

সত্যজিৎ রায়ের ইতিহাস-চেতনা আমাদের বিস্মিত করে দেয়। ‘অপরাজিত’র অপু গ্রামে স্কুল ইন্সপেক্টরের সামনে আবৃত্তি করেছিল– “কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল…”। আবৃত্তির মাঝখানে যখনই “সে আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে” পংক্তিটি আসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে অপু ‘আমাদের’ এবং ‘আমাদেরই’– খুব জোর দিয়েছিল এই দু’টি শব্দের উপর। ব্রিটিশ সরকারের বেতনভোগী স্কুল ইনস্পেক্টর শুনছিলেন মুগ্ধ চোখে।
প্রাচীন এক ইউ গাছের নিচে ঘাসের ওপর বসে আছে উইলিয়াম। মাথা নোয়ানো নরম ঘাসগুলো গালিচার মতো বিছিয়ে আছে যেন। খানিক দূরে গাছের ডালের আড়াল থেকে রবিন পাখি ডাকছে। উইলিয়াম এক মনে রবিনের ডাক শুনছে। হ্যাম্পশায়ারের কুইনউড ছিল উনিশ শতকের শান্ত, স্নিগ্ধ, সবুজ পৃথিবী। চারদিকে সবুজ মাঠ, গাছপালায় ঢাকা ঢালু জমি, ফলের বাগান আর উন্মুক্ত আকাশ। তার মধ্যে ইউ ও বিচ গাছগুলো মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হাওয়ায় ভেসে আসত পাখির ডাক, পাতার মর্মর শব্দ আর দূরে ছাত্রদের শোরগোল। কুইনউডে পড়াশোনার পাশাপাশি উইলিয়াম ও তার বন্ধুরা মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াত, গাছ থেকে পড়ে যাওয়া পাখির ডিম সংগ্রহ করত এবং চারপাশের পৃথিবীর ছোট ছোট বিষয় খুব মন দিয়ে লক্ষ করত। তখন কে জানত, সেই পুরনো ইউ গাছের নিচে বসে থাকা ছেলেটিই একদিন ইংরেজি মিশনারি স্কুলের পরিবর্তে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন? এমনকী, নীরব চিহ্ন রেখে যাবেন সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেও?

১৮৬২ সালের নভেম্বর মাসে এই উইলিয়াম উইলসন হান্টার এসে উপস্থিত হন বাংলার বীরভূম জেলায়। সেখানে সরকারি কাজ করতে গিয়েই বাংলার মানুষ, তাঁদের ভাষা, জীবনযাত্রা, রীতিনীতি এবং পুরনো ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ও সমবেদনা তৈরি হয়। হান্টার প্রস্তাব দিলেন, এখন থেকে বাংলার সমস্ত স্কুলে ছোট ছেলেমেয়েরা পড়বে বাংলা ভাষায় লেখা বই। আর সেই সমস্ত বই ছাপা হবে বাংলা হরফে। মিশনারি স্কুলের ওপর আর নির্ভর করা চলবে না। তার বদলে গ্রামে গ্রামে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে হবে পুরনো পাঠশালা-ব্যবস্থা। ফলে গ্রামে গ্রামে শত শত নতুন বাংলা স্কুল খোলার ধূম পড়ে গেল। তার জন্য দরকার পড়বে হাজার হাজার নতুন বই। এত বই ছাপা হবে কী করে? তাই তৈরি হল হাজার হাজার নতুন প্রিন্টিং প্রেস। অগণিত নতুন পাঠক পাঠিকার জন্ম হল।
ইংরেজি ছিল স্কুলশিক্ষার প্রধান ও একমাত্র ভাষা, আর বাংলা ছিল বাড়ি, পাড়া ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষা। হান্টার এর বিরোধিতা করলেন। ১৮৮২ সালে স্যর উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশন’ বা ‘ভারতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠিত হয়। মায়ের ভাষা আর শিক্ষার ভাষার মধ্যে দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে বাংলার শিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। সেই সময়, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সংখ্যা পৌঁছেছিল প্রায় একশোর কাছাকাছি। পাঠক-পাঠিকার সংখ্যা অভাবনীয় রকম বেড়ে গিয়েছিল। বিপুল সংখ্যক পাঠকের দাবির উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিলে। তাই ছোটগল্প লেখার হাত থেকে তাঁর মুক্তি ছিল না। মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলা ভাষার প্রচলনের সবচেয়ে বড় সুফল– জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল পাঠিকার সংখ্যা। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে অন্তর্লীন আবেগের যে ঘনত্ব আর গভীরতা– তা স্পর্শ করছিল নারীদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল। তাই রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প চিরস্থায়ী আসন পেতে বসল বাঙালির অন্তঃপুরে। নিজের সম্পাদিত ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রায় প্রতি মাসেই তিনি গল্প লিখতে প্রায় বাধ্য হলেন বললেও অত্যুক্তি হবে না।

হান্টার কমিশনের সুপারিশের ১০-১২ বছরের মধ্যেই, বাংলা ছাপাখানা শুধু আর কলকাতায় আবদ্ধ রইল না। ছড়িয়ে পড়ল ছোট ছোট শহরে। এমনকী, গ্রামে গ্রামেও। অবসর বিনোদনের জন্য বাঙালির হাতে হাতে উঠে এল অগণিত গল্প উপন্যাস। শুধু বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন বা রবীন্দ্রনাথ নন– আরও অনেক সাহিত্যিক। পাঠক-পাঠিকার দাবি যত বাড়বে, ততই বাড়বে সচল কলমের সংখ্যা। বাংলার মুদ্রণ শিল্পে সত্যিকারের উৎকর্ষ সাধন করেছিল যে সমস্ত মুদ্রণালয়– তাদের মধ্যে কয়েকটির নাম উল্লেখ করি। ইউ. রায় অ্যাণ্ড সন্স, কুন্তলীন প্রেস, বঙ্গবাসী প্রেস, ঢাকা প্রেস, বটতলা… ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষে যার কথা বললাম, সেই প্রকাশক অবশ্য অত্যন্ত কম দামে জনপ্রিয় গল্প-উপন্যাস ছাপাতেন। আর ছবিও ছাপাতেন অল্প খরচে, কাঠের ব্লক দিয়ে।

এই কাঠের ব্লকে ছাপা ছবি দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, নিজের চেষ্টায় বাংলা বইয়ের জন্য ভালো ছবি ছাপার কৌশল আবিষ্কার করবেন। নিজেই গবেষণা করে উপেন্দ্রকিশোর হাফটোন ব্লকের অভাবনীয় উন্নতি সাধন করলেন। (‘হাফটোন’ মানে যে কৌশলে ছাপা ছবিতে আলোছায়ার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনকেও বিশ্বাসযোগ্য রূপ দেওয়া যায়।) নানান গবেষণার পর, ‘৬০ ডিগ্রি ডিফ্র্যাকশন পদ্ধতি’ প্রয়োগ করে সাফল্য পেলেন উপেন্দ্রকিশোর। ইউ. রায় অ্যাণ্ড সন্স থেকে ছাপা বইপত্র আর রঙিন ছবি হয়ে উঠল জীবন্ত– নামকরা ইউরোপীয় প্রেসে মুদ্রিত বইকেও তা হার মানায়।

এই পর্যন্ত পৌঁছে আবার ফিরে যেতে হবে উইলিয়াম হান্টারের কথায়। তাঁর মৌলিক ভাবনা ও মাতৃভাষায় লেখাপড়ার অভাবনীয় প্রস্তাবের ফলেই বাংলা ভাষায় পাঠকসংখ্যার বিস্ফোরণ হয়েছিল। আর তার ফলেই কলকাতায় বসে বিশ্বমানের মুদ্রণের স্বপ্ন দেখার সাহস পেয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলা বইয়ের বিক্রি যে হারে বাড়ছে, তাতে উন্নত মুদ্রণের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করলেও সেই টাকা ফেরত আসতে দেরি হবে না। কল্পনা করুন, উইলিয়াম হান্টার বীরভূমে নিযুক্ত হননি, বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে তিনি চেনেন না– তাহলে কী হত? তাহলে বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত, বাংলা ভাষায় লেখা বই পড়ার এমন বিস্তৃত সুযোগ পেত না বাঙালি পাঠক-পাঠিকারা। ফলে ‘সাধনা’ পত্রিকার পাতা ভরানোর জন্য রবীন্দ্রনাথকে প্রতি মাসে বিশ্বমানের গল্প লিখতে হত না। আর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও ‘৬০ ডিগ্রি ডিফ্র্যাকশন পদ্ধতি’ প্রয়োগ করে হুবহু বাস্তবধর্মী ছবি ছাপানোর কোনও প্রয়োজনই অনুভব করতেন না।

নিশ্চয়ই অনেক পাঠকেরই মনে হচ্ছে, উইলিয়াম হান্টার-এর ভূমিকা নিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করছি না তো? ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে হান্টার সাহেবকে এতটা বড় করার কোনও মানে হয়? আসলে কিন্তু ওঁকে আমরা আদৌ বড় করছি না। বরং, কমিয়ে দেখাচ্ছি উইলিয়াম হান্টারের কালজয়ী অবদানকে। কেন? মাত্র দুটো উদাহরণ দিলেই ওঁর অবদান সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে উঠবে আমাদের মনে। বীরভূমের অতি সাধারণ ও বৃদ্ধ কৃষকদের সঙ্গে দিনের পর দিন কথা বলেছিলেন তিনি। বীরভূমের মাটির মানুষদের পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত স্মৃতি লিখে রেখেছিলেন নিজের ডায়েরিতে। তার থেকে উনি যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সবই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে। তাঁর লেখা চিরকালের ক্লাসিক ‘অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল’ বইয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি লিখেছেন– পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এমন ভয়াল রূপ ধারণ করার নেপথ্যে দায়ী ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের ‘কর ব্যবস্থা’। কীরকম?

হান্টার বিশ্লেষণ করে দেখালেন, দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা যত বেড়ে চলেছিল, ট্যাক্স দেওয়ার মতো মানুষও ততই কমে যাচ্ছিল। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজকোষে অর্থভাণ্ডার নেমে যাচ্ছিল তলানিতে। সেই ঘাটতি পূরণ হবে কী করে? ওয়ারেন হেস্টিংসের মাথায় এল একটাই উপায়। দুর্ভিক্ষ কবলিত হয়েও যাঁদের প্রাণ তখনও কোনওমতে ধুকপুক করছিল– তাঁদের খাজনা বাড়িয়ে দিলেন তিনগুণ। ভাবা যায়? ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্থিক ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়ে গেল। ওদিকে বাঙালি জাতিটাই মুছে যাচ্ছিল পৃথিবীর বুক থেকে। আইসিএস অফিসার হয়েও ব্রিটিশ সরকারের অনাচারকে যিনি এরকম নির্ভয়ে ফাঁস করে দিতে পারেন, তিনি যে দরিদ্র মানুষের বুকে বাঁধা ভারী পাথরটাকেই সরিয়ে নিচ্ছেন, এ বিষয়ে কোনও সংশয় নেই।
উইলিয়াম হান্টার এই দুঃখী বাঙালিদের মুখেই ভাষা ফোটাতে চেয়েছিলেন। ওঁর লক্ষ ছিল, বাঙালিরা নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা নিজেরাই লিখুক। আর সেকথা লিখুক নিজেদের মাতৃভাষায়। এই কারণেই তিনি বাংলা ভাষায় মাধ্যমিক শিক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। বিপন্ন ও কোণঠাসা বাঙালি জাতির সঙ্গে যে একাত্মতা অনুভব করেছিলেন উইলিয়াম হান্টার, সেই সহমর্মিতাকে বিরল বললেও কমিয়ে বলা হয়। একটি পরাধীন জাতির জীবনে তা কতটা দুর্লভ, তা বুঝতে গেলে অন্য কোনও পরাধীন জাতির সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে। যে কোনও বস্তু বা সিস্টেমকে মাপতে গেলে পাশেই একটা সমগোত্রীয় স্কেল রাখা চাই।

সুতরাং বিশ শতকের প্রথম দু’-দশকের ভারতের মতোই অন্য একটি পরাধীন দেশকেই বেছে নিলাম স্কেল হিসেবে। দেশটার নাম ক্যামেরুন। ম্যাপটা দেখলে মনে হয়, আফ্রিকা যেন তার বিরাট মাথাটি নুয়ে, ক্যামেরুনকে সস্নেহ কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ক্যামেরুনের বুকে উষ্ণ জল ছুঁইয়ে আদর করছে দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক মহাসাগর। ইউরোপীয়দের লোভী চোখ চিরকালই নিবদ্ধ ছিল ক্যামেরুনের দিকে। কারণ, সোনা, হীরে, লোহা, ইউরেনিয়াম, টাইটেনিয়াম, খনিজ তেল– কী পাওয়া যায় না এ-দেশে! অনিবার্য ফল একটাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত এই দেশ ছিল জার্মানির মুঠোয়। এই বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি বিশ্রীভাবে হেরে যাওয়ার পর, ফ্রান্সের থাবায় বন্দি হয়ে ছটফট করতে লাগল ক্যামেরুন। পৃথিবীর সব জাতির মতো ক্যামেরুনের মাতৃভাষা তো ছিলই, সেই সঙ্গে ছিল তার চোখ জুড়িয়ে দেওয়া লিপি। সেই লিপির নাম ‘বামুম’। মাতৃভাষায় বামুম লিপিতে পড়াশোনা করে যাতে ক্যামেরুনের ছেলেমেয়েরা সত্যিকারের আনন্দ পায়, তার জন্য দেশ জুড়ে শত শত বামুম মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আর সেই স্কুলগুলোর উপর যত রাগ গিয়ে পড়ল নতুন ফরাসি শাসকের।
সিংহাসনে বসেই নতুন সরকার সমস্ত বামুম মিডিয়াম স্কুল নিষিদ্ধ করে দিলেন। বামুম ভাষায় লেখা হাজার হাজার বইয়ের অনেক লাইব্রেরি ছিল ক্যামেরুন জুড়ে। সমস্ত পুড়িয়ে দেওয়া হল। ভেঙেচুরে ধ্বংস করে দেওয়া হল সমস্ত বামুম প্রেস। যাতে বামুম অক্ষর লিখতেই ভুলে যায় ক্যামেরুনের সব মানুষ। পড়তেও যাতে ভুলে যায়, তাই নতুন একটি আইন তৈরি করে কঠোরভাবে সেটার প্রয়োগ করা হতে লাগল। আইনটা হল, ক্যামেরুনবাসীদের মাতৃভাষাও লিখতে হবে ল্যাটিন হরফে। যাতে একটি জাতি সম্পূর্ণ মূক ও বধির হয়ে যায়। হলও তা-ই। শুধু অতি গোপনে, বনের অন্ধকারে, ছোট ছোট ভ্রাম্যমাণ ছাপাখানায় বামুম লিপিতে ছাপার কাজ চলতে লাগল। তবে সেগুলো বই নয়– প্যামফ্লেট, বিপ্লবীদের ইশতাহার।

ক্যামেরুনের মানুষের হাত থেকে যে বছর তাদের অক্ষর ছিনিয়ে নেওয়া হল, ঠিক সেই বছর আমরা কী করছি? জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চিঠি লিখছেন রবীন্দ্রনাথ। যে দু’-তিন বছর ধরে, ক্যামেরুনের এ-কোণ থেকে ও-কোণ পর্যন্ত চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে, বামুম লিপির প্রেস ভেঙেচুরে দেওয়া হচ্ছে– ঠিক সেই সময়সীমায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ‘মুক্তধারা’ নাটক। লিখছেন নিজের মাতৃভাষায়, বাংলা অক্ষরে। ল্যাটিন হরফে যদি রবীন্দ্রনাথ লিখতে বাধ্য হতেন, তাহলে কি ‘মুক্তধারা’ নাটকটি মুক্তচিন্তার ভগীরথ হতে পারত? ক্যামেরুনের মাতৃভাষার প্রেস গুঁড়িয়ে দেওয়ার উল্লসিত পাগলামি যখন চলছে– ঠিক সেই বছরগুলোয় সুকুমার রায় একের পর এক লিখে চলেছেন ‘আবোল তাবোল’-এর কবিতা। ল্যাটিন হরফে আবোল তাবোল লেখার ইচ্ছে সুকুমার রায়ের হত কি? ঠিক এখানেই উইলিয়াম হান্টারের নীরব অবদান। অনেকেই খেয়াল করলেন না, বাংলা অক্ষরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, আর দিকে দিকে প্রসারিত করার জন্য কীভাবে যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়েছিলেন এই ব্রিটিশ আইসিএস অফিসার।

এবার ফিরে আসি ‘অপুর সংসার’-এ। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের পদের জন্য প্রার্থী চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল ‘হরিমতী প্রাইমারী বিদ্যালয়’। স্কুলটি খোলা হয়েছে পুরনো একটি নোনাধরা বাড়িতে। বাড়িটার তুলনায় স্কুলের সাইনবোর্ডটা আয়তনে বেশ বড়। তাতে স্কুলের নামের নিচেই লেখা আছে– স্থাপিত ১৩০২। তার মানে ১৮৯৫ সাল। হান্টার কমিশনের প্রস্তাবের প্রভাব তখন তুঙ্গে। মাত্র ১৩ বছর কেটেছে। তাই যেদিকে পারো, যত পারো বাংলা মাধ্যম স্কুল খোলো– এই ছিল স্লোগান। এই হিড়িকের মধ্যে স্কুল-বাড়ির বিষয়ে এতটা খুঁতখুঁতে ভাব থাকলে আর চলে না। শুধু সাইনবোর্ডে বড় বড় বাংলা অক্ষরে স্কুলের নামটা লিখে রাখাই যথেষ্ট। জীবনে প্রথম কলকাতায় পা দিয়েই ওকে খুঁজে বের করতে হবে থাকার জায়গাটা– অপু এটা জানত। ওকে থাকতে হবে একটা ছাপাখানায়। নাম: ‘দ্য রয়াল প্রেস’ (The Royal Press)। ওখানেই কাজ নিয়েছিল ‘অপরাজিত’-র অপু।

অপু লাজুক, তাই কারওকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস না করেই অপু এগিয়ে চলেছে রাস্তার নাম দেখে দেখে। রাস্তার নামগুলো বাড়ির গায়ে স্ক্রু দিয়ে লাগানো। সব নাম লেখা হয়েছে কাস্ট আয়রনের প্লেটের উপর– রোদে জলে শীতেও যাতে অক্ষয় থাকে। কাস্ট আয়রন যেন কলকাতা শহরের সহনশীলতার প্রতীক। আশ্চর্য, রাস্তার সব নামই লেখা হয়েছে ইংরেজি হরফে। তাহলে ইংরেজি হরফ যাঁদের অচেনা, তাঁরা ঠিকানা খুঁজে বের করবেন কী করে? ইংরেজ শাসিত কর্পোরেশন এই সমস্যার কথা ভেবেও দেখেনি। পরপর অপু মুখ তুলে পড়ে নিল হ্যারিসন রোড আর পটুয়াটোলা লেন। একটু পরেই ও পৌঁছে গেল ওর থাকার জায়গায়– দ্য রয়াল প্রেস। খুব কমদামি টিনের পাতের গায়ে তুলি দিয়ে লেখা, যেন মোটরগাড়ির নম্বর প্লেট। কিন্তু হরফটা ইংরেজি! দরজার পাল্লায় আঠা দিয়ে সাঁটা আছে একটা সাদা কাগজ। তাতেও ইংরেজি অক্ষরে লেখা আছে– OFFICE… ইংরেজি হরফে হরফে ছয়লাপ। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি হরফে সাইনবোর্ড লেখাটা ছিল প্রচলিত রীতি। রাস্তার নাম থেকে দোকানের নাম– সবই ইংরেজি অক্ষরে লেখা।


এমনকী, স্বাধীনতার পরেও, ‘পরশপাথর’ ছবিতে পরেশচন্দ্র দত্ত এসেছেন নলিনী শেঠ রোডে একটি সোনার দোকানে। সেই দোকানের সাইনবোর্ডও লেখা হয়েছে ইংরেজি হরফে। নলিনী শেঠ রোড বড়বাজারে সোনাপট্টির অঙ্গ। জোব চার্নক এই অঞ্চলে আসার প্রায় ১০০ বছর আগেই এই অঞ্চলে ছিল শেঠ ও বসাক পরিবারের রমরমা। সব জমিই ছিল তাঁদের। তাঁরা ছিলেন বিপুল সম্পদশালী সুতোর ব্যবসায়ী। সুতো থেকেই এই অঞ্চলের নাম সুতানুটি। শেষ পর্যন্ত বড়বাজারের পুরোটাই চলে গিয়েছিল রাজস্থান ও গুজরাত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের দখলে। নলিনী শেঠ রোড নামটাই শুধু বাঙালির ব্যবসায়িক সাফল্যের চিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে আজও। সুতরাং, অন্তত এই রাস্তায় যেসব দোকান আছে, তাদের সাইনবোর্ডের নিচের দিকে বাংলা অক্ষরে ‘নলিনী শেঠ রোড’ কথাটা লেখা যেতেই পারত। কিন্তু তা তো হয়নি! ‘পরশপাথর’ ছবিতেও দেখলাম নলিনী শেঠ নামটাও লেখা হয়েছে ইংরেজি হরফে।


রাস্তার নাম ইত্যাদি কেন ইংরেজি হরফে লেখা? উত্তরটা এতক্ষণে খুব সহজ হয়ে গিয়েছে আমাদের কাছে। কারণ এইসব নামের সঙ্গে শিক্ষা প্রসারের একফোঁটাও সম্পর্ক নেই। তাই রাস্তার নাম লেখার হরফে উইলিয়াম হান্টারের কোনও প্রভাব পড়েনি। কিন্তু হরিমতী প্রাইমারি বিদ্যালয় ছিল হান্টার সাহেবের মায়াজালে বন্দি। তাই ওই সাইনবোর্ড লেখা হয়েছিল বাংলা অক্ষরে। শুধু স্কুলের নাম নয়– বাংলা অক্ষরের সৌন্দর্যকেও যেন বুক ফুলিয়ে জাহির করছে এই সাইনবোর্ড। এটা শুধু বাহ্যিক (external) চিহ্ন নয়। একইসঙ্গে এই সাইনবোর্ড ব্রিটিশ সরকারের পরিবর্তিত শিক্ষানীতিকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

সত্যজিৎ রায়ের ইতিহাস-চেতনা আমাদের বিস্মিত করে দেয়। ‘অপরাজিত’র অপু গ্রামে স্কুল ইনস্পেক্টরের সামনে আবৃত্তি করেছিল– ‘কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল…’। আবৃত্তির মাঝখানে যখনই ‘সে আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে’ পঙ্ক্তিটি আসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে অপু ‘আমাদের’ এবং ‘আমাদেরই’– খুব জোর দিয়েছিল এই দু’টি শব্দের উপর। ব্রিটিশ সরকারের বেতনভোগী স্কুল ইনস্পেক্টর শুনছিলেন মুগ্ধ চোখে। উইলিয়াম হান্টার যদি বাংলা হরফের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিতেন, তাহলে আর ১২ বছরের অপু ‘আমাদেরই বাংলাদেশ’ শব্দটার উপর এতটা জোর দিতে পারত না। কবিতাটা হয়তো লেখাই হত না। একথা ভাবা অর্থহীন যে, হান্টার সাহেব আমাদের দেশপ্রেম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেটা অসম্ভব। তবে বাংলা অক্ষর ও ভাষার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে উনি দেশপ্রেম বাড়ানোর অনেক পথ খুলে দিয়েছিলেন। শুধু কি তা-ই?
গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, প্রাচীন পাঠশালা ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে জাগিয়ে তোলার প্রস্তাবও উনিই দিয়েছিলেন। ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে এই রকমই একটি পাঠশালা স্থায়ী চিহ্ন এঁকে রেখেছে বাঙালির জাতীয় স্মৃতিতে। একটি দৃশ্য ভেসে ওঠে আমাদের কল্পনায়। বীরভূমের যে বিপুল বটবৃক্ষের নিচে বসে উইলিয়াম হান্টার দিনের পর দিন শুনতেন ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের স্মৃতিকথা, হয়তো সেই একই বটের নিচে একলা বসে জলরং দিয়ে খোয়াইয়ের ছবি আঁকছেন তরুণ সত্যজিৎ। পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন আচার্য নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। দূরে হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো ঝরা পাতার মধ্যে দিয়ে হেঁটে এগিয়ে আসছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর প্রিয় সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিতের দিকে।
তথ্যসূত্র:
১. পরমেশ্বর থঙ্কপ্পন নায়ার– A History of Calcutta’s Streets, ২য় সংস্করণ, ২০১৩, পুঁথি পুস্তক
২. রাধারমণ মিত্র– কলিকাতা দর্পণ, ১৯৮০, সুবর্ণরেখা
৩. বিনয় ঘোষ– সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ১৯৬২, প্যাপিরাস
৪. সৌম্যেন্দু রায়– অপুর সংসার প্রসঙ্গে, পাঁচালী থেকে অস্কার, ১ম খণ্ড, প্রতিভাস
৫. সত্যজিৎ রায়– ফটিকচাঁদ, ১৯৭৬, আনন্দ পাবলিশার্স
৬. অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত Text of Power: Emerging Disciplines in Colonial Bengal, প্রকাশক– ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা প্রেস এবং সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশাল সায়েন্সেস, কলকাতা
৭. অধ্যাপক রণজিৎ গুহ– Small Voice of History, ২০০৯, প্রকাশক– Permanent Black
৮. অধ্যাপক গৌতম ভদ্র– ন্যাড়া বটতলায় যায় ক-বার, ২০১১, ডি এম লাইব্রেরি
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved