

রোগা, ছিপছিপে চেহারা, মুখের মধ্যে এমন একটা সরলতার ছাপ, সেই প্রথম দর্শনেই মনে হয়েছিল যেন ‘পথের পাঁচালী’র অপু! তখনই সুমিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, বামপন্থী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী সুমিত লিখছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। সেই সব লেখাতেও তাঁর বামপন্থী ভাবনার সুস্পষ্ট ছাপ। সেই আমাদের অসম বন্ধুত্বের শুরু। সেই সুমিতই একদিন আমাদের বাড়িতে এসে বেশ কড়া গলায় বলেছিলেন, ‘আলপনা, তোমাকে ইতিহাস নিয়ে এম.এ. পড়তে হবে। কোনও সমস্যা হবে না। আমি তোমাকে সাহায্য করব। বই, নোট সব পেয়ে যাবে। শুধু তোমাকে মন দিয়ে পড়াশোনো করে যেতে হবে। ফাঁকি দিলে চলবে না।’
১৩ অগাস্ট, ২০২৬, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, গবেষক ও অধ্যাপক সুমিত সরকারের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হল ভারতের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে।
সুমিত সরকারের জন্ম ১৯৩৯ সালে। তাঁর পিতা সুশোভন সরকার ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ। সুমিত সরকার ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি যুক্ত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। আধুনিক ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস-চর্চার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

সুমিতের মতো প্রতিভাশালী ইতিহাসবিদের এই সংক্ষিপ্ত জীবনকথা দিয়ে শুরু করছি বন্ধু সুমিতের স্মৃতিচারণ।
মাঝে বহুদিন যোগাযোগ ছিল না। এক দশকেরও বেশি সময় সুমিতের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত হয়নি। আমার কলকাতাবাসী বন্ধু সুনন্দা বসুর কাছে ওদের খবর পেয়েছি মাত্র আর তার সঙ্গে ইন্টারনেট তো ছিলই। গত বছর সোশাল মিডিয়ার সৌজন্যে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছিল সুমিতের স্ত্রী অর্থাৎ, অধ্যাপিকা তনিকা সরকারের সঙ্গে। তার পরে ফোনালাপ। প্রথম দিন সুমিতকে তনিকা আমার কথা জানাতে, সুমিত কথা বলেছিলেন সেদিন। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ও হল। এতদিন বাদেও সুমিত আমাকে ভোলেননি। কৃতার্থ বোধ করেছিলাম সেদিন।
মাঝে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বেশ কিছুদিন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। আমরা, ওঁর বন্ধুজনেরা একটু নিশ্চিন্ত হলাম। গত মাসের প্রথমদিকেই বোধ হয় তনিকার সঙ্গে ফোনে কথা হল। প্রতিবারের মতো সেবারও আমার সঙ্গে সুমিতের কথা বলিয়ে দিলেন। সুমিত ইদানীং একটু চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন।আমার সৌভাগ্য, তা সত্ত্বেও প্রতিবারই কথা বলেছেন আমার সঙ্গে। এবারেও তার অন্যথা হয়নি। জিজ্ঞাসা করেছিলেন– কেমন আছি। কী করছি আজকাল। আমি সবিস্তারে জানিয়ে ছিলাম আমার সব খবর। আমি এখনও লেখালিখি চালিয়ে যাচ্ছি শুনে ভারি খুশি হয়েছিলেন, বলেছিলেন, ‘লেখা ছেড়ো না, আলপনা’। মাঝে মাঝে তনিকা আমার লেখা পড়ে শোনাতেন সুমিতকে। খুশি হতেন সুমিত। মন্তব্যও করতেন। তনিকা হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ করে সে-কথা জানিয়েও দিতেন। আমার দিনটা সেদিন বদলে যেত। জুলাইয়ের সেই দিন কথা বলার পরে ভেবেছিলাম, এবারে সুমিতের সঙ্গে মাঝে মাঝেই ফোনে কথা বলব। আমার নিজের অলসতার তা আর হয়ে উঠল না। সুমিতও চলে গেলেন!

সুমিতের গুণমুগ্ধ বিদ্বজ্জনেরা সুমিতকে স্মরণ করছেন তাঁর অসাধারণ সব গ্রন্থ, তাঁর গবেষণা, তাঁর রচনা ইত্যাদি সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে। অধ্যাপক হিসেবেও তিনি ছিলেন যথার্থই প্রবাদপ্রতিম।
আমি সুমিতের এক অতি সাধারণ বন্ধু। কোন ক্ষেত্রেই আমি যে তাঁর তুলনীয় নই, সে-কথা আমার থেকে ভালো আর কে জানে? তবু কী করে সুমিতের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, সে-কথা ভেবে আজও বিস্মিত হই। সত্যি কথা বলতে কী, সুমিতের বিশাল কর্মযজ্ঞের ধারেকাছে পৌঁছনোর সাধ্য আমার ছিল না। আজও নেই। তাই সুমিতের কথা বলতে হলে, আমি বলব ব্যক্তি সুমিতের কথা, তাঁর সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে আমার অতি সাধারণ এক বন্ধুতার কথা।
সাল ১৯৬৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিষয়ে সবে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্স করছি। তার সঙ্গে ‘দৈনিক বসুমতী’, পরে ‘কালান্তর’ পত্রিকায় রিপোর্টারি করছি শিক্ষানবিশ হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খ্যাতনামা নাট্য-ব্যক্তিত্ব কেয়া চক্রবর্তীর স্নেহধন্য হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তিনি আমাকে একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু, ম্যাক্সমুলার ভবনে কর্মরত জার্মান ভাষা-শিক্ষিকা সুনন্দা বসুর সঙ্গে। কম দিন হয়নি কেয়াদি প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু আজও সুনন্দার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব অবিচ্ছেদ্য, অটুট।
সুনন্দা প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের ছাত্রী ছিলেন। সেই কলেজে ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছিলেন সব অন্য বিষয়ের ছাত্র। তাঁদের সঙ্গে আজও ওঁর বন্ধুত্ব অবিচ্ছিন্ন। সুমিত সরকার ছিলেন এমনই এক বন্ধু, ইতিহাসগত প্রাণ। আরও দুই বন্ধুর মধ্যে ছিলেন– সোমদেব দাশগুপ্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করে ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ তখন দাপিয়ে রিপোর্টারি করছেন। আর একজন মণীশ নন্দী, ‘ডানলপ’ কোম্পানির তরুণ একজিকিউটিভ। আর সুমিত তখনই কলকাতা বিস্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়াচ্ছেন। সুনন্দার এই বন্ধুবৃত্তে কীভাবে যেন আমিও যুক্ত হয়ে গেলাম! ওঁরাও বয়সে কনিষ্ঠ আমার মতো এক অতি সাধারণ মেয়েকে সাদরে ওঁদের বৃত্তে গ্রহণ করেছিলেন, কে জানে! হয়তো বা ওঁদের প্রিয় বন্ধু সুনন্দার খাতিরেই।

ওঁদের তিনজনের মধ্যে চালচলনে, পোশাকে-আশাকে সব চাইতে সাধারণ ছিলেন সুমিত। ইতিমধ্যে একদিন সুনন্দা সুমিতকে নিয়ে হাজির হল আমাদের গড়িয়াহাট রোডের বাড়িতে। রোগা, ছিপছিপে চেহারা, মুখের মধ্যে এমন একটা সরলতার ছাপ, সেই প্রথম দর্শনেই মনে হয়েছিল যেন ‘পথের পাঁচালী’র অপু! তখনই সুমিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, বামপন্থী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী সুমিত লিখছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। সেই সব লেখাতেও তাঁর বামপন্থী ভাবনার সুস্পষ্ট ছাপ। সেই আমাদের অসম বন্ধুত্বের শুরু।
পড়াশুনোয় চিরদিনই আমি ছিলাম অতি সাধারণ আর একটু ফাঁকিবাজও। সুমিতের জ্ঞানের ব্যাপ্তি সম্বন্ধে কোন ধারণাই ছিল না আমার। ওঁর অমায়িক ব্যবহার, সাদাসিধে কথাবার্তা, ওঁর সরলতা নিঃসন্দেহে আমাকে সাহায্য করেছিল অতি সহজে সুমিতের বন্ধু হয়ে উঠতে। নিজেকে সাধারণ জেনেও কোনও সংকোচ বোধ করিনি বন্ধুতা পাতাতে। সুনন্দার তিন বন্ধুর ব্যবহারে কোনও দিনই প্রকাশ পায়নি মেধার ক্ষেত্রে কোনও তারতম্য।
সুনন্দাই একদিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সুমিতের বাড়ি। পরিচয় হল সুমিতের বাবা অধ্যাপক সুশোভন সরকারের সঙ্গে। সুনন্দাকে ওঁরা সবাই চিনতেন। কারণ, সুনন্দা তো সুমিতের সেই কলেজবেলার বন্ধু। সুমিতের বাবাকে প্রণাম করতে মাথায় হাত রাখলেন উনি। কত কথা হল, কত গল্প হল! সুমিতের দিদি শিপ্রা সরকারের সঙ্গে ‘কালান্তর’-এর দফতরে পরিচয় হয়েছিল। আমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন শিপ্রাদি। আজও মনে আছে ওঁদের সহৃদয় ব্যবহারের কথা।

সুমিত মাঝে মাঝে চলে আসতেন আমাদের বাড়িতে কখনও একা, কখনও সুনন্দাকে সঙ্গে নিয়ে। সব কিছু নিয়েই সুমিতের কৌতূহল ছিল অপরিসীম। খুব খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন সাংবাদিকতার পাঠক্রম সম্বন্ধে। এর নেপথ্যে আর একটা উদ্দেশ্য কাজ করত বোধহয়– সুমিত আমার ফাঁকিবাজ স্বভাবের কথা জানতেন। আমি বিষয়টা ঠিকঠাক বুঝেছি কি না, সেটাই হয়তো যাচাই করে নিতে চাইতেন। এ-ব্যাপারে অবশ্য সুমিতকে হতাশ করিনি কখনও। আমি যে এম.এ. না পড়ে সাংবাদিকতা ক্লাসে ঢুকেছিলাম, সে-কথা সুমিতকে বলেছিলাম কোনও প্রসঙ্গে। আর ইংরেজিতে অনার্স থাকলেও, ইতিহাস পড়তে আমি ভালোবাসি, সে-কথাও জানা ছিল সুমিতের। এম.এ. না-পড়ে যে আমি ঠিক করিনি, তা নিয়ে এক মস্ত লেকচার দিয়েছিলেন সেদিন।
এর মধ্যে এক ছুটির দিনে বেলা তিনটে নাগাদ বইপত্র নিয়ে হাজির সুমিত আমাদের বাড়িতে! বেশ একটু কড়া গলায় বলেছিলেন, ‘আলপনা, তোমাকে ইতিহাস নিয়ে এম.এ. পড়তে হবে। কোনও সমস্যা হবে না। আমি তোমাকে সাহায্য করব। বই, নোট সব পেয়ে যাবে। শুধু তোমাকে মন দিয়ে পড়াশোনো করে যেতে হবে। ফাঁকি দিলে চলবে না।’ সে-দিন সুমিতের এক অন্য রূপ দেখেছিলাম। বন্ধু নয়, সেদিন সুমিতকে মনে হয়েছিল যেন এক রাগী মাস্টারমশাই!

সামনেই সাংবাদিকতা ক্লাসের ফাইনাল পরীক্ষা। সঙ্গে কালান্তরে রিপোর্টারি। সত্যি, বেজায় ব্যস্ত তখন আমি।সে-কথা বলতে বললেন, ‘ঠিক আছে, এই পরীক্ষা শেষ হলে, শুরু করবে ইতিহাস পড়া।’ তখনকার মতো রেহাই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! সাংবাদিকতা পরীক্ষা শেষ হতেই সুমিতের কাছে শুরু হল আমার ইতিহাস পড়া।
ইংরেজি অনার্স পড়েছিলাম এক কিংবদন্তি অধ্যাপক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। ওঁর বাড়ি গিয়ে পড়তাম। সে ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা! এবার সুমিত সরকার। এই দুই শিক্ষকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, বেশি দূর এগনো গেল না! এক কঠিন অসুখে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। ছিটকে গেলাম সাংবাদিক জীবন থেকে। সুমিতের কাছে পড়ে ইতিহাসে এম.এ. পড়ার স্বপ্নও অপূর্ণ রয়ে গেল। দু’বছর বাদে সুস্থ জীবনে ফিরলেও সাংবাদিকতাতে আর ফেরা হল না!

যত দূর মনে পড়ে, সুমিত সে-সময়ে অক্সফোর্ডে পোস্ট ডক্টোরাল ফেলোশিপ সম্পূর্ণ করছিলেন। এর পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন। বাকি কর্মজীবন ওখানেই কাটিয়েছেন। দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না। সুমিতের নানা কৃতিত্বের খবর পেতাম সুনন্দার কাছে। ইন্টারনেটেও সুমিতের গ্রন্থ প্রকাশের খবর পেতাম। সুমিতের লেখা– ‘The Modern India’ (১৯৮৩), তাঁর জীবনের প্রথম গবেষণা-গ্রন্থ– ‘The Swadeshi Movement in Bengal’ প্রকাশেই স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার অবদান সম্বন্ধে তাঁর গভীর জ্ঞান ইতিহাস চর্চা ধরা পড়েছিল।

২০০৪ সালে ‘Writing Social History’ গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ পেয়েছিলেন। ২০০৭-এ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে সেই পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সুমিত। ‘Women and Social Reform in Modern India’ গ্রন্থটি যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছিলেন সুমিত এবং ওঁর যোগ্য সহধর্মিনী তনিকা সরকার। সুমিত ও তনিকা এক বিরল দম্পতি, যাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কখনও যৌথভাবে, আবার কখনও নিজস্ব পরিসরে গবেষণা ও গ্রন্থরচনার কাজ করে গিয়েছেন।
সুমিত চলে গিয়েছেন, কিন্তু তাঁর ছাত্র এবং গবেষকদের জন্য রেখে গেলেন তাঁর কাজ, তাঁর গ্রন্থ সম্পদ।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন আলপনা ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved