

দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে বিচিত্র গাইড। কেউ কথায় পটু, কেউ বা ইতিহাসে। কখনও সখনও ইতিহাস, এক্কেবারে নতুন করে মুখে মুখেও তৈরি করা যায় যে, তার হাতে-নাতে প্রমাণ পাওয়া যায় একটু শান্তিনিকেতন-পুরী-মালদা-মুর্শিদাবাদ গেলেই। তাই বলে, ইতিহাসনিবিষ্ট, কর্মোদ্যোগী গাইড কি নেই? আছে। কিন্তু তারা সম্ভবত খুব একটা ভালো নেই।
বাঙালি হল ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ আর ‘দেখব এবার জগৎটাকে’র দুর্দান্ত কম্বো। উইক এন্ড এলেই ঘাটশিলা, মধুপুর, দিঘা, সুন্দরবন ডাকে। লম্বা ছুটি হলে আর পায় কে! ত্রৈলোক্যনাথের ডমরুধর সাধে সেই কোনকালে আক্ষেপ করেছে, ‘…কিন্তু এখনকার বাবুদের সে বোধ নাই। বাবুরা এখন হাওয়াখোর হইয়াছেন। দেশে হাওয়া নাই, বিদেশে গমন করিয়া বাবুরা হাওয়া সেবন করেন, আর বাপ-পিতামহের পূজার দালানে ছুঁচো-ছামচিকাতে অপরিষ্কার করে।’ আবার পরশুরাম ভ্রমণপিপাসা নিয়ে লিখছেন, ‘ঘোলা আকাশ ছিঁড়িয়া ক্রমশঃ নীল রং বাহির হইতেছে। রৌদ্রে কাঁসার রং ধরিয়াছে, গৃহিণী নির্ভয়ে লেপ-কাঁথা শুকাইতেছেন। শেষ রাতে একটু ঘনীভূত হইয়া শুইতে হয়। টাকায় এক গণ্ডা রোগা-রোগা ফুলকপির বাচ্ছা বিকাইতেছে। পটোল চড়িতেছে, আলু নামিতেছে। স্থলে জলে মরুৎ-ব্যোমে শরৎ আত্মপ্রকাশ করিতেছে। সেকালে রাজারা এই সময়ে দিগ্বিজয়ে যাইতেন।’
সুতরাং দেশভ্রমণের সুখ থেকে আমাদের পরিত্রাণ নেই। আর ভ্রমণ থাকলেই গাইড থাকবে অবিচ্ছেদ্যভাবে। সে আপনি চান বা না-চান।

ইন্দ্র মিত্রর ‘তাজমহল’ বলে একটা মজার গল্প পড়েছিলাম। এক ভদ্রলোক আগ্রা গিয়ে এক হোটেলে উঠেছে। উদ্দেশ্য: তাজমহল দর্শন। ঘটনাচক্রে সেই হোটেলের ম্যানেজার ছিল বাঙালি। তা টুরিস্ট ভদ্রলোক যথাবিহিত তাজমহল দর্শন শেষে পরদিন হোটেল চেক আউট করতে যাচ্ছে, আর ম্যানেজার তাকে পাকড়াও করল। একবার দিনের আলোয় তাজমহল দেখলেই কি তাজমহলের মহিমা বোঝা যায়? ম্যানেজার ভদ্রলোক দক্ষ সেলসম্যানের মতো ফিরিস্তি দিতে থাকল, চাঁদের আলোয় তাজমহল, শিশিরে ভেজা ভোরে তাজমহল ইত্যাদি ইত্যাদি। টুরিস্ট মশাই তো যাকে বলে হুক, লাই অ্যান্ড সিঙ্কার গিলে বসে আছে। ম্যানেজারের সম্মোহনী কথায় ফেরা ক্যানসেল করে পরের সাত-দশ দিন আশ মিটিয়ে তাজমহলের বহুতর রূপ দেখে অবশেষে ফেরা। ম্যানেজার ভদ্রলোককে, বলাই বাহুল্য, অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে-টানিয়ে। যাই হোক, বছর কয়েক পরে শিয়ালদহ অঞ্চলে ম্যানেজারের সঙ্গে আমাদের এই টুরিস্টের দেখা। ম্যানেজার তখন শিয়ালদার কোনও হোটেলে ম্যানেজারি করছে। টুরিস্ট তাই শুনে বলল, আর যাই হোক, আগ্রায় চাকরি করার সুবাদে আপনার চেয়ে ভালো করে কেউ তাজমহল দেখেনি বা মর্মে মর্মে অনুভব করেনি– এ আমি হলপ করে বলতে পারি! ম্যানেজার করুণ মুখে জানালেন, ‘ওটাই তো মুশকিল। চাকরি পেয়ে ভাবলাম, আগ্রায়ই তো থাকব। যে কোনও সময় তাজমহল দেখে নিলেই হবে। ওই চক্করে তাজমহলটা আর দেখা হয়ে ওঠেনি!’

কয়েক বছর আগে মালদা-মুর্শিদাবাদ বেড়াতে গিয়ে দেখেছি বুকে কার্ড ঝোলানো একদল গাইড প্রথমেই ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দেবে। দরদাম করাটাই দস্তুর। ‘সেলস টক’ হিসেবে কানের কাছে বলবে: ‘পুরো হিস্ট্রির ব্যাপার আছে। খালি চোখে বোঝা যাবে না।’ কী জানি কী মিস করে যাব ভেবে দরদাম করে রাজি হলাম। আদিনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, ফিরোজ মিনার, দাখিল দরওয়াজা, লুকোচুরি দরওয়াজা, লোটন মসজিদ বা একলাখি সমাধি দেখতে গিয়ে মালদায় গাইডের কাছে এমন কিছু জানলাম না যা এএসআইয়ের বোর্ডে লেখা নেই। শুধু লোটন মসজিদের সময় রাজ-নর্তকী লোটন বাইয়ের রূপ বর্ণনা একটু ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে করছিল। তবে এরা শুধু গাইড করেই ক্ষান্ত দেয় না। যে কোনও রেস্তরাঁয় ওয়েটারেরা যেমন, তেমনই এরাও ছবি তুলে দিতে সদা তৎপর। কোন অ্যাঙ্গেলে কোন দিকে কোন সময় ভালো ছবি আসবে, সে বিষয়ে দুরন্ত! পুরী-কোনারক হলে হনিমুন কাপলকে গাইড বলে থাকে, ‘চাপি চাপি ঠাসি ঠাসি’। অর্থাৎ, এখন গাইড হল ‘টু-ইন-ওয়ান’। মুর্শিদাবাদেও একই অভিজ্ঞতা। পাবলিকও রিল, ফোটো তোলায় ব্যস্ত– ইতিহাস নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না। শুধু আজিমুন্নিসা বেগমের সমাধিতে এসে কেন তাঁকে ‘কলজে খাকি’ বলা হয়, এই নিয়ে রোমহর্ষক কাহিনি শুনিয়ে দিল আমাদের গাইড। গঙ্গার অন্য পাড়ে সিরাজ লুতফার সমাধি। ভিড়ভাট্টা কম। সেখানে দেখলাম শিক্ষিত এক মুসলিম যুবক যত্ন নিয়ে লুতফুন্নেসার শেষজীবনের কথা বলছে। রীতিমতো পড়াশোনা করেছে, বোঝা যায়। টাকা দেওয়ার সময় বললাম, ‘গাইড হয়ে সংসার চলে?’ ম্লান মুখে জবাব দিল, ‘‘এদিকে ক’জন আর আসে বলুন?’’

মালদা-মুর্শিদাবাদের মতো হট ফেভারিট আরেক উইকএন্ড ডেসটিনেশন হল শান্তিনিকেতন। সুরসিক অরুণ নাগ ‘আমোদের শান্তিনিকেতন’-এ এই ধরনের লোকাল গাইড নিয়ে চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন; ‘শান্তিনিকেতনে কী কী দ্রষ্টব্য, কী তাদের ইতিহাস, কখন কোন অনুষ্ঠান, যাবতীয় বিবরণ সম্বলিত গাইডবই পাবেন, পায়ে হেঁটে ঘুরলে সাইকেল-বিহারী কথক গাইড পাবেন, আর যদি আরামসে সংক্ষিপ্ত সময়ে দেখে নিতে চান পাবেন রিকশাচালক গাইড। প্রায়ই দেখা যায় যাত্রী নিয়ে রিকশার সারি এগিয়ে চলেছে শান্তিনিকেতন থেকে শ্রীনিকেতনের দিকে, সঙ্গে চলছে রানিং কমেনট্রি , এই উত্তরায়ণ– রবিঠাকুরের বাড়ি, উনি থাকতেন, ডানদিকে নাট্যঘর– উনি থিয়েটার করতেন, বাঁদিকে কলাভবন– উনি ছবি আঁকতেন, ডানদিকে মালঞ্চ– উনি কবিতা লিখতেন, বাঁদিকে সঙ্গীত ভবন,– উনি গান গাইতেন, তাল মিলিয়ে রিকশায় বসা দুটি মাথা ক্রমান্বয়ে একবার ডানদিক ও বাঁদিকে ঘুরছে।’

আমার আগ্রা-ফতেহপুর সিক্রি দেখার অভিজ্ঞতা হল, যাকে প্রথমে গাইড ভাবছি, সে আসলে এগ্রিগ্রেটর। তার সঙ্গে দরদাম– ‘ভালো করে সব দেখাতে হবে’। কিন্তু ইত্যাদি হয়ে যাওয়ার পরে সে গিয়ে আমাদের মতো কয়েকজনকে গিয়ে গস্ত করছে আরেকজনের কাছে। সে সব ঘুরিয়ে দেখাবে। প্রথমজনের কাজ কাস্টমারের সঙ্গে নেগশিয়েট করা, অন্যের কাজ হল দেখানো। সেখানেও জুতো রাখা ইত্যাদিতে তাদের নিজস্ব নেট ওয়ার্ক আছে। একবার সেই ঘুঘুচক্করে পড়ে গেলে এগজিট গেট পর্যন্ত আর নিস্তার নেই! একই চিত্র দেখলাম আন্দামানে। এখানে ইতিহাস আর প্রকৃতি সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে ওয়াটার স্পোর্টস। আপনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেশ কিছু রাইডের টিকিট কাটিয়ে দেবে। সঙ্গে আশ্বাস, না-চড়লে টাকা রিফান্ড। সে রিফান্ড আপনি পাবেন। কিন্তু কী রাইড, তাতে কী হয়, শরীরে সেই ধকল সইবে কি না– না জেনেই টিকিট কাটা, এ কীরকম ব্যাপার? তার ওপর আছে, সেলস টক। এলিফ্যান্টা বিচে মোটা টাকা খরচ করে সেমি সাবমেরিন চড়ে মেরিন লাইফ, লাইভ কোরাল অমুক-তমুক দেখলাম। আবার ভরতপুর বিচে জোরাজুরি, সাবমেরিনের চেয়ে অনেক ভালো দেখবেন, গ্লাস বটম বোট। মাঝখান থেকে মাথা পিছু ৮০০ টাকা গচ্চা গেল! লক্ষ্মণপুর-২ বিচে গাইডরা জানাল, কোরাল ব্রিজ দেখতে হলে গাইড লাগবে। গ্রুপ পিছু ১৫০০ টাকা। গ্রুপ যদি দু’জনের হয়, তাও একই দর। গুটি গুটি পায়ে নিজেরাই এগলাম। একটু সিঁড়ি ভেঙে আবার নিচে নেমে কোরাল ভরা এবড়ো-খেবড়ো পথে হেঁটে দেখে এলাম প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি– কোরাল ব্রিজ। প্রকৃতির খেয়ালে কোরালের একটা আর্চ, ঠিক ব্রিজের মতো। মধ্যিখান থেকে তিন হাজার টাকা বেঁচে গেল।

সেলুলার জেলে গাইড অত্যাধুনিক মেগাফোন নিয়ে গ্রুপে সেলুলার জেলের ইতিহাস বলছে। কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করে গিয়েছিলাম, তাছাড়া সন্ধেবেলায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখব– তাই আর গাইড নিইনি। দেখি জনগণ ওই মুক্তির মন্দির সোপান তলে তেড়ে সেলফি তুলছে। নব-বিবাহিতা ব্রীড়া বিপ্লবীদের কুঠুরিতে ঢুকে গরাদ ধরে পোজ দিচ্ছে, পতিদেবতা ছবি তুলে দিচ্ছে। ফাঁসির মঞ্চের সামনে সেলফি তুলছে আমোদগেঁড়ে পাব্লিক। জেলের ঘানি টানার ভান করে ছবি তুলছে কেউ কেউ।
এদেরকে গাইড করবে কেউ, এমন সাধ্য কার?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved