রোডাক্ট ‘মার্কা লুনা’-র প্রোমোশনের জন্য একটি বিজ্ঞাপন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রায় ৬০০টি হাতে-আঁকা বিজ্ঞাপন জমা পড়েছিল, পুরস্কৃত হয়েছিল বাছাই ছয়টি। পুরস্কারপ্রাপক বিজ্ঞাপনের মধ্যে তিনটি বিজ্ঞাপনেই কৃষ্ণাঙ্গ চাকরদের আঁকা হয়েছিল চকোলেট পরিবেশনকারীর ভূমিকায়। তবু এর মধ্যেও জ্বলজ্বল করছে আঠেরো শতকের ফিলাডেলফিয়ার বেঞ্জামিন জ্যাকসনের কাহিনি, শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত চকোলেট ইন্ডাস্ট্রিতে শুধুমাত্র নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার জোরে যিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন।

সেই সময়ে আজকের মতো মসৃণ, মিষ্টির আধিক্যময় চকোলেট বার খাওয়ার চল ততটা ছিল না, বরং ‘হট ড্রিংক’ হিসেবে, কিংবা রান্নায় একটু তিতকুটে জোরালো স্বাদের গভীরতা আনার জন্য চকোলেট ব্যবহার হত। জ্যাকসন নিজের হাতে পাথরে পেষাই করে এমন চকোলেট তৈরি করতেন, যাতে কোকো বিনের একটু কিচকিচে গুঁড়ো মুখে এসে পড়ে, দাঁতের দুই পাটির মাঝে স্পষ্ট অনুভব করা যায় চূর্ণ কোকো বিনের অস্তিত্ব। আজও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চকোলেট ব্র্যান্ডগুলোর একটা বড় অংশ এই বিশেষ ‘টেক্সচারড চকোলেট’ তৈরির আইডিয়া নিয়েই চলে, ‘বিন টু বার’ নামে বিজ্ঞাপিত হয় সেসব চকোলেট। যদিও গ্লোবালাইজেশনের ঠেলায় আজকের চকোলেট ইন্ডাস্ট্রির গা থেকে এসব পুরনো লড়াই, রক্ত আর ঘামের গন্ধ কবেই মুছে গিয়েছে, বিস্মৃতির কুয়াশায় মেজে ঝকঝকে হয়ে উঠেছে চকোলেটের জনপ্রিয়তা আর আবেদন।

চকোলেট মানেই যেন উৎসব, আনন্দ। চকোলেটকে উদ্‌যাপনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলার এই ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরনো। প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মায়া সভ্যতাতেও ধর্মীয় আচারে, বিবাহ উৎসবে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে চকোলেট পরিবেশিত হত অতিথি-অভ্যাগতের হাতে হাতে। ফেনিল চকোলেটের পাত্র উচ্চাসনে বসা অভিজাত ব্যক্তির দিকে এগিয়ে দিয়ে নতজানু হয়ে বসে আছেন পরিবেশক– এমনই একটি চিত্রের সন্ধান মেলে মায়া সভ্যতার সিরামিক শিল্পে।

zoom
মায়া সভ্যতার সিরামিক শিল্প

ছবির কথা যখন উঠলই, আঠেরো শতকের বিখ্যাত ইতালীয় শিল্পী পিয়েত্রো লংঘি-র ‘আর্লি মর্নিং চকোলেট’ শীর্ষক তৈলচিত্রটির কথাও এ-প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখ্য। সে-ছবিতে এক অভিজাত-বংশীয়া যুবতী এলিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন দুধসাদা বিছানায়, পায়ে রেশমি কম্বল টানা, কোলে একটি কুকুর। তাঁকে ঘিরে তিন উচ্চপদস্থ পুরুষ, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, প্রত্যেকের হাতেই গরম চকোলেটের কাপ, একপাশে রাশ করে রাখা মিষ্টি রুটি। কী বলব এ-ছবিকে? নেহাতই একটি চকোলেট পানের প্রাতঃকালীন দৈনন্দিন দৃশ্য? না কি এক নারীকে ঘিরে তিন পুরুষের কামনা, বাসনা, অধিকারবোধ অথবা চাপা লড়াইয়ের ঈর্ষার আগুনে একটু একটু ধুনো-গন্ধ জোগাচ্ছে চকোলেটের আবেদন?

zoom
ইতালীয় শিল্পী পিয়েত্রো লংঘি-র আঁকা ‘আর্লি মর্নিং চকোলেট’

চকোলেটকে যৌন আবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই প্রবণতা আজ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। ভ্যালেন্টাইনস ডে-র একচেটিয়া উপহার হিসেবেই হোক, কিংবা দেহসুগন্ধি হিসেবে চকোলেটের গন্ধ বিক্রি করার প্রবণতায়, অথবা যৌনক্রীড়ার বিবিধ উপকরণে চকোলেট ফ্লেভারের পরিচিত ব্যবহারে– চকোলেটকে বারবার ‘অ্যাফ্রোডিসিয়াক’ হিসেবে পেশ করার ধরনটি পরিচিত। অর্থাৎ, চকোলেট প্রত্যক্ষভাবেই যৌনকামনা, লিবিডো বা যৌনসুখের উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ‘অ্যাফ্রোডিসিয়াক’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার আর পাঁচটা উপাদানের সঙ্গে চকোলেটের তফাতটা এইখানেই যে, এ শুধু উত্তেজনাবর্ধক ওষুধের মতো নিভৃতে টপ করে গিলে ফেলার জিনিস নয়, যার যাবতীয় কেরামতি শুরু হবে গলা দিয়ে নেমে যাওয়ার পর। বরং চকোলেট খাওয়া, চকোলেট দেওয়া, চকোলেট উপহার পাওয়া– সব কিছুর সঙ্গেই মিশে আছে প্রলোভনের হাতছানি।

কী এমন আছে চকোলেটে, যা বারবার এইরকমভাবে তাকে যৌন প্রতীক করে তুলল? ডোপামিনের ফোয়ারা ছুটিয়ে দিতে পারার এই ক্ষমতা চকোলেট আসলে ধরে রেখেছে স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে এবং অবশ্যই ‘টেক্সচার’-এ।

চকোলেট যদি শুধুই মিষ্টি হত, তাহলে তার এই বিপুল বৈচিত্র সম্ভব হত কি? মিষ্টির স্বাদে একটা সরলরৈখিক পবিত্র নিরীহপনা আছে, অনস্বীকার্য। চকোলেটে তার সঙ্গে এসে মেশে একটা তীব্র তিক্ততার ভাব। অনাঘ্রাত পাপড়ির ওপরে ছড়িয়ে থাকা রেণুগুচ্ছ যেমন আকাঙ্ক্ষার আভাস মিশিয়ে দিয়ে যায় নিষ্পাপ ফুলের শরীরে, ঠিক তেমন মিঠেকড়ার সুবাসে শিহরিত এই স্বাদ। তার সঙ্গে অবশ্যই সম্মিলন ঘটায় আশ্চর্য এক গন্ধ– কোকোর ঈষৎ কষাটে, ভ্যানিলার মিহি আর দুধের কোমলতা মিশে কস্তুরীগন্ধের মতো এক তীব্র, সমৃদ্ধ, নাছোড় ঘ্রাণানুভূতি। আর রং? সেও আর-এক মোহময় দৃষ্টিসুখ। নিকষ কালোও নয়, মালিন্যহীন সাদাও নয়, বরং গাঢ় বাদামি বর্ণে আবারও সেই যুগল-সম্মিলনের বিমিশ্র ইঙ্গিত। চিনির ডেলার মতো শক্তও নয়, ক্যান্ডিফ্লসের মতো তুলতুলে নরমও নয়, কঠিনও নয়, ট্যালটেলে তরলও নয়, অর্ধতরল আঠালো এবং চটচটে। ঘনত্ব এতটাই যে, সহজে ভেসে যাবে না মাধ্যাকর্ষণের টানে। একটু একটু করে গড়িয়ে পড়বে ঢিমে দ্রুতিতে। স্থিতিতেও নয় গতিতেও নয়, এক মধ্যবর্তিনী জাড্যধর্মের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লেগে থাকবে, মাখামাখি হবে হাতে এবং ঠোঁটে।

zoom
পারফিউমের বিজ্ঞাপনে চকোলেট পণ্য

চকোলেটের আবেদনের মধ্যে ধ্রুপদী ভাবটা কম, বরং স্রোতে গা ভাসানোর আশকারা কিঞ্চিৎ বেশির দিকেই। স্পষ্ট মনে আছে, বিশ্বভারতী যখন রবীন্দ্ররচনাবলির চেনা ক্রিমরঙা প্রচ্ছদ বদলে প্রথমবার গাঢ় চকোলেটরঙা কভার প্রকাশ করেছিল, তখন এক বিখ্যাত রবীন্দ্র-গবেষক এই প্রচ্ছদে জনমোহিনী রুচির প্রতি ঝোঁক এবং পুরাতনী রুচি থেকে বিচ্যুতি বলে তাকে চিহ্নিত করতে ভোলেননি। প্রচ্ছদনির্মাতারা সত্যিই একথা স্পষ্ট করে ভেবেছিলেন কি না, তা আমার পক্ষে বলা শক্ত। তবে দর্শকের চোখে চকোলেট রঙের গ্রহণসংকেত যেভাবে এসে ধরা দিয়েছিল, তাতে রবীন্দ্র-গবেষকের এই নির্ভুল সন্ধান দেখে যথেষ্ট চমৎকৃত হয়েছিলাম।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা বলি। ‘লাক্স’ সাবানের একটি বিজ্ঞাপন একবার মারাত্মক হইচই ফেলে দিয়েছিল বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রিতে। চকোলেট ফ্লেভারের ‘লাক্স’-এর বিজ্ঞাপনী মডেল হিসেবে আবির্ভূতা হয়েছিলেন করিনা কাপুর, সারা গায়ে চকোলেট মেখে। বিজ্ঞাপনী দৃশ্যগুলি এমনভাবে সংস্থাপিত হয়েছিল, যার ফলে দর্শকের মনে হয়, নগ্ন নায়িকা টইটম্বুর অবগাহন করছেন চকোলেট স্রোতে, বাদামি তরল চুঁইয়ে নামছে তাঁর খোলা পিঠ বেয়ে। এই যে লোভনীয় চকোলেটের বিপুল জনপ্রিয়তা আর নায়িকা মডেলের সুতীব্র যৌন আবেদন– এই দুইকে মিলিয়ে দিয়ে যৌনতা, নারী ও চকোলেটের যে ত্রিকোণ তৈরি হল, তা থেকে নারীর সামাজিক ধারণার সঙ্গে একীভূত হয়ে গেল চকোলেট সংক্রান্ত খাদ্য-খাদকের ধারণা।

zoom
করিনা কাপুর

বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হওয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন সংবাদপত্রে নায়িকার এই নতুন অবতারে অবতীর্ণ হওয়ার খবরটি জমিয়ে প্রকাশিত হয়, করিনা কাপুর নিজেই বিবৃতি দেন– ‘ওঁরা (বিজ্ঞাপননির্মাতা) আমার কয়েকটি ছবিতে চকোলেট লাগিয়ে এনেছিলেন। সেগুলো আমার এত পছন্দ হয় যে, আমি কাজ করতে রাজি হয়ে যাই।’ বলা বাহুল্য, সাবানের গুণাগুণ দেখে নয়, বরং করিনা কাপুর ও তৎসংক্রান্ত যৌন হাইপের জোরেই বিজ্ঞাপনটি চলে আসে পাদপ্রদীপের আলোয়। চকোলেট ও যৌনতার পারস্পরিক আঁতাত মেনেই এই বিজ্ঞাপন দর্শক দেখেন, আর তারপর যাঁরা ক্রেতা হন, তাঁরাও অজান্তেই নিজেকে ঠাঁই দেন সেই বৈশিষ্ট্যকরণের পরিধি জুড়ে। একই ‘ট্রেন্ড’ মেনে বছর ছয়েক আগে টোনি কক্করের হিন্দি মিউজিক ট্র্যাকেও প্রেমিকার রূপবর্ণনায় স্পষ্ট করেই বাজে– ‘কুড়ি তু চকোলেট হ্যায়’!

সত্যি বলতে, চকোলেট বোধহয় সেইসব পণ্যের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে থাকবে, যেগুলো তাদের নিজস্ব অবতার ছাড়াও অন্য নানাবিধ অবতারে সবচেয়ে বেশি হাজিরা দিয়েছে। মিষ্টি, আইসক্রিম, দই এসব তো আছেই, এর সঙ্গে পরপর যোগ দিয়েছে চকোলেট-গন্ধী টুথপেস্ট, অ্যালকোহল, রোলিং পেপার, ক্রিম, লিপস্টিক, পারফিউম এমনকী তালিকায় আছে চকোলেট ফ্লেভারড ইসবগুল পর্যন্ত!

এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে চকোলেটকে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক নির্মাণ বলে স্বীকার করতেই হয়, যার নাম উচ্চারণমাত্র স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ আর ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে মিলেমিশে তালগোল পেকে ওঠে। এই বিচিত্র ‘সাইনাসথ্যাশিয়া’-র একটা গল্প বলে শেষ করি।

কলেজজীবনের এক বন্ধু ছিল আমাদের, রক মিউজিক শুনতে ভালোবাসত সে, আর শুনতে শুনতে প্রত্যেকবার অবিসংবাদিতভাবেই চকোলেট ওয়েফার খেতে ইচ্ছে হত তার। মুখে মুখে তার ডাকনামই হয়ে গিয়েছিল ‘রকোলেট’! তখন মোটে ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি বটে, কিন্তু পরে জেনেছি, এমন ইন্দ্রিয়বিভ্রাট সত্যিই হয়! বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে বলে ‘সোনিক সিজনিং’।

zoom
‘জো খায়ে, খো যায়ে!’, বিখ্যাত চকোলেট বিজ্ঞাপনের দুই মুখ রমেশ আর সুরেশ

হরেক কায়দা সেখানে আছে অবশ্য, হাই পিচ মিউজিকের সঙ্গে মুচমুচে স্বাদ না কি যায় ভালো, নরম সুরের সঙ্গে মেলে স্পঞ্জের মতো খাবার, আবার মৃদু সুরে খাপ খায় বাদামঘেঁষা স্বাদ! সুর আর জিভের সংগতির এত পরীক্ষানিরীক্ষা করিনি কখনও সত্যি, তবে একখানি রেশমি কোমল চকোলেট বার মুখে দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত ক্যাওটিক কাওতালি কিংবা হুল্লোড়ের হুলিগ্যানিজম সরিয়ে, সমস্ত অ-সুর আর বে-সুরকে ভুলে যাওয়ার মস্ত ক্ষমতা আমার আছে বলেই জানি। সেই বিখ্যাত চকোলেট বিজ্ঞাপনের রমেশ আর সুরেশের মতো, ‘জো খায়ে, খো যায়ে!’

Aphrodisiac Chocolat chocolate Chocolate Bar Chocolate Lover Cocoa Bean Joanne Harris Lasse Hallström Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar world chocolate day

Share this article on